২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ভালবাসার কথা দোলনচাঁপা জানে...


ভালবাসার কথা দোলনচাঁপা জানে...

মোরসালিন মিজান

ভরা বর্ষা এখন। বৃষ্টির জলে ধোয়া প্রকৃতি। এমনিতেই সুন্দর। আর এ সুন্দরের সঙ্গে যেন আলিঙ্গন করে আছে দোলনচাঁপা। ফুলটি, হ্যাঁ, পরিচিত। এর শুভ্র সাদা পাঁপড়ি। একগুচ্ছ দোলনচাঁপা ঘরের কোণে রাখলে সাদার সৌন্দর্যটা উপলব্ধি করা যায়। আর যে ঘ্রাণ, সে তো লিখে বোঝানোর চেষ্টা করাই বৃথা। এত মিষ্টি! এত মন ভাল করে দেয়া ঘ্রাণ! অনেক দূর থেকে নাকে এসে লাগে। সাদা রং আর মিষ্টি ঘ্রাণ মিলে পবিত্র একটা অনুভূতির জন্ম দেয়। সব মিলিয়ে অনন্য দোলনচাঁপা।

বরাবরই ফুলপ্রেমীদের বিশেষ ভালবাসা দোলনচাঁপার জন্য। কোন এক কবি সে ভালবাসার কথা চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর বলাটি ছিল অনেকটা এরকমÑ আমার ভালোবাসার কথা দোলনচাঁপা জানে/তাই এতো সুগন্ধ ছড়ায়...। সত্যি এই ফুল নাকের সামনে ধরলে কারও কারও মনে হতে পারেÑ এই ফুল ভালবাসাটা বোঝে। প্রতিদানে তাই এত মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়ায়। ফুলটি নিয়ে বহু কবিতা হয়েছে। গান এবং গল্প হয়েছে। আর এখন ভরা বর্ষা। দোলনচাঁপার মৌসুম। বাগানে, টবে চমৎকার ফুটে আছে। ফুলের দোকানে পাওয়া যাচ্ছে। তারও বেশি ঢাকার রাস্তায়। পথশিশুরা প্রতিদিন এই ফুল ফেরি করে বেড়াচ্ছে। যে পথ দিয়ে তারা যাচ্ছে, সে পথের পুরোটাজুড়ে ঘ্রাণ! পুরোটাই দোলনচাঁপার হয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে বিজয় সরণি এলাকাটি ঘুরে আসলে যে কেউ প্রমাণ পেয়ে যাবেন। সংসদ ভবনের পূর্ব পাশে চন্দ্রিমা উদ্যান সংলগ্ন যে সড়ক, সেখানে দোলনচাঁপা হাতে পথশিশুদের ছোটাছুটি। যত ছোটাছুটি ততই বাতাসে মিষ্টি ঘ্রাণ। অবশ্য দিনের প্রথমভাগে দোলনচাঁপার দেখা মেলে না বললেই চলে। এ ফুল ফোটে বিকেল বা সন্ধ্যায়। রাত যত গভীর হয় ঘ্রাণ ততই ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এভাবে মন খারাপের বিকেল কিংবা একলা জাগা রাতের কষ্ট ভুলিয়ে দেয় দোলনচাঁপা। প্রিয় এই ফুলের দিকে তাকিয়ে কবিগুরু লিখেছেনÑ দোলে দোলে দোলে প্রেমের দোলন-চাঁপা হৃদয়-আকাশে...। নজরুলের ভাষায়Ñ যেন দেবকুমারীর শুভ্র হাসি, ফুল হয়ে দোলে ধরায় আসি/ আরতির মৃদুজ্যোতি প্রদীপ কলি দোলে, যেন দেউল আঙিনাতে...। সাধারণ মানুষও বিভিন্নভাবে ফুলটির প্রতি তাঁদের অনুরাগের কথা জানিয়েছেন। জানিয়ে যাচ্ছেন।

নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মারও দোলনচাঁপা খুব প্রিয়। তিনি জানান, এটি মূলত বুনো ফুল। আদিনিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। ভারতীয় প্রজাতির ফুল বহুকাল ধরে বাংলাদেশে আছে। এর প্রায় ৪০টির মতো প্রজাতি। কোনটির রং হলদেটে। কোনটি আবার লাল। তবে প্রধানত সাদা রঙের হয়। পুরোপুরি ফুটলে পাঁপড়িগুলোকে প্রজাপতির ডানার মতো মনে হয়। ফুলের গায়ে হাওয়া লাগলে সাদা প্রজাপতিরা নড়ে চড়ে ওঠে। এ কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ফুলটিকে বাটারফ্লাই জিঞ্জার লিলি বলা হয়। তিনি জানান, দোলনচাঁপা গাছ ৬০ থেকে ৭০ সেমি উঁচু হয়। কা-ের পাশে কয়েকটি লম্বা পাতা থাকে। দোলনচাঁপার পাতা লেন্স আকৃতির। লম্বায় আট থেকে চব্বিশ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। চওড়ায় হয় দুই থেকে পাঁচ ইঞ্চি।

বর্তমানে ফুলটির ভাল চাষ হয়। ফুলচাষীরা মৌসুমী ফুল হিসেবে দোলনচাঁপার চাষ করে থাকেন। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে বসন্ত পর্যন্ত গাছের উপরের অংশে ৬ থেকে ১২ ইঞ্চি পুষ্পমঞ্জরি দেখা দেয়। দোলনচাঁপা গাছ দেখতে অনেকটা আদা বা হলুদ গাছের মতো। ফুল ফোটা শেষ হলে কা- শুকিয়ে যায়। তবে গোড়া থেকে আবার নতুন কা- জন্ম নেয়। সূর্যের আলো সরাসরি পড়ে না- এমন জায়গায় ভাল জন্মে। তবে দোলনচাঁপা নিজেকে এত বিলিয়ে দেয় যে, দুই দিনের বেশি বাঁচে না। আর শীতে শুকিয়ে যায় গোটা গাছ। গ্রীষ্মকালে ফের প্রাণ পায়। এখন সেই কাল। দোলনচাঁপার কাল।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: