২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

কক্সবাজারে পুলিশের ইয়াবা কানেকশন নিয়ে তোলপাড়


এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ॥ কক্সবাজারে হাতেগোনা কয়েকজন অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার কারণে জেলার সর্বত্র পুলিশের কর্মকা- নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যে রাতভর সড়কপথে পুলিশের কর্ম তৎপরতা চোখে পড়ার মতো, তা অকপটে স্বীকার করছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, প্রবাদ আছে- একজনে করে নষ্ট সবে দুঃখ পায়। কক্সবাজারেও তাই হয়েছে। ডিবি পুলিশের কয়েকজন অসৎ কর্মকর্তার কারণে পুলিশের দুর্নাম রটেছে। পুলিশের চাকরি নিয়ে কক্সবাজারে বদলি হয়ে এসে কতিপয় পুলিশের পরিবারের ভাগ্যের পবির্তন এসেছে বটে চাকরি জীবনের পরিবর্তন বা উন্নতি আসেনি। এতে নিজ কর্তব্য পালনকারী পুলিশ বিভাগে চাকরিরত কর্মকর্তাদের অনেকে ওইসব ইয়াবা পুলিশের ওপর খুবই নাখোশ। কেননা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলছে। পাশাপাশি সন্ত্রাসী আটক ছাড়াও মাদক জব্দ এবং চোরাচালানিদের গ্রেফতারও করে চলছে। তবে কিছু লোভী পুলিশের কারণে দুর্নাম রটেছে। ফেনীতে ৭ লাখ পিচ ইয়াবাসহ পুলিশের এক এএসআই গ্রেফতার ও তার স্বীকারোক্তিমূলক জবাববন্দীতে পুলিশের ইয়াবা সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে। কক্সবাজার ডিবি অফিসে, উখিয়া ও টেকনাফে থানায় দায়িত্ব পালনকারী কিছু লোভী পুলিশের কারণে জনগণের কাছে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে। ডিবি পুলিশের কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত থাকা বা সহযোগিতার করার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা যায়, কেনাফ-মংডুভিত্তিক গড়ে ওঠা ইয়াবা সিন্ডিকেট টেকনাফের একটি হোটেলে এক কর্মকর্তার সঙ্গে গোপনে বৈঠকে বসেছিলেন। স্থলপথে টেকনাফ সীমান্ত থেকে লাখ লাখ পিচের ইয়াবার চালান ওই ডিবি দারোগার গাড়িতে করে কক্সবাজার পর্যন্ত নিয়ে আসা হতো বলে জানা গেছে। ওই কর্মকর্তা কক্সবাজার গোয়েন্দা পুলিশে থাকাকালীন সময়ে প্রাইভেট নোয়া, কার ও মাইক্রোবাসে করে সিপাহীদের নিয়ে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়ক ও মেরিন ড্রাইভ সড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে ইয়াবা উদ্ধার করতেন। যা পরবর্তীতে ঢাকায় চালান করা হতো। উদ্ধারকৃত ইয়াবার হাতেগোনা কয়েকশ’ জব্দও দেখানো হতো।

ফেনীতে ৬ লাখ ৮০ হাজার ইয়াবাসহ র‌্যাবের হাতে আটক টেকনাফ থানার সাবেক এক কর্মকর্তা র‌্যাবের কাছে অনেক তথ্য দিয়েছেন। ইয়াবা সিন্ডিকেটে জড়িতদের একটি তালিকাও দিয়েছেন তিনি।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সময় উদ্ধার হওয়া লাখ লাখ ইয়াবা জমা করতে কক্সবাজারে হোটেল কক্ষ নতুবা বিলাস বহুল বাসাভাড়া নিয়েছিলেন এসআই ইউনুচ ও বিল্লাল। মজুদকৃত ইয়াবাগুলো পুলিশের অথবা ডিবি পুলিশের স্টিকার লাগিয়ে ঢাকায় চালান করা হতো। প্রতি মাসে দুটি করে চালান ঢাকায় পাঠানো হতো। অনেক সময় নিরাপদে ইয়াবার চালান ঢাকায় আনতে পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়িও ব্যবহার করা হতো। পুলিশ বা ডিবি পুলিশ লেখা গাড়ি দেখলে রাস্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ তল্লাশি করত না। সহজেই ইয়াবার চালান পৌঁছে যেত ঢাকায়। প্রসঙ্গত, ২০ জুন রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী বাইপাস অংশের লালপুল থেকে ৬ লাখ ৮০ হাজার ইয়াবাসহ পুলিশের এসবির এএসআই মাহফুজুর রহমান ও তার গাড়িচালক মোঃ জাবেদ আলীকে আটক করে র‌্যাব সদস্যরা। ওই সময় তাদের কাছ থেকে মাদক বিক্রির নগদ সাত লাখ টাকা, চারটি মোবাইল সেট, বিভিন্ন ব্যাংকের আটটি ক্রেডিট কার্ড ও তিনটি মাদক বিক্রির টাকার হিসাবের নোটবুক উদ্ধার করে র‌্যাব। এ ঘটনার পর ইয়াবা পাচারের ঘটনায় পুলিশের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাওয়ায় পুলিশ সদর দফতর দুইটি পৃথক কমিটি গঠন ও তদন্ত শুরু করেন। বর্তমানে কমিটি জেলার বিভিন্ন থানায় তদন্তের কাজ চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

পুলিশের ইয়াবা মজুদের আস্তানা ॥ কক্সবাজার শহরের রহস্যঘেরা আলোচিত একটি ভবনের নাম ‘হাজী আমির আলী ম্যানশন’ এখন সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এ ভবনে ভাড়া থাকেন এমপি এবং পুলিশ, বিজিবি, সেনা কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীসহ ভিআইপি মর্যাদার লোকজন। এ ভবনটির সুনাম ছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু ইয়াবা মজুদের গুদাম হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় এখন অনেকেই আতঙ্কিত। কেনা-বেচা কিংবা পুলিশের হাতে আটকের পর গায়েব করা ইয়াবা মজুদ করা হতো বাহারছড়ার সার্কিট হাউস রোডের হাজী ছিদ্দিক আহমদের মালিকানাধীন ভবনটির তৃতীয় তলার সি-১নং ফ্ল্যাটে। নিরাপদে লেনদেন আর ইয়াবা মজুদ করতে গুদাম হিসেবে দামি এ ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উপ-পরির্দশক (এসআই) বিল্লাল হোসেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ভবনের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এসআই বেলালের সঙ্গে ওই ফ্ল্যাটে সার্বক্ষণিক যাতায়াত ছিল টেকনাফের দুলাল নামের এক যুবকের। এমনকি দিন-রাতের অধিকাংশ সময় ওই ফ্ল্যাটে আড্ডা ছিল কক্সবাজার সদর মডেল থানা, টেকনাফ থানা, চকরিয়া থানা, মহেশখালী থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের ৭Ñ৮ জন সদস্যের। সাদা পোশাকে এবং পুলিশের পোশাকে তারা সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করতেন এবং আড্ডা দিতেন। এ কারণে অনেক সময় পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দারাও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যেতেন।

সূত্র জানায়, গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের মধ্যে থাকা কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ‘সিভিল টিম’ নিয়ে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ইয়াবা ধরার পর অধিকাংশ সময় ইয়াবা ও আটককৃতদের ওই ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে দফা-রফা করে তাদের অনেককেই ছেড়ে দেয়া হতো। আবার জব্দ করা ইয়াবা থেকে সিংহভাগ ইয়াবা চুরি করে তা ওই ফ্ল্যাটে মজুদ করে আসছিল। পুলিশের ইয়াবা সিন্ডিকেটের উদ্ধার হওয়া পরবর্তীতে সরকারী নিয়মে জমা না করে গায়েব করা ইয়াবা, এবং কম দামে কিনে নেয়া ইয়াবা মজুদ করতেন ওই এসআই বেলালের ফ্ল্যাটে। ইয়াবার মজুদদার ছিলেন ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া গোয়েন্দা পুলিশের এসআই বিল্লাল। আমির আলী ম্যানশনে অবস্থানরত বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, এসআই বিল্লাল বেতন-ভাতাসহ সর্বসাকুল্যে প্রায় ১৫ হাজার টাকা মাসিক বেতন পেলেও তিনি যে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছেন তার ভাড়া ১৭ হাজার টাকা। কয়েকটি মোটরসাইকেল, নোয়া মাইক্রোবাস, কারসহ বেশ কয়েকটি গাড়ি নিয়ে আয়েশি জীবন-যাপন করতেন তিনি। চলাচল ছিল রাজকীয় হালে। এমনকি তার সিন্ডিকেটের সদস্য ছাড়া পুলিশের অন্য কোন সদস্যকে পরোয়াও করতেন না তিনি। সম্প্রতি এএসআই মাহফুজ ইয়াবাসহ আটক হওয়ার পর ওই ফ্ল্যাট থেকে পালিয়ে যান এসআই বিল্লাল। ওই ঘটনার পর থেকে ফ্ল্যাটটি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। অন্য গাড়িগুলো না থাকলেও তার ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল রয়েছে ওই ভবনের নিচে পার্কিং-এ। অভিযোগের ব্যাপারে জানার জন্য এসআই বিল্লাল ও এসআই শেখ মোহাম্মদ ইউনুচের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের মোবাইল বন্ধ থাকায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: