২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

তরুণদের প্রেরণা এ্যান্ড্রেস নিউম্যান


এ্যান্ড্রেস নিউম্যান এই প্রজন্মের আর্জেন্টাইন জনপ্রিয় সাহিত্যিক। বয়স ৩৮ হয়ে গেছে, কিন্তু এখনও তাঁর সাহিত্যকর্মে তারুণ্যের ছোঁয়া। তারুণ্যই তাঁর সাহিত্যের প্রাণ। তারুণ্যের জয়গানই তিনি গেয়েছেন তাঁর রচিত উপন্যাস, গল্প এবং কবিতায়। ডি-প্রজন্মের পাঠকদের কাছে এ্যান্ড্রেস নিউম্যানের তারুণ্যনির্ভর কর্মময় জীবন তুলে ধরা হলো।

এ্যান্ড্রেস নিউম্যান খ্যাতিমান অনবদ্য সাহিত্যকর্মের জন্য। তাঁর রচিত উপন্যাস, গল্প এবং ছোট গল্পগুলোতে তিনি মানুষের মনোজৈবনিক প্রেক্ষিতকে বিশ্লেণ করে পাঠকের মাঝে উপস্থাপন করেছেন। জীবনের ট্র্যাজিক অবস্থার সঙ্গে হাস্যরসাত্মক অবস্থার অপূর্ব মেলবন্ধন দেখিয়েছেন। মানব প্রাণের প্রাত্যাহিক জীবনের প্রতিধ্বনি-প্রতিচ্ছবি তিনি তুলে ধরেছেন পারঙ্গমতার সঙ্গে। কবিতাতেও তাই। কবিতার প্রতি ছন্দে কল্পনা-বাস্তবতার মিশেলে তিনি জীবন দর্শনকে তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সার্থকভাবে।

কবিতা, ছোট গল্প, উপন্যাস লেখার পাশাপাশি অনুবাদ কর্ম, কলাম লেখা, চালিয়ে যাচ্ছেন বেশ সমানতালে। তাঁর জনপ্রিয়তা আর্জেন্টিনা, স্পেন ছাড়িয়ে এখন পুরো বিশ্বেই। মাত্র বাইশ বছর বয়সে রচনা করা ‘বারিলোচি’ বইটির মাধ্যমে তাঁর খ্যাতি আর্জেন্টিনা আর স্পেনে ছড়িয়ে পড়লেও বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন ৩২ বছর বয়সে রচিত ‘ট্রাভেলার অফ দি সেঞ্চুরি’ বইটির জন্য। খ্যাতির সঙ্গে তার ঝুড়িতে জমা হয়েছে অনেক প্রাপ্তি অনেক পুরস্কার। অল্প বয়সেই সাহিত্যজগতে নিজের অবস্থান বেশ ভালভাবেই পাকা করে নিয়েছেন এ্যান্ড্রেস নিউম্যান। তাঁর সাহিত্যকর্মগুলো ইতোমধ্যে ১৭টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

১৯৭৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্সে। বাবা-মা দু’জনই ছিলেন সঙ্গীতের সঙ্গে জড়িত।

সঙ্গীতের আবহের মধ্যেই তাঁর বেড়ে ওঠা। কিন্তু সেই বেড়ে ওঠার সময়টা তাঁর জন্য, তাঁর পরিবারের জন্য সুখের ছিল না। এর কারণ ছিল সেই সময়কার রাজনৈতিক অস্থির অবস্থা। ঐ অস্থিরতার কারণে নিউম্যানের পুরো পরিবারকে দুঃসহ যন্ত্রণাকাতর অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাঁর বয়স যখন ১৪ তখন পুরো পরিবার আর্জেন্টিনার সকল সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে শান্তির আশায় স্পেনে পাড়ি জমান।

নিউম্যানকে সেই কিশোর বয়সেই রুটি-রুজির কাজ শুরু করতে হয়েছিল। আইসক্রিম তৈরি করা, ঘরের পর্দা ঝুলানো ইত্যাদি অড জব করে পরিবারকে সাহায্য করতেন তিনি। ওই যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতিই তাঁর সাহিত্যকর্মকে প্রভাবিত করেছে। নিজের জীবন থেকেই তিনি দেখেছেন নির্মম জীবনরূপ আর সেই রূপটিই তিনি পাঠকের সামনে পরবর্তী সাহিত্যিক জীবনে তুলে ধরেছেন।

তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘নাইট মেথডস’। ১৯৯৮ সালে ২১ বছর বয়সে এই কবিতার বই প্রকাশিত হয়। এই বইটির জন্য নিউম্যান এ্যান্টোনিও কারভাজাল ইয়াং পোয়েট্রি এ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। কবি হিসেবে সেই অল্প বয়সেই সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হন নিউম্যান। এরপর একে একে তিনি আরও কতগুলো কবিতার বই রচনা করেন। ‘দ্য পুল প্লেয়ার’ বইটি ২০০০ সালে প্রকাশিত হয়। এরপর ২০০২ সালে প্রকাশিত হয় ‘দ্য টোবোগান’ নামক কবিতার বইটি। এই বইটি হিপেরিয়ন পয়েট্রি পুরস্কার লাভ করেন। তার ‘ডাউন মিসটিক’ নামক কবিতার বই প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালে। ওই বছরেই তাঁর কবিতা রচনার একদশকের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয় ‘ডিকেট, পয়েট্রি ১৯৯৭-২০০৭’ নামক বইটি। এরপর দীর্ঘ চার বছর পর ২০১৩ সালে স্প্যানিশ ভাষায় একটি কবিতার বই বের হয়। নিউম্যানের কাছে কবিতা হচ্ছে সুখের রাজ্যে বসবাস করার শামিল।

এ্যান্ডেস নিউম্যান কবি হিসেবে সুনাম অর্জন করলেও তাঁর মূল পরিচয় কিন্তু ঔপন্যাসিক হিসেবে। তিনি ‘ট্রাভেলার অব দি সেঞ্চুরি’ বইটির জন্যই বেশি খ্যাতি অর্জন করেন। অবশ্য ঔপন্যাসিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস থেকেই। ১৯৯৯ সালে নিউম্যানের বয়স যখন ২২ তখন প্রকাশিত হয় তাঁর ‘বারলোচি’ বইটি। এটিই ছিল তাঁর রচিত প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। বারলোচির রাবিশ কালেক্টর দিমেত্রিও রোজার প্রাত্যাহিক রাবিশ সংগ্রহের কাজের মধ্যে দিয়ে নিম্নবিত্ত মানুষের দরিদ্র সত্তাটি ফুটে ওঠে আবার জিগসো খেলার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে শৈল্পিক সত্তা। দিমিত্রি গরিব হলেও তার চাওয়া-পাওয়া কম নয়। নারীর প্রতি তীব্র আকর্ষণ আর দরিদ্রতা এরই মধ্যে দিয়েই অতিবাহিত হয় অসুখী দিমিত্রির জীবন। দিমিত্রির মধ্যে দিয়ে নিউম্যান আর্জেন্টিনার নিম্নবিত্ত পরিবারের চাওয়া-পাওয়া অর্থাৎ প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছেন।

ট্রাভেল অফ দি সেঞ্চুরি বইটির মধ্যে দিয়েই বিশ্বব্যাপী এ্যান্ড্রেস নিউম্যানের পরিচিতি। বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে। ওই বছরেই বইটির জন্য নিউম্যান আলফাগুয়ারা পুরস্কার লাভ করেন। সেই সঙ্গে লাভ করেন ন্যাশনাল ক্রিটিকস এ্যাওয়াড বইটির বিশেষত্ব হলো বইটির কাহিনী একবিংশ শতাব্দীর পাঠককে নিয়ে যায় উনবিংশ শতাব্দীতে। আর সেই সঙ্গে পাঠককে পোস্ট মর্ডান রোমান্টিসিজমের স্বাদ-আস্বাদনের সুযোগ এনে দেয়। বইটির প্রধান চরিত্র সোফি আর হ্যানস। এদের পারস্পরিক ভালবাসা, মনোজাগতিক চিন্তা-চেতনা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদি বিষয় বইটিজুড়ে থাকলেও এতে শিল্প বিপ্লব পরবর্তী পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, রাজনৈতিক ডামাডোলে মানুষের জীবনে যে প্রভাব সৃষ্টি হয় সেই বিষয়গুলোকেও তুলে আনা হয়েছে।

এরপর এ্যান্ড্রেস নিউমেনের বই ‘টেকিং টু আওয়ারসেলভস’ ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়। এটি ইংরেজী ভাষায় অনূদিত তাঁর দ্বিতীয় বই। বইটির কাহিনী তিনজন মানুষের ভাষ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। বাবা, মা আর তাদের সন্তান। এখানে একটি পরিবারের প্রোট্রেট আঁকা হয়েছে। এ্যান্ড্রেস নিউম্যান কবিতা, উপন্যাস ছাড়াও অনেক সার্থক ছোট গল্প লিখেছেন। তাঁর ছোট গল্পের বইগুলোর মধ্যে দ্য ওয়ান হু ওয়েটস (২০০০), দ্য লাস্ট মিনিট (২০০১), বার্থ (২০০৬), প্লেয়িং ডেড ( ২০১১) উল্লেখযোগ্য।

যে বয়সে অনেক বিখ্যাত লেখকই লেখা শুরু করেননি সেই বয়সেই নিউম্যানের খ্যাতি স্পেন, আর্জেন্টিনার গ-ি ছড়িয়ে বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত হয়ে গেছে। তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রশংসায় পঞ্চমুখ পৃথিবী বিখ্যাত লেখক-সমালোচকরাও। এ্যান্ড্রেস নিউম্যানের প্রশংসা করে স্প্যানিশ সমালোচক ফার্নান্দো ভেলাস বলেন, ‘নিউম্যান এই প্রজন্মের অন্যতম এক লেখক যিনি শুধু ভাল বই লেখেন না, লেখেন মহৎ বইও।’