মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

সম্মুখযুদ্ধে মৃত নীপা বীরশ্রেষ্ঠ হলো না কেন?

প্রকাশিত : ১৫ জুলাই ২০১৫
  • মমতাজ লতিফ

নীপা- এ দু’অক্ষরের একটি মেয়ের নামে একটি বিশাল প্রায় ছয় শ’ পৃষ্ঠার বইটি যখন হাতে এলো তখনই আমাদের জাহানারা আপা জানালেন বইটির লেখক নীরা লাহিড়ী, নীপা লাহিড়ীর ছোট বোন। বইটিতে চিত্রিত নীপার সঙ্গে আমার নিজের অনেক মিল খুঁজে পাই। বিশেষ করে মাতৃভূমিতে পশ্চিমা শাসকদের চরম বৈষম্যমূলক আচরণ দেখে তাদের হাত থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষার এক লড়াইয়ে যোগ দেয়ার অদম্য ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার মিল দেখে। একইসঙ্গে কেন যেন সম্মুখযুদ্ধে লড়াইরত নীপাকে বড়ই সৌভাগ্যবতী ও যুদ্ধ ক্ষেত্রে যেতে না পারা আমার চাইতে অনেক উর্ধে এক দেশপ্রেমিক মহামানব মনে হয়, যে অতি উজ্জ্বল মেধা, বুদ্ধি এবং মানবিকতা বোধ ও দেশপ্রেম সহযোগে জন্ম নেয়া এক ক্ষণজন্মা ব্যতিক্রমী মানুষ। সে জন্মে ছিল ঠাকুরদা, মামা, মা, মাসিদের বামপন্থায় বিশ্বাসী কমিউনিস্ট এক পরিবারে, যার কমিউনিস্ট মামারা পাকিস্তান আমলে বার বার জেলে যাচ্ছেন আর বের হচ্ছেন। এমন এক পারিবারিক আবহে নীপার মতো একটি মেয়ে মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে নিজের পেশা মেডিক্যাল কলেজের প্রথম বর্ষে পরীক্ষায় অর্জিত উজ্জ্বল ফলগুলো তার উজ্জ্বলতর জীবনে ভবিষ্যত নির্দেশ করলেও, সেসব অর্জনকে সে যে মাতৃভূমির রক্তবেদিতে সম্পূর্ণ করতে মুহূর্তও দ্বিধা করবে না, সে কথাটি বইটিতে নীপার বড় হওয়ার কাহিনীতে প্রস্ফুটিত হয়ে আছে। আমাদের অজানা-অদেখা নীপাকে এত স্পষ্টভাবে নীরা লাহিড়ী উপস্থাপন করেছেন, সেটি সম্ভব হয়েছে লেখক নীরা নীপার বোন হিসেবে তাকে দিনরাত দেখেছেন যা নীপার অপর কোন ব্যক্তি বা বন্ধু লিখলে নীপা পাঠকের কাছে এত কাছের, এত আপন, এত কুশলী, জেদি এক দেশপ্রেমিক কিশোরী-তরুণীকে সে লেখায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব হতো না। বাবা অধ্যাপক শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী দারিদ্র্যের মধ্যে লেখাপড়া শিখে বড় হচ্ছেন এমন এক সময়ে যখন হিন্দু, শিক্ষিত, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দেশত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গে ঠাঁই করার চেষ্টা করছিল! পাড়া, গ্রাম থেকে অধিকাংশ হিন্দু পরিবার দেশ ছাড়ছিল যখন, তখন শিবপ্রসন্ন লেখাপড়া শেষ করে প্রথমে বেসরকারী কলেজে, পরে সরকারী কলেজে অধ্যাপনার চাকরি শুরু করে স্বদেশেই স্থায়ীভাবে বাস করবেন, সেটি ক্রমশ স্পষ্ট হয়। এমন কি ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে খান সেনারা তাঁকে শেষ পর্যন্ত উঠিয়ে জিপে নিয়ে যাওয়ার সময়ও তিনি তাদের কথামতো কলেজে ছাত্র আসছে, লেখাপড়া- ঠিকমতো চলছে- এ মিথ্যা বক্তব্য দিতে অস্বীকার করছেন বার বার, যদিও নির্যাতন করে ওরা তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছিল! এসব প্রমাণ করে তিনিও একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। তাঁর স্ত্রীকে সংসার কর্ম বন্ধ রেখে কলেজে পাস দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য তিনি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন যা হিন্দু, মুসলমান, যে কোন বাঙালী পুরুষের জন্য সে যুগেই শুধু নয়, এ যুগেও বিরল ঘটনা! নীপা তাঁর মতোই মেধাবী, জেদি এবং সত্যিকার অর্থে মাতৃভূমির সন্তান! আবার মা, মামাদের মতো মাতৃভূমির প্রতি অসাধারণ ভালবাসায় সিক্ত ও তাড়িত!

যুদ্ধের ভেতরেই তরুণ, সুন্দরী নীপার নিরাপত্তার জন্য বাবা তাকে পাবনা থেকে একজন সহৃদয় শিক্ষক সহকর্মীর সঙ্গে নীপার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পাঠিয়ে দিলেন। নীপা এ যাত্রায় খুশি হলো, কেননা ঢাকা থেকে ছাত্রছাত্রী নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে যাত্রা করে। তার পক্ষেও বাড়ির বাধা-মুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারত যাত্রা ঢাকা থেকে সহজতর হবে। নীপা তার মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে ওঠে। ওখানে সে জানতে পারে অর্থোপেডিক্সের ডাঃ রুহুল হক ছাত্রছাত্রীদের অর্থোপেডিক্সের ওপর প্রশিক্ষণ নিতে বলেছেন। ওপরের নির্দেশ শীঘ্রই এই চিকিৎসা সেবার প্রয়োজন হবে। তখনকার জন্য যত বেশিসংখ্যক সম্ভব ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুত করতে হবে। নীপা অনেক মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে অর্থোপেডিক্সের ক্ষত স্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধা, ড্রেসিং করা, স্যালাইন পুশ করা, ইঞ্জেকশন দেয়া,স্টিচ দেয়া, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের নাম ইত্যাদি নিবিষ্ট মনে শিখতে শুরু করল। সত্যিই তো, শত শত, হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ নারী, পুরুষ, শিশু গ্রামে, গঞ্জে আগুনে দগ্ধ হবে, বুলেটে বিদ্ধ হবে, বোমার আঘাতে হাত-পা ভেঙ্গে কাদের কাছে চিকিৎসা সেবা পাবে? সেজন্য মেধাবী নীপা মনোযোগ দিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। কারণ আর কিছুদিন পরই ডাক আসলে সে ওপারে গিয়ে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেবে এবং আবার মাতৃভূমিতে প্রবেশ করে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেবে। পাশাপাশি আহত, পঙ্গু গ্রামবাসী, সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধাদের সেবাটাও তো করতে হবে, দিতে হবে সঠিক চিকিৎসাটাও। নীপা ও তার সঙ্গী ছাত্রছাত্রীরা ঢাকা মেডিক্যালের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়ে। চলছে তাদের চিকিৎসা প্রশিক্ষণ এ কেবিন থেকে ও কেবিনে। এরপর মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগেও কাজ শিখতে শুরু করে নীপারা। খুব ভাল করে শেখে আহত ব্যক্তির ব্লাড লস হয়ে যেন সে শকে না চলে যায়। ব্লাড ভলিউম ঠিক রাখতে প্রথম কাজ করতে হবে, শেখে নীপারা। নীপা, বন্ধুরা সবাই ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে উপস্থিত হলো। নীপা দেখা পেল তার আরাধ্য নেতার। লেনিন, মার্কস পেছনে পড়ে রইল। একজোড়া দরদী উজ্জ্বল চোখে গাঢ় পুরো চশমায় ঢাকা দুটি চোখ, মুখে মধুর হাসি, উদাত্ত কণ্ঠস্বর তার মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। মুজিব-লেনিন একাকার হয়ে যায়। নীপা যুদ্ধে যাবে। এর মধ্যে তার অনেক বন্ধু, সমসাময়িক ডাক্তারদের মৃত্যু সংবাদ পেল। নীপা দেখা করে ডাঃ কাসেম, ডাঃ রাব্বী, ডাঃ আলীম চৌধুরীর সঙ্গে। তাঁরা আশ্বাস দেন ভারত পাঠাবার ব্যবস্থা দ্রুতই হবে। সেদিনটি এলো। নীপার দলে এক বৃদ্ধ, দু’তিন যুবক আর আট বছরের একটি শিশু, একটি পরিবারের মতো তারা গ্রাম-গ্রামান্তর দিয়ে নিরাপদ পথ খুঁজে খুঁজে নদী পেরিয়ে, ভ্যান, গরুর গাড়িতে চলতে থাকে। অবশেষে নিরাপদেই নীপার দল ভারত পৌঁছে যায়। সীমান্তজুড়েই চলছিল মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং। প্রধান লক্ষ্য ছিল ৫-১০ জনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলাদের নিয়ে এক একটা গেরিলা দল গঠন করে হাজার হাজার গেরিলা যোদ্ধারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করবে। আক্রমণ কর, আর সরে পড়Ñ এই হবে তাদের কৌশল। দেখা গেল, খুব কমসংখ্যক ডাক্তারই ভারতে গিয়েছিল। তাই মেডিক্যালের ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন ক্যাম্প ও আশ্রয় শিবিরে চিকিৎসার দায়িত্ব দেয়া হয়। আসাম, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গের বর্ডার এলাকায় শত শত প্রশিক্ষণ ক্যাম্প তৈরি হয়। আশ্রয়প্রার্থীরা যে পথেই ভারতে প্রবেশ করুক না কেন, তাদের ক্যাম্পে রেজিস্ট্রেশন করতে হতো। তারপর নিকটস্থ ট্রেনিং সেন্টারে যোগাযোগ করতে হতো যুদ্ধের ট্রেনিংয়ের জন্য। খালেদ মোশাররফ এক যুদ্ধ পরিচালনাকালে গোলার আঘাতে গুরুতর অসুস্থ হলে ক্যাপ্টেন হায়দার খালেদের নির্দেশে বেশকিছু বামপন্থী ছাত্রছাত্রীকে গেরিলা ট্রেনিং দিয়েছিলেন। এমন কি উইলিয়াম অডারল্যান্ড, এক ডাচ অস্ট্রেলিয়ান কমান্ডো অফিসার তাঁর কর্মস্থল ঢাকার বাটা কোম্পানির অফিসে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়েছেন এবং তাদের ক্যাপ্টেন হায়দারের কাছে খাদ্য, ওষুধ ও অস্ত্রশস্ত্রসহ পৌঁছে দিয়েছেন। এছাড়াও মানিকগঞ্জের ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরীর দল, টাঙ্গাইলের কাদেররিয়া বাহিনী, গোপালগঞ্জে হেমায়েত বাহিনী, গফরগাঁওয়ে আফসান বাহিনী প্রমুখ বাহিনী স্বাধীনতার লক্ষ্যে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আগরতলায় মেলাঘর ও মতিনগর প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রচুর ছেলেমেয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ঢাকায় প্রবেশ করে যুদ্ধে যোগ দেয়। নীপা ট্রেনিং নিচ্ছিল হাঁটা, দৌড়, ক্রলিং করা, এ্যামবুশ করা, শত্রুকে ঘায়েল করা, শত্রুকে বিপদে ফেলা, গ্রেনেড ছোড়া, থ্রি নটথ্রি চাইনিজ রাইফেল ছোড়া, মাইন পাতা, মাইন ফাটানো, এলএমজি চালানোর ওপর। নীপা হ্যান্ড গ্রেনেড ছোড়ার কৌশলটা ভাল রপ্ত করেছিল। সে রাইফেল চালানো, বিস্ফোরক ব্যবহার, রেইড, এ্যামবুশ, এগুলো মনোযোগ দিয়ে শিখে নেয়। সব সময় নোটখাতায়, পেন্সিলে সে কৌশলগুলো লিখে রাখত। নীপা যেহেতু মেডিক্যাল ট্রেনিংপ্রাপ্ত এবং যুদ্ধের ট্রেনিংও নিয়েছিল, তাই তাকে পুবাইল এবং কালীগঞ্জ সেক্টরের জন্য নির্বাচন করা হলো। নীপা কখনও নৌকার ছইয়ের ভেতর লুকিয়ে, কখনও তরিতকারির ট্রাকের পেছনে বসে, পর্দা ঢাকা ভ্যানে আগের আশ্রয়দাতা ভাবির দেয়া বোরকা পরে এগিয়ে গেল দেশের ভেতরে পূবাইল-কালীগঞ্জের পথে। বালু নদীর পশ্চিমে পুবাইল, পূর্বে কালীগঞ্জ। নীপাদের লক্ষ্য ছিল লুদুরিয়া গ্রামের নিমাই কস্তার বাড়ি। তাদের পুত্র মধু কস্তা ছিল সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা, কন্যা নীলিমা শর্মা ও ভিক্টোরিয়া। পরমা সুন্দরী গেরিলা নীপা ওদের বিস্মিত করে নৌকা থেকে নেমে আসে, সঙ্গে ছেলেরা অস্ত্র, গোলাবারুদের ভারি ব্যাগ নিয়ে নামে। খড়ের গাদার পেছনে অস্ত্র, গোলাবারুদ রাখা হলো। খ্রীস্টান, হিন্দু অধ্যুষিত লুদুরিয়ায় গীর্জা, পুকুর, স্কুল, খেলার মাঠ নিয়ে লুদুরিয়া মিশনে ছিলেন তিন ফাদারÑ যারা নিত্যদিন দগ্ধ, আধপোড়া, বেয়নেটের খোঁচা খাওয়া, গুলি খাওয়া আহত, কপর্দকশূন্য ভারতের পথে যাত্রারত শরণার্থীদের আশ্রয় দিচ্ছিলেন। নীপার চিকিৎসাজ্ঞান থাকায় তাঁরা খুব আনন্দিত হলেন। নীপা মিশনে থাকা রোগীদের সেবায় লেগে গেল। ভিক্টোরিয়া ওর সঙ্গে থেকে নার্সিং শিখে নিল। নীপাদের দল রেলস্টেশন, রেললাইন মাইন দিয়ে উড়িয়ে দেয়। এদিকে প্রতিশোধ নিতে পাকবাহিনী গ্রামে ঢুকে বাড়ি ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়, গুলিতে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দাতা অধিবাসীদের হত্যা করে, কাউকে বা আহত করে। নীপা আবার মিশনে নতুন রোগীদের চিকিৎসা করে। ফাদাররা ওর প্রেসক্রিপশনের ওষুধ ঢাকা থেকে কিনে আনেন। বড় ডেগ ভর্তি খিচুড়ি রেঁধে সবাইকে খাওয়াতেন। একটু সুস্থ হলে মানুষগুলো ভারতের পথে যাত্রা করত। পাক আর্মি একদিন মিশন শেষে ফিরতি পথে জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা নীপা, কবির মাস্টার, সাইদুল হক, বদিউজ্জামান খসরুর গ্রেনেড আর গুলিতে মারা গেল, আহত হলো, কেউ পালাল। ওরা সিদ্ধান্ত নেয়, এখন থেকে আর্মিদের নিয়মিত টহলের সময় আক্রমণ করবে। আকাশ গোমেজ, বিশাল গোমেজ, লেবু গোমেজ, মোক্তার, সিরাজ, শম্ভু পেরেরা, অগাস্টিন পেরেরা, অমল কস্তা, এ্যান্টনি- সবাই সিদ্ধান্ত নিল- এবার দুর্ধর্ষ গেরিলা যুদ্ধ শুরু করতে হবে। প্রতি থানায়, প্রতি গ্রামে, মরতে তো হবে, কিন্তু শত্রুর শেষ রাখব না। নীপা বলল, এ যুদ্ধ কত বছর চলবে তার স্থির নেই। সেজন্য এ গ্রামের ছেলেমেয়েদের যুদ্ধের কিছুটা ট্রেনিং দিতে হবে। আমরা না থাকলে ওরা যুদ্ধ করবে। জঙ্গলে ট্রেনিং দেয়া স্থির হয়। নীপা দেখে ঘর ভর্তি আগ্রহী নবীন কিশোর, তরুণ, তরুণী। তাদের প্রশিক্ষণ চলে। নীপা, এ্যান্টনি, মোক্তার আর সিরাজ কালীগঞ্জ থানা আক্রমণের পরিকল্পনা করে। যুদ্ধ বেড়ে যাওয়ায় আহত হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধারা। খোলা হলো ফিল্ড হাসপাতাল। নীপার কাজ বেড়ে যায়, দিন, রাত। কালীগঞ্জে আসগর হোসেন পাঠান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের বড় আশ্রয়দাতা। এই পাঠান বাড়িতেই সিদ্ধান্ত হলো কালীগঞ্জের সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর পরিকল্পনা। জঙ্গলে বাংকারে ট্রেঞ্চে গ্রামবাসী, মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিল। ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু“হয়। শাহজাহান, বিমল, নীপা, ফরহাদ, ফেরদৌস, মফিজ, সমর ডি কস্তা, হুমায়ুনসহ নাম না জানা শত শত তরুণ- মেশিনগান, থ্রিনট থ্রি রাইফেল, গ্রেনেড আর মাইন নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। এক সময় পাকিস্তানী সৈন্যরা দিবারাত আক্রমণে অস্থির হয়ে ট্যাঙ্ক নিয়ে তুমুলিয়া গ্রামে ঢোকে। তখন নীপা অস্থায়ী হাসপাতালে শাহাজাহান, বিমল, মফিজসহ কয়েক শ’ আহত মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসা সেবায় রত। চারদিকে আগুন আর গুলি বৃষ্টি। মুক্তিবাহিনী ঝোপঝাড় বাংকার থেকে আক্রমণ করছে। যে কোন মুহূর্তে অস্থায়ী হাসপাতালের বেড়ায় আগুন লেগে যেতে পারে। চিন্তিত নীপা কয়েকজনের সাহায্যে একে একে সব আহত মুক্তিযোদ্ধাকে ট্রেঞ্চে নামিয়ে ফেলে। কিন্তু ঘরে রয়ে গেল মূল্যবান যুদ্ধের অস্ত্র, গ্রেনেড, রাইফেল। আগুন ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের চালে। নীপা অস্ত্রগুলো উদ্ধারের জন্য বিপদ মাথায় নিয়ে আবারও ঘরে ঢোকে। সে গ্রেনেড আর অস্ত্রের থলি নিয়ে দৌড়ে বের হতে চেষ্টা করে। ঘরের চাল আগুন, কামানের গোলায় ভেঙ্গে পড়ে, নীপা অস্ত্রের ব্যাগসহ বাইরে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু সে জানে না কখন আগুনের স্ফুলিঙ্গ তার দেহে, শাড়ির আঁচলে লেগে গেছে। নীপা দাঁত দিয়ে ক্লিপ খুলে পর পর দুটো গ্রেনেড ছুড়ে মারে শত্রুদের লক্ষ্য করে। ততক্ষণে নীপার সমস্ত শরীর জ্বলে উঠেছে দাউদাউ করে। নীপা মাটিতে গড়াগড়ি দেয়, তারপর ছুটে যায় জঙ্গলের দিকে। ঠিক সে সময় একটা বুলেট এসে নীপার বুকে বিঁধে। জ্বলন্ত নীপা শেষবারের মতো থ্রিনট থ্রিতে চাপ দেয়, বুলেট ছুটে যায় আর্মি প্লাটুনের দিকে। উবু হয়ে বসে সে বুকের কাছে বন্দুক লাগিয়ে আবার গুলি ছোড়ে। জ্বলন্ত ঘরবাড়ি, জঙ্গল আর নীপার দেহ। ধীরে ধীরে নিথর হয়ে যায় জ্বলন্ত দেহ। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা যুদ্ধ শেষে মুক্তিবাহিনী গ্রামে ফিরে আসে। তারা তাদের অসীম সাহসী যোদ্ধা, চিকিৎসক বোনটির দেহের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু না, কান্নার বা মৃতদের সমাহিত করা সম্ভব হয় না। যে কোন মুহূর্তে পাক আর্মি আবারও আক্রমণ করবে। তাঁরা শত শত মৃতদেহের সঙ্গে অগ্নিদগ্ধ নীপাকে ভাসিয়ে দিলেন শীতলক্ষ্যার বুকে।

যুদ্ধ শেষ হয়। অজস্র ক্ষত, দুঃখ, যন্ত্রণা, হারানোর বেদনা নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়। ‘নীপা’র যুদ্ধ জীবনের কাহিনী যে কোন বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরশ্রেষ্ঠ-এর সমতুল্য। কোন মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধও করছেন, আবার আহত সঙ্গীদের চিকিৎসা করছেন- এটি একটি দুর্লভ ঘটনা। আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, নীপার তো অনেক সঙ্গী ছিল যারা নিপাকে যোদ্ধা হিসেবে, চিকিৎসক হিসেবে দেখেছে। কেন যুদ্ধ করে, মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতে দিতে নিহত হওয়া নীপার মতো মুক্তিযোদ্ধা ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হলো না? নীপার কাহিনীই বা কেউ জানল না কেন? ওকে জানার জন্য ওর বোন নীরা লাহিড়ীর বইটি রচনা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো কেন? একজন নীপার কাহিনী পাঠ্যবইতে থাকুক, চলচ্চিত্র হোক, রাষ্ট্র তাকে সম্মানিত করুক- এই আমার চাওয়া।

লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক

প্রকাশিত : ১৫ জুলাই ২০১৫

১৫/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: