১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শিশু রাজন হত্যার প্রতিবাদে সিলেট উত্তাল


শিশু রাজন হত্যার প্রতিবাদে সিলেট উত্তাল

সালাম মশরুর, সিলেট অফিস ॥ বর্বরোচিত নির্যাতনে ১৩ বছরের শিশু রাজন হত্যার প্রতিবাদে সিলেট এখন উত্তাল। মঙ্গলবার রোজা রেখে প্রচ- গরম উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদ জানাতে সমবেত হন কুমারগাঁও এলাকায়। বিভিন্ন স্থানে একই প্রতিবাদে হয়েছে মানববন্ধন সমাবেশ। রাজনের মৃত্যু কোটি কোটি বিবেককে নাড়া দিয়েছে। কুমারগাঁও বিশাল সমাবেশ থেকে রাজন হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও খুনীদের জনতার হাতে তুলে দেয়ার দাবি উঠেছে। রাজনের অন্যতম ঘাতক চৌকিদার ময়নার পরিবারকে এলাকায় সামাজিকভাবে বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আদালতে প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দীতে ৬ জন মিলে রাজনকে পিটিয়েছে বলে জানা গেছে। রিমান্ডের প্রথম দিন

আসামি মুহিত রাজন হত্যার দায় স্বীকার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। বলাৎকারে ব্যর্থ হয়ে চোর সাজিয়ে নির্যাতনের বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে। মুহিতের স্ত্রীসহ আরও ৩ জনকে আটক করা হয়েছে। ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে আসামি কামরুলকে বিদেশ পালাতে ও অন্য আসামিদের রক্ষা করতে পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত হচ্ছে। কুমারগাঁও প্রতিবাদ সভায় আসার পথে রাজনের বাবা আজিজুর রহমান জ্ঞান হারিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মা লুবনা পুত্র শোকে পাগলপ্রায়। জেদ্দায় রাজন হত্যার আসামি কামরুল ইসলামকে কূটনৈতিক পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। রাজনের বাবার হাতে ২০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন সিলেটের জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীন। রাজন হত্যার ঘটনায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারের আশ্বাস দেয়া হয়েছে।

রাজন হত্যার প্রতিবাদে কুমারগাঁও পয়েন্টে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। প্রতিবাদে উত্তাল সমাবেশে খুনীদের ফাঁসি চাই খুনীদের ফাঁসি চাই উচ্চারিত হতে থাকে। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ্যাড. মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, এই বৃহত্তর কুমারগাঁও, টুকেরবাজার এলাকাবাসী অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়। তারা ইচ্ছা করলেই থানা ঘেরাও পাষ- আসামিদের বাড়ি-ঘর ভাংচুর জ্বালাও পোড়াও করতে পারত কিন্তু তা না করে তারা এখনও সুশৃঙ্খলভাবে এই বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশে তাদের ক্ষোভ ঘৃণা প্রকাশে সমবেত হয়ে তাদের দাবি জানাচ্ছে। অতীতেও এলাকাবাসী কোন অন্যায় অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়নি। বিজিবি, পুলিশ ও এলাকাবাসীর কাছে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলের কাছেই জালালাবাদ থানা। আমরা জানি প্রশাসনের গোয়েন্দা বাহিনী ও পুলিশের অসংখ্য সোর্স থাকা সত্ত্বেও ৪ ঘণ্টা ধরে তারা একটি শিশুর ওপর এমন অমানুষিক নিযার্তন করে লাশ গুম করে ফেলতে চায় তা সত্ত্বেও পুলিশ সেটা জানতে পারে না। সেখানে এলাকার মানুষ ঘাতকদের ধরে পুলিশে দেয়। এখানে নিঃসন্দেহে পুলিশের ভূমিকা সন্দেহজনক। তাই এই থানার ওসি আব্দুল জলিল বিতর্কিত, এসআই মইনুল হককে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে নেয়া হোক। তারপর তদন্ত কমিটি করে রিপোর্ট দেয়া হোক। তিনি বলেন, আমি একজন পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে এলাকার সকল মামলার বিচার কার্য আমাকেই সরকারের পক্ষে দেখভাল করতে হয়। আমি এলাকাবাসীকে আশ্বস্ত করে বলতে চাই এই শিশু সন্তানের বিচার প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদিতে অবস্থান করে ও সর্বক্ষণিক যোগযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমি আশা করছি এই মামালার চার্জশীট দাখিলের সঙ্গে সঙ্গেই আগামী ৯০ দিনের মধ্যেই বিচারকার্য শেষ করে ঘাতকদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হবে। তখন সমাবেশে উপস্থিত শত শত মানুষ বলে ওঠে জানোয়ারদের ধরে আমাদের মাঝে দিন আমরাই বিচার করব।

এ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, সিলেটের কোন আইনজীবী হত্যাকারীদের পক্ষে যাতে না দাঁড়ায় সেজন্য আইনজীবী সমিতিতে আলাদা মনিটরিং সেল গঠন করা হবে। সমাবেশে বক্তরা আরও বলেন, ঘাতক কামরুল ও মুহিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাজার ও এলাকার অন্যান্য সব দোকানপাট খুলে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে যাতে এলাকার মানুষ কোন বাধা সৃষ্টি না করে।

বলাৎকারে ব্যর্থ হয়ে খুন ॥ প্রত্যক্ষদর্শী ও জেদ্দায় আটক আসামি কামরুলের দেয়া তথ্য থেকে শিশু রাজনকে নির্যাতনের পেছনে চৌকিদার ময়নার বলাৎকারের উদ্দেশ্যই প্রাথমিকভাবে প্রমানিত হয়েছে। শিশু সামিউল আলম রাজনকে নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শী দুজনকে সোমবার রাতে থানায় রেখে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন জানিয়েছেন রাজনকে বলাৎকার করতে না পেরে নৈশ প্রহরী ময়না মিয়া চোর সাজিয়ে কামরুল ও মুহিদকে দিয়ে পিটিয়ে খুন করিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা হলেন ঘাতক কামরুলের ওয়ার্কশপের পাশের ভবনের পাহারাদার ফিরোজ আলী (৬০) ও ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী কুমারগাঁওয়ের বাসিন্দা আজমত উল্লাহ (৫৫)। ওসি আখতার জানান, জিজ্ঞাসাবাদে পাহারাদার ফিরোজ বলেছেন গত বুধবার ভোরে ঠেলা গাড়ি চুরির অপবাদ দিয়ে নৈশ প্রহরী ময়না মিয়া শিশু রাজনকে আটক করে। এরপর চোর আটক করা হয়েছে বলে ফোন দিয়ে ঘটনাস্থলে কামরুল ও মুহিদকে নিয়ে আসে। তারা দুইজন এসে তাকে বেঁধে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে তাকে উদ্ধারে এগিয়ে যান পাহারাদার ফিরোজ। তখন তাকে কামরুল ও মুহিত ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। ফিরোজের বরাত দিয়ে ওসি জানান, কামরুলদের ওয়ার্কশপের নৈশ প্রহরী ময়না মিয়া শিশুদের ডেকে নিয়ে বলাৎকার করে। এর আগে সে এরকম অনেক ঘটনা ঘটিয়েছে। সে রাজনকেও বলাৎকারের চেষ্টা করেছিল। তাতে ব্যর্থ হয়ে তাকে চোর অপবাদ দিয়ে কামরুল ও মুহিতকে দিয়ে পিটিয়ে খুন করিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে আজমত উল্লাহ জানান, শিশু রাজনের চিৎকার শুনে তার স্ত্রী তাকে ঘটনাস্থলে পাঠান। তিনি এসে এভাবে নির্মমভাবে না পেটানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু কামরুল ও মুহিত তার কথা শোনেনি।

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ॥ এদিকে রাজন হত্যাকা-ের পর দিনভর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানান তথ্য হাওয়ায় ভাসতে থাকে। পুলিশ এই নিয়ে বাণিজ্যের পাঁয়তারা করছে। ওইদিন রাতে এক যুবককে ধরে এনে আবার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়া হয়। আবলুছ মিয়া নামের এক ব্যক্তিকেও আটকের ব্যাপারে প্রতিবাদ এসেছে। এই নিয়ে শেষে শিশু সামিউর রহমান রাজনের পিতা আজিজুর রহমানও অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেন, ৬ লাখ টাকা নিয়ে পুলিশ কামরুলকে সৌদি আরব পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। তাদের সঙ্গে কন্টাক্ট ছিল আরও ৬ লাখ দিলে রাজন হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়া কামরুলের বড় ভাই মুহিত আলমকেও ছেড়ে দেবে পুলিশ। কিন্তু এর আগেই বিষয়টি সর্বত্র জানাজানি হয়ে যাওয়ায় তাকে আর ছাড়তে পারেনি। তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, আমার ছেলে রাজনকে হত্যার পর বুধবার রাতে জালালাবাদ থানায় মামলা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ মামলা নেয়নি। আমাকে থানা থেকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় এসআই আমিরুল। পুলিশ হত্যাকা-টি ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। আজিজুর রহমান মাইক্রোবাস চালক। তিনি বুধবার সকালেই বাসা থেকে বের হয়ে যান। আর তার ছেলে রাজন যায় সবজি বিক্রি করতে। কিন্তু সন্ধ্যায়ও সে ফিরে না আসায় তার খোঁজ পড়ে। আজিজুর রহমান জানান, ‘রাত সাড়ে ৯টার দিকে এসআই আমিরুল রাজনের লাশের ছবি দেখায় তার মোবাইল ফোনে। এরপর হাসপাতাল মর্গে গিয়ে লাশ শনাক্ত করে থানায় যাই মামলা করতে।’ ততক্ষণে এসআই আমিরুল অজ্ঞাতদের নামে আগেই মামলা করে বসে আছেন। আমি আসামিদের নাম ধরে মামলা করতে চাইলে এক পর্যায়ে এসআই আমিরুল আমাকে গলাধাক্কা দিয়ে থানা থেকে বের করে দেয়।’

তিনি অভিযোগ করেন, ‘এরপর পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতারে কোন উদ্যোগ নেয়নি। চারদিন পর পত্রিকায় খবর বের হলে পুলিশ তৎপর হয়। পুলিশ কোন আসামিকে ধরেনি। মুহিত আলমকে সাধারণ মানুষ ধরেছে।’ জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আখতার হোসেন এসআই আমিরুল প্রসঙ্গে বলেন, বলেন, ‘আমি ঘটনার দিন থানায় ছিলাম না। মামলার সাক্ষী দিতে গিয়েছিলাম। পরে এসে রাজনের বাবার লিখিত অভিযোগকে এজাহার হিসেবে নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসআই আমিরুলের মামলায় কোন আসামির নাম ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘রাজনের বাবা এসআই আমিরুলে বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’ আজিজুর রহমান অভিযোগ করেন, ‘এসআই আমিরুল অপরাধীদের পালাতে সহায়তা করে। আর কারণেই মূল হোতা কামরুল ইসলাম সৌদি আরব পালাতে সক্ষম হয়।’

রিমান্ডে মুহিতের স্বীকারোক্তি ॥ নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে সিলেটে কিশোর সামিউল আলম রাজন হত্যাকা-ের ঘটনায় রিমান্ডে থাকা মুহিত আলম হত্যার দায় স্বীকার করেছে। রিমান্ডের শুরুতে সে হত্যাকা-ের সময় ৫ জন মিলে সামিউলকে নির্যাতন করাসহ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। সিলেট মহানগরীর জালালাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আখতার হোসেন জানান, সোমবার আদালতের মাধ্যমে মুহিতকে ৫ দিনের রিমান্ডে আনা হয়। রিমান্ডে সে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। মুহিতের বরাত দিয়ে ওসি আরও জানান, রিমান্ডে মুহিত হত্যায় জড়িত ৫ জনের নাম উল্লেখ করেছে। এই ৫ জন হচ্ছে মুহিত নিজে, তার ভাই কামরুল ইসলাম, শামীম আহমদ, আলী ও চৌকিদার ময়না। মুহিত নির্যাতন ও হত্যায় জড়িত থাকা শামীম, আলী ও ময়নার অবস্থান বিষয়ে তথ্য দিয়েছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মুহিত জানিয়েছে যে, হত্যাকা-ের স্থলে রাখা একটি ভ্যানগাড়িতে হাত দেয়ায় তাকে চোর সন্দেহে আটক করে মারধর করা হয়।

আটক আরও ৩ ॥ পুলিশ এ ঘটনায় প্রধান আসামি মুহিত আলমের স্ত্রী লিপি বেগমসহ আরও ৩ জনকে আটক করেছে। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জে তার খালাত বোনের বাড়ি থেকে লিপিকে আটক করা হয়। মোগলগাঁও ইউনিয়নের মীরগাঁও থেকে ইসমাইল আলী আবলুছ নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। ইসমাইল আলী আবলুছ মিয়ার স্ত্রী সুমাইয়া ইসমাইল জবা দাবি করছেন, তার স্বামী রাজন হত্যাকা- সম্পর্কে কিছুই জানেন না। পুলিশ আসামি ধরতে কামরুলের আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফেরার পথে আবলুছ মিয়াকে থানায় নিয়ে আসে। পরে রাজন হত্যা মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী উল্লেখ করে ধরে নিয়ে আসে। জবা আরও অভিযোগ করেন যেখানে রাজন হত্যাকা- হয়েছে, সেখানে অন্তত ২০-২৫টি দোকান রয়েছে। এসব দোকানের মালিক-কর্মচারীরা স্বচক্ষে দেখেছে। অথচ ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৩০ কিলোমিটার দূরের মীরগাঁও থেকে প্রত্যক্ষদর্শী আটক করেছে বলে আবলুছ মিয়াকে চালান দেয়া হয়েছে। তিনি বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।

রিমান্ডে আরও একজন ॥ শিশু রাজন হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত অপর আসামি ইসমাইল হোসেন আবলুছের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। মঙ্গলবার সকালে রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানি শেষে আদালতে তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে ইসমাইলের বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল।

রবিবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও জালালাবাদ থানার (ওসি, তদন্ত) আলমগীর হোসেন আসামিকে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (২য়) আদালতে হাজির করে এ রিমান্ড আবেদন করেন। শিশু রাজন হত্যা মামলায় মোট তিনজনকে বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হয়েছে।

স্বামীর বিচার চান লিপি ॥ সিলেটে শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যাকা-ের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া মুহিদ আলমের স্ত্রী লিপি বেগমও বিচার চেয়েছেন নির্মম এ খুনের ঘটনার। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন খুনের ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। নির্মম এ হত্যাকা-ের সঙ্গে তার স্বামী জড়িত থাকলে তিনিও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। জানা যায়Ñ গত সোমবার রাতে জালালাবাদ থানা পুলিশ মুহিদের স্ত্রী লিপিকে থানায় এনে জিজ্ঞাবাদ করে। এ সময় লিপি খুনের ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানে না বলে দাবি করে। তবে তার স্বামী ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ হাওয়া গেলে তাকে শাস্তির দাবি জানান। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে লিপি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হয়।

পুলিশের তদন্ত কমিটি ॥ আলোচিত শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন হত্যাকা-ের পর ঘাতকদের রক্ষায় জালালাবাদ থানার ওসিসহ (তদন্ত) দুই কর্মকর্তা গোপন বৈঠক করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার রাতে থানায় এজাহার নিয়ে গেলে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহতের স্বজনদেরকে থানা থেকে বের করে দেন। পুলিশের রহস্যজনক আচরণেই অন্যতম ঘাতক কামরুল ইসলাম সৌদীতে পালিয়ে যায়। নিহতের স্বজনরা এ অভিযোগ করেছেন। নগর পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সব অভিযোগ উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। এ সব বিষয় খতিয়ে দেখতে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আলোচিত এ হত্যাকা-ের পর পুলিশের এসব ভূমিকার ব্যাপারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে নগর পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থাসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দাবি জানানো হয়েছে। এদিকে, পুলিশের গাফিলতিসহ মামলার ব্যাপারে খতিয়ে দেখতে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে মহানগর পুলিশ। নগর পুলিশের মুখপাত্র ও এডিসি রহমত উল্লাহকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এসি আ ফ ম নিজাম উদ্দিন, জালালাবাদ থানার এসি এইচ এম কামরুল ইসলাম, ওসি আক্তার হোসেন ও এসআই জাকির হোসেন। এডিসি রহমত উল্লাহ জানিয়েছেন, পুলিশের গাফিলতিসহ মামলার বিষয়টি দেখতেই এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। নগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) ফয়সল মাহমুদ বলেন, দু-এক পুলিশ সদস্যের ব্যাপারে অভিযোগ উঠেছে।

যেভাবে ধরা পড়ল কামরুল ॥ ১৩ জুলাই সোমবার বিকেল তখন। জেদ্দার বাঙালী অধ্যুষিত কিলো তামানিয়া এলাকায় হঠাৎ চোখে পড়ে কামরুলকে। দুজন প্রবাসী ফেসবুকে দেখা ছবির সঙ্গে কামরুলের চেহারার মিল পেয়ে যান। বাপ্পি লস্কর নামে আরেকজন প্রবাসীকে ফোনে খবর দেন তারা। এ সময় বাপ্পি লস্কর ও তার এক বন্ধু এম এ সালাম মক্কা থেকে জেদ্দায় ফিরছিলেন। তাদেরকে বলা হয় কামরুলকে নজরে রাখতে। তখনই জেদ্দা কনস্যুলেটে খবর দেন লস্কর। দ্রুতই ঘটে যায় সবকিছু। কনস্যুলেটের সচিব আজিজুর রহমান তিন কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় পেঁৗঁছান। এ সময় প্রবাসীদের সহায়তায় কামরুলের গাড়ি ও এর প্লেট নম্বর আবিষ্কার করেন তারা। কামরুলের গাড়িটি এ সময় তার সৌদি মালিকের বাড়ির ফটকে অবস্থান করছিল। ওই বাড়িতে দারোয়ানের কাজ করতেন কামরুল। ১৫ বছর ধরে তিনি কর্মরত রয়েছেন সেখানে। বাড়ির সামনে মানুষের ভিড় দেখে সৌদি মালিক এ সময় বেরিয়ে আসেন। তাকে কামরুলের ছবি দেখিয়ে রাজন হত্যার বিবরণ দেয়া হলে সৌদি মালিক তাৎক্ষণিকভাবে কামরুলকে ধরিয়ে দেন। সেখান থেকে সন্ধ্যা ৭টায় জেদ্দা কনস্যুলেট জেনারেল ভবনে নেয়া হয় তাকে। ততক্ষণে জেদ্দা কনস্যুলেটে প্রবাসীদের ভিড় জমে যায়। স্থানীয় সংবাদকর্মীরা রাজন হত্যা নিয়ে নানা প্রশ্ন করতে থাকেন তাকে। কামরুল জানান, বাড়িতে চোর ধরা পড়েছেÑ এ খবর পেয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে একটি ছেলেকে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার চারপাশে চৌকিদারসহ অনেকেই ছিল। চৌকিদার ছেলেটিকে বেদম পেটাচ্ছে। এ সময় তিনিও ছেলেটিকে পিটিয়েছেন বলে স্বীকার করেন। তিনি জানান, তার উদ্দেশ্য ছিল না ছেলেটিকে মেরে ফেলার। চোর বলেই তাকে প্রহার করা হয়েছে। কিছুক্ষণ পিটিয়ে তারপর তিনি নিজের ঘরে চলে যান। এর কিছুক্ষণ পরই তাকে জানানো হয় ছেলেটি মারা গেছে। পরে মৃতদেহটি ফেলে দেন একটি ময়লার স্তুপের নিচে। কামরুল আরও জানান, ঘটনার পরই তিনি দ্রুত বাংলাদেশ ত্যাগ করে সৌদি আরবে চলে আসেন। শিশু রাজনকে প্রহার করতে ৯ জনের মধ্যে তার ভাইয়েরা ছিলেন কিনা জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করেন। জানান, তার কোন ভাই রাজনকে পেটায়নি। প্রশ্ন করা হয়, তাহলে পুরো ঘটনাটি সে একা করেছিল কিনা। কামরুল বলে, চৌকিদারসহ কিছু মানুষ । ছেলেটি মৃত্যুযন্ত্রণায় পানি পান করতে চেয়েছিল দেয়া হয়নি কেন- জিজ্ঞেস করলে কামরূল বলে, চৌকিদার বলেছে পানি পান করলে এ সময় মারা যাবে বিধায় দেয়া হয়নি। এদিকে, জেদ্দা কনস্যুলেটের প্রথম সচিব জানান, কামরুল ইসলামকে কূটনৈতিক পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন তিনি জেদ্দার জামেয়া থানায় পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে যত দ্রুত সম্ভব তাকে দেশে পাঠানো হবে।

নিহত সামিউল আলম রাজনের হত্যার প্রতিবাদে কুমুরগাও পয়েন্টে আয়োজিত সমাবেশে আসার পথে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তার বাবা আজিজুর রহমান। অসুস্থ অবস্থায় তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার বেলা সোয়া ২টার দিকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালের ২য় তলার ১৬নং ওয়ার্ডেও ১১নং বেডে চিকিৎসাধীন।

স্বারকলিপি ॥ সিলেটের কুমারগাঁওয়ে নির্মম নির্যাতনে খুন হওয়া শিশু সামিউল আলম রাজনের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন জালালাবাদ থানা শাখা নেতৃবৃন্দ। সোমবার দুপুরে এ স্মারকলিপি দেয়া হয়। স্মারকলিপির অনুলিপি সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার ও সিলেটের পুলিশ সুপার বরাবরও দেয়া হয়েছে। স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা জজ কোটের এ্যাডিশনাল পিপি এ্যাডভোকেট শামসুল ইসলাম, মানবাধিকার কমিশন সিলেট বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী বাবু মনোরঞ্জন তালুকদার, কমিশনের সিলেট জেলা সভাপতি মাহবুবুল আলম মিলন, এ্যাডভোকেট শেখ মখলু মিয়া, মোতাহির আলী, এ্যাডভোকেট আলা উদ্দিন, জালালাবাদ থানা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক আবদাল হোসেন নাহিদ, সহ-সাংগঠনিক আলী আহমদ রেদওয়ান, আইনবিষয়ক সম্পাদক এ্যাডভোকেট বাবুল মিয়া, সিলেট ল’ কলেজ শাখার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ।

বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠন করে বিচারের আশ্বাস; শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যার ঘটনায় বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠন করে বিচারের আশ্বাস দিয়েছন সিলেটের জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীন। মঙ্গলবার সকালে কান্দিগাওয়ে রাজনের বাড়ি পরিদর্শনে গিয়ে এ আশ্বাস দেন তিনি। এ সময় সিলেটের পুলিশ কমিশনার কামরুল আহসানসহ উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা রাজনের বাবা-মাকে সান্ত¡না দেন ও বিচারের আশ্বাস প্রদান করেন। এ সময় জেলা প্রশাসক রাজনের বাবার হাতে ২০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন। জেলা প্রশাসক জয়নাল আবেদীন বলেন, রাজন হত্যা মামলাকে চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অভিহিত করা হবে। পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকেই এ মামলাটি চাঞ্চল্যকর মামলার তালিকাভুক্ত করা হবে। এছাড়া বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করে এ মামলার বিচার কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।

মানববন্ধন ॥ সিলেট নগরীর কয়েকটি স্থানে আলোচিত শিশু রাজন হত্যাকা-ের প্রতিবাদে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সিলেট প্রেসক্লাবের সামনে সিলেট ব্লগারস এ্যান্ড অনলাইন এক্টিভিটিস্ট এ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে এবং নগরীর পাঠানটুলায় সচেতন নাগরিক সমাজ এর ব্যানারে এ মানববন্ধন হয়। মানববন্ধনে বক্তরা শিশু রাজন হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি যে পুলিশ সদস্যরা কামরুলকে সৌদিআরবে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে তাদেরকেও আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য আইনশৃঙ্খলার বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান সিলেট প্রেসক্লাবের মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন ব্রিগেডিয়ার (অব) জুবায়ের সিদ্দিকী। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র কয়েস লোদী, সাংবাদিক আব্দুল মুকিত অপি, কবি মতিউর রহমান খালেদ, ফয়জুল ইসলাম, এমজে এইচ জামিল, মিনহাজ ফয়সল প্রমুখ। ব্রিগেডিয়ার জুবায়ের সিদ্দিকী বলেন, আমরা কেউ-ই চাই না রাজনের মতো ফুটফুটে একটা শিশু নরপশুদের হাতে এভাবে ঝরে যাক। এমন জঘন্য হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে যে বা যারা রাজনের খুনীদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন তাদেরকে তদন্তের মাধ্যমে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার আহ্বান জানান। এদিকে, নগরীর পাঠানটুলায় সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে আশপাশের এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষজন উপস্থিত ছিলেন।

‘এটা মর্মান্তিক, পৈশাচিক Ñ আইজিপি ॥ সামিউল আলম রাজন হত্যাকা-ের ব্যাপারে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘এটা মর্মান্তিক, পৈশাচিক। এটা মনুষ্যত্বের বিকৃতি। যারা করেছে তাদের মনুষ্যত্ববোধ নেই। কোন ক্রমেই এ ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। আমরা অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছি আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য। একটা শিশু যত বড় অপরাধই করুক, তাকে তো কোনক্রমেই টর্চার করে মেরে ফেলা কোন বিবেকবান লোকের কাজ নয়।’ তিনি বলেন, ‘রাজন হত্যা মামলার মূল আসামি মুহিদ, কামরুল ইসলাম আর আলী তারা আপন তিন ভাই। এ ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেফতার করেছি। আমরা মুহিদকে গ্রেফতার করেছি। কামরুল ইসলাম জেদ্দাতে আমাদের কনস্যুলেটের সহযোগিতায় গ্রেফতার হয়েছে। আমি যোগাযোগ করছি। ইন্টারপোলের মাধ্যমে ম্যাসেজ দিয়েছি। তাকে যাতে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে পারি সে চেষ্টা করা হচ্ছে। আশা করি শিগগিরই পারব।’ মঙ্গলবার দুপুরে তিনি গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। এ সময় তার সঙ্গে পুলিশের ডিআইজি (ঢাকা রেঞ্জ) এসএম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান, ডিআইজি হাইওয়ে মল্লিক ফখরুল ইসলাম, এডিশনাল ডিআইজি (অপরাধ) মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: