১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

আক্রান্ত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ও ধর্মের দুর্বৃত্তায়ন


নিউইয়র্কের এক অনুষ্ঠানে সম্প্রতি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর প্রদত্ত বক্তব্যকে ঘিরে হেফাজত, জামায়াত ও বিএনপি তথা হেজাবিরা অহেতুক তুমুল বিতর্ক শুরু করেছে। তথাকথিত ইসলামের ধ্বজাধারী এসব মতলববাজ রাজনৈতিক দল আসলে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের নামে রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। গতকালের পর আজ পড়ুন তৃতীয় কিস্তি-

যেসব রাষ্ট্রে রাজতন্ত্র নেই সেখানে ধর্মকে সামনে রেখে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল ও কুক্ষিগতকরণ। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া বা বাংলাদেশ এর উদাহরণ। একই বিষয় লক্ষণীয় ছিল ইরাক সিরিয়া প্রভৃতি দেশে। আইএস যা করছে তা সেই শিয়া-সুন্নি গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত। বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান বা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এর উদাহরণ। তবে এখনও বাংলাদেশে ঐ ধরনের শাসন দীর্ঘকাল করা সম্ভব হয়নি। তার কারণ সমাজের অন্তর্নিহিত সেক্যুলার বোধ ও জনসমাজের সজীবতা। যে কারণে এখানে শিয়া-সুন্নি গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব নেই। আহমেদীয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু ধর্ম ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত সক্রিয়, মৌল জঙ্গীবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায়, যার উদাহরণ ব্লগারদের হত্যা, যারাই তাদের বিরোধিতা করে তাদের মুরতাদ হিসেবে ঘোষণা করা, সুস্থ ইসলামের প্রতীক শেখ হাসিনাকে ডজনখানেকবার হত্যার চেষ্টা, বিশিষ্ট জনকে হত্যার চেষ্টা বা হুমকি দিয়ে তাদের নিঃশব্দ করা। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে মুরতাদ ঘোষণা এর সর্বশেষ উদাহরণ।

॥ পাঁচ ॥

পাকিস্তান আমলে ধর্মের পীড়ন ছিল। ধর্ম নিয়ে ব্যবসাও ছিল। কিন্তু নতুন শতাব্দীতে বাংলাদেশে ধর্মীয় পীড়ন ও ব্যবসা মাত্রা ছাড়িয়েছে। এবং এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে কেউ আগ্রহী নন। ধর্ম এখন কিছু লোকের কারণে মানুষের কল্যাণে নয়, মানুষকে হুমকি দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পেশাদার রাজনীতিক, ধর্ম ব্যবসায়ী রাজনৈতিক দল ও সরকারের প্রচ্ছন্ন মদদ থাকে। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর আমলেই ধর্ম নিয়ে মানুষকে হুমকি দেয়ার কেউ সাহস রাখেনি। সামরিক কর্মকর্তারা বাংলাদেশের যে ক্ষতি করেছেন তা আর কেউ করতে পারেননি। জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদ বুকে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে দেশটিকে আবারও পাকিস্তানের অঙ্গীভূত করতে চেয়েছিলেন। এ কারণে পাকিস্তান সরকার জিয়াউর রহমানকে পুরস্কৃত করতে পারেনি কারণ তার আগেই তার মৃত্যু হয়; কিন্তু জেনারেল এরশাদকে পেরেছিল। এ দু’জন সামরিক কর্মকর্তা ইসলামকে যতভাবে পারা যায় ব্যবহার করেছেন নিজ স্বার্থে এবং দুর্নীতির প্রস্রবণ খুলে দিয়েছিলেন। একই পথ অনুসরণ করেছিলেন খালেদা জিয়া। জামায়াত বা বাংলাদেশ-বিরোধীদের জিয়া অবমুক্ত করেছিলেন তার সহযোগী শক্তি হিসেবে। আওয়ামী লীগবিরোধী প্লাটফর্ম তৈরি করতে গিয়ে জিয়া ও এরশাদ এই সর্বনাশটি করেছিলেন। তাদের পুরো রাজনীতির মৌল বিষয় ছিল ধর্ম উন্মাদনা জাগিয়ে তোলা এবং নিজেদের ইসলামের ধারক-বাহক হিসেবে তুলে ধরা। এরশাদ এ কারণেই রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেছিলেন। এগুলো রাজনীতি নয়, রাজনৈতিক খচরামি যা রাজনৈতিক খচ্চরদের পক্ষেই করা সম্ভব।

জিয়া-এরশাদ-খালেদা তাদের নীতি বাস্তবায়ন করতে প্রায়োগিক দুটি ক্ষেত্র বেছে নিয়েছিলেন। এক. হিন্দুদের ভারত আমাদের জানি দুশমন। দুই. আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ্বাসী তারা হিন্দুদের এজেন্ট। বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত ইসলাম- এই তিনটি সংগঠন এখন এর মূল প্রবক্তা। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি দৃঢ় করার জন্য তারা মাদ্রাসা শিক্ষা তুঙ্গে নিয়ে যায় এবং সব ধরনের মৌলবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। ইসলামকে সামনে রেখে প্রবল লুটপাটের মাধ্যমে তারা আমলাতন্ত্রে এবং সিভিল সমাজে একটি বিশেষ শ্রেণী তৈরি করে এবং শিক্ষা-সংস্কৃতিতে তাদের নীতি সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করে মানস জগতে আধিপত্য বিস্তার করে। নিউইয়র্কে যারা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে হেনস্থা করেছে তারা এর উদাহরণ।

হেজাবিরা মানস জগতে এমন প্রভাব সৃষ্টি করে যে, আওয়ামী লীগ তা জুঝবার জন্য আবার ধর্মকে আশ্রয় করে। আমার সঙ্গে অনেকে একমত হবেন না কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি এই কৌশল ছিল ভুল।

লক্ষ্য করবেন দু’দশক আগেও আওয়ামী লীগের নেতারা বিসমিল্লাহ বলে বক্তৃতা শুরু করতেন না। জিয়াউর রহমান ও এরশাদ এ ধরনের বক্তৃতা শুরু করার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের মনে হতে লাগল ইসলামী দৌড়ে বুঝি তারা পিছিয়ে পড়ছেন। সুতরাং, তারা তাদের অনুসরণ করলেন যদিও আওয়ামী লীগাররা হেজাবিদের থেকে অনেক বেশি ধর্মপ্রাণ। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী সেøাগান ও পোস্টারেও আল্লাহ-বিসমিল্লাহ-রসুলুল্লাহ (স.) চলে এলো। হেজাবিরা শিক্ষায় মাদ্রাসা খাতে এবং সামরিক আমলাতন্ত্রে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে। যদিও খাত দুটি অনুৎপাদনশীল। তাদের ধারণা এরা এদের মাঠ-সৈনিক হিসেবে কাজ করবে। করেছেও। আওয়ামী লীগ সরকারও এই ধারা অনুসরণ করেছে। আওয়ামী লীগের ডান অংশ এখন শক্তিশালী হয়ে উঠছে। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখবেন, অতি আওয়ামী লীগাররা যাদের সম্পদের ভিত্তি লুণ্ঠন, তারা বক্তৃতা-বিবৃতিতে বলছেন, বামধারার মানুষজনের অনুপ্রবেশে আওয়ামী লীগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাদের নিজস্বতা হারাচ্ছে। তারা কিন্তু কখনও বিএনপি-জামায়াতের নিন্দা করে না।

গত কয়েক বছর হেজাবিরা ইসলামের নামে কী করেছে তা সবার জানা। খালেদা জিয়া নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং শুরু করেছেন ধর্মের নামে মানুষ পোড়ানো। হেফাজতের কথা মনে আছে? হেফাজত ঢাকা দখল করার পরিকল্পনা করে বিএনপির সহায়তায়। মানুষ দেখছিল কী অসহায়ভাবে সরকার আত্মসমর্পণ করছে। আওয়ামী লীগের ডানপন্থী নেতারা চেয়েছিল সমঝোতা করে মীমাংসা করতে। এ পরিস্থিতিতে সৈয়দ আশরাফ যখন ঘোষণা করেন, রাজাকারের বাচ্চাদের ছাড়া হবে নাÑ তখন এক নিমিষে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সাধারণ মানুষ উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। সাময়িকভাবে ডানপন্থীরা হটে যায়। শেখ হাসিনার নির্দেশে হেফাজতিদের সরানো হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের ক্ষতি না করে এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ঘটনা খুব কম। কিন্তু শুনেছি, পরে অনুযোগ করা হয়, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আলমগীরের কারণে আওয়ামী লীগ ইসলামী ভোট হারাল। অথচ, সরকার সেই সময় যে কৌশল নিয়েছিল তাতে অটল থাকলে হেজাবিদের অবস্থা আরও খারাপ হতো। বিএনপি এতো দুষ্কর্ম করার সুযোগ পেত না। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, ডানপন্থী ধারা প্রবল হচ্ছে আওয়ামী লীগে যা দেশ ও জাতির জন্য শুভ নয়।

সঙ্গে সঙ্গে আমি এ কথাও বলব, দেশটি যে মৌল জঙ্গীবাদীরা একেবারে দখল করতে পারেনি তার কারণ শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নয়। সাধারণ মানুষের যতটা আস্থা আওয়ামী লীগের ওপর তার চেয়ে বেশি শেখ হাসিনার ওপর। তার দৃঢ় সিদ্ধান্তের কারণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। এখন পর্যন্ত বিচারালয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠেনি তেমন। যদিও বলা হচ্ছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদ-, সেখানে যাবজ্জীবনের কোন স্থান নেই। মানুষজন সাগ্রহে অপেক্ষা করছে সাকাচৌ ও নিজামীর আপিলের রায় শোনার জন্য। বিদেশী পত্রিকায় এসেছে এবং আদালতপাড়ায় গুঞ্জন অপরাধীদের আত্মীয়স্বজন দেখা করেছেন আদালতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। আমরা সে বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে চাই না। সমস্যা হচ্ছে, নেতিবাচক কিছু ঘটলেই সবাই শেখ হাসিনার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেন। যদিও আদালতের রায়ের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক নেই। ইতিবাচক হলে সবাই বিচারকদের প্রশংসা করেন। অতিরিক্ত সাফল্যও মাঝে মাঝে বিপদ ডেকে আনে।

মানবতাবিরোধী অপরাধ বন্ধ করার জন্য জামায়াত-বিএনপি যথেষ্ট চেষ্টা করেছে। তারা তাদের মুরব্বি সৌদি-পাকি এবং আমেরিকার কাছে ধর্ণা দিয়েছে বারবার। হাসিনা নড়েননি। উইকিলিকসের তথ্য অনুযায়ী সৌদিরা এ বিষয়ে সাড়া দেয়নি। (চলবে)