২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

চির বিদায় ‘সুলতান অব হলিউড’


সংস্কৃতি ডেস্ক ॥ হলিউডের প্রবাদ প্রতিম শিল্পী, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কনট্রাক্ট ব্রিজ খেলোয়াড়, ব্রিজ কলাম লেখক, বাদামি চোখের অভিনেতা ওমর শরিফ ৮৩ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। ফিল্মের মতোই বর্ণময় এই অভিনেতার জীবনযাত্রা থেমে গেল। শুক্রবার মিসরের কায়রোর এক হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান প্রবীণ এই হলিউড অভিনেতা। নন্দিত এই অভিনেতার মৃত্যুতে বিশ্ব চলচ্চিত্রাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন হলিউডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রশিল্পীরা। স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোক এবং শ্রদ্ধা জানিয়েছেন চলচ্ছিত্র সংশ্লিষ্টরা। তবে মৃত্যু হলেও ওমর শরিফ অভিনীত জনপ্রিয় চলচ্চিত্রগুলো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।

এদিকে শুক্রবার তাঁর মৃত্যুর পর টুইটার ও সামাজিক নেটওয়ার্কের সাইটগুলোতে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান সহশিল্পী ও বন্ধুরা। বিশ্বনন্দিত অভিনেতা স্যার রজার মুর তাঁর টুইটে লিখেছেন, লরেন্স অব এ্যারাবিয়া চলচ্চিত্রে তাঁর বিস্ময়কর অভিনয় অনেকদিন মনে থাকবে। চলচ্চিত্রটি চমৎকার। তাঁর অভিনয়ও ভয়াবহ। তাঁকে খুব মিস করব।

লেখক, অভিনেতা, পরিচালক ও নির্মাতা ভিনসেন্ট ডি অনফ্রিও লিখেছেন, তাঁকে ভীষণ মিস করব। শৈশব থেকেই তাঁর চমৎকার অভিনয় দেখছি। তাঁকে স্যালুট। অভিনেতা, পরিচালক ও লেখক ম্যাথু মদিন লিখেছেন, আপনার মার্জিত, মেধাবী আর স্টাইলিশ অভিনয়ের জন্য ধন্যবাদ। চলচ্চিত্রে আপনি এক অমোচনীয় দাগ রেখে গেলেন! অভিনেতা এ্যান্টোনিও বান্দারেজ লিখেছেন, তিনি এক মহান কথক, একজন বিশ্বস্ত বন্ধু এবং এক প্রজ্ঞাবান মানুষ। অভিনেত্রী মরগান ফেয়ারচাইল্ড লিখেছেন, ডক্টর জিভাগোখ্যাত ওমর শরিফ তিরাশিতে চলে গেলেন। প্রিয় এই মেধাবী মানুষটির জন্য সব সময় ভালবাসা। অভিনেতা, পরিচালক ও নির্মাতা লুক গস লিখেছেন, পর্দার কিংবদন্তি ওমর শরিফ আমাদের দুঃখে ভাসিয়ে চলে গেলেন। শূটিংয়ের সেটে এখনও তাঁর হাসির শব্দ শুনতে পাই। তিনি শান্তিতে নিদ্রিত হন।

ওমর শরিফের এজেন্ট স্টিভ কেনিসের উদ্ধৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, এ্যালজাইমার্স রোগে ভুগছিলেন ওমর শরিফ। গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চলে এসে তিনি মিসরে তাঁর পৈত্রিক বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। ১০ জুলাই শুক্রবার বুকে যন্ত্রণা অনুভব করায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই হার্ট এ্যাটাকে তাঁর মৃত্যু হয়। বর্ণময় জীবনের সমাপ্তিও ঘটল ফিল্মের মতো করেই। এ বছরই গোড়ার দিকে ৮৩ বছর বয়সে মারা যান শরিফের প্রথম স্ত্রী ফাতেন হামামা। কয়েক মাসের মাথায় চলে গেলেন তাঁর প্রেমিকও, সুলতান অব হলিউড। তবে ওমর শরিফ চলে গেলেও রেখে গেছেন তাঁর অভিনীত ১১৮টি চরিত্র। শেরিফ আলি, ড. জিভাগো, কলরাডো সিনে পর্দায় করা এই চরিত্রগুলোর জন্যই তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর এর জন্য ভক্তদের কাছেও তিনি অমর হয়ে থাকবেন। আলেকজান্দ্রিয়ায় রোমান ক্যাথলিক পরিবারে ১৯৩২ সালে ওমর শরিফের জন্ম। বাবা-মা নাম দিয়েছিলেন মাইকেল দিমিত্রি চালহোব। অঙ্ক ও পদার্থবিদ্যা নিয়ে কলেজ পাস করার পর পরিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন। পাশাপাশি চলতে থাকে অভিনয়। ১৯৫০-এর দশকে তিনি হলিউডে নিজের অভিনয় জীবন শুরু করেন। ফিল্ম করতে গিয়েই এক সময় আলাপ হয় মিসরের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ফাতেন হামামার সঙ্গে। চলচ্চিত্রটির নাম ‘দ্য বে জিং সান’। সেই চলচ্চিত্রে প্রথম চুম্বন দৃশ্যে অভিনয় করবেন হামামা। বিপরীতে মাইকেল। প্রত্যাশিতই ছিল ওই দৃশ্য নিয়ে বিতর্ক বাঁধবে। বাবার কাছে লুকোতে ছদ্মনামে অভিনয় করলেন মাইকেল। নিজের নাম রাখলেন, ওমর আল শরিফ। সেই শুরু হলো ওমর শরিফের অভিনয় জীবন। এর পরে হামামার সঙ্গে অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। বন্ধুত্ব এক সময় পরিণতি পায় প্রেমে। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৫৫ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বিয়ে করেন হামামাকে। তবে এ বিয়ে টেকেনি। হামামার সঙ্গে সম্পর্কে চিড় ধরে ১৯৬২ সালে। ১৯৫৭ সালে ওমর শরিফ ও ফাতেন হামামার মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের পর শরিফ আর বিয়ে করেননি।

মিসরে বড় হওয়ার সুবাদে আরবি ভাষায় তো পারদর্শী ছিলেনই, সঙ্গে স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, গ্রিক এবং ফ্রেঞ্চ ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারতেন। ১৯৬০-এর দশকে তার অভিনীত বেশকিছু চরিত্র স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। জানা যায় ১৯৬২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘লরেন্স অব এ্যারাবিয়া’র মাধ্যমে প্রথম চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষের নজরে আসেন বিখ্যাত এই অভিনেতা। এতে শেরিফ আলি চরিত্রে ওমর শরিফের অনবদ্য অভিনয় তাঁকে তারকাখ্যাতি এনে দেয়। এতে অভিনয়ের জন্য ১৯৬৩ সালে অস্কারের মঞ্চে মনোনীত হন তিনি। একই চলচ্চিত্রের জন্য গোল্ডেন গ্লোব জেতেন তিনি। এর তিন বছর পর ১৯৬৫ সালে ‘ডক্টর জিভাগো’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ওমর শরিফ। এই দুটি চলচ্চিত্রের জন্যই তিনি গোল্ডেন গ্লোব এ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। চে গুয়েভারার জীবন কাহিনী নিয়ে নির্মিত ‘চে’ চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। ওমর শরিফ যখন হয়ে উঠলেন শরিফ আলি, ডেভিড লিন-এর ‘লরেন্স অব আরাবিয়া’ ফিল্মে। লিন পরে জানান, অভিনয়ের জন্য নয়, শরিফকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন তাঁর বাদামি চোখের জন্য। চলচ্চিত্রের নায়ক পিটার ও’টুলের নীল চোখের বিপরীতে। সাড়া ফেলে দিয়েছিল শরিফ আলি। এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য দু’টো গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার ও অস্কার মনোনয়ন পেলেন তিনি। শরিফ আলির হাত ধরেই শুরু হলো ওমর শরিফের হলিউড যাত্রা। কিন্তু থেমে গেল হামামার সঙ্গে পথ চলা। শরিফ নিজেই স্ত্রীকে জানালেন, এই বিয়ে টিকিয়ে রাখা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। হামামা যেন তাঁকে ডিভোর্স দিয়ে অন্য কাউকে বিয়ে করেন। ভেঙে গেল বিয়ে। শরিফের কথা রেখেই এক ডাক্তারকে বিয়ে করলেন হামামা। তারপর শরিফের জীবনে এসেছিল অসংখ্য প্রেম-ভালবাসা। কখনও তাঁর নাম জড়িয়েছে টুইসডে ওয়েল্ডের সঙ্গে, কখনও ডায়ান ম্যাকবেন, কখনও আবার ইনগ্রিড বার্গম্যানের সঙ্গে। যখন যার বিপরীতে অভিনয় করেছেন, প্রেমে পড়েছেন তাঁরই। হয়ে উঠেছেন হলিউডের ‘সুলতান অব সেডাকশন’। মিসরীয় বংশোদ্ভূত এই শিল্পী আলেকজান্দ্রিয়া শহরের ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়েছেন। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে স্নাতক পাস করে পারিবারিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর তিনি চলচ্চিত্রজগতে আসেন।

‘ফানি গার্ল’ চলচ্চিত্রে বারবারা স্ট্রেস্যান্ডের সঙ্গে কাজ করার পর নিজেই বলেছিলেন, পাগলের মতো ওঁর প্রেমে পড়ে গেলাম। কিন্তু সেই অনুভূতি চার মাসের বেশি থাকেনি ঠিক যতদিন পর্যন্ত শূটিং চলেছিল। তার পরেই ফের অন্য নায়িকার সঙ্গে অভিনয় করতে গিয়ে নতুন সম্পর্কে জড়িয়েছেন। তবে হাজারো সম্পর্কের ভিড়ে একটা কথা বার বারই বলেছেন, হামামাই আমার জীবনের একমাত্র ভালবাসা। আর কাউকে কোনদিন ভালবাসতে পারিনি। জানা যায় ১৯৯৯ সালে একবার এক মহিলা সাংবাদিক দাবি করেন, তাঁর ছেলের বাবা শরিফ। অভিনেতা খুব শান্তভাবে জবাব দিয়েছিলেন, খুব অল্প সময়ের জন্য সম্পর্ক হয়েছিল ওই মহিলার সঙ্গে মানে কয়েক মিনিটের। আমি ওকে আমার ছেলে বলে মানি না। তবে হ্যাঁ, আমারই স্পার্ম থেকে ওঁর জন্ম হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু তা হলে তো আমার লাখখানেক সন্তান!

চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি একজন তুখোড় কনট্রাক্ট ব্রিজ খেলোয়াড় হিসেবে শরিফের সুনাম ছিল। সত্তর ও আশির দশকে তিনি ব্রিজ খেলা নিয়ে চিকাগো ট্রিবিউন-এ কলামও লিখেছেন। ১৯৯২ সালে বাজারজাত হওয়া ‘ওমর শরিফ ব্রিজ’ নামে একটি কম্পিউটার গেমও রয়েছে। তিনি ব্রিজ খেলা নিয়ে কয়েকটি বইও লেখেন। রেসের ঘোড়া পোষাও ছিল তাঁর শখ। তবে তাসের নেশা আর ক্যাসিনো একবার তাঁকে প্রায় পথে বসিয়ে দিয়েছিল। ৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড হেরে যাওয়ার পর নিজের প্যারিসের বাড়িটা বিক্রি করে দিতে হয় তাঁকে। পরে জানিয়েছিলেন, সে সময় কয়েকটা জামাকাপড় ছাড়া আমার আর কিছুই ছিল না। একের পর এক প্রেম আর বিচ্ছেদের জেরে ক্রমেই তাঁকে ঘিরে ধরে একাকীত্ব। অভিনয়ে সাফল্যও সে একাকীত্ব মুছতে পারেনি। চেপে বসে অবসাদ। কখনও পুলিশের গায়ে হাত তুলে, কখনও ক্যাসিনোয় ভাঙচুর চালিয়ে মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েন। ২০০৩-এ এক বার প্রায় জেলে যেতে বসেছিলেন। এরই মধ্যে শেষের দিকে এ্যালঝাইমার্সে আক্রান্ত হন। নিজে অবশ্য শরিফ রোগের কথা কিছুতেই স্বীকার করতে চাইতেন না।

প্রেমের পাশাপাশি চলতে থাকে একের পর এক সাড়া জাগানো অভিনয়। ইংরেজি, ফরাসি, স্পেনীয়, ইতালীয়, আরবি, গ্রিক সহ ছ-ছ’টা ভাষা জানতেন। আর তাই এতে সহজেই হয়ে উঠেছেন, ‘বিদেশি’, কখনও ‘সুলতান’, ‘স্পেনীয় সন্ন্যাসী’, কখনও আবার ‘মেক্সিকান কাউবয়’ কিংবা ‘চেঙ্গিস খাঁ’। ওমর শরিফ অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র সিরা ফি ওয়াদি (দ্য বেজিং সান) মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫৩ সালে। এর পর অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন ওমর শরিফ। নন্দিত এই অভিনেতার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো দ্য রেইনবো থিফ (১৯৯০), ম্যাকানাস গোল্ড (১৯৬৯), চে (১৯৬৯), ফানি গার্ল (১৯৬৮), দি পিংক প্যান্থার স্ট্রাইকস এগেইন (১৯৭৬) প্রভৃতি।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: