মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

লোকসভা ভবনে ১৫ আগস্ট বোমা হামলার চক্রান্ত

প্রকাশিত : ১৩ জুলাই ২০১৫
  • বিপুল গোলাবারুদসহ ২২ জন গ্রেফতার লালমনিরহাট সীমান্তে

জাহাঙ্গীর আলম শাহীন, নিজস্ব সংবাদদাতা, লালমনিরহাট ॥ দিল্লীর পার্লামেন্ট ভবনে বোমা হামলার পরিকল্পনা করেছে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্র। ভারতের বিএসএফের হাতে আটক হয়েছে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের সদস্য বাংলাদেশের নাগরিক দুলাল মিয়া ও এমদাদুল হক। জিজ্ঞাসাবাদে এই ধরনের তথ্য দিয়েছে তারা। তাদের কাছে এই ধরনের তথ্য পাওয়ার পর ভারতের কুচবিহারের দিনহাঠা থানা এলাকায় চলে এসেছে তাদের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)। এই ধরনের তথ্য ফাঁস হওয়ায় সীমান্ত এলাকায় তারা জারি করেছে রেড এ্যালার্ট। ভারতের মাটিতে অভিযান চালিয়ে অন্তত ২২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যার মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকও রয়েছেন। বাংলাদেশের লালমনিরহাটের মোগলহাট সীমান্তের বিপরীতে ভারতীয় জারিধরলা গ্রাম হতে বিপুল পরিমাণ বোমা ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। স্থল সীমান্ত ও ছিটমহল চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা দিতে ভারতের সংসদ ভবনে ও অসমে হামলার পরিকল্পনা করেছে আটক আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের সদস্যরা। উগ্র মৌলবাদী জঙ্গীগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রকে সহায়তা করছে এই ধরনের তথ্য পাওয়ার পর ব্যাপক অনুসন্ধান ও তদন্ত করা হচ্ছে। ভারত ও বাংলাদেশের প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে এ খবর জানা গেছে। কলকাতায় কর্মরত সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, দিল্লীর পার্লামেন্ট ভবনে হামলার পরিকল্পনার কথা আটক দুর্বৃত্তরা স্বীকার করেছে ভারতে আটকৃতরা। তাদের দেয়া জবানবন্দী অনুযায়ী সীমান্ত গ্রাম জারিধরলা ও অসমে ভারতীয় ও উচ্চপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে তৈরি ভারতীয় যৌথবাহিনী অভিযান পরিচালনা করছে। এই অভিযান এই মাফিয়া চক্রের মূল উৎপাটন না করা পর্যন্ত চলবে। এই ঘটনায় ভারতসহ ভারতের উত্তরাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রেড এ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। সীমান্তে বিএসএফ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।

লালমনিরহাট জেলার পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, ভারতে আটক বাংলাদেশী নাগরিক দুলাল মিয়া মোগলহাটে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। সম্প্রতি সে মোগলহাট আওয়ামী লীগের সভাপতি সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী গোলাম ফারুকের হাত ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ করেছে। জেলা তরুণ লীগের সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান মোগলহাট সীমান্তে সরকারী বিল লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে। এই সময় এই মাফিয়া ডন গোলাম ফারুকের রোষানলে পড়ে তাকে লিজ ছেড়ে দিয়ে জীবন রক্ষায় পালিয়ে আসতে হয়।

লালমনিরহাট জেলার পুলিশ সুপার মোঃ মুজাহিদুল ইসলামের কাছে ভারতে বোমাসহ বাংলাদেশের নাগরিক মোঃ দুলাল মিয়া আটকের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তিনি জনকণ্ঠকে জানান, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে দুলাল মিয়া ভারতে বোন ও দুলাভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে আটক হয়েছে। দুলালের বিরুদ্ধে লালমনিরহাটে একাধিক মামলার কথা স্বীকার করেন। পুলিশ তাকে খুঁজছিল। পুলিশের হাতে আটকের ভয়ে সে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে ছিল বলে জানান।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানান, আগামী ১৫ আগস্ট ভারতীয় স্বাধীনতা দিবসে সংসদ ভবনে নাশকতার পরিকল্পনা করা হয়। আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে এই ধরনের তথ্য ফাঁস হয়েছে। বিপুল পরিমাণ বোমাসহ দ্বৈত নাগরিক এমদাদুল (৩৭) ও দুলাল মিয়া (৩২) শনিবার আটক হয়েছে বিএসএফের হাতে। আটক দুইজনের কথামতো ভারতীয় আজ (রবিবার) ভোর রাত পর্যন্ত ভারতীয় ১৫ বিএসএফ গিদালদহ ক্যাম্পের সদস্যরা সীমান্তে রেড এ্যালার্ট জারি করে অভিযান পরিচালনা করে। এই সময় বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল, গাঁজা ও মদ উদ্ধার করে। বিএসএফর অভিযানের ফলে আন্তর্জাতিক মাফিয়া ও অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্রটির নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে পড়েছে। সীমান্তের বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিজিবি নিñিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করে গভীর পর্যবেক্ষণ করছে। সীমান্তের দুই পাশে গড়ে উঠা মাফিয়া চক্রের গড ফাদাররা গত শনিবার হতে গা ঢাকা দিয়েছে। সীমান্ত গ্রামটিতে চোখে পড়ার মতো বিপুল পরিমাণ বিএসএফ সীমান্তে টহল দিচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতীয় পুলিশের খাতায় মোস্ট ওয়ান্টেড কুখ্যাত মাদক, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের গড ফাদার দ্বৈত নাগরিক জারিধরলার ফকরা বাবু গংগের সদস্য মোঃ দুলাল মিয়া (৩৫), ভারতীয় নাগরিক জারিধরলার এমদাদুল (৩৫) ও শহিদুলকে (৩৪) বিপুল পরিমাণ বোমা, ফেনসিডিল, মদ ও বিয়ারসহ শনিবার ভোরে আটক করার পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

সীমান্ত এলাকায় কর্মরত একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, জেলার মোগলহাট সীমান্ত হতে জারিধরলার দূরত্ব খুব সামান্য। ঢিল ছুড়ে মারার দূরত্ব। এই গ্রামের বাসিন্ধারা ভৌগোলিক কারণে ভারতীয় গ্রামবাসীরা নিত্য প্রয়োজনে মোগলহাট বাজারের সহজে যাতায়াত করতে পারে। অত্যন্ত মানবিক কারণে বিজিবি বিষয়টি ওভারকুল করে আসছে যুগের পর যুগ ধরে। সীমান্ত গ্রামের নিরীহ মানুষের দুর্বলতা ও সীমান্ত শিথিলতার সুযোগ নিয়ে এখানে ২০০৫ সালে অবৈধ অস্ত্র, চোরাকারবারি চক্র ও মাদক ব্যবসায়ী চক্র গড়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে এই চক্রের আটক দুইজন ভারতীয় পুলিশ ও বিএসএফের কাজে স্বীকার করেছে তারা আগামী ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবসের দিন ভারতের সংসদ ভবনে আক্রমণের পরিকল্পনা করে ছিল। এর আগেও কয়েকবার পরিকল্পনা করে হামলা করতে ব্যর্থ হয়। ভারতীয় জারিধরলা গ্রামের ছামিদুল হক পিঁপড়া গত শনিবার আটককৃতদের সম্পর্কে দিনহাটা থানায় খোঁজখবর নিতে গেয়ে এই তথ্য জানতে পেরেছে। তিনি আটককৃত দুলালের স্বজনদের বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছেন বলে জানান। মাফিয়া চক্রের গড ফাদার ফকরা বাবু দ্বৈত নাগরিকে জেলার আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ি গ্রামে জনৈক কসাইয়ের পুত্র বলে জানা গেছে। সে পৌর ছাত্র দলের আহ্বায়ক পরশ হত্যা মামলার আসামি। আটক আরেক মাফিয়া চক্রের গড ফাদার ও বোমা তৈরিতে বিশেষজ্ঞ সন্ত্রাসী দুলাল মিয়ার (৩২) বাড়ি জেলা সদরের মোগলহাট ইউনিয়নের কণপুর গ্রামের চওড়াটারীতে। তার বাবার নাম অমশের আলী (ডেপকা ডাকাত)। আটক ভারতীয় নাগরিক কুচবিহার জেলার দিনহাটা মহকুমার গিদাদহের জারিধরলা গ্রামের আনছার আলীর পুত্র। শনিবার হতে রবিবার ভোর পর্যন্ত আটককৃতদের স্বীকারোক্তি মতে জারিধরলার নগদটারী গ্রামে অভিযান চালিয়ে জনৈক আবির বাড়ি হতে ৩৫০ পিস ফেনসিডিল, নাড়িয়ার বাড়ি হতে ২০ কেজি গাঁজা ও বিপুল পরিমাণ বিয়ার এবং ভারতীয় বিভিন্ন ব্যান্ডের মদ উদ্ধার করেছে।

আন্তর্জাতিক মাফিয়ার গোপন আস্তানা ॥ শনিবার ভোরে জারিধরলায় দুর্বৃত্ত ও আন্তর্জাতিক মাফিয়ার গোপন আস্তানায় বিএসএফের ডিআইজির নেতৃত্বে ১৫ গিদালদহ বিএসএফ ক্যাম্পের সদস্যরা হানা দিয়ে ৩ জনকে আটক করে। এরা হলেন, সন্ত্রাসী দুলাল মিয়া (৩২), এমদাদুল (৩৪) ও শহিদুল (৩০)। ভারতীয় পুলিশ শহিদুলকে পরে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিয়েছে। দুলাল ও এমদাদুলকে আটক দেখিয়ে বিস্ফোরক এবং হামলার পরিকল্পনা মামলা দিনহাটা থানা পুলিশ দায়ের করেছে। সন্ত্রাসী ও মাফিয়া চক্রের গোপন আস্তানা হতে ১৬টি অত্যাধুনিক বোমা, তিন শত বোতল ফেনসিডিল ও ৬০টি ভারতীয় বিয়ার জব্ধ করেছে। দিনহাটা থানার পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক দুর্বৃত্তগণ ও আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্রের গড ফাদাররা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে যে, তারা দীর্ঘদিন ধরে বোমা ও অস্ত্র ব্যবসা করে আসছে। আগামী ১৫ আগস্ট ভারতের সংসদ ভবনে হামলার পরিকল্পনা ছিল। ভারতের অসমে ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ বোমা ও আগ্নেয়াস্ত্র তারা পাঠিয়েছে। মূলত ছিটমহল বিনিময় ও সীমান্ত চুক্তি বিল পাসের বিরুদ্ধে নাশকতা চালাতে এসব অস্ত্র-বোমা অসমে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল।

চলতি বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে দৈনিক জনকণ্ঠে মোগলাহাট সীমান্তে মাদক ব্যবসা, চোরাচালানী, অস্ত্র ব্যবসা, উগ্র মৌলবাদ ও আর্চেজ গ্রেনেড উদ্ধার ও ফতোয়াবাজি নিয়ে কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। পুলিশ, বিজিবি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত জিরো টলারেন্স নিয়ে চোরাচালানী, মাদক ব্যবসা ও সীমান্ত অপরাধ দমনে অভিযান চালায়।

মোগলহাট বিজিবি বিওপি ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার মোঃ ছামাদ জানান, বিএসএফ তাদের সীমান্তে চোখে পড়ার মতো পাহারা জোরদার করেছে। সীমান্তে টহল জোরদার করার বিষয়টি বিএসএফ বিজিপিকে জানিয়েছে। এই সীমান্তে চোরাচালানী প্রতিরোধ প্রয়োজনে যৌথ টহল দেয়া হয়ে থাকে। ধরলা নদীর ভাঙ্গনপ্রবণ সীমান্ত গ্রাম হওয়ায় সীমান্তের আন্তর্জাতিক পিলারগুলো নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে কিনা সেটাও যৌথ টহলের মাধমে নিশ্চিত করা হয়।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ লালমনিরহাট ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল আহমেদ বজলুর রহমান হায়াতী জানায়, এই কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী আন্তর্জাতিক মাফিয়া গড ফাদার মোঃ দুলাল মিয়া ভারতে বিএসএফর হাতে আটকের খবর নিশ্চিত করেছেন। সীমান্তে বিজিবি গভীর পর্যবেক্ষণ করছেন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টহল জোরদার করছে। ছিটমহল যৌথ জরিপ কাজ চলায় বিজিবি সর্বক্ষণিক যৌথ জরিপ টিমকে সহায়তা দিচ্ছে।

প্রকাশিত : ১৩ জুলাই ২০১৫

১৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: