মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৬ আশ্বিন ১৪২৪, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

জিম্বাবুইয়ে পাকিস্তান ভারতের পর দক্ষিণ আফ্রিকা বধ ॥ টানা চার সিরিজ জয়

প্রকাশিত : ১৬ জুলাই ২০১৫
জিম্বাবুইয়ে পাকিস্তান ভারতের পর দক্ষিণ আফ্রিকা বধ ॥ টানা চার সিরিজ জয়
  • সাকিব ও মাশরাফির দুই শ’ উইকেট
  • ম্যাচ ও সিরিজ সেরা সৌম্য সরকার
  • সাকিব-মাশরাফির দুই শ’ উইকেটের মাইলফলক
  • শেষ ওয়ানডেতে ৯ উইকেটে নাকাল প্রোটিয়ারা

মিথুন আশরাফ ॥ ক্রিকেটপ্রেমীদের ঈদ উপহার যেন মিলেই গেল। সেই সঙ্গে যেন ঈদ বোনাসও। টাইগারদের কাছ থেকে জয়ই বোনাস চেয়েছিল ক্রিকেটপ্রেমীরা। মাশরাফি, সাকিব, তামিমরা তা দিয়ে দিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতেও বৃষ্টি আইনে ৯ উইকেটে জিতে গেল বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকাকেও ২-১ ব্যবধানে সিরিজে হারাল মাশরাফিবাহিনী। দেশের মাটিতে জিম্বাবুইয়ে, পাকিস্তান, ভারতের পর দক্ষিণ আফ্রিকাকেও বধ করল বাংলাদেশ। ঈদের আনন্দও তাতে দ্বিগুণ হয়ে গেল। টস জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। মাঝে বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ থাকায় খেলা ৪০ ওভারে হয়। সাকিব, মুস্তাফিজ ও রুবেলের বোলিং তোপে দক্ষিণ আফ্রিকা ৪০ ওভারে ১৬৮ রান করে। সাকিব ৩ উইকেট নেন। মুস্তাফিজুর রহমান ও রুবেল হোসেন ২টি করে উইকেট শিকার করেন। প্রতিটি ওয়ানডেই লো স্কোরিং হয়। যারাই আগে ব্যাট করেছে তারাই ১৬০-১৭০ রানের ঘরে গুটিয়ে গেছে। তাতে দ্বিতীয় ইনিংসে যারা ব্যাটিং করেছে তারা জয় পেয়েছে। তৃতীয় ওয়ানডেতেও তাই ঘটল।

বৃষ্টি আইনে বাংলাদেশের সামনে জিততে ১৭০ রানের টার্গেট দাঁড় হয়। ১০ রানের জন্য শতক হাতছাড়া হওয়া সৌম্য সরকার (৯০) ও নৈপুণ্যে ফেরা তামিম ইকবাল (৬১*) মিলেই ম্যাচ জিতিয়ে দিলেন। উদ্বোধনী জুটিতে এ দুইজনের করা ১৫৪ রানের জুটিতেই জিতে গেল বাংলাদেশ। ২৬.১ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে ১৭০ রান করে জয় তুলে নিল। ৮৩ বল বাকি থাকতেই অসহায় আত্মসমর্পণ করল দক্ষিণ আফ্রিকা। তামিম-সৌম্য মিলে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে রেকর্ড জুটিও গড়ে ফেললেন। ‘লাকি গ্রাউন্ড’ চট্টগ্রামে আবারও জয় মিলল। দাপটের সঙ্গেই জয় মিলল বাংলাদেশের। লিটন কুমার দাস বাউন্ডারি হাঁকাতেই খেলাও শেষ হলো। র‌্যাঙ্কিংয়ে সেরা ৫ এ থাকা কোন দলকে প্রথমবারের মতো ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারাল বাংলাদেশ।

দুর্দান্ত সময় যাচ্ছে বাংলাদেশের। একের পর এক জয় মিলছে। একের পর এক সিরিজ জয়ও হয়ে যাচ্ছে। ঘরের মাঠে টানা চার সিরিজ জিতে নিয়েছে বাংলাদেশ। জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সিরিজ জয় দিয়ে শুরু হয়েছিল। ৫-০ ব্যবধানে জিম্বাবুইয়েকে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। এর পর পাকিস্তানকে ‘বাংলাওয়াশ’ করেছে। ভারতকেও ২-১ ব্যবধানে সিরিজে হারিয়েছে। এবার দক্ষিণ আফ্রিকাকেও উড়িয়ে দিল। দেশের মাটিতে টানা ৪ সিরিজ জিতে নিল বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে ৬০ তম দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে নেমে ১৯তম সিরিজ জিতে নিল বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো কোন সিরিজে জিতল বাংলাদেশ।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে যদি চট্টগ্রামে তৃতীয় ওয়ানডেতে জয় মেলে তা বড় পাওনাই হবে। এমনই বলেছিলেন বাংলাদেশ অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান, অবশ্যই পাকিস্তান ও ভারতের থেকে বড় (প্রাপ্তি)। কারণ, এই জিনিসগুলো তো আমরা আগে কখনও করিনি। যেই জিনিসটা আগে করিনি স্বাভাবিকভাবে সেই জিনিসটা অবশ্যই বড় হবে। যদি এ রকম কিছু হয় অবশ্যই বড় হবে। এখন পর্যন্ত যেটা করেছি সেটাও বড়। এর আগে তো কখনও দক্ষিণ আফ্রিকাকে সিরিজে হারাতে পারিনি। সেটাই একটা বড় ব্যাপার। যদি সিরিজটি জিততে পারি তা হলে অনেক বড় ব্যাপার হবে। সেই বড় পাওনা মিলে গেছে।

এমন দিনে একই ম্যাচে আবার ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ২০০ উইকেট নেয়ার মাইলফলক স্পর্শ করলেন সাকিব আল হাসান। তার সঙ্গে মাশরাফি বিন মর্তুজাও একই কীর্তি গড়েছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকা যে রান করেছে, তাতে প্রথম ইনিংস শেষেই বাংলাদেশ জয়ের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। প্রথম ওয়ানডেতে ৮ উইকেটে হারের পর যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ, তাতে জয় প্রত্যাশা করাটাই স্বাভাবিক। চাপে দক্ষিণ আফ্রিকা যে মুষড়ে পড়ে, এ জন্যই ‘চোকার্স’ খেতাব মিলেছে; তা আবারও প্রমাণ হলো। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৭ উইকেটে জিতে যে সিরিজ জেতার স্বপ্ন দেখেছে ক্রিকেটাররা, সেই স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেছে। আত্মবিশ্বাসও যে বেড়ে যায়, সেই বিশ্বাস পুঁজি করেই স্বপ্ন সফলও হয়ে গেল।

বৃষ্টির বাধায় একটা সময় মনে হচ্ছিল সিরিজের অবস্থা না আবার এমন দাঁড়িয়ে যায়, দক্ষিণ আফ্রিকা ১, বাংলাদেশ ১, বৃষ্টি ১। অর্থাৎ তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকা এক ম্যাচে জিতে। এর পর বাংলাদেশ এক ম্যাচ জিতে সিরিজে আনে ১-১ সমতা। সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে এসে বুধবার কোন দলই ওয়ানডের শিরোপা জিততে পারবে না। তৃতীয় ওয়ানডেতে জয় হয়ে যাবে বৃষ্টিরই। শেষ পর্যন্ত খেলা শুরু হলো। দক্ষিণ আফ্রিকার ৭৮ রানের সময় বৃষ্টি শুরু হলেও খেলা শুরু হয়। তাতে করে ৪০ ওভারে ম্যাচ হয়।

শুরুতেই ডি কককে (৭) বোল্ড করে দেন মুস্তাফিজুর রহমান। এর পর থেকেই স্টেডিয়ামে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ, রব উচ্চৈঃস্বরে বাজতে থাকে। সময় গড়াতে থাকে আর দক্ষিণ আফ্রিকাকে চেপে ধরতে থাকে বাংলাদেশ। ১৯ রানে গিয়ে ডু প্লেসিসকে (৬) আউট করেন সাকিব। তার ২০০ উইকেট শিকার করতে আর ১টি উইকেট লাগে। ৪৫ রানে গিয়ে হাশিম আমলাকেও (১৫) আউট করে দিয়ে সাকিব ২০০ উইকেট নিয়ে নেন। আব্দুর রাজ্জাকের (২০৭ উইকেট) পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বোলার হিসেবে ২০০ উইকেট শিকার করেন সাকিব। এর সঙ্গে সাকিব আরেকটি রেকর্ডও গড়েন। বাংলাদেশের একমাত্র অলরাউন্ডার হিসেবে ৪০০০ রান ও ২০০ উইকেট শিকার করেন সাকিব।

৫০ রানে গিয়ে মাহমুদুল্লাহ বল করতে এসে রিলি রুশোকে (১৭) আউট করে দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসে চিড় ধরিয়ে দেন। ৪ উইকেট হারিয়ে বসে প্রোটিয়ারা। এর পরই শুরু হয় ডেভিড মিলার ও জেপি ডুমিনির জুটি। যেই দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোরবোর্ডে ৭৮ রান জমা হয়, বৃষ্টিও শুরু হয়ে যায়। বিকেল ৪ টা ৩০ মিনিটে বৃষ্টি নামে। সেই বৃষ্টি থামে ৭ টায়। খেলা শুরু হয় ৭ টা ৩০ মিনিটে। তিন ঘণ্টা খেলা বন্ধ থাকার পর ৪০ ওভার করে খেলা গড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ততক্ষণে ২৩ ওভার শেষ হয়ে যায়।

এর পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা একটু সময় আধিপত্য বিস্তার করলেও যেই মিলারকে (৪৪) আউট করে দেন মাশরাফি, শুরু হয়ে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার পতন। পঞ্চম উইকেটে মিলার-ডুমিনির ৬৩ রানের জুটিরও ইতি ঘটে। মাশরাফিরও ২০০ উইকেট শিকার হয়ে যায়। বাংলাদেশের তৃতীয় বোলার হিসেবে এ মাইলফলক স্পর্শ করেন মাশরাফি। এর পর দক্ষিণ আফ্রিকারও বড় স্কোর গড়ার স্বপ্ন ধূলিসাত হয়ে যায়। ১৪৯ থেকে ১৬৭ রান মাত্র ১৮ রানের ব্যবধানে আরও ৩ উইকেটের পতন ঘটে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার। সাকিব আরেকটি উইকেট পান। দলীয় ১৪৯ রানের সময় বেহারডিয়ানকে (১২) আউট করে দেন। ১৫৫ রানে রাবাদাকে (১) বোল্ড করেন মুস্তাফিজ, আর ১৬৭ রানে এ্যাবোটকে (৫) বোল্ড করে দেন রুবেল। শেষে ১৬৮ রানে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ইনিংসে একমাত্র অর্ধশতক করা ডুমিনিকে (৫১) সাজঘরে ফেরান রুবেল। সেই সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসেরও শেষ হয়।

দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস শেষ হতেই বাংলাদেশের জয়ের আশা দেখা হয়। ধারাভাষ্যকাররা যে বুধবার পাঞ্জাবি পরে ধারাভাষ্য দেন, তাদের কণ্ঠেও বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনার কথাই শোনা গেছে বার বার। তবে এ জয়ের সঙ্গে স্বস্তিও মিলেছে। তামিম ইকবাল আবার ঘরের মাঠে নৈপুণ্যে ফিরেছেন। তার সঙ্গে তিন ম্যাচে ১০২.৫০ গড়ে ২০৫ রান করে সিরিজ সেরা ও ম্যাচ সেরা সৌম্যের দুর্দান্ত ব্যাটিং বাংলাদেশকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে। সিরিজ জয়ের আনন্দ আবারও মিলে গেছে।

স্কোর ॥ দক্ষিণ আফ্রিকা ইনিংস ১৬৮/৯; ৪০ ওভার (ডুমিনি ৫১, মিলার ৪৪, রুশো ১৭; সাকিব ৩/৩৩, মুস্তাফিজ ২/২৪, রুবেল ২/২৯)।

বাংলাদেশ ইনিংস ১৭০/১; ২৬.১ ওভার (সৌম্য ৯০, তামিম ৬১*, লিটন ৫*)।

ফল ॥ বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী।

ম্যাচ সেরা ॥ সৌম্য সরকার (বাংলাদেশ)।

সিরিজ ॥ ২-১ ব্যবধানে বাংলাদেশের সিরিজ জয়।

সিরিজ সেরা ॥ সৌম্য সরকার (বাংলাদেশ)।

প্রকাশিত : ১৬ জুলাই ২০১৫

১৬/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: