মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১১ আশ্বিন ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

বাংলাদেশের বস্তি ও ভাসমান লোকগোষ্ঠী

প্রকাশিত : ১৫ জুলাই ২০১৫
  • ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৪ সালে প্রশংসনীয়ভাবে দেশের বস্তি ও ভাসমান লোকগোষ্ঠীর একটি শুমারি সমাপ্ত করেছে। পাঁচ বা ততোধিক গৃহস্থালি সংবলিত অপরিকল্পিতভাবে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সরকারী বা বেসরকারী ভূমিতে গড়ে ওঠা ঘনবসতিকে বস্তি এবং সড়ক ও রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, বাসস্ট্যান্ড, হাট-বাজারের মধ্যে বা কাছে, মাজারের সঙ্গে ও সরকারী, বেসরকারী ইমারতের সিঁড়িতে বা মুক্ত স্থানে সড়কের পাশে বা নির্দিষ্ট ঠিকানা ছাড়া স্থায়ী নিবাসবিহীন জনগোষ্ঠীকে ছিন্নমূল ভাসমান লোকগোষ্ঠী হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে এই জরিপ অনুষ্ঠিত হয়। এই জরিপে সারাদেশে শহরাঞ্চলে ১৩,৯৪৩টি বস্তি বিদ্যমান বলে জানা গেছে। ১৯৯৭ সালে একই খাতে অনুষ্ঠিত জরিপে ২,৯৯১টি বস্তি দৃষ্ট হয়েছিল। অন্যকথায় বস্তির সংখ্যা এ সময়ে ৩৬৬% বেড়েছে। ১৭ বছরের এই বাড়ার হার অনেকাংশে সম্ভবত ১৯৯৭ সালে সমাপ্ত জরিপে সকল বস্তির শুমারি হয়নি বলে দেখা গেছে।

২০১৪ সালে দেখা গেছে যে, এসব বস্তিতে বসবাসরত লোকগোষ্ঠীর সংখ্যা ২২,৩২,১১৪। বর্তমানে দেশের শহরাঞ্চলে মোট জনসংখ্যার ২৮% বাস করেন। যে ২৮% জনগণ বর্তমানে শহরাঞ্চলে বাস করেন তাদের মধ্যে বস্তিবাসীদের সংখ্যা প্রায় ৫%। সুস্থ ও স্বাস্থ্যসম্মত শহরাঞ্চলের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংখ্যা অবজ্ঞাকরণীয় নয়। এসব জনগণের ৫১.২% পুরুষ ও ৪৮.৬% নারী এবং অবশিষ্ট ১ ভাগেরও কম হিজড়া বলে বিদিত হয়েছে। এসব জনগণের মধ্যে প্রায় ৯৩% মুসলিম, ৬% হিন্দু এবং ১% এরও কম খ্রীস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। কোন সাম্প্রদায়িকতার উপসর্গ এদেশের বস্তি এলাকায় দেখা গেছে বলে জানা যায়নি। ২০১৪ সালের এই জরিপে শহরাঞ্চলে বস্তির বাইরে ভাসমান বা ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা ১৬৬২১ জন বলে বিদিত হয়েছে। ১৯৯৭ সালে এদের সংখ্যা ছিল ৩২০৮১। এই ১৪ বছরে শহরাঞ্চলে ভাসমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৫০% কমে গেছে। সম্ভবত ভাসমান ছিন্নমূল জনগণের এক তাৎপর্যপূর্ণ অংশ বস্তিতে আশ্রয় নিতে কিংবা অর্থনৈতিক মই বেয়ে উপরে ওঠার সুযোগ পেয়েছেন। সরকারের সাম্প্রতিক কুশলধর্মী কার্যক্রম এই প্রক্রিয়ায় সহায়ক হয়েছে বলে ধারণা করা যায়।

বস্তিবাসীদের ৫১% কাজের খোঁজে এসে বস্তিবাসী হয়েছেন, ২৯% দারিদ্র্য নিপীড়িত হয়ে গ্রাম ছেড়েছেন, ৮% নদী ভাঙ্গনের ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শহর এলাকায় বাস গেড়েছেন বলে জরিপে জানা গেছে। বাকি ১২% বস্তিতে জন্মগ্রহণ করে বস্তিবাসী হয়ে আছেন বলে ধারণা করা যায়। বস্তিবাসীদের উৎস হিসেবে গ্রামাঞ্চলকে ধরা যায়। তার অর্থ দীর্ঘ মেয়াদে বস্তিবাসীদের সংখ্যা সঙ্কুচিত করতে হলে গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য, ভূমিহীনতা ও নদী ভাঙ্গনের বিপর্যয় রোধ করতে হবে। জরিপে দেখা গেছে যে, এসব জনগণ ৫৯৪৮৬১টি বাসায় থাকেন, যার মধ্যে ৭২.৫% সিটি কর্পোরেশন এবং ২১.৮% পৌরসভা এলাকায়। অবশিষ্ট ৫.৯% বস্তিবাসী উপজেলা কেন্দ্রে ও অন্যান্য শহর এলাকায় থাকেন বলে বিদিত হয়েছে। ছিন্নমূল ভাসমান লোকগোষ্ঠীর প্রায় ৪৪% ঢাকা নগরে রয়েছেন। গাজীপুরে আছেন প্রায় ৮% এবং চট্টগ্রামে রয়েছেন প্রায় ৫%। গাজীপুরে ছিন্নমূলদের অপেক্ষাকৃত বড় আস্তানা ঢাকার সন্নিকটে অবস্থানের কারণে হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। ঢাকার তুলনায় চট্টগ্রামে ছিন্নমূলদের নি¤œতর সংখ্যায় অবস্থান সহজে বোধগম্য নয়। ছিন্নমূলদের মধ্যে হিজড়াদের সংখ্যা নি¤œতম ও ফলত তাৎপর্যবিহীন বলে দেখা গেছে।

সকল বস্তিবাসীর ৬২% টিন বা কাঁচা বাসায়, ২৬.৪% আধা-পাকা বাসায়, ৬.২% ঝুপড়ি, ৪% পাকা বাসায় থাকেন। সকল বাসার মধ্যে ৬৪.৮% ভাড়ায় নেয়া, ২৭% নিজস্ব মালিকানাভুক্ত এবং প্রায় ৭% ভাড়াবিহীন স্থান বা ঝুপড়ি। বস্তিতে ভাড়ায় প্রদত্ত বাসার মালিকদের প্রতাপশালী মহাজন হিসেবে ধরা যায়। বস্তিবাসীদের ৫% নলকূপ থেকে পেয় পানি সংগ্রহ করেন; ৪৫% নলবাহিত কল থেকে পানি পান, ০.৫% কূপ থেকে, ১.৬% ডোবা ও পুকুর থেকে এবং ২.৬% নদী বা খাল থেকে পানীয় পানি সংগ্রহ করে থাকেন। সিটি কর্পোরেশন এলাকার বস্তিতে সাধারণভাবে নলবাহিত ও নলকূপের পানি লভ্য মনে করা যায়। পৌরসভাধীন বস্তিবাসীরা সম্ভবত ডোবা-পুকুর বা খাল-নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে থাকেন। বস্তিবাসীদের ৯০% আলোর জন্য বিদ্যুত এবং প্রায় ১০% কেরোসিনকে আলোর উৎস হিসেবে ব্যবহার করেন; ০.৩৩% সৌর বিদ্যুত থেকে আলো পেয়ে থাকেন। ধারণা করা যায় যে, বিদ্যুত সরবরাহ প্রায় সকল ক্ষেত্রে ভাড়ায় প্রদত্ত বস্তির মহাজন মালিকদের অনুকূলে দেয়া হয়েছে। জরিপে যদিও দেখা যায়নি তথাপি বলা চলে যে, স¦ল্প সরবরাহের কারণে ভাড়ায় দেয়া বাসার বিপরীত বস্তিবাসীরা উঁচু হারে ভাড়া দিতে বাধ্য থাকেন। বিদ্যুত থেকে আলোক প্রাপ্তি এবং সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার এ ক্ষেত্রে আশাপ্রদ। সিটি কর্পোরেশন ও অন্যান্য শহর এলাকায় বিদ্যুত বিতরণকারী সরকারী প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে বলা চলে। সৌর বিদ্যুতের প্রান্তিক ব্যবহার সংশ্লিষ্ট বস্তিবাসীর প্রযুক্তি উন্মুখ মানসিকতার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচ্য।

বস্তিবাসীদের প্রায় ৪২% বিষ্ঠা বা বর্জ্যব্যবস্থপনায় গর্ত ব্যবহার করেন, ২৬% স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করে থাকেন, ২১% টিন দিয়ে তৈরি এবং ৮.৬৩% ঝুলানো বা কাঁচা পায়খানায় যান এবং প্রায় ২% বিষ্ঠা ত্যাগের জন্য উন্মুক্ত স্থান ব্যবহার করেন। তবে বিষ্ঠা ত্যাগের জন্য উন্মুক্ত স্থানের ব্যবহার উত্তর ভারতের উন্মুক্ত স্থান ব্যবহারের হার বা মাত্রার তুলনায় অনেক কম। বস্তিবাসীদের ৪৮% রান্নার জন্য লাকড়ি, ৩৫% গ্যাস, ১১% খড়কুটো, ৩% ভাগ কেরোসিন, ১.৩৪% বিদ্যুত ব্যবহার করেন। দৃশ্যত রান্নার জন্য বস্তিতে বিদ্যুতের ব্যবহার অবৈধ। ধারণা করা যায় গ্যাস ব্যবহারকারী বাসাসমূহ ভাড়ায় প্রদত্ত। প্রচলিত আইন অনুযায়ী কেবলমাত্র সুনির্দিষ্ট সম্পত্তিতে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়। অন্য কথায় ধারণা করা যায়, এসব বাসাসমূহের মালিকরা গ্যাস বৈধ বা অবৈধভাবে সংযোজিত করেছেন। এসব বস্তির সকল গৃহস্থালির শতকরা ৮৪ ভাগেরও বেশি ভূমিহীন। এদের শহর বা গ্রামাঞ্চলে নিজস্ব মালিকানায় কোন জমি নেই।

এই শুমারিতে দেখা গেছে যে, বস্তিতে বসবাসরত ৩৩% লোক সাক্ষর । পুরুষদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৩৫%, নারী ও হিজড়াদের মধ্যে ৩১%। ছিন্নমূলদের ক্ষেত্রে সাক্ষরতার হার এর চেয়ে কমÑ মাত্র ১৯%। ছিন্নমূল নারীদের সাক্ষরতা ৯% এর চেয়ে বেশি নয়। সাক্ষরতার জাতীয় হারের চেয়ে অনেক কম সাক্ষরতার হার বস্তিবাসী ও ছিন্নমূলদের অনুকূলে শিক্ষাকে অর্থনৈতিক সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে অবারিত করছে না। বস্তিবাসীদের তুলনায় ছিন্নমূলদের অর্থনৈতিক অবস্থা নি¤œতর। তারা সকলে দারিদ্র্যরেখার নিচে আছেন। বস্তিবাসীদের প্রায় ১৭% রিক্সা বা ভ্যানচালক। প্রচলিত ধারণার বাইরে অধিকাংশ রিক্সাচালক বস্তির বাইরে থাকেন বলে মনে হয়। সাম্প্রতিক রিক্সাচালকদের আয় বাড়ার ফলে সম্ভবত এই বিবর্তন ঘটেছে। বস্তিবাসীদের ১৬% ছোটখাটো ব্যবসা করেন; পোশাকশিল্পে ১৪%, নির্মাণশিল্পে ১৮% এবং সেবা খাতে ১৪% কাজ করেন। ৬.৫% বস্তিবাসীসংলগ্ন শহর এলাকায় বাসাবাড়িতে কাজ করে থাকেন। ১৩.৩% বস্তিবাসী ছাত্রছাত্রী হিসাবে পাঠরত আছেন বলে জরিপে দেখা গেছে। প্রায় ৭% বস্তিবাসী কাজ করতে অসমর্থ বলে বিদিত হয়েছে। এসব জনগণের মধ্যে ১ ভাগের বেশি প্রতিবন্ধী। সাধারণ ধারণায় বস্তিবাসী প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা আরও বেশি। এসব প্রতিবন্ধী পেশা হিসেবে সম্ভবত ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নিয়েছেন। শুমারিতে বসতি এলাকায় ভিক্ষুকদের অবস্থান তেমন পাওয়া যায়নি। বস্তি এলাকায় কিংবা শহরাঞ্চলের ভাসমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোন বেদে জরিপে উল্লেখিত হননি। ভাসমান বেদে সম্প্রদায় শহর এলাকায় বাস করেন না বলে মনে হয়। দারিদ্র্য বিমোচনমূলক কার্যক্রমের ফলে সারাদেশে সাম্প্রতিক ভিক্ষুকের সংখ্যা কমে গেছে বলে দৃষ্ট হচ্ছে। ২০১৪ সালের জরিপে বিদিত হয়েছে যে, বস্তিবাসীর ১৩% এর বেশি সরকারী ত্রাণমূলক সহায়তা পাননি। শহর এলাকায় সরকারের ত্রাণমূলক কার্যক্রম কম বলে এটা ঘটেছে বলে ধারণা করা যায়।

বস্তির প্রায় ৮৪% গৃহস্থালিতে কমপক্ষে ১টি মুঠোফোন আছে। ৪৮% গৃহস্থালিতে টেলিভিশন, ৭৯% গৃহস্থালিতে ফ্যান, ৭% গৃহস্থালিতে ফ্রিজ আছে। মুঠোফোন, টেলিভিশন ও ফ্যানের ব্যবহার মাত্রা সাধারণভাবে এক্ষেত্রে বিদ্যমান ধারণার ব্যতিক্রম। এত বেশি বিদ্যুত ও বিদ্যুতভিত্তিক অনুষঙ্গের ব্যবহার বস্তিবাসীরা করেন বলে সাধারণ ধারণা নেই। সাম্প্রতিক দেশের মাথাপিছু আয়-বাড়া ও ব্যবসায়ের বা জীবিকার মাধ্যম হিসেবে যোগাযোগের আবশ্যকতা এসবের কারণ বলে ধরে নেয়া যেতে পারে। এই জরিপে বস্তি এলাকায় ৬% গৃহস্থালি রিক্সার মালিক, ৪% গৃহস্থালি সেলাই কলের মালিক বলে জানা গেছে; প্রায় ৫% গৃহস্থালিতে বাইসাইকেল, ৩%-এ রেডিও বিদ্যমান বলে বিদিত হয়েছে।

সাধারণ ধারণা রয়েছে যে, দেশের শহরাঞ্চলের বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল জনগোষ্ঠী অপরাধ প্রবণতার জন্ম দেয় ও অপরাধীদের লালন-পালন করে। বস্তিবাসীদের জীবিকা ও কার্যক্রম সম্পর্কিত যে সব তথ্য এই জরিপে এসেছে, তাতে একথা সুস্পষ্ট যে বাংলাদেশের বস্তি এবং ছিন্নমূলদের থাকার জায়গা কোনক্রমেই অপরাধীদের আখড়া হিসেবে বিবেচনীয় নয়। স্পষ্টত শহরাঞ্চলের অপরাধীদের বিচরণক্ষেত্র ও আবাস বস্তিবহির্ভূত এলাকায়। বস্তিবাসীরা বা ছিন্নমূল লোকগোষ্ঠীদের মাদক দ্রব্যের বাহক কিংবা সাময়িক রক্ষক বলে বিবেচনা করার কোন অবকাশ নেই। তেমনি চোরাই মালের সংরক্ষক বা চোরাই ব্যবসার মাধ্যম হিসেবে তাদের বিবেচনা করা যায় না। মাদকের ব্যবহার কিংবা ব্যবসা বস্তিবাসীদের মধ্যে তেমন দেখা যায়নি বা জরিপে দৃষ্ট হয়নি বলা চলে।

বস্তিবাসী ও শহরাঞ্চলের ছিন্নমূল জনগণের পুষ্টির অবস্থা এবং সরকার, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা কর্তৃক তাদের অনুকূলে প্রদত্ত স্বাস্থ্য সেবার কোন তথ্য এই জরিপে প্রতিফলিত হয়নি। এতদসত্ত্বেও এই বিষয়ে ধারণা করা যায় যে, অন্যান্য সুগঠিত শহর এলাকার জনগণের তুলনায় এসব স্থানে এবং এসব লোকগোষ্ঠীর পুষ্টির স্তর নি¤œতর এবং স্বাস্থ্য সেবা অপ্রতুল। প্রতিবেশী ভারতের এক সাম্প্রতিক জরিপে খাদ্য উদ্বৃত্ত হওয়া সত্ত্বেও সার্বিকভাবে অন্যান্য দেশের তুলনায় সেদেশের পুষ্টির স্তরের তেমন কোন ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেনি বলে জানা গেছে। এমনকি গুজরাটের মতো সমৃদ্ধ রাজ্যেও অন্যান্য রাজ্যের আপেক্ষিকতায় পুষ্টির স্তর বাড়েনি এবং শিশুদের শারীরিক অপচয় (ধিংঃরহম) ও শারীরিক বিকাশের বিঘœতার (ংঃঁহঃরহম) ইতিবাচক কোন পরিবর্তন আসেনি। আমাদের দেশেও উদ্বৃত্ত খাদ্যের বিদ্যমানতা সত্ত্বেও যাতে এই ধরনের প্রবৃদ্ধির খাতভিত্তিক ব্যতিক্রম বা সীমাবদ্ধতা না ঘটে তার দিকে এখনই নজর দেয়া প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে শহরাঞ্চলের বস্তিবাসী ও ছিন্নমূলদের জন্য বিশেষ খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সংগত হবে।

আমাদের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় শিক্ষার সুযোগ অর্থনৈতিকভাবে ওপরে ওঠার সিঁড়ি খুলে দেয়। বস্তিবাসী শিশু ও কিশোরদের মধ্যে সাক্ষরতার বিদিত অতি নি¤œ হার সত্ত্বেও শিক্ষা গ্রহণ করার প্রবণতা ও মানসিকতা বিদ্যমান। তথাপিও বলা চলে যে বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল পরিবারের ১-১৪ বয়োবর্গের সকল শিশু-কিশোর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায় না। এ সকল শিশু-কিশোরকে নিকটস্থ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আনা এবং পরবর্তী পর্যায়ে নিকটস্থ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিয়ে যাওয়া সমীচীন হবে। ইতোমধ্যে এসব বিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষা অধিক্ষেত্রের যে ম্যাপিং বা নকশাকরণ করা হয়েছে, তাতে বিশেষভাবে বস্তিবাসী শিশু ও সংশ্লিষ্ট ছিন্নমূল পরিবারে পালিত সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিধি বিস্তৃত।

১৯৯৭ সালের তুলনায় এ দেশে বস্তিবাসীর সংখ্যা বেড়েছে। এখন দেশের শহর এলাকার সকল লোকগোষ্ঠীর ৫% বস্তিবাসী। শহর এলাকার ভাসমান ছিন্নমূল লোকগোষ্ঠীর সংখ্যা এই ১৭ বছরে কমে আসলেও যে কোন বিচারে তা এখনও কম নয়। দেশের সংবিধান অনুযায়ী সকল নাগরিকের জীবনের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যে এদের ভাগ্যের ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষ্যে এবং যাতে বস্তিবাসী ও ছিন্নমূল জনগণের সংখ্যা আর না বেড়ে যায় সেদিকে যথাযথ নজর দেয়া প্রয়োজন। যদিও দেশের সাম্প্রতিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় দেশের সর্বত্র জনগণের আয় বাড়ছে, তথাপি অবহেলিত জনগোষ্ঠীর দিকে অধিকতর নজর দেয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইপ্সিত। শহরাঞ্চলে কর্মরত সরকারের সমাজকল্যাণ বিভাগের এবং নারী ও শিশু কল্যাণমূলক সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানাদির তরফ থেকে বস্তিবাসীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বস্তিবাসীর জীবনের গ্লানি দূরীকরণে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাসস্থান। এই লক্ষ্যে বিদ্যুত ও পয়ঃপ্রণালী সংবলিত করে সিঙ্গাপুরের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লী কুয়ান ইউয়ের নেতৃত্বে সেখানে গৃহায়ন ও শহর উন্নয়নের যে সরকারী কার্যক্রম ত্বরিত গতিতে ও ব্যাপকভাবে নেয়া হয়েছিল তা আমাদের অনুকরণ করা বিধেয় হবে। সিঙ্গাপুরের অনুকরণে সরকারী খাস বা সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার জমিতে কিস্তির ভিত্তিতে পরিশোধনীয় বা লাগসই ভাড়া-কেনা (যরৎব-ঢ়ঁৎপযধংব) পদ্ধতি প্রয়োগ করে বস্তিবাসীদের নিজস্ব মালিকানায় আবাসন সৃষ্টি করা সম্ভব। ঢাকা-চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে জানা গেছে যে, বিদ্যমান বস্তিসমূহের এরূপ পূর্বাসন এবং এই লক্ষ্যে বহুতল ভবন নির্মাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি সরকার ও সিটি কর্পোরেশনের মালিকানায় বিদ্যমান। অধিকাংশ পৌরসভা এলাকায়ও এ ধরনের ব্যবহার্য জমি পাওয়া যাবে বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা। ক্ষেত্র বা ফল বিশেষে এরূপ বহুতল ভবন সরকার ও সিটি কর্পোরেশনের মালিকানায় রেখে লাগসই ভাড়ায় এখানকার বস্তিবাসীদের অধিকাংশকে পরিবার পিছু ১০০০ বর্গফুটের বাসা দেয়া সম্ভব। মোটা দাগে এই আয়তনের ১টি ফ্ল্যাটের নির্মাণ মূল্য ১০ লাখ টাকার বেশি হবে না। একটি সুনির্দিষ্ট আবাসন প্রকল্পের আওতায় এই লক্ষ্যে অর্থসংস্থান ও বিনিয়োগ সম্ভব। ৩০ বছরে সুদবিহীনভাবে পরিশোধনীয় শর্তে ভাড়া-কেনা পদ্ধতি অনুযায়ী এসব বাসা বস্তিবাসীদের দেয়া যায়। লী কুয়ান ইউ এক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতার আলোকে সুস্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে, এসব বস্তিবাসী ও ছিন্নমূলের অনুকূলে বাসস্থান বা বাসার মালিকানা না দিলে সমাজ রক্ষা ও উন্নয়নে এদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট করা এবং ফলত দেশ ও সমাজের প্রতি এদের আনুগত্য পাওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া এভাবে মালিকানার গৌরব ও অধিকার না দিলে এদের অনুকূলে প্রদত্ত বাসস্থান ও বাসগৃহের যথাযথ সংরক্ষণ করা হয়ে ওঠে না। এই লক্ষ্যে যত তাড়াতাড়ি আমরা এসব দরিদ্র ও ছিন্নমূল লোকগোষ্ঠীর এই দেশে তাদের স্বার্থ সৃজন এবং ফলত দেশ ও সমাজের প্রতি অধিকতর আনুগত্যবোধ আনয়ন করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেব, ততই দেশের মঙ্গল সাধিত হবে।

সিঙ্গাপুরের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী লী কুয়ান ইউ সেখানকার বস্তিবাসীদের জন্য যে মানসম্মত গৃহায়নের ব্যবস্থা করেছিলেন তা এদেশের নগরাঞ্চলে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও নির্দেশে করা সম্ভব। গ্রামাঞ্চলে কৃষি জমির অকৃষি লক্ষ্যে ব্যবহার রোধকরণে এবং প্রতি গ্রামে বহুতল আবাসন নির্মাণের জন্য সরকার যে প্রকল্প ও কার্যক্রম নিচ্ছে বলে জানা গেছে, তার সঙ্গে সমন্বয় করে শহরাঞ্চলের বস্তি এলাকায় যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া এবং ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর লাগসই পুনর্বাসন করা লক্ষ্যানুগ হবে।

প্রকাশিত : ১৫ জুলাই ২০১৫

১৫/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ:
রোহিঙ্গা সমস্যার সৃষ্টি মিয়ানমারের ॥ সমাধান ওদের হাতে || বাবার ফেরার অপেক্ষায় পিতৃহারা অবোধ রোহিঙ্গা শিশুরা || বছরে রফতানি আয় বাড়ছে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার || চালের বাজারে স্বস্তি প্রতিদিন দাম কমছে || বিদ্যুতের পাইকারি দর ১১.৭৮ ভাগ বৃদ্ধির সুপারিশ || মিয়ানমারে গণহত্যা বন্ধ নির্ভর করছে নিরাপত্তা পরিষদের ওপর || রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বাস্থ্য সেবায় ২৫ কোটি ডলার চেয়েছে বাংলাদেশ || আরও মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক || অপকৌশলে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা, বিপুল অর্থ আদায় || জেলে মাদক ও মোবাইল ফোন ব্যবহার ॥ সারাদেশে দুই শতাধিক কারারক্ষী গোয়েন্দা নজরদারিতে ||