মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

অবশেষে সমঝোতা গ্রীক সঙ্কটের নাটকীয় মোড়

প্রকাশিত : ১৫ জুলাই ২০১৫
  • এনামুল হক

গ্রীক সঙ্কটে নানা নাটকীয়তা ও মোড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্রাসেলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নতুন করে সমঝোতা স্বাক্ষর হয়েছে দু’পক্ষের মাঝে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যয় সংকোচনের বেশকিছু শর্ত মেনে নিয়েছে গ্রীস। যার বিনিময়ে নতুন করে আর্থিক সাহায্য জুটেছে দেশটির ভাগ্যে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারের প্রেক্ষিতে এমন সমঝোতা হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ভাষ্য। গ্রীস সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারের যে দরপতন তা ঠেকাতেই এ সমঝোতা অনুষ্ঠিত হয়। গ্রীসের সংকট নতুন করে বিশ্ব মন্দার সৃষ্টি ও পুঁজিবাজারে অস্থিতরতা তৈরি করেছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকতে এবং আর্থিক সঙ্কট থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য নতুন ঋণ পেতে হলে গ্রীসকে ব্যয় সঙ্কোচের নতুন কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, এই মর্মে দাতাদের দেয়া শর্ত গ্রীকরা গত ৫ জুলাইয়ের গণভোটে বিপুল ভোটে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এরপর দাতারা আলটিমেটাম দিয়েছিল যে, ৯ জুলাইয়ের মধ্যে গ্রীসকে ব্যয় সঙ্কোচের পরিকল্পনা দাতাদের কাছে পেশ করতে হবে। নইলে ১২ জুলাই ইইউর শীর্ষ বৈঠকে গ্রীসের এই সংস্থায় থাকা না থাকার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সেই চাপের কাছে নতি স্বীকারই হোক কিংবা গ্রীকদের নতুন কোন চালই হোক, গ্রীস গত ১০ জুলাই ব্যয় সঙ্কোচের নতুন পরিকল্পনা পেশ করেছে, সেখানে দাতাদের অনেক শর্তই মেনে নেয়া হযেছে।

চলমান সঙ্কট থেকে উদ্ধার পেতে দাতাদের কাছ থেকে ৫৩৫০ কোটি ইউরোর তিন বছর মেয়াদি নতুন ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী আলেক্সিস সিপ্রাস গত ১০ জুলাই ১৩শ’ কোটি ইউরোর ব্যয় সঙ্কোচ পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। গ্রীকরা গণভোটে ইউরোপীয়দের প্রস্তাবিত যে ব্যয় সঙ্কোচ পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছিল, এটা তার চেয়ে ৪শ’ কোটি ইউরো বেশি। পর্যবেক্ষকদের অনেকে এটাকে ইউরোপীয়দের চাপের কাছে গ্রীসের বড় ধরনের নতিস্বীকার বা আত্মসমর্পণ আখ্যায়িত করলেও প্রধানমন্ত্রী সিপ্রাসের প্রকৃত উদ্দেশ্য ঠিক স্পষ্ট নয়। এটা ইউরো থেকে গ্রীসের বেরিয়ে যাওয়া ঠেকাতে পারবে কিনা কিংবা সঙ্কট আরও ঘনীভূত করে তুলবে কি না, এ মুহূর্তে তাও টিক বোঝা যাচ্ছে না।

সিপ্রাসের ব্যয় সঙ্কোচ প্রস্তাবটি গ্রীক পার্লামেন্টে ২৫১-৩২ ভোটে অনুমোদিত হয়েছে। ৮ এমপি ভোটদানে বিরত থাকে এবং ৯ জন অনুপস্থিত ছিল। পার্লামেন্টের ব্যাপক সমর্থন লাভের পর সিপ্রাস বলেন যে, এই ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে তিনি দাতাদের সঙ্গে আলোচনা সম্পন্ন করার ব্যাপারে জোরালো ম্যান্ডেট লাভ করেছেন। ইইউর অর্থমন্ত্রীরা এখন প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখছেন।

প্রধানমন্ত্রী সিপ্রাস দাতারা যেমন চেয়েছিল, তার কাছাকাছি ব্যয় হ্রাসের জন্য কঠোরতর সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েছেন। এই সংস্কার পরিকল্পনায় রয়েছে। জিডিপির হার পুরো ১ শতাংশ বাড়ানোর জন্য ভ্যাটের আমূল পরিবর্তন এবং রেস্তরাঁ ও ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানসহ আরও অনেক কিছুকে শীর্ষ ২৩ শতাংশ কম হারের আওতায় আনা। পর্যটকদের জন্য সর্বাধিক আকর্ষণীয় স্থানসহ দেশের দ্বীপগুলোর ওপর যে স্বল্পতর ভ্যাট বলবৎ করেছে, তা তুলে দেয়ার প্রশ্নে নিজেদের বিরোধিতাও গ্রীক পরিত্যাগ করেছে। অবসর ভাতার ক্ষেত্রেও গ্রীস উল্লেখযোগ্য ছাড় দিয়েছে। দেশের দরিদ্রতম অবসরভোগীদের সংহতিমূলক অর্থ প্রদানের ব্যবস্থাটি পরিকল্পিত সময়সীমার আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে তুলে দিতেও গ্রীস রাজি হয়েছে। অবসর গ্রহণের বয়স ২০২২ সালের মধ্যে ৬৭-তে উন্নীত করা হবে।

গ্রীস আইএমএফ’এর দাবি অনুযায়ী কর্পোরেশন ট্যাক্স বাড়িয়ে ২৮ শতাংশ করতে রাজি হয়েছে। সংস্কার প্রস্তাবে সামরিক ব্যয় ২০১৫ সালে ১০ কোটি ইউরো এবং ২০১৬ সালে ২০ কোটি ইউরো হ্রাস করার, সংস্কারের লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিবর্তন বাস্তবায়িত করার এবং কর আদায় ও কর ফাঁকি প্রতিরোধের ব্যবস্থা উন্নত করে তোলার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবে আঞ্চলিক বিমানবন্দর ও বন্দরসহ সরকারী সম্পদ বিরাষ্ট্রীয়করণের পদক্ষেপের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

গত ৫ জুলাই গ্রীসের জনগণ গণভোটে ইউরোপের দাতা দেশগুলোর অধিকতর কৃচ্ছ্রতার দাবি প্রত্যাখ্যান করে। তাদের এই ‘না’ সূচক ভোটে কেউ তেমন বিস্মিত হয়নি। বিস্মিত না হওয়ার কারণও ছিল। প্রথমত : র‌্যাডিকেল বামপন্থীদের শাসক কোয়ালিশন গ্রীকদের মন মানসিকতা ভালমতই জানে ও বোঝে। ইউরোপের নেতৃবৃন্দ গ্রীসের প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে সর্বক্ষণ যেসব অবজ্ঞা ও বিদ্রƒপবাণী বর্ষণ করে আসছিল, গ্রীকরা সেগুলোকে তাদের নিজেদেরই অবমাননা বলে জ্ঞান করে।

দ্বিতীয়ত : এবং সবচেয়ে বড় কারণ, ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ গ্রীকদের এমন এক অবস্থায় দাঁড় করিয়েছিল, যেখানে তাদের হারাবার কিছু ছিল না। গ্রীকদের দু’ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে যে কোন একটিকে বেছে নিতে দেয়া হয়েছিল। একটা হলো আশু বিপর্যয়, যেখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সম্ভাবনাও আছে এবং আরেকটা হলো দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়, যেখান থেকে বের হওয়ার কোন পথ নেই।

গ্রীকরা এ অবস্থায় বেপরোয়া হয়ে ‘না’ ভোট দিয়ে ইউরোপের ব্যয় সঙ্কোচ প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছিল।

ব্যয় সঙ্কোচ প্রশ্নে গ্রীকদের সমস্বরে জোরালো ‘না’ জবাব বিবেচনায় নিলে আলেক্সিস সিপ্রাসের সংস্কার প্রস্তাবটিকে ঘটনা প্রবাহের অদ্ভুত ও নাটকীয় মোড় পরিবর্তন বলেই মনে হয়েছে।

প্রকাশিত : ১৫ জুলাই ২০১৫

১৫/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: