২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সুতোয় বোনা শিল্পকলা বয়ন চিত্রের কর্মশালা


স্টাফ রিপোর্টার ॥ রং-তুলি ছাড়াও আঁকা হতে পারে চিত্রকর্ম। আর সেটা দেখে জুড়িয়ে যেতে পারে শিল্পানুরাগীর নয়ন। সাদা সুতার বুননে জমিন তৈরি করে রঙিন সুতায় ফুটিয়ে তোলা যায় বিষয়। শিল্পীর ইচ্ছানুযায়ী সুতোয় বোনা চিত্রপটটি হতে পারে মূর্ত কিংবা বিমূর্ত। নিসর্গ, প্রকৃতি, মনুষ্য অবয়ব থেকে ক্যালিগ্রাফিÑ সবকিছুই উঠে আসতে শিল্পের এই প্রাচীন মাধ্যমটিতে। আর তেমনই কিছু শিল্পকর্মের দেখা মিলল শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার ভাস্কর্য মিলনায়তনে। পয়লা জুলাই এখান থেকে শুরু হয় বয়ন চিত্রের কর্মশালা। রবিবার প্রশস্ত মিলনায়তনজুড়ে দেখা মিলল কর্মশালায় সৃজিত সুতোয় বোনা শিল্পসম্ভার। যৌথভাবে কর্মশালাটির আয়োজন করেছে ট্যাপেস্ট্রি এ্যান্ড পেইন্টিং স্টুডি ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।

মিলনায়তনে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য। বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দেয়া শিল্পীদের চিত্রপট। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী ২৫ জন শিল্পীর প্রত্যেকেই ব্যস্ত তাদের শিল্প নির্মাণে। কাঠ বা স্টিলের ফ্রেমে চলছে ট্যাপেস্টির নির্মাণকাজ। প্রথমেই কাঠির সাহায্যে সাদা সুতোর টানা দিয়ে ফ্রেমের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত শিল্পের জমিন তৈরি করেছেন শিল্পীরা। এরপর জমিনের ওপর ড্রইং করে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছিল নকশার আউটলাইন বা বয়ন চিত্রের বিষয়। ড্রইং শেষে পাঞ্জার সহায়তায় হাতের সূক্ষ্ম কারুকাজে রঙিন সুতার আশ্রয়ে প্রকাশিত হতে থাকে শিল্পীর ভাবনাতাড়িত বিষয়টি।

কর্মশালায় প্রাঙ্গণে নিবিড় মনোযোগে বয়ন চিত্র সৃজন করছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাচ্যকলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী নাহিদা নিশা। বয়ন চিত্রে খয়েরি রঙের সুতায় চাইনিজ ক্যালিগ্রাফি সৃষ্টির সময় কথা হয় এই শিল্পীর সঙ্গে। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে সম্প্রতি চারুশিক্ষা সম্পন্ন করা এ নবীন শিল্পী বলেন, শিক্ষাজীবনে রং-তুলির আঁচড়ে ছবি এঁকেছি। এবার সেই চিত্রকর্মটাই কী করে সুতোয় বুনতে হয়, সেই কৌশলটা শিখলাম। নতুন করে কালার গ্রেডেশন সম্পর্কে জানতে পারলাম। এই প্রশিক্ষণের পর ভবিষ্যতে এ মাধ্যমে কাজ করব। আগে নানী-দাদীদের দেখতাম তারা কত সুন্দর করে এই বয়ন চিত্র বা ট্যাপেস্ট্রির কাজ করে। হারিয়ে যাওয়া সেই চর্চাটা আবার প্রতিষ্ঠিত করতে এ কর্মশালাটি খুব কাজে দেবে।

২৩ জন চারুশিক্ষার্থীসহ মোট ২৫ জনের অংশগ্রহণে কর্মশালাটির পরিচালনা করেন শিল্পী মোঃ তাজুল ইসলাম। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক সময় প্রখ্যাত শিল্পী রশীদ চৌধুরী এই শিল্পমাধ্যমটি নিয়ে ব্যাপক কাজ করেছেন। তাঁর কাছ থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে আমিও জড়িয়ে যাই ট্যাপেস্ট্রি বা বয়ন চিত্রের ভুবনে। আর এ ভূখ-ে ট্যাপেস্ট্রির ইতিহাসটাও ৫০০ থেকে ৬০০ বছরের পুরনো। চিত্রপট থেকে শুরু করে শতরঞ্জি, জায়নামাজ কিংবা ওয়ালম্যাট তৈরি হতো শ্রমসাধ্য এই শিল্পমাধ্যমের আশ্রয়ে। বর্তমানে শিল্পীদের মধ্যে ট্যাপেস্ট্রির চর্চা ক্রমশই কমে যাচ্ছে। আমার নিজেরও বয়স হয়েছে। আমি চাই দেশব্যাপী এই শিল্পমাধ্যমটির চর্চা ছড়িয়ে পড়ুক। তাই নিজের পুঁজি খরচ করে শিল্পকলার সহায়তায় এ কর্মশালার আয়োজন করেছি। এর মাধ্যমে নতুন শিল্পী তৈরি হলে টিকে থাকবে ট্যাপেস্ট্রি। আর এই নতুন শিল্পীদের দেয়া শিক্ষার ভেতর দিয়েই আমি বেঁচে থাকতে চাই।

বারো দিনব্যাপী এ কর্মশালার শেষ দিন ছিল রবিবার। সমাপনী দিনে কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের হাতে সনদপত্র তুলে দেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। কর্মশালার অনুভূতি ব্যক্ত করে বক্তব্য রাখেন মোঃ তাজরুল। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা বয়ন শিল্পীরা হলেন সাইফুল ইসলাম চৌধুরী, কাশফিয়া রাব্বী নূর, ইতি রাজবংশী, দীপা রানী দাস, মহিমা বেগম, জান্নাতুল ফেরদৌস, শুচিস্মিতা, তানভিক জাহান, সামিনা জামান, আয়শা সিদ্দিকা, নাহিদা নিশা, হরেন্দ্রনাথ রায়, তানিয়া আখতার, জান্নাতুল ফেরদৌস আপরা, তামান্না আখতার, এমএ হোসেন, বীথি দেবী সূত্রধর, তনুশা রহমান, নুসরাত জাহান, সামিনা নাফিজ, কৃষ্ণা দে চট্টোপাধ্যায়, আঞ্জুমানারা সোনিয়া, শাবনূর জান্নান ও আফরোজা জামিল কংকা।