২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

অসমাপ্ত সিম্ফনি


মাহবুব এত কী গল্প করে শান্তার সঙ্গে! শিমুটাও যা হয়েছে! মাহবুব এলে ‘ভাইয়া ভাইয়া’ করে অজ্ঞান। আঠার মতো লেগে থাকবে! বড়টাও কম কথা বলে না। দেখে মনে হবে ভেজা বিড়াল। ভেতরে ভেতরে পাকার হাড্ডি! কাকে দোষ দেব আমি? আমিই তো মাহবুবকে ডেকে এনে বাড়িতে বসিয়েছি। এখন ওদের লম্বা আলাপ ফুরোতেই চায় না! লেখাপড়া কতটুকু হচ্ছে কে জানে? ‘তারুণ্য’ কলামটা পড়তে পড়তে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল শামসুল হক। এখন আবার মন দিতে চেষ্টা করে বিরক্ত হয়। নাহ্, এ পত্রিকাটা আর রাখা যাবে না। সামনের মাস থেকে ইলিয়াসকে বলব অন্য কাগজ দিতে।

একটা কিং সাইজ টিকটিকি জানালার কোনার আড়াল থেকে খুব ধীর পায়ে আসে একটা ফুতি পোকার দিকে। পোকাটা স্থির বসে আছে। একটু আগে দু’বার সামান্য নড়াচড়া করেছে। বিন্তি, শামসুল হকের ছোট মেয়ে, দরজার পর্দা ধরে দাঁড়িয়েছিল। মুখটা শুকনো, মলিন। হক প্রশ্ন করে, মা মনি, নাশতা খেয়েছ?

না বোধক উত্তর দিয়ে পর্দা সজোরে ছেড়ে দিয়ে ভেতরে দৌড় দিল পিচ্ছিটা। ওর ‘নাহ্্’ শব্দটা শামসুল হকের কানে বাজছে এখনো। চোখে লেগে আছে বিন্তির মুখের মিষ্টি হাসি।

বাইরের ঘরে শান্তার একমাত্র ভাই সজলের স্টাডি টেবিল। ঠিক তার উপরেই চমৎকার একটা ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডারের ছবিতে কুয়াশামেদুর অনুজ্জ্বল দিন। মাঠের দিকে চলে যাচ্ছে দু’জন কৃষক। দেয়ালের এখানে-ওখানে কয়েকটা অপটু হাতের ওয়াটার কালার পেইন্টিং। সজল স্টাডিতে বসে আছে। শামসুল হক বিছানায় শুয়েই ঘাড় যতটুকু সম্ভব বাঁকিয়ে দেখার চেষ্টা করে। ছেলেটা পড়ছে, না কী করছে! ছবি আঁকছে না তো? হক একবার ভাবল, ডাক দেবে; আবার ভাবল থাক, যা খুশি করুক। সবে তো ক্লাস সেভেনে উঠল।

শিমু ভেতরে চা করছিল। শান্তার ডাক শুনে টাওয়েলে হাত মুছতে মুছতে আসে। ঠোঁটে চাপা হাসি। একগোছা চুল বাম কপালে ঝুলে আছে। মুখ উপরে তুলে শিমু জিজ্ঞেস করে, কী অপু ডাকলে কেন?

শোন, সজলকে একটু বাইরে পাঠিয়ে দে। আমার কথা বলিস। তারপর শান্তা কিছু একটা ইঙ্গিত করল মাহবুব যার মানে বুঝতে পারল না।

হক সাহেবের সঙ্গে মাহবুবের আলাপ হয়েছিল অফিসার্স ক্লাবে। পরিচয়ের ৬-৭ মাস পর হকই কথাটা তুলেছিল, আমার বড় মেয়ে শান্তা কেমিস্ট্রিতে উইক। আপনি তো কাছাকাছি থাকেন। মাঝেমধ্যে সময় করে একটু আসতেন যদি খুব উপকার হতো। মেয়েটা এবার এইচএসসি দেবে।

মাহবুব খান কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। মহাফ্যাসাদে পড়লাম তো! আমি এখন মুখের ওপর না বলি কিভাবে? হক আঙ্কলের সঙ্গে এর মধ্যেই ইন্টিমেসি গড়ে উঠেছে। তাছাড়া উনি এত চমৎকার মানুষ। কিন্তু শান্তা...! বড় মেয়ে...! আবার কেমিস্ট্রি দেখিয়ে দিতে হবে। অনেকদিন এসবের চর্চাটর্চা নেই। এ তো এক ঝামেলা! মাহবুব, অতএব, এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বলে, পড়ানোর জন্য ওদের কলেজের টিচারই তো সবচেয়ে ভালো। আপনার মেয়ের সমস্যাটা আমার চেয়ে উনারাই ভালো বুঝবেন। তাই না?

শামসুল হক বলেছিল, কিন্তু মুশকিল হচ্ছে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষের কড়া নিষেধ আছে। ওই কলেজের টিচাররা প্রাইভেট টুইশনি করতে পারেন না। মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তায় আছি। আপনি যদি একটু কষ্ট করতেন। সপ্তাহে দু’দিন হলেই চলবে।

মাহবুব এটা সেটা ভাবে। তার চুপ থাকা দেখে হক বলে, আপনার সম্মান আমি রাখার চেষ্টা করব, ভাববেন না।

সেদিন শান্তার বাবা কি বুঝতে পেরেছিল মাহবুবের ওই নীরবতার কারণ? আজ মাহবুব খান অন্যমনস্বকতার অন্ধকারে ডুব দিয়ে ভাবে, সে দিনের সেই আশঙ্কাটা সত্য হতে চলেছে, আশ্চর্য! শান্তা এরই মধ্যে একবার ভেতর থেকে ঘুরে এসেছে। মাহবুবের চা-নাশতা খাওয়া শেষ।

সাদার মধ্যে গাঢ় নীল ফুলঅলা জামা পরলে শান্তাকে রিয়েলি সুন্দর লাগে। তখন আলতো হাতে জড়িয়ে ধরে টুক করে ওপর কপালে একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু চুমু খাওয়ার চাইতে সেটা কল্পনা করতেই যেন ছেলেটার বেশি আনন্দ। এই যে মেয়েটা এখন খালি পায়ে ঘুরঘুর করছে, ঘর থেকে বারান্দায়, ও ঘর থেকে এ ঘরে। যেন হাঁটে না। শান্তার পা মেঝেতে ঠিকমতো পড়ে না। মেজের সামান্য ওপর দিয়ে সে হেঁটে-ভেসে বেড়ায়। এই যে এখন যেভাবে ও কথা বলছে মাহবুবের সঙ্গে, যেভাবে হাসছে, যেভাবে এক্ষুণি বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকে টেবিলের উপর রাখা কাগজের বাক্সটায় কি সব নাড়াচাড়া করল... এসব দৃশ্য এ মুহূর্তে যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি ভালো লাগে নিজের ঘরে বসে দেখতে। বারান্দায় চেয়ার পেতে মাহবুব কতদিন এরকম মনোচিত্র দেখেছে।

রহমত উল্লাহ রানা মাহবুবের রুমমেট। শান্তার প্রতি মাহবুবের দুর্বলতার কথা রানা একটু একটু জানে। ঘরে ঢোকার পথে বারান্দায় মেলে দেয়া ছাতাটা দেখলেই নির্ঘাত বলবে, লেডিস ছাতা! দুই নম্বরে গিয়ে দুই নম্বর কাজ করা চলবি না! তারপর ফাইন একখানা ইনোসেন্ট হাসি অনেকক্ষণ ঝুলে থাকবে তার মুখে। দুই নম্বর মানে দুই নম্বর ব্লক সার কারখানা আবাসিক এলাকার। রানা লোকটা ইন্টারেস্টিং। অর্থনীতিতে মাস্টার্স। থানা সমবায় কর্মকর্তা এই ব্যক্তি বয়সে মাহবুবের বছর তিনেকের বড়। আড্ডাবাজ কিন্তু অফিসের কাজে সিনসিয়ার। খেয়ালি ভাবও আছে তার মধ্যে। মন চাইল তো হঠাৎ একটা গল্পের বই কিংবা সানগ্লাস কিনে আনল, এরকম আর কী। কিছুদিন হলো একটা গিটার কিনেছে। শুক্রবার সকালের দিকে গিটারটা নিয়ে বসে রানা। অনেকক্ষণ ধরে ধুলা ঝাড়ে, কোনাটোনাগুলো আঙ্গুল ঢুকিয়ে মোছে। তারপর শুরু হয় টুং টাং। না, গানের গলা তার নেই। একটু বাজাতে পারলেই সে খুশি। একটা সুরই তুলতে দেখি তাকে। পুরনো সেই দিনের কথা...। সম্ভবত ওই একটা সুরই সে বাজাতে পারে। তাও পুরো গানটা ঠিকমতো আসে না। ঢাকায় গিয়ে গল্প বা কবিতার বই কিনে আনলে দেখা যাবে, দুই-চারটা লেখা পড়ল তারপর স্রেফ ভুলে গেল ওই বইয়ের কথা। একদিন অফিসার্স কলোনি নিঝুম। তিন দিনের ছুটি পাওয়ায় অনেকেই সপরিবারে দূরে কোথাও গেছে। লাঞ্চের পর চিৎ হয়ে শুয়ে মাথার পেছনে দুই হাত রেখে রানা বলছে, ‘কি কল্লাম। তিরিশ বছর পার হইয়ে গেল, বিয়ে কত্তি পাল্লাম না।’

যশোরের ডায়ালেক্ট অনুকরণ করে মাহবুব বলে, বিয়ে কত্তি আপনেরে নিষেধ করছি কিডা? ছুটিতে বাড়ি যেইয়ে বিয়ে কল্লিই তো হয়।

রাত সাড়ে ন’টা। রানা টিভি দেখছে। মাহবুব রুমে ঢুকেই জিজ্ঞেস করে, খেয়েছেন?

রানা জবাব দেয়, খালাম আর কই? আপনের জন্যি ওয়েট করতিছি, একসঙ্গে খাব বইলে।

দ্রুত হাত মুখ ধুয়ে ডাইনিংয়ে আসে মাহবুব। খাওয়া শুরু করতে যাবে এমন সময় রানা উঠে গিয়ে শসা কেটে আনে। মাহবুব জিজ্ঞেস করে, ক্লাবে গেলেন না যে!

অফিস থেকে এইসে শুয়ে পড়লাম, আর উঠতে ইচ্ছে কল্লো না।

ভাত চিবাতে চিবাতে রানা বলে, ক’দিন হলো পড়াতিছেন?

১০-১২ দিন।

আমি তো ভেইবেছিলাম বাসায় আপনি পড়াতিই যাবেন না।

না গিয়ে পারলাম কই?

রানা একটু পানি খেলো। তারপর বলল, দেখতে কেমন মেয়েটা?

ফর্সা, চেহারা ভালো।

মেয়ের বাবা তো দেইখলাম কালো।

হ্যাঁ। কিন্তু মা ফর্সা। ওর একটা ভাই আছে। সে আবার কালো। রানা মৃদু হেসে বলে, মাহবুব সাব, আমারে একটু দেখিয়েন তো আপনের ছাত্রীরে। আমার খুব ইচ্ছে কইরেছে দেইখতে।

এই মুহূর্তে মাহবুবের চোখ বার বার ওই ছাতাটার দিকে। গল্পে ফেঁসে গিয়ে রাত ন’টা বাজিয়ে দিল শান্তার ওখানে। সাড়ে ছ’টায় সে যখন রওনা হয়, দক্ষিণ আকাশে এক পিস তামাটে মেঘ ঝুলছিল। অন্যমনস্ক মাহবুবকে নিয়ে রিকশা চড়তে শুরু করেছে। রাতে কি বৃষ্টি হবে? ছাতা না এনে কি ভুল করলাম? সে দেখছে শান্তা এই মাত্র ব্যালকনি থেকে বিকেলের রঙ বদলানো দেখে ওর স্টাডিতে ঢুকল। মেয়েটা এখন পড়বে না। কিছু লিখবেও না। চুপচাপ টেবিলে বসে কিছু একটা ভাববে যতক্ষণ না মাহবুব আসে। ক্যাসেটে মাহবুবের প্রিয় ‘মেলায় যাইরে...’ গানটা নিচু স্বরে বাজছে। কী মনে হওযায় শান্তা ভেতরের ঘরে ঢোকে। একটু পরে ফিরে আসে আবার টেবিলে। শান্ত ভঙ্গিতে ডাক দেয়, স-জ-ল। ওদিক থেকে কিশোর কণ্ঠের জবাব, হুউ! যেন মুখের ভেতর চকলেট, স্বর আটকে যাচ্ছে। অদ্ভুতভাবে এসে দাঁড়ায় হালকা-পাতলা ছেলেটা। শান্তা বলে, পড়তে বস যা, আর শোন, বাপি এলে আমাকে বলবি।

সুবোধ ছেলের মতো ‘আচ্ছাআ’ বলে চলে গেল সজল। ‘আচ্ছাআ’ বলার সময় ওর কৃশ ঘাড়টা বাম দিকে সূক্ষ্ম একটা ঢেউ তুলল।

পলাশ বাজারের মোড়ে এখন মাহবুব। ফাইন বিকেল। লোকজন পিলপিল করে ফ্যাক্টরির গেটে জড়ো হয়েছে। বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে। এর মধ্যে ঢোল কোম্পানির মলম বিক্রেতা ঢ্যাঙা লোকটা দু’বার বাজারের এমাথা-ওমাথা করল। আকাশ কালো হয়ে উঠেছে। শিল্পাঞ্চল কলেজের গলির মুখে একজন লোক চাঙারিতে পেয়ারা নিয়ে বসেছে। পাশে বসে বিড়ি টানছে একজন শ্রমিক। আকাশের অবস্থা দেখে মাহবুব ভাবে, বৃষ্টি আসবে। সে সিটের ডান দিক থেকে বাম দিকে চেপে বসে। বৃষ্টি যেন ঝেঁপে নামে রাত আটটার দিকে। তারপর কন্টিন্যুয়াস রেইন! ছাতা তো সাথে নেই। ছাতা না থাকলে শান্তাকে বলা যাবে, একবার বলেছিল মাহবুব। সে দিন ঘনঘোর বর্ষা। বৃষ্টি কিছুতেই থামছিল না সেই চমৎকার রোমান্টিক রাতে। দুই-তিনবার আকাশটা অবজার্ভ করে মাহবুব বলে, বুঝেছি, আজ বোধ হয় ফিরতে পারব না। রাত তখন সাড়ে দশটা। কারেন্ট চলে যাওয়ায় চারপাশে ঘোরঘুট্টি আঁধার। হারিকেনের লাল আরোয় শান্তা, ফর্সা মায়াবী শান্তা, সে মুহূর্তে পাতালপুরীর রাজকন্যা।

আজ হোটেলে নির্ঘাত খাবার পাব না।

শান্তা তৎক্ষণাৎ বলে ওঠে, হোটেল কেন?

কাজের বুয়াটার জ্বর। দু’দিন ধরে আসে না।

তাহলে আমাদের বাসায় খাবেন, শান্তা আবদারের সুরে বলে, বৃষ্টি না থামলে এখানে আজ থাকবেন।

মেয়েটা অসম্ভব কিছু বলে ফেলেছে এরকম ভাব করে মাহবুব বলে, এখানে? মানে তোমার এই রুমে!

শান্তার ঠোঁটে স্মিত হাসি, হ্যাঁ এখানেই। কেন, সমস্যা আছে?

‘না’ মাহবুব চট করে বলে, ‘একটু কি রকম লাগে এই যা!’

তারপর স্বগতোক্তির মতো বলে, কেন যে ছাতাটা আনলাম না। মজার ব্যাপার, মাহবুব সেদিন দীর্ঘসময় থাকবে বলে বিরামহীন বৃষ্টি কামনা করেছিল, আবার রাত বাড়ছে, বৃষ্টি থামছে না দেখে বিরক্ত হয়েছিল খুব।

আজ ঘরে ঢুকে শান্তার মুখোমুখি হতেই মাহবুব বলে, তোমার পরীক্ষা তো শেষ হয়নি। এখন আমার আসা উচিত হচ্ছে না। এলেই এক দেড় ঘণ্টা নষ্ট। তারপরও তোমার ছাতাটা দিতে কাল একবার আসতে হবে।

নাআ, অসুবিধা নেই। আপনার যখন ইচ্ছে চলে আসবেন। পরীক্ষা আর মাত্র দু’পেপার আছে। ফোর্থ সাবজেক্ট।

ছোট ছোট সাদা ফুলঅলা নীল জামাটা শান্তাকে মানায় চমৎকার। আজ আরও সুন্দর লাগছে। শান্তা আজ সত্যিই হাসি-খুশি। সেভেন আপের ফেনার মতো উপচে উপচে কথা চলছে। এক মুহূর্তের জন্যও গম্ভীর হয়নি। আজ তার হাঁটাচলা কী মোলায়েম! মাহবুব বলে, ফোর্থ সাবজেক্ট বলে অবহেলা কেন? পরীক্ষা ভালোভাবে শুরু করেছ ভালোভাবে শেষ করতে হবে।

স্টাডি টেবিল থেকে উঠে ছেলেটা একবার ব্যালকনিতে গেল। একটু পরেই ফিরে এলো ঘরে। ওয়্যারড্রব আর টেবিলের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটায় মেলে রাখা প্রিন্টেড ছাতাটা হাতে নিয়ে মাথার ওপর কায়দা করে ঘোরালো। মাহবুবের মনে পড়ল ছাতা হাতে জাপানি মেয়ের বর্ষানৃত্য। রানার গলা ভেসে আসে, কিছু লুকাতিছেন মনে হতিছে ব্রাদার! মাহবুব মনে-মনে হাসে। তার মাথার ভেতর এখন রানার হাস্যোজ্জ্বল মুখ। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, রানাটা নাইস ম্যান। আমি এখান থেকে চলে গেলে কষ্ট পাবে। কিছুদিন খুব লোনলি ফিল করবে। লেডিস ছাতাটার দু’এক জায়গা দুর্বল হয়ে গেছে। রোদে-বৃষ্টিতে ভিজে কাপড়ের রঙ খানিকটা জ্বলে গেছে। স্প্রিংটাও আর অত টাইট নেই। মাহবুবের যদি মনে হয় ছাতাটা সে ইউজ করবে, ফেরত দেবে না। শান্তাকে না হয় নতুন ছাতা গিফট করবে তাহলে ক্ষতি কী? কেমিস্ট্রি-শামসুল হক-শান্তা-বৃষ্টি-লেডিস ছাতা-শান্তার হাসি-শান্তার অভিমান+গাম্ভীর্য... এরকম ভাবনায় ভেসে যেতে তার খারাপ লাগে না। মুশকিল হচ্ছে তাকে চাকরির পেছনে সময় দিতে হয় অনেক। ফলে এই ছাতা+সুজাতা মার্কা রোমান্সে মাথা ডুবিয়ে বসে থাকার মতো সময় কোথায় তার? এ মুহূর্তে মাহবুব ভাবে, বরং কাজের কাজ হবে ফ্যাক্টরির প্ল্যান্টের ইনকমপ্লিট কাজটা সেরে ফেলে রিপোর্ট তৈরি করা।

গত সপ্তাহে মাহবুব শান্তাদের বাসার দিকে পা বাড়ায়নি। এর মধ্যে ওর পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ইচ্ছে করেই ওদিকে যায়নি। তবে ৮ জুলাইয়ের ব্যাপারটা ঠিকই খেয়াল ছিল। ৭ তারিখ সন্ধ্যায় এ-দোকান সে-দোকান ঢুঁড়ে মনের মতো গিফট কিনতে না পেরে মেজাজ যখন তুঙ্গে ঠিক তখন, বলা যায় ক্ষেপে গিয়েই, মাহবুব এক শিশি ‘আর্কেডিয়া’ কিনল। বিদেশী পারফিউম। গন্ধটা রিয়েলি চমৎকার। তখন তো মাহবুব জানত না, শান্তা এটা হাতে নিয়ে কত খুশি হয়ে বলবে, এসবের কী দরকার ছিল! ওর চোখ মাতানো হাসি দেখে মাহবুব সে সময় পৃথিবীর অন্য সবকিছুর কথা ভুলে যাবে। মনে থাকবে কেবল জেরিন ইয়াসমিন শান্তার কথা। পৃথিবীর সব প্রিয়তমার কথা। আরও বেশি মনে পড়বে তাদের কথা যারা এক ফোঁটা মধুর জন্য নক্ষত্রের চিতায় ঝাঁপ দিয়েছে অবলীলায়।

অনেকক্ষণ ধরে বাইরের রুমে বসে আছে মাহবুব। সে অবশ্য সোজা ভেতরে চলে যেতে পারত। কিন্তু ভেতরে আজ গেস্ট। তাদের আছে বাচ্চা-কাচ্চা। তারা অবিশ্রাম কথা বলছে, দুষ্টুমি করছে! বিবরক্তির একটা ঘোলা স্রোত মাহবুবের মাথা থেকে গলা বেয়ে ধীরে ধীরে নামল। মাহবুব ভাবে, শান্তা আসছে না কনে? কী করছে মেয়েটা!

মধ্যবয়স্ক এক মহিলা দুই বাচ্চাসহ বেরুতে বেরুতে মিসেস হককে বলে, আসি ভাবি। শান্তা তখন বাইরের দরজার দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। চুল ফণার মতো করে বাঁধা ‘ফ্রি হওনি?’ মাহবুবের এ কথায় মেয়েটা যেন খোলের ভেতরে সেঁধিয়ে গেল! পরক্ষণেই আবার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে দ্যাখো! ওখানে দাঁড়িয়েই বলল, আমার রুমে গিয়ে বসেন।

শান্তার ঘরে ঢোকার পর মাহবুবের সারা মনে নদীতীরের মুলমুলে বাতাস। বাইরে ফাইন বিকেল! কাশফুলের ঝাড় নদীর হাওয়ায় ডানা মেলে দিয়েছে! সেই মুহূর্তে বেঁচে থাকার গভীর মানে টের পায় মাহবুব।

বিন্তি এসে দরজার পাশে দাঁড়িয়েছে। ওকে দেখলে মেরিলিন মনরোর কথা মনে পড়ে মাহবুবের। ‘ফিল্ম ফেয়ার’ পত্রিকায় এই বিশ্বখ্যাত নায়িকার শৈশবের ছবি দেখেছিল সে। ৭-৮ বছরের বিন্তি যেন হুবহু শিশু মেরিলিন। ছোট্ট হলে কি হবে, বিন্তি কিন্তু কথা বলে পাকা পাকা। মাহবুব মজা করার জন্য কয়েকবার ওকে বলেছিল, বলো তো, মেরিলিন মনরো! ও বলতো মেরিলিন মুনরু! ও মনরো বরতে পারে না, প্রত্যেকবার বলে ‘মুনরু’। তো ছোট্ট মেরিলিন এ মুহূর্তে মাহবুবের সামনে দাঁড়িয়ে বলছে, সিগারেট খান কেন? ক্যান্সার হবে! বিন্তি লক্ষ্য করেছে, মাহবুব তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। তাই সে যখন বলল, দ্যাখো তো তোমার আপা কি করছে, আপাকে ডাকো। সেই মুহূর্তেই কচি মুখ ঝামটা মেরে ওঠে, আপু নাই যান!

এ মেয়েটা দজ্জাল টাইপের হবে নাকি? একেবারে ওর বড় বোনের উল্টো? সেন্টিমেন্টাল মানুষেরা সরল হয়ে থাকে। বিন্তি বড় হয়ে সেরকম হবে? শান্তা উদিত হলো, চা-নাশতা নিয়ে। মাহবুব দেখল চায়ের সঙ্গে দু’রকম খাবারও আছে। সে এক পিস চপ তুলে নেয়। তারপর চায়ে চুমুক দিয়েই অন্যমনস্ক হয়ে যায়। অন্যমনস্ক মুহূর্তে সব মানুষই দার্শনিক।

গান শুনবেন? বলে উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে শান্তা ওর স্টেরিও চালিয়ে দেয়।

মাহবুব চেয়ার ছেড়ে বিছানাসংলগ্ন দেয়ালে বালিশ ঠেকিয়ে আধশোয়া অবস্থায় গান শুনতে থাকে। রানা তখন কী করছে? রুমে আছে, না কৃষ্ণবাবুর দোকানে বসেছে? মাহবুব অন্যমনস্ক হয়। কৃষ্ণ লাল ব্যানার্জি চমৎকার মানুষ। তার সাথে আমার সম্পর্কটা বন্ধুসুলভ। সেদিন কৃষ্ণবাবুর ফার্মেসিতে মুড়ি-চানাচুর খেতে খেতে বেশ আড্ডা হলো। বাবু হাসতে হাসতে কথাটা পাড়লেন, খান সাহেব আমার খোঁজে একটা ভালো পাত্রী আছে। গ্র্যাজুয়েট। চেহারা ও মন্দ না। মাহবুব কিছু বলেনি। তার মাথায় এ মুহূর্তে অন্য চিন্তা। আজও ন’টার আগে রুমে ফেরা হবে না। রানা অমার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসবেন। ভ্রু নাচিয়ে যা মিন করবেন তার অর্থ, কীঈ খুব জোসে আছেন মনে হচ্ছে!

অনেকক্ষণ পর শান্তা কথা কলে, ‘শ্যাওলা’ বইটা পড়লাম।

মাহবুব জিজ্ঞেস করে, কি মনে হলো? শীর্ষেন্দুর গদ্যটা বেশ ভালো, না?

হ্যাঁ। হিরন্ময়ের জন্য মায়া লেগেছে।

সেটা লাগতেই পারে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে নকশাল হিসেবে চরিত্রটা তেমন দাঁড়ায়নি। খুব রিয়্যালিস্টিক মনে হয় না। লেখক তার প্রতি পাঠকের সিমপ্যাথি তৈরি করতে পেরেছেন, ওটুকুই সাফল্য।

হঠাৎ বাল্বে ভোল্টেজ বেড়ে দ্বিগুণ হলো। শান্তার ফর্সা গোলগাল মুখে এবং শ্যাম্পু করা ঝরঝরে চুলে বিদ্যুৎ খেলে গেল কয়েক সেকেন্ড। মেয়েরা অল্প প্রশংসায় অনেক খুশি হয়। এ মেয়েটা ঠিক সেরকম না। তাই ওর সাহিত্যপ্রীতির প্রশংসা শুনেও সে বিগলিত হলো না।

মাহবুব এবার প্রশ্ন করে, কবিতা পড়তে ভালো লাগে না তোমার?

হ্যাঁ, কবিতাও তো পড়ি মাঝে মাঝে। তবে খুব কম কবির কবিতাই ভালো লাগে।

আচ্ছা শান্তা, মাহবুব প্রসঙ্গ পাল্টায়, আমার বরিশাল যাওয়া হবে না তোমাদের সাথে?

ভ্রু সামান্য কুঁচকে শান্তা বলে, হবে না কে বলেছে? আম্মুকে বলে রেখেছি আমি। ডিসেম্বরে আমরা মেহেন্দীগঞ্জ যাচ্ছি। আপনিও তখন যাবেন।

মেয়েটা পানি আনার জন্য ভেতরে গেছে। আর এদিকে ছেলেটা শান্তার বইয়ের পাতা ওল্টাতে থাকে। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে সে এখন পায়চারী করছে এমভি নীলা-৩ এর দোতলার বারান্দায়। দুটো কেবিন ভাড়া করা হয়েছে। একটা মাহবুবের ও সজলের জন্য। অন্যটা শান্তা, বিস্তি এবং ওদের মায়ের জন্য। শান্তার বাবা আর শিমু আসেনি। শীতের দিন আটটার আগে ঘুম ভাঙ্গে না মিসেস হকের। সজল তো আরও দেরিতে ওঠে। শান্তা কিন্তু আরলি রাইজার। মাহবুবও সাড়ে ছ’টার পর বিছানায় থাকে না। হটপটে রাখা সেদ্ধ ডিম আর পাউরুটি খেয়ে এখন ফ্লাস্ক থেকে চা ঢালছে শান্তা। নিজের এবং মাহবুবের জন্য। সাতটা বাজে। কেবিনের সামনের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে চায়ে চুমুক দিচ্ছে শান্তা। লঞ্চ কীর্তননখোলা নদীতে এসে পড়েছে। আর ঘণ্টা দেড়েক পরে বরিশাল পৌঁছাবে। দু’পারের পানি ছুঁয়ে থাকা ঝোপঝাড় নিয়ে অদ্ভুত শান্ত হয়ে আছে অঘ্রাণ মাসের নদী। মাহবুব সিগারেটে পাফ দিচ্ছে ধীরে ধীরে। সকালের মিষ্টি রোদ স্পর্শ করেছে শান্তাকে। তার নাক আর চিবুক উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। গাম্ভীর্যপূর্ণ ও ব্যক্তিত্বময়ী লাগছে তাকে। নীল কার্ডিগান তাতে যোগ করেছে অতিরিক্ত মাত্রা। দূরে তাকিয়ে শান্তা অন্যমনস্ক হয়েছিল। মাহবুব হঠাৎ বলে, শান্তা, তুমি এত ভালো কেন বলো তো?

‘আমি ভালো?’ শান্তা স্মিত হাসল, ‘নাহ, আমি আসলে একটা পচা মেয়ে! কেন যে এই পচা মেয়েটাকে সময় দিচ্ছেন!’

মাহবুব শান্তার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকালো। তারপর বলল, সময় দিচ্ছি এ জন্য যে, এসব আমার জীবনে ছিল। আরো কী কী আছে কে বলবে?

কী কী আছে বলবো? অনেক কিছু। তার মধ্যে হাতির ডিমও আছে।

দুষ্টুমির হাসি হাসে শান্তা। অনিন্দ্যসুন্দর সেই হাসি। এরকম হাসি, নরম কেকের মতো কথা, স্থির শারদ মেঘের মতো অভিমান আর উৎকণ্ঠাভরা প্রতীক্ষাÑ এসব মিলেই তো শান্তা। তাকে ভুলে থাকা সম্ভব? মাহবুবের উচ্চাশাহীন প্রায় নিস্তরঙ্গ, সহজ সাবলীল দিনযাপনের ভঙ্গিতে সে যোগ করেছে আশ্চর্য এক অস্থিরতা, জন্ম দিয়েছে বিচিত্র সব আকাক্সক্ষার। মাহবুব ভাবে, আমি-ই এজন্য দায়ী, হ্যাঁ আমি ছাড়া আর কে? মাহবুব আবার নিজের ভেতরে ঢোকে, শুধু আমি একা? আর কেউ না? হক আঙ্কল, সালমা ম্যাডাম এদের কোন ভূমিকাই নেই? আর শান্তা? মাহবুব মনে মনে যুক্তি খাড়া করে, ঢাক একা একা বাজতে পারে না। শান্তা হচ্ছে ঢাক। আমি সেই ঢাকের কাঠি! সে আরও ভাবে নাটক যখন জমেই উঠেছে, দেখা যাক কী ঘটে শেষ পর্যন্ত। মাহবুবের ঠোঁটের সামান্য হাসি ঠোটেই মিলিয়ে গেল। টেবিলের ওপর একটা খালি গ্লাস। এর মধ্যে শিমু এসে চায়ের কাপ তুলে নিয়ে গেছে। শিমু সামনে নেই কিন্তু ওর অনুযোগ মাখা কণ্ঠ “আপনি কিন্তু ‘মাটির পৃথিবীতে’ ক্যাসেসটা আজও আনলেন না” শুনতে পেল মাহবুব। আজ মেয়েটার মুখে মৌরি হাসি নেই। চোখ দুটো তন্দ্রা জড়ানো। গেট পেরিয়ে আসার সময় দরজায় দাঁড়ানো শিমু মাহবুবকে বলছে, জানেন ভাইয়া আপু না পড়ে না!

মাহবুব বলে, পড়ে না তাহলে কী করে?

বই সামনে খুলে রেখে খালি কী যেন চিন্তা করে! বলেই নিঃশব্দে হাসে শিমু। তার ডাগর চোখ জোড়া চকচক করে। মাহবুব খান হন হন করে পেরিয়ে গেল বারান্দা, বাগান কংক্রিটের সরু পথ।

মেইন গেটে এসেই একটা রিকশা পাওয়া গিয়েছিল। সেটিতে চড়ে বসেই মাহবুব ভাবে, খাওয়াটা বেশি হয়ে গেছে। শেষের ভাতটুকু দরকার ছিল না। সে দেখতে পায় তার পাতের দিকে মুরগির রান এগিয়ে দিচ্ছে মিসেস হক। শামসুল হক ভোজনরসিক। হাড় চিবাতে চিবাতে ছেলেটার মাংসে অনীহা দেখে বলে, আরে মাহবুব সাব খান খান। আপনার বয়সে আস্ত একটা মুরগি আমি একাই সাবাড় করেছি।

কিন্তু উনি তো জানেন না মাহবুব কেন রান পছন্দ করে না। রানের ভেতর কেমন একটা মুরগি মুরগি কাঁচা গন্ধ থাকে। পারফিউমটা বের করে শান্তার হাতে দিলে কিছুক্ষণ উল্টে-পাল্টে দেখার পর মেয়েটা প্রসন্ন মুখে বলেছিল, শুধু শুধু এতগুলো টাকা খরচ করলেন! মুখে ও কথা বলেছে যদিও, মাহবুব কিন্তু টের পেয়েছে শান্তার মাথার ভেতর তখন ছোট ছোট রঙিন প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে।

মাহবুব বাড়ি যায় বছরে দু’তিন বার। প্রত্যেকবার ফেরার সময় মা কাঁদবে। ওই কান্না দেখে তার মন খারাপ হয়ে যায়। রিটায়ার করার পর মাহবুবের বাবা ভেতরে ভেতরে গুটিয়ে গেছে। সারাদিন পায়ের ওপর পা রেখে হাতল চেয়ারে বসে থাকে। জমি-জিরাত, চাকর-গোমস্তা, আবাদ-কিস্তি, আত্মীয়স্বজন সবকিছু মাকেই দেখতে হয়। ছোট ভাই সাজু অবশ্য মাকে একটু হেল্প করে। রোকেয়ার সাথে ছাড়াছাড়ির পর বাবা খুব রেগে গিয়েছিল। অনেক দিন পর্যন্ত ছেলের সাথে ভালো করে কথাই বলেননি। তার মা খালি কাঁদে। কাঁদে আর আঁচল দিয়ে চোখ মোছে। বলে, তুই ফির বিয়া কর বাবা। কী এমন হইছে। মাইনষের জীবনে ইরকম হয়। তুই খালি রাজি হ। শেষের কথাটা বলার সময় মার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। যেন মাহবুব খান রাজি হয়ে গেছে। যেন আসছে অঘ্রাণেই তার সেকেন্ড ম্যারেজ। মাকে আরেকবার চোখ মুছতে দেখে মাহবুব বলে, হয়েছে মা আনেক কেঁদেছো। এখন শান্ত হও। সব ঠিক হয়ে যাবে।

মাহবুবের মাথায় আবার ভেসে উঠল ছাড়ানীড় নামের ভবনটা। শান্তা এইমাত্র গোসল সেরে বেরুলো। যা ফ্রেশ লাগছে মেয়েটাকে! ওর ননী ননী পুতুল পুতুল শরীরটা শাওয়ারের নিচে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনেকক্ষণ ধরে গোসল করেছে নিশ্চয়। বিকেলের আকাশজুড়ে শরতের মেঘ। মেঘ তো না ছেঁড়া ছেঁড়া তুলা। শান্তার গায়ে বেগুনি রঙের জামা। শান্তা আজ ফণার মতো করে চুল বাঁধেনি। কানের কাছের কয়েকটা এলো চুল ছাদের বাতাসে একটু একটু নড়ছে। অদূরে রেললাইন যেখানে নরসিদীর দিকে টার্ন নিয়েছে সেদিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। ভাবাতুর মুহূর্তে মেয়েটাকে এত চমৎকার দেখায়!... বড় এক পিস সাদা মেঘ ছাদের উপর দিয়ে, যেন হাত বাড়ালেই শান্তা ধরতে পারবে, আস্তে আস্তে পার হয়ে গেল।

মেয়েটা এখন মাহবুবের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছে, ও কথা বলছে কেন শান্তা? মানুষ কত কষ্টের মধ্যেও বেঁচে থাকে। বেঁচে থাকার মধ্যে আনন্দ না থাকলে কি লোকে এত কষ্ট স্বীকার করত? টেবিলের দু’পাশে মুখোমুখি দু’জন। সামনে কেমিস্ট্রি বই খোলা। কিন্তু শান্তা অঙ্ক করছে না। মাহবুবের ঠোঁট দুটো শুকিয়ে খরখরে। জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নেয় ঠোঁট জোড়া। তারপর বলে, আমরা শুধু শুধু স্বপ্নের কথা বলি। স্বপ্নগুলো এত ক্ষণস্থায়ী, আর জীবনটা এত মিথ্যা দিয়ে ঠাসা, বুঝেছো...।

শান্তা অবাক হলো। তার কাছে অদ্ভুত লাগছে মাহবুবের এসব কথা। এভাবে তাকে কথা বলতে শোনেনি আগে। মাহবুব বলে যায়। এই যে তুমি আমি এত কথা, হাসি, মান-অভিমান... সব একদিন ভুলে যাব আমরা। জীবন এমনই। সে জন্য বেশি প্রত্যাশা থাকা ভালো না।

শান্তার মুখ দিয়ে একটা কথাও বেরোয় না। অনেক কথা গলা পর্যন্ত এসে আটকে যায়। কেবল বোবার মতো অস্ফুট ‘আআআ... হ্যাঁ’ ধ্বনি তুলে কাতর চোখে মাহবুবের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলপেন দিয়ে সাদা পৃষ্ঠার ওপর অন্যমনস্ক দাগ কাটতে থাকে।

ছায়ানীড়-এর পাঁচতলার ঘরে শামসুল হক আর মিসেস সালাম তর্ক জুড়ে দিয়েছে। হক গিন্নির গলা এ মুহূর্তে চড়া, আমার মেয়েকে আমি ভালো চিনি। তুমি বেশি জানো?

বাহ! ও শুধু তোমার মেয়ে; আমার মেয়ে না?

সালমা বলে, হ্যাঁ তোমারও। কিন্তু আমি মা। মেয়ের খবর আমি তোমার চেয়ে বেশি রাখি। এর পর তো শান্তা ভার্সিটিতে ভর্তি হবে। হলে থাকবে মেয়েটা। তোমার মাহবুব সাহেব যে ওখানে গিয়ে শান্তার সাথে দেখা করবে না, তার ঠিক আছে?

তোমার মাহবুব কথাটা জনাব হককে বিদ্ধ করলেও স্ত্রীর কথার প্রত্যুত্তর দিতে গিয়েও দিল না। এখন আরও কথা বলা মানে ঝগড়া উস্কে দেয়া। হক এখন ক্লাবে গিয়ে তাস পেটাবে। তাই কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ল।

ফাঁকা মাঠে গোল করার মতো একতরফা বাতচিৎ শেষে মিসেস হক ফাঁপরে পড়ে যায়। পড়ে যায়। এই অস্বস্তি অসহ্য হয়ে উঠলে কোন কারণ ছাড়াই ডাক দিয়ে বসে, শান্তা... শান্তাআ এ-ই শান্তাআ...!

মেয়েটা ততক্ষণে ছাদের উপর। মুলমুলে হাওয়ায় তার খোলা চুল উড়ছে। চোখের উপর এসে পড়ায় কয়েকটা চুল আলতো হাতে সরিয়ে দিল। সন্ধ্যা আসন্ন। ওই দিকে, পারুলিয়ার দিকে, শীতলক্ষ্যার বাঁক। বিশাল নালা দিয়ে সার কারখানার বর্জ্য আছড়ে পড়ছে নদীর পানিতে। তুমুল শব্দ হচ্ছে। এইমাত্র জ্বলে উঠা কয়েকটা ঢাউস বাল্ব। কী মনে পড়ায় শান্তা অল্প একটু হাসলো। সেই হাসি দেখলো কেবল ছাদের উপর দিয়ে ঠোঁট নিচু করে উড়ে যাওয়া একটা পাখি। শান্তার ফর্সা, কোমল পা জোড়া এখন ছাদের সামান্য উপর দিয়ে হেঁটে-ভেসে বেড়াচ্ছে। তার ভালো লাগছে না। কিন্তু কী করলে ভালো লাগবে তা-ও সে বুঝতে পারছে না।