১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩১ ভাদ্র ১৪২৬, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 

বেগম জিয়ার দল গোছানোর টার্গেট পূরণ হচ্ছে না

প্রকাশিত : ২৩ জুলাই ২০১৫
  • মা-ছেলের কৌশল আপাতত ভেস্তে

শরীফুল ইসলাম ॥ ঈদের পর পর দল গোছানোর কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। কিন্তু অনেক নেতা স্পর্শকাতর মামলার আসামি এবং বেশ ক’জন কারাগারে থাকাসহ দলটি এখনও নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত থাকায় এখনই দল গোছানোর কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। তাই এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যে খালেদা জিয়া সর্বস্তরে দল গোছানোর যে টার্গেট নিয়েছিলেন তা পূরণ হচ্ছে না।

সর্বস্তরে কমিটি পুনর্গঠন শুরু করতে ঈদের আগে থেকেই ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি শুরু করেছিল বিএনপি হাইকমান্ড। এ জন্য দলের ক’জন নেতার সহযোগিতায় একটি কর্মপরিকল্পনাও করেছিলেন চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। আশা ছিল রমজানে ওমরাহ করতে সৌদি আরব গিয়ে ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করে সর্বস্তরে দল গোছানোর কৌশল চূড়ান্ত করবেন। এ ব্যাপারে তারেক রহমানও একটি ছক করে রেখেছিলেন। কিন্তু নানামুখী সমস্যায় শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সৌদি আরব যাওয়া হয়নি। আর এতেই দল গোছানোর বিষয়ে মা-ছেলের কৌশল আপাতত ভেস্তে গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির এক সিনিয়র নেতা জনকণ্ঠকে জানান, ঈদের আগে দল গোছানোর বিষয়ে খালেদা জিয়া যে টার্গেট করেছিলেন তা আপাতত পূরণ হচ্ছে না। কারণ, তিনি আশা করেছিলেন ঈদের আগেই হয়ত কারাবন্দী অধিকাংশ দলীয় নেতা মুক্তি পাবেন। কিন্তু এখনও অনেক নেতা কারাবন্দী রয়ে গেছেন। কেউ কেউ গ্রেফতার এড়াতে বিদেশে চলে গেছেন। শীঘ্র তাদের দেশে ফেরার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। আবার সিনিয়র নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ রয়েছেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন মামলায় আসামি করা হয়েছে দলের অসংখ্য নেতাকর্মীকে। এসব মামলার কারণে তারা হয়রানির শিকার হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি নেই। তাই শীঘ্রই দল গোছানোর কাজে হাত দিতে পারছে না দলীয় হাইকমান্ড।

উল্লেখ্য, নবেম্বরের মধ্যে বিএনপির সকল শাখা কমিটি, নয়টি অঙ্গ ও দুটি সহযোগী সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যে দলের জাতীয় কাউন্সিল করে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি পুনর্গঠন করতে চেয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এবারের কমিটি পুনর্গঠনে বর্তমানে দল থেকে দূরে থাকা সংস্কারপন্থী নেতাদেরও সম্পৃক্ত করা, অন্য দল থেকে ক’জনকে নিয়ে আসা এবং নিষ্ক্রিয় নেতাদের বাদ দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দলের ব্যাপারে তার এসব পরিকল্পনা এখন ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

দলকে গতিশীল করে আস্তে আস্তে আবারও সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বিভিন্ন মহলের পরামর্শে সারাদেশের সকল স্তরে কমিটি পুনর্গঠন করতে চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া। এ জন্য তিনি লন্ডন প্রবাসী ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও একটি পরিকল্পনা নিতে বলেছিলেন। মায়ের নির্দেশে লন্ডনে বসে তারেক রহমানও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। আশা করেছিলেন ওমরাহ করতে গিয়ে মায়ের সঙ্গে সৌদি আরবে দেখা হলে সামনাসামনি সবকিছু বুঝিয়ে বলবেন তাকে। কিন্তু তা আর হলো না। মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার শীঘ্রই কোন সম্ভাবনাও নেই।

জানা যায়, বার বার আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ায় দেশ-বিদেশে ৫ বার ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল বিএনপির দুর্বলতা প্রকাশ পায়। এ পরিস্থিতিতে ছেলে তারেক রহমানসহ বিভিন্ন মহলের পরামর্শে সর্বস্তরে কমিটি পুনর্গঠনের সময় এবার ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ২০১৩ সালের আন্দোলন ও এ বছর ৬ জানুয়ারি থেকে টানা ৯২ দিনের আন্দোলনে যাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাদের প্রাধান্য দিয়ে কমিটি করতে চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া। আর বিভিন্ন সময় বিএনপি ছেড়ে অন্য দলে যোগ দেয়া কিছু নেতাকেও ফিরিয়ে এনে দলে স্থান দিতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে বর্তমানে দলে নিষ্ক্রিয়দের মধ্য থেকে অনেকের নামই বাদের তালিকায় রাখা হয়েছিল। কিন্তু আপাতত এ প্রক্রিয়া আর হালে পানি পাচ্ছে না। কারণ, খালেদা জিয়া নিজেই বিভিন্ন মামলা মোকাবেলা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। কারাবন্দী অন্য নেতাদেরও মুক্ত করতে পারছেন না। যারা মামলামুক্ত আছেন তারাও দলে সক্রিয় হচ্ছেন না। উপরন্তু দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ হাইকমান্ডের সমালোচনা করছেন।

এদিকে বিএনপির সংস্কারপন্থীদের মধ্যে কেউ কেউ ভেতরে ভেতরে আবারও জিয়ার আদর্শে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে খালেদা জিয়াকে বেকায়দায় ফেলতে চাইছেন। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহির্প্রকাশ ঘটাতেই তারা এমনটি করতে চাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তাদের মতে ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক নেতৃত্বের দাপটে দলের অনেক নেতাকেই কারণে-অকারণে হেনস্তা করা হয়। দলীয় অবস্থান খর্ব হওয়ার ভয়ে তখন তারা নীরবে সব সহ্য করে গেছেন। আবার মাত্রাতিরিক্ত অপমান সহ্য করতে না পেরে অনেকে মানে মানে কেটে পড়েছেন। কেউবা তখন দলে থেকেও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়াসহ দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা সংস্কারের পক্ষে চলে যান। কিন্তু ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের আগে মান্নান ভুঁইয়া ও সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান মারা যান। সেই কাউন্সিলের পর সংস্কারপন্থী বেশ ক’জন নেতাকে দলে ফিরিয়ে নিলেও অনেকেই বাইরে রয়ে যান। তাদের দলে ফিরিয়ে আনতে বেশ ক’বার উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে এসব নেতা এখন ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয়ে নতুন দল গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে।

দল পুনর্গঠন হলে বিএনপির যেসব নেতা জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে বর্তমানের চেয়েও ভাল ভাল পদ পেতেন তাদের মধ্যে এখন হতাশা দেখা দিয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, সেলিমা রহমান, সাদেক হোসেন খোকা, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. ওসমান ফারুক, আবদুল আউয়াল মিন্টু, শামসুজ্জামান দুদু, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, সালাহউদ্দিন আহমেদ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুস সালাম, শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, যুববিষয়ক সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, সহ-মহিলাবিষয়ক সম্পাদক শিরিন সুলতানা, সহ-তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবি, মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন অসীম প্রমুখ। আর বাদের তালিকায় ছিলেন নিষ্ক্রিয় নেতাদের মধ্যে বেশ ক’জন নেতা।

প্রকাশিত : ২৩ জুলাই ২০১৫

২৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: