২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

আল বিদা মাহে রমজান


আল বিদা  মাহে রমজান

অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম রফিক ॥

তিরিশ রোজার সিয়াম শেষে

এলো খুশির ঈদ,

জাগলো আকাশ পাহাড় নদী

ভেঙ্গে চাঁদের নিদ।

-(কবি ফজলে খোদা)

‘ঈদ’ মানে খুশী, আনন্দ, আর ফিতর মানে ভাঙ্গা। অর্থাৎ মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর ঈদ-উল-ফিতর হলো রোজা ভাঙ্গার উৎসব। তাহলে নামেই বোঝা যায়, এদিন কোন সচরাচর আনন্দোৎসবের দিবস

নয়, এ হলো রোজাদারের সাধনার সুফলের বহির্প্রকাশ, সিয়ামের মাসের বহুবিধ শিক্ষা প্রতিফলনের পহেলা মঞ্জিল; খুশী ও ইবাদতের সমন্বিত এক নির্মল আনন্দধারা। মাহে রমজান এখন বিদায়লগ্নে, ২/৩ দিনের ব্যবধানে রোজা ভাঙ্গার উৎসব।

মাহে রমজান মুসলমানদের দ্বারে দ্বারে নিয়ে এসেছিল খোদাভীতি, সংযম, সাম্য, মৈত্রী ও ভালবাসার সওগাত। মাসব্যাপী এসব সাধনা ও অনুশীলনে প্রতিটি মুসলমান কাক্সিক্ষত নৈতিক চরিত্রগুলো অর্জন করেছেন বৈকি? এখন থেকে ঈদের আনন্দধারায় তা সমাজে প্রদর্শনের বাস্তব মহড়া শুরু হবে, যা গোটা বছরের জন্য উম্মাহর পাথেয় হয়ে থাকবে... এ হলো ইসলামের দর্শন। তাই এই ঈদের আনন্দ নীতি-নৈতিকতা বিসর্জিত আনন্দোৎসব কিংবা উৎসবের নামে হৈ-হুল্লোড় ও বাড়াবাড়িকে সমর্থন করে না। অথচ এক শ্রেণীর মানুষ ঈদকে ভোগের মহড়া, অপচয়, অপব্যয়ের প্রতীকে পরিণত করে তুলেছে।

বস্তুত এ ঈদ ত্যাগের, নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার আর উৎসর্গ করার, এ ঈদ ধনী-গরিব, শহুরে-গ্রামীণ সবার মাঝে সাম্য মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধ রচনার। ঈদের দিনেও ইসলাম তাই গরিবদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারটি প্রাধান্য দিয়েছে। হাদীস শরীফে ঈদের নামাজের আগেই গরিবদের হক মিটিয়ে দেয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছে। যাতে তাদের হাত পাততে না হয়।

সত্যিকারের ঈদের আনন্দ রোজাদারের আমল বৃদ্ধি করে, নাজাতের পথ করে সুগম। ঈদের (পূর্ব) রাতকে ইসলাম ঘোষণা করেছে পুরস্কার বিতরণের রজনী হিসেবে। ঈদ-উল-ফিতর প্রসঙ্গে বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এক দীর্ঘ হাদীসে বর্ণনা করেন : যখন ঈদের সকাল নামে মহান আল্লাহ প্রতিটি দেশে দেশে ফেরেস্তা পাঠান। তারা অবতরণ করে পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারা ডাকতে থাকেন। তাদের আহ্বান মানুষ ও জ্বীন ব্যতীত আল্লাহর সব মাখলুকই শুনতে পায়। তারা বলেন, ওহে উম্মতে মুহাম্মদী! বের হয়ে এসো অতি মর্যাদাবান প্রতিপালকের নিকট। তিনি অধিক পরিমাণে দান করে থাকেন। আর মারাত্মক অপরাধও ক্ষমা করেন।

যখন লোকজন বেরিয়ে এসে ঈদগাহে সমবেত হয়, তখন আল্লাহ ফেরেস্তাগণকে লক্ষ্য করে জানতে চান, শ্রমিক যখন তার নির্ধারিত কাজ সম্পন্ন করেন তখন তার বিনিময় কি হতে পারে? ফেরেস্তাগণ বলেন, ‘ওহে আমাদের প্রভু, ওহে আমাদের আল্লাহ! তার বিনিময় পরিপূর্ণভাবে দেয়া উচিত।’ তখন আল্লাহ ঘোষণা করবেন, হে আমার ফেরেস্তাকুল; আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, আমি তাদের রমজান মাসের সিয়াম সাধনার এবং রাতের ইবাদতের বিনিময়ে আমার সন্তুষ্টি এবং ক্ষমা দান করলাম। আল্লাহ বলেন, ওহে আমার বান্দাগণ! তোমরা আমার নিকট চেয়ে নাও। আমি আমার সম্ভ্রমের কসম খেয়ে বলছি, তোমরা তোমাদের এ ঈদ সমাবেশে পরকালের জন্য যা কিছু চাইবে আমি তা দেব। আর দুনিয়ার ব্যাপারে যা চাইবে, আমি সে ব্যাপারেও বিবেচনা করব। (কেননা অনেক সময় দুনিয়ার ব্যাপারে এমন কিছু চাওয়া হয় যা কল্যাণকর নয়)। আমি আমার সম্মানের কসম খেয়ে বলছি, যতদিন তোমরা আমাকে সমীহ করে চলবে, আমি তোমাদের ভুলভ্রান্তি চেপে যাব (বায়হাকী)।

আজকের লাগামহীন ঈদের আনন্দে আমাদের অনেকে ঈদের উপরোল্লিখিত ধর্মীয় গুরুত্ব ও মর্যাদার কথা বেমালুম ভুলে থাকে। যার কারণে আমরা লক্ষ্য করছি, মুসলমানদের ঈদ ক্রমশ: হয়ে পড়েছে নিষ্প্রাণ, উদ্দেশ্য আর লক্ষ্যহীন। বস্তুত রমজান যেমন সাধনার মাস এতে সিয়াম, কিয়ামসহ কঠিন ইবাদতসমূহের মাঝামাঝি রয়েছে ইফতার সেহরির আনন্দদায়ক মুহূর্তগুলো, তেমনি ঈদ-আনন্দও কিছু বিধিনিষেধে পরিপূর্ণ যা অনিয়মতান্ত্রিকতাকে নিরুৎসাহিত করে এক সুশৃঙ্খল ও ধারাবাহিক দায়িত্ব কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দেয়।