১৮ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

যেখানে জীবন চলে বহতা নদীর মতো


মানিক সরকার মানিক, রংপুর ॥ বহতা নদীর মতোই ওদের জীবন। চলছে তো চলছেই। কূল নেই কিনার নেই। শিক্ষা স্বাস্থ্য বিনোদন নেই। নেই কোন স্বপ্ন সাধও। এমনকি ঈদ-পুজো উৎসবের কোন আমেজও ওদের স্পর্শ করে না। আর তাইতো ঈদ নিয়ে কোন উৎসাহ আগ্রহ নেই ওদের। আছে শুধু অন্ধকারময় অজানা এক ভবিষ্যত। ওরা চরবাসী। অশিক্ষা, কুসংস্কার বাল্যবিয়ে আর অন্ধকারময় ভবিষ্যত নিয়েই তিস্তাপারের চরবাসী এই শিশুরা বেড়ে উঠছে বংশ পরম্পরায়। ঈদ উৎসব কী তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই কারোরই। মাথাব্যথা শুধু ঈদের ‘নাউ দৌড়’ (নৌকা বাইচ) নিয়ে। ঈদের দিন কেমন কাটে বলতেই চরের শিশু ৭ বছরের আলিম জানায়, ‘ঈদের দিন বিয়ানোইত (সকালে) ঘুম থাকি উঠি নমাজখান পড়ি এ্যানা সোমাই খ্যায়ায় যাই নদীর ঘাটোত্। অঁটেকার নাউ দৌড়-ই হামার ঈদ’। আর ৯ বছরের জাহিদুলের মতে, ‘হামরা কী আর টাউনের মানুষ, যে হামার এত্তি ঈদ হইবে, নাউ খেলাই হামার ঈদ, হামরা ইয়াতে খুশি’। চরের এসব শিশুদের ঈদের আনন্দটা এমনই।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের তিস্তা নদী তীরবর্তী প্রত্যন্ত এলাকা চর হয়বত খাঁ, চর গনাই, চর আজম খাঁ, উচ্ছচর গ্রামে গেলেই দেখা মেলে তাদের। বেরিয়ে আসে তাদের জীবন চিত্রের করুণ কাহিনী। এলাকার সমাজকর্মী হানিফ উদ্দিন জানালেন, তিস্তার লাগাতার ভাঙ্গনে এই শিশুদের পরিবারগুলো এখন যাযাবরে পরিণত হয়েছে। আজ এ চর তো কাল সে চরে। নিজেদের স্থায়িত্ব না থাকায় অন্ধকারময় এক ভবিষ্যত নিয়েই বেড়ে উঠছে এ শিশুরা। কাউনিয়া উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে টেপামধুপুর গ্রাম। সেখান থেকে আরও অন্তত ৮ কিলোমিটার দূরের তিস্তার প্রত্যন্ত এই চর এলাকায় ২শ’ পরিবারের প্রায় ২ হাজার মানুষের বসবাস। এদের অর্ধেকেই শিশু। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এসব চরাঞ্চল পরিবারের মানুষেরা এখনও পরিবার পরিকল্পনার ধার ধারে না। যে কারণে অনেক পরিবারেই রয়েছে ৪ থেকে ৫ সন্তান। এসব সন্তানদের অধিকাংশই স্কুলে যায় না। পরিবারের কর্তারা প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে জেগেই কাজের জন্য বেরিয়ে পড়েন উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকায়। গৃহিণীদের কেউবা ব্যস্ত হন নিজেদের গৃহস্থালীর কাজ কিংবা অন্যের বাসায় ঝিয়ের কাজে। আর শিশুরা থাকে খেলায় মত্ত। দারিদ্র্যতা, অশিক্ষা, অজ্ঞতা, শিশু শ্রম বাল্যবিয়েই যেন তাদের নিত্য সঙ্গী। অসচেতনতা আর অব্যবস্থাপনার মধ্যেই বেড়ে উঠছে এই শিশুরা। এদের কেউই প্রাইমারীর গ-ি পেরোয়নি। তার আগেই মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে। ছেলেরা জড়িয়ে পড়ছে শিশুশ্রম কিংবা নানা কাজের সঙ্গে। পুরো এলাকায় নেই কোন স্বাস্থ্য কেন্দ্র।