২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে ফের তলব করেছে ট্রাইব্যুনাল


স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের নিয়ে ‘কটূক্তি’ করায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আবারও তলব করেছে ট্রাইব্যুনাল। ২২ জুলাই বুধবার সকাল সাড়ে দশটায় তাকে ট্রাইব্যুনালে সশরীরে হাজির হয়ে তার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না, তা জানতে চেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান শাহীনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রবিবার এ আদেশ প্রদান করে। ট্রাইব্যুনালে অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম। আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার খান শামীম আজিজ ও মোরশেদ আলম।

এর আগে ৬ জুলাই জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনার জন্য আবেদন জানায় তিন মুক্তিযোদ্ধা ও গণজাগরণ মঞ্চের একাংশ। এদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে এই আবেদন করেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা মনোরঞ্জন ঘোষাল, মুক্তিযোদ্ধা আলী আসগর, মুক্তিযোদ্ধা শেখ নজরুল ইসলাম ও গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের আহ্বায়ক কামাল পাশা চৌধুরী ও কর্মী এফএম শাহীন। তাদের পক্ষে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে আবেদনটি দাখিল করেন আইনজীবী খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হলো।

ডেভিড বার্গম্যানের দ- ও জরিমানার বিষয়ে ৫০ নাগরিক বিবৃতি প্রদান করেন। এরমধ্যে মানবাধিকারকর্মী ও নারীনেত্রী খুশি কবির ওই বিবৃতি প্রকাশের পর পরই নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে ১৪ জনের নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তাদের অবমাননার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয় আদালত। ওই দিন সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক, সুজন সভাপতি হাফিজ উদ্দিন খান, সুজনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ ও আমেনা মহসিন, বাংলাদেশ শিশু বিকাশ কেন্দ্রের ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর ডাঃ নায়লা জামান খান, ড. শাহনাজ হুদা, পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক আসিফ নজরুল, মানবাধিকারকর্মী জাকির হোসেন, সঙ্গীতশিল্পী অরূপ রাহী, লেখক শাহীন আক্তার ও অধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান আদালতে ক্ষমা পান।

এরপর ৩ মার্চ নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে রেহাই পান বিবৃতিদাতা আরও ১০ জন। এরা হলেনÑ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের শিক্ষক ড. আলী রিয়াজ, ড. পারভিন হাসান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজীর ফিরদৌস আজিম, প্রকাশক মহিউদ্দিন আহমেদ, মানবাধিকার আইনজীবী ড. ফস্টিনা পেরেইরা, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নূর খান লিটন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সামিয়া হক, ড. সেঁউতি সবুর, তাসমিন সারা সাহাবুদ্দীন ও লেখক তাহমিমা আনাম। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দিনা এম সিদ্দিকী ও অধিকারকর্মী রেজাউর রহমানও পরে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে রেহাই পান।

শুধুমাত্র ব্রিটিশ নাগরিক ডেভিড বার্গম্যানের সাজায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ‘অবমাননাকর’ বিবৃতি দেয়ায় গত ১০ জুন জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে সাজা দেয় আদালত। শাস্তি হিসেবে তাকে এক ঘণ্টা আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সেই সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক মাসের কারাদ- প্রদান করে ট্রাইব্যুনাল। জাফরুল্লাহ চৌধুরীর আবেদনে সুপ্রীমকোর্টের চেম্বার আদালত পরে ওই জরিমানার আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করে দেয়। ট্রাইব্যুনালের রায়ের দিন আদালত সাজা ঘোষণার পর জাফরুল্লাহ চৌধুরী রায়ের অনুলিপি হাতে না পাওয়া পর্যন্ত কাঠগড়ায় যাবেন না বলে দীর্ঘসময় অনড় থাকেন। পরে রায়ের কপি হাতে দেয়া হলে স্বেচ্ছায় কাঠগড়ায় গিয়ে সাজাভোগ করেন এবং পরে আদালতের বাইরে এসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। সে সময় তিনি বলেন, ‘আজকের আদালত অবমাননার রায়টা তিনজন বিচারকের মানসিক অসুস্থতার প্রমাণ। যেখানে বিচারপতিরা সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না, সেখানে ন্যায়বিচার হয় না।’

‘যখন তারা সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না, তখন যুক্তি থাকে না বলেই তারা আইনের আড়ালে আত্মগোপন করেন।’ এখানে এই মামলাটার বোঝার বিষয় আছে। আদালত অবমাননার মামলায় তিনটির একটি বিষয় প্রমাণ করতে হয়। স্ক্যান্ডালাইজিং দ্য কোর্ট, কোর্টের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা, অবস্ট্রাকশন অব দ্য এ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব দ্য জাস্টিস, বিচারের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা, আদালতের ডিগনিটি ক্ষুণœ করা। আদেশের সময় এজলাসকক্ষে অভিযুক্তদের দাঁড় করিয়ে রাখাটা ‘অভদ্রতা’ মন্তব্য করে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, যখন রায় পড়েন তখন সকল অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দাঁড় করিয়ে রাখা অর্থহীন। এটা প্রাগৈতিহাসিক, মধ্যযুগীয় ঘটনা। কিন্তু তারা দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। তারপর বলেছেন বয়স, কিন্তু বয়সের সম্মান আমি তাদের কাছে কামনা করি না।

ব্রিটিশ নাগরিক ডেভিড বার্গম্যানকে দেয়া ট্রাইব্যুনালের সাজার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দেয়ায় ১০ জুন আদালত অবমাননার দায়ে তাকে এক ঘণ্টার কারাদ- (ট্রাইব্যুনালের এজলাসকক্ষে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা) এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক মাসের কারাদ- দেয় ট্রাইব্যুনাল-২। আসামির কাঠগড়ায় এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার দ- ভোগ করলেও জরিমানা দেবেন না জানিয়ে আদালতের ভেতরে-বাইরে নানাভাবে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

এদিকে, ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর আবেদনে তাকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ গত ১৬ জুন স্থগিত করেছে আপীল বিভাগের চেম্বার জজ বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর আদালত। একই সঙ্গে আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেয়া হয় আবেদনটি। এছাড়াও বেসরকারী টিভি চ্যানেল চ্যানেল-২৪ এ ‘মুক্তবাক’ অনুষ্ঠানে করা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তখন বিচারিক বিষয় ও ট্রাইব্যুনাল নিয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সতর্ক করে ওই আবেদনটি নিষ্পত্তি করা হয়েছিল।

এক ঘণ্টা সাজাভোগ করে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দেবেন না বলে জরিমানার বিরুদ্ধে আপীল আবেদন নিয়ে চেম্বার আদালতে যান জাফরউল্লাহ চৌধুরী। ট্রাইব্যুনালের দেয়া জরিমানার আদেশ স্থগিত করে আপীল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য ধার্য করে হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর চেম্বার কোর্ট। আদশের কপি ট্রাইব্যুনালে না পৌঁছায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আদালত। পরোয়ানা জারির দিন আপীল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতের স্থগিতাদেশ ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়ার সময় তিনি ফের ট্রাইব্যুনালের বিচারপতিদের নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি তিনজন বিচারকের মানসিক অসুস্থতার প্রমাণ। তাই পাগলকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য চেম্বার জজ আদালতের স্থগিতাদেশ ট্রাইব্যুনালের কাছে পৌঁছে দিয়ে গেলাম বলে মন্তব্য করেন।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: