১৭ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এ কোন্ বর্বরতা!


সিলেটের কুমারগাঁওয়ে একটি দোকানঘরের খুঁটিতে বেঁধে চোর ‘অপবাদে’ শিশু রাজনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়তে হয়। গোটা সমাজের মর্মমূলই এতে প্রচ-ভাবে নাড়া খেয়েছে। এ কোন্ বর্বরতা! মানুষ এতটা নির্মম নৃশংস নিষ্ঠুর কিভাবে হতে পারে? এ ঘটনায় প্রকৃত মানুষের বিবেকবোধ বিবশ হয়ে পড়ার মতো। শিশুর প্রতি বড়দের স্নেহের উদ্রেক হওয়াটাই স্বাভাবিক ও বাঞ্ছিত। এর অন্যথা হওয়া অস্বাভাবিক অসুস্থ বিষয়। কোন শিশু যদি কোন অপরাধ কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত হয়েও পড়ে তাহলেও তাকে শাস্তি প্রদান সভ্যতাবিরোধী। শিশুদের ওপর গবেষণা ও সমীক্ষা থেকে বিশ্বে এই সত্যটিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, শিশুদের গালমন্দ বা মারধর করা তাদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য শুভ ও ইতিবাচক নয়। অপরাধী শিশুর স্থান কারাগার নয়, তাকে রাখা হয় সংশোধনাগারে, তার মনমানসিকতার সংশোধনের আশাতেই। শিশু রাজন যদি কথিত চুরির সঙ্গে জড়িতও থেকে থাকে তাহলেও তার গায়ে হাত তোলার অধিকার কারও নেই। পৈশাচিক উল্লাসে মেতে রাজনকে যারা হত্যা করেছে তারা দেখতে অবিকল মানুষের মতো হলেও মানুষ নয় তারা। কিছুতেই তারা মানুষ হতে পারে না। পাষ-, নরাধম, বিকৃত মস্তিষ্ক, নরকের কীটÑ কোন বিশেষণেই তাদের পরিচয় যথার্থভাবে তুলে ধরা যাবে না।

সংঘটিত এই নির্মম হত্যাকা-ের সংবাদটি গণমাধ্যমে কিছুটা দেরিতে প্রকাশিত হয়। তার আগে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে প্রায় আধা ঘণ্টার ভিডিও, যা ধারণ করেছিল ওই হন্তারক দলেরই একজন। ওই ভিডিওতে রাজনের বাঁচার আকুতি যে কোন পাষ-ের হৃদয়েও করুণার উদ্রেক করবে। এতটাই মর্মস্পর্শী সে চিত্র। রাজনকে অনেকটা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রোলার দিয়ে পেটানো হয় এবং নানা প্রশ্ন করা হয়। এক পর্যায়ে মাটিতে নিস্তেজ হয়ে পড়ে পানি খাওয়ার আকুতি জানায় রাজন। পানির বদলে ‘ঘাম খা’ বলে মাটিতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হয়। কয়েক মিনিটের জন্য রাজনকে হাতের বাঁধন খুলে রশি লাগিয়ে হাঁটতে দেয়া হয়। ‘হাড়গোড় তো দেখি সব ঠিক আছে’Ñ এভাবে রাজনের বাঁ হাত খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে কয়েক দফা পেটানো হয়। এক পর্যায়ে রাজনের শরীর পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে আসে।

রাজন হত্যা আমাদের সমাজ অবক্ষয়ের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। আমাদের এই সমাজ নেতিবাচকভাবে বদলে গেছে। বদলানোর জন্য একাধিক বিষয় দায়ী। তার একটি হলো মানুষের অবনতিশীল মনোভাব। মানুষ যেন এখন মানবিকবোধ খুইয়ে বসেছে। মানুষের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিক ও ভোগসর্বস্ব মানসিকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এই সমাজকে রসাতলে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবেও অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে। আমাদের সমাজে মাঝে-মধ্যে এমন সব ঘটনা ঘটানো হচ্ছে যা রীতিমতো এবসার্ড নাটকের দৃশ্যকে হার মানায়। এই চরম নৈরাজ্য থেকে পরিত্রাণের পথ অবশ্যই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। সেজন্য আইনের শাসনের কোন বিকল্প নেই। অন্ধকার অসভ্যতা অসুস্থতা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হলে সত্য, সুন্দর ও জ্ঞানের আলোর উদ্বোধন চাই। মানবতা, মনুষ্যত্ববোধ, সুস্থ রুচি, আদর্শ এবং মূল্যবোধের চর্চা আজ জরুরী হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিষবৃক্ষকেও উপড়ে ফেলতে হবে শিকড়সুদ্ধ।

আমরা শিশু রাজনের নৃশংস হত্যাকা-ের তীব্র নিন্দা জানাই। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সকল হত্যাকারীকে খুঁজে বের করে আইনের হাতে সোপর্দ না করতে পারলে মানুষ স্বস্তি পাবে না।