১৩ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

সংস্কারপন্থীদের দলে ফেরাতে চান খালেদা জিয়া


শরীফুল ইসলাম ॥ সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আসন্ন ঈদের পর সর্বস্তরে কমিটি পুনর্গঠন শুরু করবে বিএনপি। এ জন্য ভেতরে ভেতরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে দলীয় হাইকমান্ড। নবেম্বরের মধ্যে দলের সকল শাখা কমিটি ও ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যে দলের জাতীয় কাউন্সিল করে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি পুনর্গঠন করতে চান বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এবার কমিটি পুনর্গঠনে বর্তমানে দল থেকে দূরত্ব বজায় রাখা এক সময়ের সংস্কারপন্থী নেতাদেরও সম্পৃক্ত করা হবে। সূত্রমতে, বিএনপির থিংকট্যাঙ্ক বলে পরিচিত বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শে সারাদেশের সকল স্তরে দলের কমিটি পুনর্গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন খালেদা জিয়া। এ জন্য তিনি লন্ডন প্রবাসী ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানেরও মতামত নিয়েছেন। পরে তারেক রহমানের সঙ্গে এ বিষয়ে আরও কথা বলবেন। আর এ বিষয়ে মতামত নিতে সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।

জানা যায়, দলের কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে ফাইল ওয়ার্ক করার জন্য খালেদা জিয়া ইতোমধ্যেই দলের ক’জন নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। এছাড়া আসন্ন ঈদে দলের সকল কেন্দ্রীয় নেতাকে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় অবস্থান করে তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়ে কমিটি পুনর্গঠনের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন খালেদা জিয়া। আর এ কাজে দলের কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও তিনি নেতাকর্মীদের হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।

সূত্রমতে, সর্বস্তরে কমিটি পুনর্গঠনের সময় এবার ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ২০১৩ সালের আন্দোলন ও এ বছর ৬ জানুয়ারি থেকে টানা ৯২ দিনের আন্দোলনে যাদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাদের প্রাধান্য দেয়া হবে। সেই সঙ্গে বর্তমানে দলে নিষ্ক্রিয় এবং সরকারী দলের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করে চলেন এমন নেতাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। আর দলে নিষ্ক্রিয়দের মধ্য থেকে অনেককেই বাদের তালিকায় রাখা হবে। ইতোমধ্যেই বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান এ ব্যাপারে প্রাথমিক কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপি পুনর্গঠনের কাজে খালেদা জিয়াকে সহযোগিতা করছেন এমন এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্ষমতা থেকে দূরে থাকা এবং বার বার আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ায় এবার ভিন্ন কৌশলে দল গোছানোর উদ্যোগ নিয়েছেন চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। লন্ডন থেকে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে খোঁজখবর নিয়ে দল গোছানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।

এদিকে এক সময় দলের সংস্কারপন্থীদের ব্যাপারে তারেক রহমানের নেতিবাচক মনোভাব থাকলেও এখন সর্বস্তরে দলের পুনর্গঠনকে সামনে রেখে তিনি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন বলে জানা গেছে। এ কারণে, যেসব সংস্কারপন্থী বিএনপি নেতারা এতোদিন দলীয় কর্মকা- থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন তারাও এখন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে শুরু করেছেন। এবারের কমিটিতে সংস্কারপন্থীদেরও স্থান দেয়া হবে।

সূত্রমতে, রাজনৈতিকভাবে চরম বেকায়দায় থাকায় বিদেশী কূটনৈতিক ও বিএনপির থিংকট্যাঙ্ক বলে পরিচিত বুদ্ধিজীবীরা বিএনপি হাইকমান্ডকে এখন সব বাদ দিয়ে দল পুনর্গঠন কাজ জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছেন। আর এ কারণেই আপাতত আন্দোলন বা কোন নেতিবাচক কর্মসূচীর কথা না ভেবে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দল পুনর্গঠনের কাজে মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর অংশ হিসেবেই তিনি সব কেন্দ্রীয় নেতাদের এবার ঈদে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে জনসংযোগ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

জানা যায়, দল পুনর্গঠনকে সামনে রেখে বিভিন্ন সময় বাদ পড়া নেতাদেরও ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। আর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে বহিষ্কৃত নেতাদেরও। এ ছাড়া সমমনা দল থেকেও যদি কেউ বিএনপিতে যোগ দিতে চায় সে ক্ষেত্রে তাদের স্বাগত জনানো হবে। তবে অবশ্যই তাদের দলের ব্যাপারে আন্তরিক হওয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

সূত্রমতে, তারেক রহমান ইতোমধ্যেই তার মা খালেদা জিয়াকে দল পুনর্গঠন কাজ শুরুর পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করতে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সারাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে যেসব ইউনিয়ন প্রতিনিধি সভা হয়েছিল সেভাবে কোন কর্মসূচী নেয়া যায় কিনা তাও তার মাকে বলেন। তবে খালেদা জিয়া ইউনিয়ন প্রতিনিধি সভার মতো কোন কর্মসূচী পালন করতে না পারলেও সারাদেশের সকল জেলা সফর কর্মসূচী পালনের কথা ভাবছেন। ঈদের পর তিনি বিভিন্ন জেলা সফরে যাওয়ারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়াসহ দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা সংস্কারের পক্ষে চলে যান। কিন্তু ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলের আগে মান্নান ভূঁইয়া মারা যান। সেই কাউন্সিলের পর সংস্কারপন্থী বেশ ক’জন নেতাকে দলে ফিরিয়ে নিলেও অনেকেই বাইরে রয়ে যান। তবে এবার তাদের সবাইকে দলে ফিরিয়ে আনতে চান খালেদা জিয়া। সেই সঙ্গে বর্তমানে দলে নিষ্ক্রিয় এমন নেতাদের বাদের তালিকায় ফেলে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সংস্কারপন্থীদের মধ্যে এখনও যারা বিএনপির রাজনীতি থেকে দূরে রয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন মেজর জেনারেল (অব.) জেড এ খান, মোকাম্মেল হক, শহিদুল হক জামাল, আবু হেনা, জহিরউদ্দিন স্বপন, সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, আবুল হোসেন প্রমুখ। এছাড়া যাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আশরাফ হোসেন, সাবেক দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি প্রমুখ।

এবার বিএনপির জাতীয় নির্বাহী পুনর্গঠনের সময় দলের ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, আবদুল্লাহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকা, সেলিমা রহমান, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, আবদুল আউয়াল মিন্টু, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, সালাহউদ্দিন আহমেদ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, আ ন ম এহছানুল হক মিলন. শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরীন সুলতানাকে পদোন্নতি দেয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত বলে জানা গেছে।

কেন্দ্রীয়ভাবে দল পুনর্গঠন কাজ শেষ করতে এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় কাউন্সিল করার প্রস্তুতি নিয়েছেন বিএনপি হাইকমান্ড। কাউন্সিলকে সামনে রেখে দল পুনর্গঠনের সময় যোগ্য নেতাদের কমিটিতে স্থান দিতে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে একটি তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। জাতীয় কাউন্সিলের পর গঠনমূলক কর্মসূচী পালনের মধ্য দিয়ে সর্বস্তরে দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করে আস্তে আস্তে পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে বিএনপি। তবে সরকারকে চাপে রাখতে মাঝেমধ্যে আন্দোলন কর্মসূচীও পালন করা হবে।

এদিকে দল পুনর্গঠনের পাশাপাশি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জাপানসহ প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে দলের ক’জন নেতাকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছে বিএনপি হাইকমান্ড। তাদের প্রচেষ্টায় এবার কূটনৈতিকদের সম্মানে খালেদা জিয়ার ইফতার পার্টিতে ৪৭টি দেশের কূটনৈতিকে জড়ো করা সম্ভব হয়েছে। পরবর্তীতে বিদেশী কূটনৈতিকদের নিয়ে বিএনপি আরও অনুষ্ঠান আয়োজন করবে বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন জনকণ্ঠকে বলেন, ঈদের পর সর্বস্তরে দল পুনর্গঠন করা হবে বলে চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বলেছেন। এ ব্যাপারে প্রস্তুতি চলছে। দলের অনেক নেতাকর্মী এখনও জেলে রয়েছে। আশাকরি সরকার তাদের মুক্তি দেবে। তবে ঈদের পর দল পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নিতে কোন সমস্যা হবে না বলে আমরা আশাবাদী।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, দল পুনর্গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে সর্বস্তরে দল পুনর্গঠনের কাজ ঈদের পর থেকে শুরু হবে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ইতোমধ্যেই এ নিয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের জাতীয় কাউন্সিল হয় না। তাই জাতীয় কাউন্সিলকে সামনে রেখে সারাদেশের সর্বস্তরে দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিএনপির সকল শাখা কমিটি ও ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠনের পর এ বছরই জাতীয় কাউন্সিল করা হবে। এর মাধ্যমে জাতীয় নির্বাহী কমিটিও পুনর্গঠন করা হবে। এতে যোগ্য নেতাদের অবশ্যই মূল্যায়ন করা হবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: