২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সুন্দরবনে তেলবাহী একতলা জাহাজ চালাতে চাপ সৃষ্টি


রশিদ মামুন ॥ সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে এক প্রকোষ্ঠের (একক স্তর) জাহাজে তেল পরিবহন করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে চাপ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। সারাসরি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে আরও দুই বছর এক প্রকোষ্ঠের জাহাজে করে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে তেল পরিবহনে চুক্তি করতে বলা হচ্ছে। এছাড়া জাহাজ মালিকদের সরকার দলীয় নেতারাও প্রতিদিনই নতুন চুক্তি করতে বিদ্যুত জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন সুন্দরবনের স্বার্থে নেয়া সিদ্ধান্তটি এত দ্রুত তারা বদলাতে চান না। এছাড়া এক প্রকোষ্ঠের জাহাজ ছাড়াই তেল পরিবহনে কোন সমস্যা হচ্ছে না। সুন্দরবনে একের পর এক জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটছে। কোন অবস্থানে বিদ্যুত জ্বালানি মন্ত্রণালয় নিজেদের গাফিলতিতে এর দায় নিতে পারে না। তবে উচ্চ পর্যায়ের চাপ থাকার কারণে সরাসরি বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুত জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কেউ কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দাবি দেখে মনে হচ্ছে সুন্দরবনের চেয়ে গুটিকয়েক নৌযান মালিকের স্বার্থই তাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে বিপিসি সূত্র জানায়, তাঁরা এক প্রকোষ্ঠের জাহাজে তেল পরিবহনে কোন নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। শুধুমাত্র তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা এবং যমুনাকে একটি নির্দেশনা দিয়েছে, যাতে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে এক প্রকোষ্ঠের জাহাজে করে তেল পরিবহন করা না হয়। দেশে সব মিলিয়ে ২১৯টি ট্যাংকার রয়েছে যা অভ্যন্তরীণ রুটে তেল পরিবহন করে। এর মধ্যে ৫১টির দুই প্রকোষ্ঠ রয়েছে। বাকি সবগুলোই এক প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট। দেশে বিদ্যুত উৎপাদন বৃদ্ধি করায় জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়ে যায়। এতে করে অনেকেই বালুবাহী এক প্রকোষ্ঠের জাহাজও জ্বালানি তেল পরিবহনের কাজে ব্যবহার করছে। গত ডিসেম্বরে সুন্দরবনের জাহাজ ডুবির পর বলা হয় জাহাজটি আগে বালু পরিবহন করতো।

২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীতে ফার্নেস অয়েল নিয়ে ‘সাউদার্ন স্টার সেভেন’ নামের একটি জাহাজ ডুবে যায়। বিষয়টি ওই সময়ে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সরকার সুন্দরবনের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা কামনা করে। যা ওই সময় বিশ্ব পরিম-লেও প্রভাব ফেলে। জাতিসংঘ সুন্দরবনের ক্ষতি পর্যবেক্ষণ এবং কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারের সহায়তায় এগিয়ে আসে। এরপর সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধও ছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট হিসেবে মংলা ঘষিয়াখালি চ্যানেলের সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে আবারও পন্যবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমোদন দেয় বিআইডব্লিটিএ। কিন্তু গত ৪ মে সুন্দরবনে আবারও জাহাজডুবির ঘটনা ঘটে। শরণখোলা রেঞ্জের মরা ভোলা এলাকার ভোলা নদীর চরে আটকে সারবাহী জাহাজটি ডুবে যায়। এমভি জাবালে নূর নামের জাহাজটি ৫০০ টন সার নিয়ে মংলা থেকে ঢাকায় যাচ্ছিল। এই রুটে গত বছর ডুবে যাওয়া চারটি জাহাজের মধ্যে এমভি শাহিদূত, এমভি হাজেরা-২, এমভি নয়ন শ্রি-৩ উদ্ধার করা সম্ভবই হয়নি।

বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, এবং জাতিসংঘের রামসার কনভেনশনের তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমোদন দেয়ায় বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। উপরন্তু এই রুটে জাহাজ ডুবির ঘটনার ক্ষতি হ্রাস করতে সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে সন্তোসজনক কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি। জাহাজডুবির পর স্থানীয় জনসাধারণ ওই তেল সংগ্রহ করে বিপিসির কাছে বিক্রি করেছে। বাকি তেল সুন্দরবন ও আশপাশের নদী খালে ছড়িয়ে পড়েছে। বড় ধরনের বিপর্যয় রোধের প্রস্তুতি না থাকায় পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকে যায়।

বিআইডব্লিটি এ সূত্র জানায়, ২০১১ সালের নবেম্বরে বিআইডব্লিটিএ সবকিছু অগ্রাহ্য করে সুন্দরবনের মধ্যে দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমোদন দেয়। শুরুতে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫টি জাহাজ চললেও এখন তার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০টিতে। এসব দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে দ্রুতই এক প্রকোষ্ঠের জাহাজে তেল পরিবহন বন্ধ করে দেয় বিপিসি। এতে বিপিসির তেল পরিবহন বা তেলের সরবরাহ বিতরণ ব্যবস্থায় কোন সমস্যা হচ্ছে না। গুটিকয়েক নৌযান মালিক এ রুটে তেল পরিবহন করতে পারছেন না। চলতি মাসের প্রথম দিকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে একটি বৈঠকও করে। যাতে জাহাজ মালিকরা তেল পরিবহন না করতে দেয়ার প্রতিবাদ করে।