২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সিলেটের কুমারগাঁওয়ে আকাশে-বাতাসে ক্ষোভ আর ঘৃণা


সালাম মশরুর, সিলেট অফিস ॥ সিলেট শহরতলীর কুমারগাঁও। এখন আলোচিত এক এলাকা, আকাশে-বাতাসে ক্ষোভ আর ঘৃণা। শিশু সামিউল ইসলাম রাজনের নৃশংস হত্যাকা-ের ঘটনায় সবার মন ভারাক্রান্ত। মুখে মুখে শুধু পাষ- খুনীদের বিচারের দাবি। এখানকার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার চিত্রও অনেকটা বদলে গেছে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ভিড় করছেন রাজনের গ্রামে। যাচ্ছেন রাজনের কবর দেখতে, সমবেদনা জানাচ্ছেন বাবা-মা, আত্মীয়-পরিজনদের। রাজনের মৃত্যুশোকে কাতর হয়ে আছে গোটা এলাকা। যেখানে রাজনের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল, সেই মার্কেটটি এখন অভিশপ্ত মনে হয় সবার কাছে। এই মার্কেটে ঘাতক মুহিত ও কামরুলের দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও আরও চারটি দোকান রয়েছে। এ ঘটনার পর অন্য ব্যবসায়ীরাও দোকান খোলেননি। আশপাশের অন্য মার্কেট ও দোকানপাট গত ছয়দিন যাবত বন্ধ রয়েছে।

বুধবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের কুমারগাঁও বাসস্ট্যা-ের কিছু দূরে একটি মার্কেটের সারিবদ্ধ কয়েকটি দোকান শেষ মাথায় ‘ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামে দোকানের পাশে একটি খালি জায়গা। সেখানে কয়েকটি বিদ্যুতের খাম্বা, এই খাম্বার সঙ্গে মার্কেটের কয়েকটি ভ্যানগাড়ি তালা দিয়ে রাখা হতো। ঘটনার দিন শিশু রাজন মায়ের দেয়া সবজি নিয়ে সেখানে বিক্রি করতে গেলে মার্কেটের প্রহরী ঘাতক ময়না মিয়া রাজনকে ভ্যানগাড়ি চুরির অপবাদে তাকে আটকে খাম্বার সঙ্গে বেঁধে রাখে। পরে মার্র্কেটের পাশে অবস্থিত কামরুল মুহিতদের বাসায় খবর দেয়। তারা এসে চার ঘণ্টাব্যাপী রাজনকে অবর্ণনীয় নির্যাতন করে এবং তা মোবাইলে ভিডিও করে। একপর্যায়ে রাজনের মৃত্যু হয়।

শিশু রাজনের চাচা শহিদুর রহমান আলাপকালে বলেন, দুই ভাইয়ের মধ্যে রাজন বড়। সে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ত, তার ছোট ভাইয়ের বয়স ৬ বছর। তাদের অভাবের সংসারে রাজনের বাবা আজিজুর রহমান আলম মাইক্রোবাস চালক। রাজনের বাবার আয়ে সংসার চলত না বলে রাজনের মা মাঝে মাঝে তাদের ক্ষেতের সবজি তুলে তা রাজনকে দিয়ে বাজারে বিক্রির জন্য পাঠাতেন।

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ১৩ বছরের রাজনের কেবলমাত্র শরীর ফুটে উঠছিল। সে বাড়ির সবার মধ্যে খুব স্বাস্থ্যবান সুন্দর ছিল। আর তার ওপর লোলপ দৃষ্টি পড়ে জানোয়ারদের। আর সেই উদ্দেশ্য হাসিলে ব্যর্থ হয়েই চৌকিদার ময়নার সহযোগিতায় তাকে এমনভাবে হত্যা করা হয়।

তিনি বলেন, চৌকদার ময়না বদমাশ প্রকৃতির লোক। গ্রামের বিদেশীরা এলে তাদের চামচামি করে সে বাড়তি উপার্জন করে। রাজনকে শুধু বলৎকারে ব্যর্থ হয়ে খুন করা হয়েছে। কেন তিনি এ ধারণা করছেন, তা জানতে চাইলে রাজনের চাচা শহিদুর রহমান বলেন, কামরুল ও তার পরিবারের অন্য ভাইয়েরা দুষ্ট ও বদমাশ প্রকৃতির লোক তা এলাকার সবাই জানে। সে দেশে এলেই বিভিন্ন খারাপ কাজে সময় কাটিয়ে আবার চলে যায়। তাদের মালিকানাধীন ‘ভাই ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং’ সব সময় খারাপ সন্ত্রাসী লোকদের আড্ডাস্থল ছিল। কামরুল দেশে এলে বন্ধুবান্ধব নিয়ে এখানে আড্ডা দিত। তাদের টাকা আর প্রভাবের ভয়ে এলাকার অনেকে তাদের অপকর্ম নিয়ে মুখ খুলতে চাইত না।

তিনি বলেন, আমার ভাতিজাকে হারিয়ে আমার হার্টের রোগী ভাই মেডিকেল ভর্তি। আমার ভাইয়ের বউয়ের দিকে তাকাতে পারছি না। সান্ত¡নার কোন ভাষা নেই।

নিহত রাজনের মায়ের সঙ্গে কথা বলতে গেলে দেখা যায়, টিনশেডের সেমিপাকা ঘরের ভেতরে কেউ কাঁদছে, কেউ রাজনের কথা বলে স্মৃতিচারণ করছে। এলাকা ও আশপাশের মুরুব্বি ও বিভিন্ন বয়সের লোক কারও মুখেও শোনা যায়নি রাজন চোর বা খারাপ ছিল। রাজনের মা লুবনা আক্তার কুটিনা পাগলপ্রায়। তিনি বিলাপ করতে করতেই বললেন, আমার ছেলে চোর না। সেহরি খেয়ে আমি ক্ষেত থেকে সবজি তুলে তাকে বাজারে পাঠাই, সে বলে মা তুমি তো রোজা আমি তাড়াতাড়ি এগুলো বিক্রি করে চাল নিয়ে আসব আমাকে ভাত দিও। বুকফাটা আর্তনাদে বলেন, আমার ছেলে আর ফিরে এলো না। আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিন। নইলে যারা আমার ছেলেকে পানি না দিয়ে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মেরেছে, তাদেরও যেন সেইভাবে পানি না দিয়ে মারা হয়। আমি কামরুলসহ সবার ফাঁসি চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার অনুরোধ, তাঁদের এমন শাস্তি দিন, যেন আর কোন মা এমন সন্তানহারা না হয়। আর কোন বাবা যেন সন্তান হারানোর বেদনায় হার্টএ্যাটাকে মেডিক্যালে ভর্তি না হয়। আমার সন্তান হত্যার বিচার করুন।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: