১৬ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বোলারদের আতঙ্ক সৌম্য


উঠন্তি মুলাপত্তনেই চেনা যায়। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে মাত্র এক ম্যাচ খেলেই বিশ্বকাপ দলে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন তরুণ টপঅর্ডার সৌম্য সরকার। অভিষেকে জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে আহামরি কিছু করেছিলেন বিষয়টা এমন নয়। আবার বিশ্বকাপেও একটি অর্ধশতক ছাড়া বাকি পাঁচ ম্যাচে দারুণ কিছু করেছিলেন সেটাও বলা যাবে না। কিন্তু এরপরও সবার নজর কেড়েছিলেন সতেজ, সপ্রতিভ ব্যাটিং দিয়ে। যেভাবে বোলারদের মোকাবেলা করেন তা দেখাটা মনোমুগ্ধকর। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ২৮ রানের ক্ষুদ্র যে ইনিংসটি খেলেছিলেন ওয়ানডাউনে নেমে সেটা নজর কেড়ে নিয়েছিল অনেকের। সৌম্যর ব্যাটিং দেখে বিশ্বব্যাপী ক্রিকেট বোদ্ধা ও বিশ্লেষকরা এরপরই ঘাঁটতে শুরু করেছিলেন ইতিহাস। তাঁরা ঠিকই চিনেছিলেন অনেক বড় এক ক্রিকেটার হয়ে উঠবেন সৌম্য। বৈচিত্র্যময় ব্যাটিং কৌশল, স্নায়ুচাপহীন এবং ভয়ডরহীন মনোভাব নিয়েই ব্যাট চালিয়েছেন ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় সেই ওয়ানডেতে। কিন্তু এরপরও সৌম্যের সঙ্গে সেঁটে যেতে শুরু করেছিল একটি নাম হয়ে গিয়েছিল ত্রিশের ব্যাটসম্যান! কারণ প্রায় ৩০-৪০ রানে আউট হয়ে যাচ্ছিলেন। তবে সেটা ঘুঁচালেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে অপরাজিত ৮৮ রানের ইনিংস খেলে। নাম সৌম্য হলেও প্রোটিয়া বোলারদের সঙ্গে বৈষম্য দেখিয়ে তাঁদের তুলোধুনো করেছেন। দলকে জিতিয়েই মাঠ ছেড়েছেন, ম্যাচজয়ী খেলোয়াড় হিসেবে নিজের নামটাকে তুলে ধরেছেন। এটি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে কোন বাংলাদেশীর সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। এর আগে মোহাম্মদ আশরফুল ৮৭ রানের ইনিংস খেলেছিলেন ২০০৭ সালে প্রভিডেন্সে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচে। এবার সৌম্য তাঁকে ছাড়িয়ে গেলেন এবং প্রোটিয়াদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার জয়ের স্বাদ উপহার দিলেন টাইগারদের।

বিশ্বকাপ শেষে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এক ধাপ ওপরে উঠে ওপেনার হয়ে যান সৌম্য। কারণ বিশ্বকাপেই তরুণ ওপেনার এনামুল হক বিজয় ইনজুরিতে পড়ে ছিটকে গিয়েছিলেন। যদিও বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথমবার ইনিংস উদ্বোধন করতে নেমে নেলসনে করেছিলেন মাত্র ২ রান। এরপর অবশ্য পরের তিন ম্যাচে তিনি ওয়ানডাউনেই খেলেন। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৪০ ও নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৫১ রানের ইনিংস খেলে সবার নজর কাড়েন দারুণ ব্যাটিং কৌশলের কারণে। তাঁর শটগুলো নাকি তুলনাহীন এবং এতটাই বিদ্যুত গতির যে ফিল্ডারদের তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। এমন কথাই বলেছেন বিশিষ্ট ক্রিকেট বিশ্লেষকরা। সেই সৌম্য বিশ্বকাপ শেষে দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য ওপেনার তামিম ইকবালের সঙ্গী হয়ে গেলেন, করলেন ইনিংস উদ্বোধন। তবে পাকদের বিরুদ্ধে প্রথম দুই ওয়ানডেতেই ব্যর্থ হলেন ২০ ও ১৭ রান করে সাজঘরে ফিরে। তবে কি এখানেই শেষ সৌম্য? এমনটাই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কিন্তু সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে যা করলেন তা অনেক দিন মনে থাকবে বাংলাদেশের মানুষের, এমনকি পাকিস্তানীদেরও। কারণ দুর্ধর্ষ একটি ইনিংস উপহার দিলেন এদিন এবং সে কারণেই ক্রিকেট পরাশক্তি পাকিস্তান ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা বরণ করল বাংলাদেশের কাছে। অথচ এই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এ সিরিজটির আগে মাত্র একবারই হেরেছিল পাকরা। সেটা ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে। তারাই হোয়াইটওয়াশ হলো শেষ ম্যাচে সৌম্যের ত্রাসোদ্দীপক ব্যাটিংয়ের কারণে। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি হাঁকান সেদিন। শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকে দলকে ৮ উইকেটের বিশাল জয় এনে দেন। খেলেছিলেন ১১০ বলে ১৩ চার ও ৬ ছক্কায় সাজানো বিস্ময়কর এক বিস্ফোরক ইনিংস। তাঁর সেই ব্যাটিং তা-বে তছনছ হওয়া পাক বোলাররা কি কখনও ভুলতে পারবেন যন্ত্রণার কথাটা?

এরপরও হচ্ছিল না। ভারতের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে খুব বড় ইনিংস উপহার দিতে পারেননি। তবে ব্যাটিংয়ের ধার দেখিয়ে ঠিকই তিন ওয়ানডেতে করেছিলেন যথাক্রমে ৫৪, ৩৪ ও ৪০। তাই যেন নাম হয়ে গেল ত্রিশের ব্যাটসম্যান। তাছাড়া টি২০ ম্যাচেও যেন তিনি কোনভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারছিলেন না। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে প্রথম ওয়ানডেতে মাত্র ২৭ রান করেই আউট হয়ে যান। ত্রিশের আশপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছিলেন তিনি। বড় ইনিংস খেলার জন্য ছিলেন সচেষ্ট। অবশেষে প্রোটিয়াদের বিরুদ্ধে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ঠিকই জ্বলে উঠলেন। সিরিজ হার ঠেকালেন ৮৮ রানের ম্যাচজয়ী হার না মানা ঝকঝকে ইনিংস খেলে। ম্যাচশেষে এ বিষয়ে সৌম্য বলেন,‘কৌশল পরিবর্তনের জন্য আলাদা কোন পরিকল্পনা ছিল না। আমার লক্ষ্য ছিল টার্গেটে যেতে পারলেই হল। ৫০ কিংবা ১০০ করতে পারি।’ ক্যারিয়ারের দুটি বড় ইনিংস খেলেই দলকে জয়ের পেছনে ভূমিকা রেখেছেন। এ বিষয়ে সৌম্য বলেন, ‘ভাল করেছি বলেই এখানে (সংবাদ সম্মেলনে) আসতে পেরেছি। যেদিন ৩০ কিংবা ৪০ রান করি সেদিন আসতে পারি না। সব সময় সেটাই চেষ্টা করব যেন বড় রান করতে পারি এবং এখানে আসতে পারি। আগের দুটি ম্যাচ ভাল শুরু করেও শেষ করতে পারিনি। ওইটাই মাথার মধ্যে কাজ করছিল যেন আজকের ম্যাচটা আমি শেষ করতে পারি।’

একটিমাত্র ওয়ানডে খেলেই বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ করে নিয়েছিলেন সৌম্য। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণের মধ্যে অন্যতম দীর্ঘকায় সৌম্য পেস বলে ভাল খেলেন এবং হুক-পুল করতে পারেন যা অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের গতিময় ও বাউন্সি উইকেটে কার্যকর হবে। কিন্তু মাত্র ১৪ ওয়ানডে খেলা সৌম্যকে নিয়েই পরিকল্পনা করেছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বোলাররা। কারণ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপরাজিত ১২৭ রানের ইনিংস একটি বার্তা ঠিকই দিয়েছিল বিশ্ব ক্রিকেটকে। সেই বার্তাটা হচ্ছে যেদিন তিনি ক্রিজে থাকবেন সেদিন আর সৌম্য, ভদ্র আচরণ করবেন না বোলারদের সঙ্গে। তাই বাউন্সার দিয়েই সৌম্যের ত্রাস আটকানোর পরিকল্পনা করেছিল প্রোটিয়া পেসাররা। এ বিষয়ে সৌম্য বলেন, ‘শুনেছিলাম আমাকে বাউন্সারে আটকানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আমি চেয়েছিলাম ওরা বাউন্স যদি মারে আমি আউট হলেও খেলব। এর থেকে আমি বের হয়ে আসতে চাই। আমার পরিকল্পনা ছিল বাউন্স যেভাবেই আসুক যত জোড়েই আসুক আমি খেলতে চাই।’ এদিন তৃতীয় উইকেটে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের সঙ্গে ১৩৫ রানের জুটি গড়েন যা দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নতুন রেকর্ড। আর ৮ বছর পর আবারও প্রোটিয়াদের বিরুদ্ধে জয়ের কারণে ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি নিশ্চিত করে ফেলেছে বাংলাদেশ। সোনায় সোহাগা সৌম্য এখন প্রত্যাশার কেন্দ্রে বাংলাদেশ দলের এবং ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের। কারণ মাত্র ১৫ ওয়ানডে খেলেই ৪৬.৩০ গড়ে তাঁর রান ৬০২; স্ট্রাইকরেট ১০০.৩৩।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: