মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১০ আশ্বিন ১৪২৪, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

গুলশানের কালাচাঁদপুর স্কুলের শিক্ষকদের ঈদ বোনাস অনিশ্চিত

প্রকাশিত : ১৪ জুলাই ২০১৫
  • সরকারীকরণের বিরুদ্ধে গবর্নিং বডির অবস্থানে সঙ্কট তৈরি
  • হুমকিতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সরকারীকরণের বিরুদ্ধে গবর্নিং বডির অবস্থানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সঙ্কটে পড়েছে রাজধানীর গুলশানের কালাচাঁদপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। গবর্নিং বডির আপত্তির পরেও সরকারীকরণের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় প্রতিষ্ঠানের শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর ঈদের আগের বেতন-বোনাস পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। গবর্নিং বডির সদস্য ও তাদের মদদপুষ্ট বহিরাগতদের হুমকিকে ভয়ে প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ এমপিওভুক্ত বেশ কয়েকজন শিক্ষক এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। নিরাপত্তা চেয়ে গুলশান ও ভাটারা থানায় একাধিক জিডিও করেছেন শিক্ষকরা। শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, জাতীয়করণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে গবর্নিং বডি এখন জোর করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়ার চেষ্টা করছে। তারা প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর সহায়তা কামনা করেছেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আবেদনের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর কালাচাঁদপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। তারপরই সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুর রউফ ফকির ও গবর্নিং বডির একটি পক্ষ জাতীয়করণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদনের পর গবর্নিং বডির সভাপতি মোঃ ওয়াকিলউদ্দিন ঘোষণা করেছেন, এলাকা আমার, প্রধানমন্ত্রীর নয়। আমি না চাইলে প্রধানমন্ত্রী এ প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করতে পারবেন না। তার নেতৃত্বেই এখন জাতীয়করণ বিরোধী নানা কার্যক্রম চলছে বলে অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষকরা। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ২০১৩ সালের ২২ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ৩০ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, পদোন্নতি স্থগিত, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সরকারের কাছে হস্তান্তরের জন্য ডিড অব গিফট (দানপত্র দলিল) সম্পন্ন করার আদেশ জারি করে। কিন্তু গবর্নিং বডি তা না করে মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার চার মাস আগেই কোন নির্বাচন ছাড়াই ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে নতুন গবর্নিং বডির অনুমোদন নেয়। একই সময়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে সাবেক প্রধান শিক্ষকের চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তাকে অধ্যক্ষ দেখিয়ে দুই বছরের জন্য মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। হেদায়েতউল্লাহ নামে একজন গবর্নিং বডির কো-অপ্ট সদস্য হিসাবে দাবি করছেন, কিন্তু তাকে কো-অপ্ট সদস্য হিসেবে এখন পর্যন্ত কোন অনুমোদন দেয়নি বলে বলছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। তবে এসব বেআইনী তৎপরতায় যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানানো হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে। আবেদনকারী শিক্ষকরা বলছেন, গবর্নিং বডি ও সাবেক প্রধান শিক্ষকের বিপক্ষে অসংখ্য অভিযোগ করা হয়েছিল ঢাকা বোর্ডে। অভিযোগের ২০১৪ সালের ২৭ জানুয়ারি দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছিল বোর্ড। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তদন্ত সম্পন্ন করে কমিটি। অথচ আজ পর্যন্ত তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি সংশ্লিষ্ট আসনের সংসদ সদস্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য এস এম আবুল কালাম আজাদ নানা অভিযোগসহ গবর্নিং বডি ভেঙে দিয়ে এ্যাডহক কমিটি গঠনের জন্য কয়েকটি ডিও লেটার দিলেও তা আমলে নেননি বোর্ড। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সহযোগিতা পেয়ে জাতীয়করণ বিরোধী তৎপরতা আরও সক্রিয় হয়। এ অবস্থায় গেল বছর ২ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সংসদ সদস্যের আদেশক্রমে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এমএ রশীদ মিয়া কালাচাঁদপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সকল নিয়োগ-পদোন্নতি স্থগিত করে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি মহামান্য রাষ্ট্রপতি বরাবরে দানপত্র দলির সম্পন্ন করে দেন। সেই দানপত্র দলিলের বিপক্ষে ভুয়া রেজুলেশন করে গবর্নিং বডির সদস্যরা হাই কোর্টে রিট করে বলে অভিযোগ ওঠে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন গবর্নিং বডির সদস্যরা।

চলতি বছরই একুশে ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহরে প্রতিষ্ঠানের শহীদ মিনারে ফুল দিতে গেলে সরকারীকরণের পক্ষে অবস্থান নেয়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষকের ওপর হামলা চালানো হয়। একই কারণে ১৪ জুন কলেজের হিসাববিজ্ঞানের প্রভাষক আবুল কালাম আজাদকে অপহরণের অপচেষ্টা চালানো হয়। এ বিষয়ে গুলশান থানার জিডি করা (নম্বর-১১৭৮/২০-০৬-২০১৫) হয়। একই সময়ে ইংরেজী বিষয়ের প্রভাষক মিথুন কুমার বিশ্বাস, বাংলা প্রভাষক আজিজুল ইসলামের বাসায় হামলা চালানোর হুমকি দেয়া হয়।

গত কদিন ধরেই শিক্ষকরা অভিযোগ করছেন, জাতীয়করণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার জন্য গবর্নিং বডির সদস্যরা এখন জোরপূর্বক এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়ার চেষ্টা করছে। গবর্নিং বডির সদস্যরা ঘোষণা দিয়েছে, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, হিসাববিজ্ঞানের প্রভাষক, ইংরেজীর প্রভাষক, গণিতের প্রভাষক, বাংলার প্রভাষক, সিনিয়র শিক্ষক মতিয়ার রহমান প্রতিষ্ঠানে আসলে, তাদের হাত-পা ভেঙে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়া হবে। প্রাণের ভয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আত্মগোপনে থাকায় বেতন-বিলে স্বাক্ষর করতে না পারায় ঈদের আগে শিক্ষকদের বেতন-বোনাস অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যর মাধ্যমে বিষয়টি মধ্যস্থতার চেষ্টাও ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু গবর্নিং বডির সভাপতি সংসদ সদস্যকে জানিয়ে দিয়েছেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ তাদের তালিকা অনুযায়ী শিক্ষকরা পদত্যাগ করলে বেতন-বিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এসব বিষয়ে গুলশান থানায় জিডি (জিডি নম্বর ৪৫০ ও ৪৫১) করা হয়েছে।

এদিকে গবর্নিং বডির সদস্যরা তাদের দল ভারি করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গত মে মাসের ১৫ তারিখ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন। এজন্য লাগেনি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ পরীক্ষাও নেয়া হয়নি। এ নিয়োগেও উঠেছে লাখ লাক টাকার বাণিজ্যের অভিযোগ। প্রতিষ্ঠানের কলেজ শাখায় ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ের কোন অনুমোদন নেই। অথচ এখানেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একজন প্রভাষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ। এ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাওয়া অন্যান্য শিক্ষকেরও একই অবস্থা বলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ভুক্তভোগী শিক্ষকরা প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

তবে কোন শিক্ষকদের হুমকি দেয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন গবর্নিং বাডির সভাপতি ওয়াকিলউদ্দিন।

প্রকাশিত : ১৪ জুলাই ২০১৫

১৪/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: