২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ২ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ঈদের কেনাকাটায় সরগরম গোটা দেশ


রহিম শেখ ॥ ঈদ উৎসব বলে কথা। বড় উৎসব তাই বিরাট আয়োজন। আর এই উৎসবকে বরণ করতে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় সরগরম গোটা দেশ। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত চাঙ্গা হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। ঈদকেন্দ্রিক পোশাক-আশাক ও বিভিন্ন ধরনের উপহার-সামগ্রীর বাজার জমে উঠেছে। প্রতিটি মার্কেট ও ফুটপাথের লোকের ভিড়ই বলে দেয় বেচাবিক্রি কী পরিমাণ বেড়েছে। মানুষের জমানো টাকা, উৎসবভাতা, বেতন ও বোনাস সবই ক্রেতারা খরচ করছেন ঈদ উৎসব উদ্যাপনকে সামনে রেখে। ফলে বিপুল পরিমাণ এ অর্থ ব্যয়ের কারণে অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতিশীলতা আসছে। ব্যাংকিং খাতে লেনদেন বেড়েছে ব্যাপক হারে। ঈদ উপলক্ষে রেকর্ড গতিতে দেশের অর্থনীতিতে জমা হচ্ছে প্রবাসীদের রেমিটেন্স। ঈদের কেনাকাটায় এটিএম বুথে প্রতিদিন ১৫ কোটি টাকার বেশি উত্তোলন করছেন গ্রাহকরা। মোবাইলে লেনদেন হচ্ছে ৪২০ কোটি টাকার বেশি। এদিকে মানুষের চাহিদা পূরণে বাজারে অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আজ ২৮ রমজান। দু-একদিন পরেই পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। আগামীকাল শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে সরকারী ছুটি। এর সঙ্গে শুরু হয়েছে ঈদ উৎসবও। শেষ সময়ে কেনাকাটার জন্য ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে রাজধানীর মার্কেটগুলোয়। গোটা রাজধানী রূপ নিয়েছে ঈদ মার্কেটে। কেনাকাটা চলছে গভীর রাত পর্যন্ত। উপজেলাগুলোতে জমজমাট ঈদের বাজার। পোশাকের সঙ্গে গৃহস্থালি জিনিসপত্রের বাজারে বেচাবিক্রি ভাল হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সূত্রেপ্রাপ্ত তথ্যমতে, ঈদবাজার ঘিরে ইতোমধ্যে কয়েক হাজার কোটি টাকা লেনদেন ছাড়িয়ে গেছে। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী কতটুকু ব্যবসা হচ্ছে এ নিয়ে রয়েছে ব্যবসায়ীদের ভিন্ন মত। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এসএ কাদের কিরণ জনকণ্ঠকে বলেন, এবার রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় ঈদের ব্যবসা ভাল যাচ্ছে। দুই বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতায় উৎসবে ব্যবসা করতে পারেননি দোকানিরা। এখন দোকানগুলোয় বেচাকেনা অন্য সব সময়ের চেয়ে ভাল। তিনি বলেন, দেশে সহিংসতা না থাকায় ব্যবসায়ীরা গত বছরের চেয়ে দ্বিগুণ বিনিয়োগ করেছেন। এতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বিক্রি তিনগুণ বাড়বে। এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম জনকণ্ঠকে বলেন, ঈদ অর্থনীতির প্রবাহ ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামে। এটা খুবই ইতিবাচক দিক। ঈদ সামনে রেখে ক্রেতাদের খরচ বাড়ছে। আর ক্রেতাদের খরচ বাড়লে তার প্রভাব অর্থনীতির ওপর এসে পড়বে, যা ঈদ মার্কেট ঘিরে হচ্ছে।

ঈদের অর্থনীতি চাঙ্গা করেছে নগদ অর্থের প্রবাহ। এটিএম বুথ, ব্যাংকের শাখার মাধ্যমে প্রচুর নগদ টাকার লেনদেন হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও ঈদকেন্দ্রিক ২২ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছেড়ে টাকার পরিমাণ বাড়িয়েছে। ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটায় এটিএম বুথ থেকে টাকা উত্তোলন দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইস অব বাংলাদেশে (এনপিএসবি) বর্তমানে ৪২টি ব্যাংকের গ্রাহকরা অন্যের বুথ থেকে এটিএম কার্ড দিয়ে টাকা উত্তোলন করতে পারছেন। প্রতিদিন গ্রাহকরা গড়ে ১৫ কোটি টাকা বেশি উত্তোলন করছেন, যা গত মার্চের গড় লেনদেনের তুলনায় দ্বিগুণ। ঈদ উপলক্ষে বেড়েছে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন। প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হচ্ছে ৪২০ কোটি টাকার বেশি। দেশের আপনজনদের ঈদের আনন্দ বাড়িয়ে দিতে অনেক বেশি রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। ইতোমধ্যে রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্সের টাকা যোগ হয়েছে দেশের অর্থনীতিতে। সদ্য সমাপ্ত জুনে ১৪৪ কোটি ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। অর্থবছর শেষে সবচেয়ে বেশি ১৫ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স এসেছে। এদিকে ১০ জুলাই পর্যন্ত রেমিটেন্স এসেছে ৪৮ কোটি ডলার। এ প্রসঙ্গে রূপালী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক জনকণ্ঠকে বলেন, এবারের ঈদে ব্যাংকিং লেনদেন অনেক বেশি। বিশেষ করে ভোক্তারা অনেক বেশি খরচ করছেন। দোকানি ও ব্যবসায়ীরা পণ্যের পসরা সাজাতে ব্যাংক থেকে প্রতিদিনই টাকা তুলছেন। সব মিলিয়ে স্বাভাবিকের তুলনায় লেনদেন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

জানা গেছে, সরকারের হিসাবে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রতিমাসে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে। ওই হিসাবে এক-তৃতীয়াংশের সামান্য বেশি বোনাস বাবদ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ইতোমধ্যে দেয়া হয়েছে। বেতন ও বোনাস পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের কেনাকাটায় মেতে উঠেছেন তাঁরা। অবশ্য বোনাসের টাকার পুরোটাই তাঁরা ব্যয় করেন পোশাক কেনাকাটায়। অনেকে কেনাকাটা শেষে তাদের পরিবারকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এ জন্য কয়েক দিন আগেই তারা কেনাকাটা শেষ করেছেন। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে দেশে ২০ লাখ দোকান, শপিংমল, বাণিজ্য বিতান রয়েছে। গড়ে একটি দোকানে ৪ জন করে ধরা হলে ৮০ লাখ কর্মচারী ও কর্মকর্তা কাজ করছেন। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এসএ কাদের কিরণ বলেন, একজন কর্মীকে কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা ও ঊর্ধ্বে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বোনাস দেয়া হচ্ছে দোকানগুলোতে। ওই হিসাব সামনে রেখে নিচে ৫ হাজার টাকা ধরা হলেও বোনাস বাবদ ৪ হাজার কোটি টাকা কর্মীদের দেয়া হয়েছে। কর্মীরা এ টাকার পুরোটা দিয়েই নিজ এবং পরিবার-পরিজনের জন্য ঈদের কেনাকাটা করবেন। প্রকৃত অর্থে বোনাসের টাকা আরও বেশি হবে। দোকান কর্মচারীদের বোনাসের সঙ্গে বেতনও রয়েছে। ফলে অর্থনীতি গতিশীলতায় বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে বলে তিনি মনে করেন।

৩০ লাখ গার্মেন্ট শ্রমিকের বেতন হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু ভাল প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের ঈদ বোনাস দিয়ে দিয়েছে। জানা গেছে, পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা বেতন-বোনাস পেয়ে কেনাকাটায় মেতে উঠেছেন। ঈদে কমপক্ষে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বোনাস যাচ্ছে শ্রমিকদের হাতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিএমইএ’র সাবেক এক নেতা বলেন, তার একটি ফ্যাক্টরিতে ঈদ বোনাস গুনতে হয় ৪ কোটি টাকা। তাঁর মতে, কমপক্ষে ২০০ পোশাক শিল্প এবং তার চেয়ে বড় আরও দেড় শ’ শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া মাঝারি ধরনের অসংখ্য তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। তার ধারণা, বোনাসের টাকা ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তবে কত টাকা বেতন-বোনাস দেয়া হয় বা প্রতিমাসে এ শিল্পের ৩৫ লাখ শ্রমিকের বেতন বাবদ ব্যয় কত এ হিসাব পাওয়া যায়নি। ঈদ বাজারের অর্থনীতি নিয়ে এ পর্যন্ত সূচারুভাবে কোন গবেষণা হয়নি, তাই সুস্পষ্ট কোন রেকর্ডও পাওয়া যায়নি। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, মানুষের আয়ের ৬২ শতাংশ ব্যয় করা হয় ভোগের পেছনে। অর্থনীতিবিদ ড. মির্জ্জা আজিজুল ইমলামের মতে, গ্রামের লিংকেজ বেড়েছে। শহরের সঙ্গে তাল মিলিয়েও গ্রাম চলছে। ফলে ঈদ মার্কেট ঘিরে গ্রামের অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়েছে।