২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কৃষি যন্ত্রে এগিয়ে


দেশে কৃষিতে যন্ত্রের প্রবেশ দুয়ার বগুড়া। বগুড়ার তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশ সারাদেশের শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি চাহিদা মেটাচ্ছে। একসময় চীন, জাপান, কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কৃষি যন্ত্রাংশ এদেশের বাজার দখল করে থাকলেও এখন তা দখলে নিয়েছে বগুড়ার তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশ। বগুড়ার তৈরি কৃষি যন্ত্রাংশ একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করছে। অন্যদিকে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বগুড়ার গোহাইল এলাকায় চল্লিশের দশকে ধলু মেকানিক নামের এক মেকানিক প্রথম হাল্কা প্রকৌশল কারখানা স্থাপন করেছিলেন। তার দেখাদেখি অল্প কয়েকটি কারখানাও সেখানে গড়ে ওঠেছিল। তবে বঙ্গবন্ধুর সবুজ বিপ্লবের ডাকের পর এই এলাকায় কৃষি যন্ত্রের অনেকগুলো কারখানা গড়ে ওঠে।

গোহাইল রোড স্টেশন রোডের দুই ধারে কৃষি মেশিনারি দোকান, লেদ মেশিন ও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) এলাকায় কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা, ঢালাই কারখানা স্থাপিত হতে থাকে। আশির দশকে এসে বগুড়াতে হাল্কা প্রকৌশল শিল্প ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। ৮০-এর দশকের প্রথম ভাগেই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয় স্বল্প দামের সেচযন্ত্র ও পাওয়ার টিলার। যা মধ্যম সারির কৃষকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসে। এরপর বগুড়াকে আর পেছনের দিকে তাকাতে হয়নি। নিত্যনতুন আধুনিক কৃষি যন্ত্রের বড় বাজারে পরিণত হয় বগুড়া। এক জেলা থেকে আরেক জেলা উপজেলায় পৌঁছে যায় বগুড়ার তৈরি কৃষিযন্ত্র সেচপাম্প ইত্যাদি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলায় বগুড়ার তৈরি কৃষিপণ্য বেচাকেনার বড় বাজারে পরিণত হয়।

৯০-এর দশকের শেষ দিকে বগুড়াকে কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনে জোনে (এপিজেড) পরিণত করার দাবি তোলেন শিল্প উদ্যোক্তরা। এরই মধ্যে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) নিজস্ব চত্বরে কৃষি যন্ত্রপাতি ও বীজ প্রযুক্তি মেলার আয়োজন করে। কৃষিশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কৃষি উৎপাদন সহায়ক নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের পরিচয় করিয়ে দিতে এবং কৃষিপণ্য ও বীজের সঠিক ব্যবহার জানাতে প্রতি বছর এ ধরনের মেলার আয়োজন করে আরডিএ। আরডিএ-র এক গবেষণায় দেখা গেছে দেশে দেশজ ও আমদানি করা কৃষিযন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের বার্ষিক বাজারের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে আড়াই হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি দেশীয়। যার ৮০ শতাংশই পূরণ করে বগুড়া। অর্থাৎ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বগুড়ার তৈরি। এসব যন্ত্র তৈরিতে বগুড়ায় গড়ে উঠেছে উন্নতমানের ফাউন্ড্রি শিল্প। বলা হয় শিল্পের মাদার ইন্ডাস্ট্র্রি ফাউন্ড্রি। ভারত ও চীন প্রথমে ফাউন্ড্রি শিল্পকে ডেভেলপ করে ভারি শিল্পের প্রসারে পৌঁছেছে। এই ধারায় কৃষি যন্ত্রপাতির বাজারকে আরও সমৃদ্ধ করতে বগুড়ায় ফাউন্ড্রি শিল্পের ব্যাপ্তি বাড়ানো হয়েছে।

এই কাজে পাইওনিয়র হিসাবে নিরলস কাজ করছেন বগুড়ার তরুণ শিল্প উদ্যোক্তা আইনুল হক সোহেল। তিনি বাংলাদেশ ফাউন্ড্রি ওনার্স এ্যাসোসিয়েশনের (ফোয়াব) সভাপতি। তিনিই প্রথম ভারত থেকে আটো ফাউন্ড্রি মেশিন আমদানি করেন। ঢালাই শিল্পের এমন আধুনিকায়নের অগ্রযাত্রায় বগুড়ায় বেশ কয়েকটি ফাউন্ড্রি শিল্প স্থাপিত হয়েছে। এখন শুধু কৃষি যন্ত্রাংশই নয় বিদেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অতি উন্নতমানের ভারি শিল্পের যে কোন যন্ত্রাংশ বানানো হচ্ছে বগুড়ায়। ফোয়াব সভাপতি আইনুল হক সোহেল বললে, সরকার ফাউন্ড্রি শিল্পকে এগিয়ে নিতে প্রায়োগিক কাজে আরও সহায়তা দিলে বগুড়া দেশের সকল শিল্পের যন্ত্র তৈরির বড় মার্কেটে পরিণত হবে। বর্তমান সরকার ঘোষণা দিয়েছেন ২ হাজার ২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার এবং ২ হাজার ৪১ সালের মধ্যে দেশকে ধনী দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার। আইনুল হক সোহেলের মতে বগুড়াকে এখনই কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনের জোনে (ইপিজেডের আদলে এপিজেড) পরিণত করলে নির্ধারিত সময়ের আগে ধনী দেশের অন্তর্ভুক্তি নয় সরাসরি ধনী দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। কৃষিযন্ত্রপাতি উৎপাদনে বগুড়ায় বর্তমানে আধুনিক ও ছোটবড় মিলিয়ে ৭০টি ফাউন্ড্রি, কৃষিযন্ত্রপাতি উৎপাদন কারখানা ও ওয়ার্কশপ ৮ শ’টি, কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদন কারখানা ও ওয়ার্কশপ প্রায় দেড় হাজারটি এবং কৃষিযন্ত্রপাতি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ওয়ার্কশপ রয়েছে অন্তত ২০ হাজারটি। সেচকাজে ব্যববহৃত অগভীর নলকূপ ও পাওয়ার পাম্পের জন্য সকল সেন্ট্রেফিউগাল পাম্প, ধান-গম-ভুট্টা মাড়াই যন্ত্রের সরবরাহ সম্পূর্ণ দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। যার প্রায় ৮০ শতাংশই পূরণ করে বগুড়া। বিশেষ করে সেচপাম্প, ধান-গম-ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র ডিজেল ইঞ্জিনের পিস্টন লাইনার ইঞ্জিন ও মেশিনের খুচরা যন্ত্রাংশের বাজার দখল করে আছে বগুড়া।

বর্তমানে আরডিএ-র উদ্ভাবিত কৃষিযন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ কয়েকটি কৃষি কেন্দ্রে সরবরাহ করা হচ্ছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশের সঙ্গে বগুড়ার তৈরি যন্ত্রাংশের মান পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বিদেশের চেয়ে তা কয়েকগুণ উন্নত ও টেকসই। বিশেষ করে লায়নার, গজন পিন, গজন বুশ, হেড গ্যাসকেট, হেড সেট, ভাল্ব গাইড, ফুয়েল ফিল্টার, পাম্প, ইম্পেলার, ওয়েল সিল, এয়ার ক্লিনার, সাইলেন্সার, চেইন কভার, বুশ গাইড, ওয়াশার, পিটি চেন কভার, পিটি পুলি, ডি পুলি, ফুয়েল কি, ফুয়েল পাইপ, ওয়েল ক্যাচার, গভর্নর বুশ, এসএফ পুলি টেনশন সেট, হাউজিং ফুয়েল ট্যাংক এতটাই উন্নতমানের যে এসব যন্ত্রের অর্ধেকের বেশি আর আমদানি করতে হয় না। এর বাইরে আরও অনেক যন্ত্রপাতি তৈরি হচ্ছে। যার মধ্যে আছে ড্রাম সিডার উইডার, আলু উত্তেলন যন্ত্র, আলু গ্রেডিং যন্ত্র, রাইস গ্রেডার, মাছ ও মুরগীর খাবার তৈরি যন্ত্র, রাইস পলিশার, অটো ক্রাশার মেশিন, অটো মিক্সচার মেশিন, চিড়া মুড়ি তৈরি মেশিন, ওয়েল মিল, ধান ভাঙানো যন্ত্র, ইট মিক্সিং মেশিন, ড্রায়ার মেশিন ইত্যাদি। বগুড়ায় তৈরি এসব যন্ত্রপাতি দেশের মোট চাহিদার ষাট ভাগ মেটাচ্ছে।

বগুড়ার ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে। উদ্যোক্তারা নিজস্ব তহবিল দিয়ে গড়ে তুলেছেন এসব প্রতিষ্ঠান। এসব শিল্পে ব্যাংক ঋণ বা সরকারি সহযোগিতার পরিমাণ খুবই কম। শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আবার যন্ত্রপাতি তৈরিতে আধুনিক মেশিনারির অভাবও রয়েছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে। অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করছে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান। কৃষি প্রধান উত্তরাঞ্চলে বগুড়া যন্ত্রের শৈলীর মাধ্যেমে কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন সরকারী পৃষ্ঠপোষকাতা। এবং তা করা হলে বগুড়ার এই শিল্প শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদাই মেটাবে না, বিদেশে রপ্তানির মাধ্যেমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও করতে সক্ষম হবে।