মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ঈদের সেকাল একাল মো. আবু হাসান তালুকদার

প্রকাশিত : ১৩ জুলাই ২০১৫

রমজানের ঐ রোজার শেষে, এলো খুশির ঈদ...। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই গানের সুরে প্রতিটি মুসলিম বাঙালীর হৃদয়ের কোণে কোণে জেগে ওঠে সুখের নাচন, আনন্দের নাচন। মাহে রমজানের এক মাস রোজা থাকার পর শেষ ইফতারের সঙ্গে সঙ্গে যখন ঈদের নতুন চাঁদ দেখা যায় তখন আনন্দ যেন একসঙ্গে উপচে পড়ে। আর রেডিও টিভিতে যখন নজরুলের এই গান বেজে ওঠে তখন তো আনন্দের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। সমস্ত মুসলমান যেন এ আনন্দে একাকার হয়ে যায়। আকাশ-বাতাস মনে হয় হেসে ওঠে ঈদ আনন্দে।

ঈদের আনন্দ কি সবসময় একই রকম ছিল। আসলে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় এই উৎসবে আনন্দের কমতি কখনই ছিল না। সেকাল-একাল সবকালেই আনন্দময়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ত পাল্টে গেছে এই আনন্দ উদযাপনের পদ্ধতি। হয়ত বদলে গেছে আনন্দানুভূতির ধরন-বৈচিত্র্যতা। তবে সেকাল-একাল যে কালেই হোক না কোন ঈদের আনন্দ মূলত শিশুদেরই।

কেমন ছিল সেকালের ঈদ? সেকাল তো একালের বড়দের শৈশব কাল। শৈশবের স্মৃতি মানুষকে এমনিতেই আবেগতাড়িত করে। তার ওপর আবার ঈদের স্মৃতি। সে কি ভোলা যায়! তখনকার দিনে এখনকার মতো রেডিমেড গার্মেন্ট ছিল না। তখন থান কাপড় কিনে বানাতে হতো। রোজার প্রথম থেকে ভিড় শুরু হয়ে যেত খলিফা (টেইলর) বাড়িতে। আবার কাপড় যখন তখন কেনা যেত না। কারণ হাটবারে হাট ছাড়া কাপড় পাওয়া যেত না। অবশ্য গঞ্জে বা সদরের নিউমার্কেট থেকে সম্ভ্রান্তরা কিনত। যাই হোক খলিফাবাড়িতে কাপড় বানাতে গিয়ে ছোটদের আর তর সয়না। মাঝে মধ্যেই ঢুঁ মেরে আসে খলিফাবাড়িতে। তারটা বানাতে আর কত দেরি। কার কার পোশাক বানানো হলো এই সব তথ্য সংগ্রহের জন্য। এই আনাগোনা ও অপেক্ষা ছিল কতই না মধুর। অবশেষে ঈদের দুই একদিন আগে পেয়ে যেত তার কাক্সিক্ষত পোশাকটি। নতুন পোশাক পেয়ে তার ঈদ হয়ে যেত রঙিন। ঈদের দিন সকালবেলা ছোট বড় সকলে দল বেঁধে পুকুরে বা নদীতে গোসল করা। তারপর নতুন পোশাক পরে পায়েশ-সেমাই খেয়ে সারিবদ্ধভাবে দূরের কোন ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়তে যাওয়া। মনে হয় মেঠো পথে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি টুপি পরিহিত মানুষের মিছিল মিলিত হয়েছে কোন এক মোহনায়। তখন গ্রামে গ্রামে ঈদগাহ মাঠ ছিল না। কয়েকটি গ্রামের জন্য ছিল একটি ঈদগাহ মাঠ। গ্রামে গ্রামে ঈদগাহ এর প্রয়োজনীয়তাও মনে করত না। কারণ এই উপলক্ষে ঈদগাহে কয়েকটি গ্রামের লোক একসঙ্গে মিলিত হতে পারত। নামাজ শেষে পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করে চলত কুশল বিনিময়। ঈদগাহ থেকে ফেরার পর প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি যাওয়া, মিষ্টি মুখ করা। ছোটরা নতুন জামা কাপড় পরে দল ধরে এ বাড়ি সে বাড়ি বেড়াতে বের হতো। তাদের তো দশ/বার বাড়িতে না যেতে পারলে যেন ঈদের আনন্দ পরিপূর্ণ হতো না। কোন কোন আত্মীয়স্বজন ছোটদেরকে দুই টাকা/পাঁচ টাকা ঈদের সালামি দিত। এই সালামি পেয়ে নিজেদেরকে অনেক সম্পদশালী মনে হতো। এই মূল্যবান সম্পদ আমরা অনেকদিন আগলে রাখতাম। টাকার গরম অনেক দিন থাকত। আগের দিনে অনেক এলাকায় গ্রামের লোকজন সাধারণত গরিবদের ফেতরার টাকা না দিয়ে সমপরিমাণ খাবার চাল দিত। ঈদের দিন সকালবেলা ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় পোঁটলা বেঁধে চাল সঙ্গে করে নিয়ে যেত। ঈদগাহ মাঠের চারপাশে ভিখারি ও গরিব লোকজন এই চাল নেয়ার জন্য কাপড় বিছিয়ে রাখত। লোকজন নামাজের পূর্বে সঙ্গে আনা চাল ওই কাপড়ের ওপর ছিটিয়ে দিত। ছোটরা এই কাজটি করতে খুব আনন্দ পেত।

তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি ও স্যাটেলাইট টিভির প্রভাবে বর্তমানে ঈদ উদযাপনের পদ্ধতিও পাল্টে গেছে। আগে ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য ঈদকার্ড প্রেরণ বেশ জনপ্রিয় ছিল। বর্তমানে অফিস ও কর্পোরেট জগতে এর প্রচলন থাকলেও ব্যক্তি পর্যায়ে তেমন একটা নেই। এখন ঈদের শুভেচ্ছা জানানো হয় ফেসবুক, ভাইবার, টুইটার, ইমেইল বা মোবাইলের এসএমএস বা এমএমএস-এর মাধ্যমে। ঈদের আনন্দ আবর্তিত হয় ফ্যাশন ডিজাইন, বিউটি পারলার ও শপিংকে কেন্দ্র করে। কেনাকাটাই যেন এখন ঈদের মূল আনন্দ। নিজেকে সুন্দর করে সাজানোর জন্য রমজানের মাঝামাঝি সময় থেকেই বিউটি পারলারগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে। ফ্যাশন হাউসগুলো জমজমাট হয়ে ওঠে। কিশোরী-তরুণীর হাতে মেহেদি লাগানো সেকাল-একাল দুই কালেই খুব জনপ্রিয়। মনে হয় তাদের হাতে আনন্দ যেন মূর্ত হয়ে ওঠে। আনন্দ যেন হাতের মুঠোয় থাকে। তবে এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন রংয়ের মেহেদি রেডিমেড পাওয়া যায়, হাতে লাগানোর সহজ উপায় আছে। কিন্তু সেকালে মেহেদি লাগানো ছিল অনেক কষ্টকর। তখন এই কষ্টকর কাজটিই ছিল ঈদ আনন্দের প্রধান আকর্ষণ। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে সংগ্রহ করা হতো মেহেদি বা মেন্দির পাতা। তারপর রাতে একজন শিল-পাটা নিয়ে মেন্দি বাটতে বসত। আর তাকে ঘিরে চারদিকে গোল হয়ে বাকিরা বসত। চলত গল্পগুজব, হাসি-ঠাট্টা-গান। মেহেদি প্রস্তুত হলে একটি ছোট কাঠি দিয়ে হাতে মেহেদির নকশা আঁকা হতো বা চুন দিয়ে নকশা একে হাতের তালুতে মেহেদি ছাপ মেরে রাখা হতো। পরে দেখা যেত হাত লাল-সাদা নকশা হয়েছে। নিজের, চাচাত-ফুফাত, প্রতিবেশী ভাই-বোনদের সঙ্গে মেহেদি লাগানোর সেই সময়টুকু যে কি মধুর ছিল!

কিন্তু যে ঈদের জন্য এত আয়োজন সেই ঈদের দিনে কি আগের দিনের মতো আনন্দ হয়? ঈদের দিনে দল ধরে প্রতিবেশীদের বাড়ি বেড়ানো গ্রামে কিছুটা থাকলেও শহরে এখন নেই বললেই চলে। সারাদিন অলস সময় কাটানোর পর বিকেলে বা সন্ধ্যায় শিশু পার্ক, এ্যামিউজমেন্ট পার্ক বা আত্মীয়স্বজনদের বাসায় বেড়াতে বের হয় কেউ কেউ। ঈদের মাঠের আনন্দও সীমিত হয়ে গেছে। শহরে তো ঈদের নামাজ ও শুক্রবারের জুমার নামাজের পার্থক্যই বোঝা যায় না। কারণ মসজিদেই হয় ঈদের জামাত। কোলাকুলি করার জায়গা নেই। বড় ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়ে কয়জনে?

অবশ্য এখন ঈদের আনন্দ দিতে বা ঈদ আনন্দকে ঘরে বন্দী করতে ব্যস্ত স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো। সপ্তাহব্যাপী প্রচারিত হয় ঈদ অনুষ্ঠান। ব্যস্ত শহর, ব্যস্ত মানুষের জন্য এই আনন্দই বা কম কি! ঈদের অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিকতা যাই থাকুক না কেন, ঈদের আনন্দ থাকে প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে, ধর্মীয় অনুভূতিতে। এই আনন্দে ছোট-বড়, ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একাকার হয়ে যায়। এটাই ঈদের বড় মহিমা।

মডেল : বর্ষা, শাওন ও সজিব

প্রকাশিত : ১৩ জুলাই ২০১৫

১৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: