মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১১ আশ্বিন ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

বড় পাখিদের সেকাল ও একাল

প্রকাশিত : ১২ জুলাই ২০১৫
  • শরীফ খান

পৌষ মাসের শেষ। কাঁপানো শীত। সকালে বাড়ির উঠানে শোনা গেল নগেন জেলের গলা। গৃহকর্তা লেপের তলা থেকে বেরিয়েই ঘরের দরজা খুলে বাইরে এলেন- নগেন দু’হাত দুদিকে প্রসারিত করে বলল- এত্তবড় ডানার একজোড়া পাখি নেমেছে বিল কেন্দুয়ায়। ইয়া বড় ঠোঁট, সাদা বড় বকের চেয়েও বড় । গৃহকর্তা উত্তেজিত হয়ে জানতে চাইলেন-মানিকজোর বা মদনটাক কিনা! নাকি কালাজাও! উত্তরে নগেন জেলে বলল- না না। ওর একটাও না। গলা ঠিক সাদা। লেজ কালো। তার বাবা নরেন বুড়ো বলেছে- রামশালিক পাখি! তাড়াতাড়ি চলেন। অন্য কেউ এসে গুলি করে দিতে পারে!

গৃহকর্তা কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। পুরু খাকি কাপড়ের বন্দুকের খাপটার বেল্ট গলা-ঘাড়ে ঝুলিয়ে কাতুর্জের থলেটা হাতে নামলেন উঠানে। এ সময় তার কিশোর পুত্র লেপের তলা থেকে বেরিয়ে এসে বায়না ধরল- যাবে সেও। গৃহকর্তা প্রায়ই শিকার যাত্রায় পুত্রকে সঙ্গে নেন- নেন অন্য যে কোনো একজন মানুষকে, যে বন্দুক চালাতে পারে। কিন্তু এত সকালে কাকে নেবেন সঙ্গে! পুত্রকেই সাইকেল চেপে যেতে হলো গ্রামের পশ্চিম পাড়ার আপ্তাব মল্লিককে ডাকতে। সে তার সাইকেলে চেপে চলে এল। বাবার সাইকেলের সামনের রডে বসল পুত্র, আস্তাব মল্লিকের সাইকেলের রডে বসল নগেন ও জেলে। শুরু হলো শিকার যাত্রা। গৃহকর্তা খসরু আলী খানের পাখি শিকারের নেশা প্রবল। মাঘের বাঘ কাঁপানো শীতও শিকার যাত্রার কাছে নস্যি। উত্তরের হাওরের বিল কেন্দুয়া পর্যন্ত যেতে হবে- তা প্রায় ৭ মাইল কাঁচা পথ পাড়ি দিয়ে। ছুরির মতো ধার শীত-বাতাসের, কুয়াশাও আছে বেশ, তাই সবাই যেন হিমে বরফ হয়ে যাচ্ছে! পুত্রের কান-মাথা-চোখে কোনো অনুভূতিই যেন নেই। খসরু খানের দু’হাতও অনুভূতিহীন- সাইকেল তবু চালাচ্ছেন বেশ জোরে। বুকের ভেতরে বইছে তার চেয়েও বেশি ঝড়- হাওরের চিতলমারী-মোল্লাহাট-ফকিরহাট অংশে বন্দুক শিকারি আছে অনেক। ওখানে পৌঁছানোর আগেই না আবার অন্য কেউ লোভনীয় শিকার দুটিকে মেরে ফেলে বন্দুকের গুলিতে! হাওরে অনেক মাছ, জেলেও অনেক। সবাই বন্দুক শিকারিদের ঘরবাড়ি চেনে। বড় বা বিশেষ কোনো পাখি অথবা পাখির সন্ধান পেলেই তারা প্রিয় কোনো শিকারির বাড়িতে ছোটে খবর দিতে। ছোটে এইজন্য যে, শিকারকৃত পাখির মাংসের একটা অংশ তারা পায়। সংবাদ বাহক হিসাবে, যেমন নগেন জেলে ৭ মাইল পথ হেঁটে খবর নিয়ে এসেছে খসরু খানের বাড়িতে।

উত্তরের হাওর হলো মাছের খনি। শীতের পাখিদের স্বর্গরাজ্য। লাখ লাখ বুনোহাঁস নামে শীতকালে। পেশাদার পাখি শিকারিরা মাইলকে মাইল নানান রকম জালের ফাঁদ পেতে শত শত পাখি শিকার করে- কত যে প্রজাতির পাখি! হাটবাজারে অবাধে বিক্রি করে প্রতিদিন। তার ভেতরে কখনো কখনো আসে বুনো রাজহাঁস (২ প্রজাতি)। গগনবেড় সারস (২ প্রজাতি), লোহারজঙ্গ বা রামশালিক, মানিকজোড়, মদনটাক, রাওলা বক, সাদা মানিজজোড়ের (এটাও রামশালিক) মতো বড় বড় পাখি, তখন হাওর পাড়ের বন্দুক শিকারিদের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়Ñ প্রতিযোগিতা জমে ওঠে। কার আগে কে মারবে। এই সব বড় পাখি প্রতিবছর আসে না, সংখ্যায়ও বেশি আসে না, এরা পেশাদার জাল শিকারিদের জালেও পড়ে না সহজেÑ খোলা হাওরে ক্রলিং করে বা চুপি চুপি নৌকা নিয়ে এগিয়েও ওদেরকে সহজে বন্দুকের রেঞ্জের আওতায় আনা যায় না। তাই, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোটেও দেরি না করে শিকারে রওনা দেয়া। প্রবল শীতে আর হিম হাওযায় দাঁতে দাঁতে টক্কর যেমন বাজছে। তেমনি কান যেন বন্ধ হয়ে গেছে সবার। তবুও শিকারের নেশা বলে কথা!

হাওর পাড়ে নগেনের মাছ ধরা নৌকাটা রেডিই ছিল। নৌকায় চড়তেই বাঁশের লগি মেরে মেরে দ্রুত স্পটের দিকে চলল সে। কিশোর পুত্র আজও মুগ্ধ-বিস্ময়ে দেখছে হাজার হাজার বুনোহাঁসের ওড়াউড়ি, শুনছে ওদের প্রচ- ডাকাডাকি। শুধু কী নানান প্রজাতির নানান রঙের হাঁস আরো কত শত কত প্রজাতির, রঙবেরঙের জলজ পাখি! হাওর ভরা শ্যাওলা, শাপলা-রক্ত শাপলা-পদ্ম-পানিফলসহ আরো কত জলজ উদ্ভিদ! জল টলটলে নীল। স্ফটিক স্বচ্ছ, জলের তলার অনেকটা দূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। ওই জলে আকাশে উড্ডীয়মান পাখি ঝাঁকের ছবি। মাছেদের কলকাকলী। অবাক চোখে দেখছে কিশোর পুত্রটি। নৌকায় বসেই গুলি করে পেড়ে ফেলা যায় দু-পাঁচটা বুনোহাঁস, কিন্তু ওগুলো এখন তুচ্ছ। দ্রুত পৌঁছাতে হবে টার্গেটের কাছে। রামশালিককে গুলী করার সুযোগ কী মেলে সহজে!

দূর থেকে আঙ্গুল তুলে পাখি দুটোকে দেখালো নগেন। শিকারিও দাঁিড়য়ে দেখলেন- বসেও পড়লেন খপ করে। নগেনকে বসে পড়ে লগি মারতে বললেন।

বিলের উঁচু মতো জায়গায় (জল নেই ওই এলাকায়, নরম কাদামাটি) পাখি দুটি যেন পাশাপাশি লাইনে থেকে লম্বা লম্বা পায়ে মার্চ করে এগোচ্ছে সামনের দিকে। বহুদূরে, তবুও অনেক বড়ই মনে হচ্ছে ওদেরকে।

শিকারি নেমে পড়ল নৌকা থেকে। হাঁটুজল ভেঙ্গে উঠে দাঁড়ালো একটি করচ গাছের তলায় রেকী করে নিল পুরো এলাকাটা। কোনদিকে কী কৌশলে ক্রলিং করে এগোতে হবে, মনে মনে সেই প্ল্যান এঁটে ফেলল। বন্দুকে পুরল এল.জি. কাতুর্জ। তারপরে একেবারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্যদের মতো শুরু করল ক্রলিং। পাখিদুটি আর শিকারির মাঝে আড়াল বলতে তেমন কিছু নেই। জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট ঝোপ আছে বটে। তার কোনটিই উপযুক্ত নয় পাখিদের দৃষ্টি থেকে আড়াল হবার বা ওই আড়াল থেকে নিকট পাল্লায় গুলি করা যাবে শিকারকে। অনুমান ৪০০ হাত দূরে আছে পাখি দুটি।

শিকারি জানেÑ খুব ভাল করেই জানে নিজের এই জার্মানির বার্মিংহাম বন্দুকটির রেঞ্জ ১৫০ গজ। সেই দূরত্বের বা রেঞ্জের শেষ সীমানায় গুলী করে কিছুতেই এত বড় পাখিদের কুপোকাত করা যাবে না। কমপক্ষে ৭৫-১০০ গজ দূর থেকে গুলী করতে হবে। তাহলে স্পট ডেড না হলেও আহত হবে মারাত্মভাবে, ধাওয়া করে ধরে ফেলা যাবে। তারপরে, চেষ্টা করতে হবে দুটিকেই এক লাইনে ফেলে গুলী করার। তাহলে দুটিই পড়ে যাবে এক গুলীতে।

শিকারি গুইসাপের মতো এগোচ্ছে। আন্দাজ শত খানেক গজ এগোনোর পরই পাখি দুটি দেখতে পেল শিকারিকে। এমনি দুটিতেই এদিকে ফিরে দাঁড়িয়ে গেল গলা লম্বা করে। একেবারে স্থির হয়ে গেছে ওরা। শিকারিও কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে পড়ে রইল স্থির। সন্দেহ ভরা চোখে কিছুক্ষণ তাঁকিয়ে থেকে পাখি দুটি এবার মুভ্ করল শিকারির উল্টো দিকেÑ যাতে সন্দেহ থেকে দূরেই থাকা যায়। বারবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখছে। শিকারি জানে, এই সকালে পেটে ক্ষিদে ভরা ওদের। সূর্যও উঠে পড়েছে বেশ আগে। হাজার হাজার পাখি উড়ছে-পড়ছে আশপাশের আকাশে, এই চরমতো এলাকাটাতেও নামছে দু-চারটে করে বক জাতীয় পাখি। শালিকের ঝাঁক। পাখি দুটো তাই আনমনা হতেও পারে!

বাঁ দিক দিয়ে অনেকটা দূর ভীষণ কষ্টকর ক্রলিংয়ে ঘুরে এসেও শিকারকে বন্দুকের রেঞ্জে আনা গেল না। সরে যাচ্ছে ওরা শিকারির বিপরীত দিকে। তারপরেও প্রায় ৫ ঘণ্টা চেষ্টা করল শিকারি। না, পাখি দুটি স্থির দাঁড়িয়ে থাকে গলা টানটান করে। শিকারি আর কতক্ষণ স্থির পড়ে থাকতে পারে এক জায়গায়! যেই না একটু মুভ্্ করে সামান্য উড়ে গিয়ে বসে ওরা আরো একটু দূরে। এভাবে প্রায় দুপুুর বেলায় পাখি দুটো ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে দিল উড়ালÑ ধীরলয়ে চলে গেল মোল্লাহাটের দিকে।

নগেন মাঝি, আপ্তাব মল্লিক ও শিকারির কিশোরপুত্র নেমে পড়ল নৌকা থেকে। শিকারি দেখল কষ্টকর ক্রলিংয়ের ট্রেইলÑ নরম মাটিতে চিহ্ন স্পষ্ট। পাখি দুটির পায়ের ছাপও দেখল সবাই। উত্তেজিত শিকারি বললÑ ওরা নিয়মানুযায়ী আগামী ভোরেও নামবে এসে এখানেই। প্রচুর খাদ্য আছে এখানে। নিরিবিলি চরের মতো এলাকা। তাই, শিকারির পরামর্শে সবাই দুহাত দিয়ে কাদামাটি তুলে ফেলতে শুরু করল। দেখতে না দেখতে প্রায় তিন হাত গভীর আর পাঁচ হাত লম্বা একটা গর্ত তৈরি হয়ে গেল। প্রশস্ত অবশ্য হাত দুই মাত্র। গর্তটা খোঁড়া হল সেখানেÑ যেখানকার চারপাশেই হাত চারেক করে উঁচু নলখাগড়ার ঝোপ আছে কয়েকটা। লুকানো বা এ্যাম্বুশের জন্য আদর্শ জায়গা। পায়ের ছাপ যে জায়গাগুলোতে বেশিÑ আশা করা যায় স্বভাব অনুযায়ী (এই পাখিদের স্বভাব) পাখি দুটি আগামী ভোরে সে জায়গাতেই এসে নামবে। যদি তাই হয়, তাহলে এ্যাম্বুশে থেকে যেকোনো দিকেই নলখাগড়ার ভেতর দিয়ে বন্দুকের নল বাড়িয়ে দিয়ে ২০/৩০ হাত পাল্লার ভেতরে গুলি করার মোক্ষম সুযোগ পাবে।

পরদিন ভোররাতেÑ বলা যায় মাঝরাতে নগেন নৌকা চালিয়েছিলÑ রাতে শিকারি, শিকারিপুত্র ও সেই আপ্তাব মল্লিক নগেনের কুঁড়ের বারান্দাতেই শুয়েছিল গাদাগাদি করে। লেপ অবশ্য বাড়ি থেকেই আনা হয়েছিল।

মরা চাঁদ ছিল আকাশে। গত কালকের সেই পয়েন্টেই নৌকা ভিড়ল। শিকারি একাই এগিয়ে সেই গর্তে লুকিয়ে পড়ল। বুনোহাঁসেরা তো সারারাতই ডাকাডাকি করে। ওড়াওড়ি করে। ওদের ডাকে কান ঝালাপালা। মাঝে মাঝে বিশাল বিশাল ঝাঁক উড়ে যাচ্ছে এই চরভূমিটার উপর দিয়ে।

তখন যেন চাঁদটা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। কান ঝালাপালা। কিন্তু ভোর যে কখন হবে! নামবে পাখি দুটো।

সূর্য উঠল। কুয়াশাও কাটল ধীরে ধীরে। চরভূমি এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। পাখি কই। একটু বাদেই দেখা গেল ওদের- টান টান গলা আর পেছন দিকে টান টান পা দুখানা ওদের দৈর্ঘ্য যেন বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে, সূর্যের সোনালি রঙ ওদের দুধসাদা গলা-বুক-পেটে যেন ‘প্রতিফলনের’ চমৎকার খেলায় মেতেছে! চরের মাথায় বৃত্তাকারে ঘুরল কয়েক পাক, নামবার স্পটটা ঠিক করে বিমানের মতো ল্যান্ডিং করলÑ নৌকায় বসা তিনজনের তো দম বন্ধ হবার দশা। এ্যাম্বুশটার খুবই কাছে নেমেছে। নেমেই কিন্তু খাদ্যে মনোযোগী হলো না ওরা। পর্যায়ক্রমে দু’খানা লম্বা পা টানটান করে ব্যায়াম করলÑ দু’পাখাও পর্যায়ক্রমে মেলে ধরে শরীরের আড়ষ্টতা কাটাল, শরীরের পালক ফুলিয়ে প্রচ- ঝাঁকুনী দিয়ে যেন গত রাতের অলসতা ঝেড়ে ফেলল। তারপর মনোযোগী হলো খাদ্য সন্ধানে।

আশ্চর্য! শিকারি কী ঘুমাচ্ছে নাকি! উত্তেজনায় নৌকার তিনজন দাঁড়িয়ে গেল। না, গুলীর শব্দ নেই। রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষার পরে আচমকা শিকারিকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখা গেল। পাখি দুটি ঝটপট উড়াল দিলÑ মিলিয়ে গেল দূরে।

নৌকার তিনজনে ছুটল শিকারির দিকে। হতাশ শিকারি ব্যর্থতার গ্লানিতে মাটিতে বসে তখন দুহাতে মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে। চোখে জল। বন্দুকটি কাত হয়ে পড়া বালুমাটির উপরে। ব্যাপার কী? কার্তুজের থলেটাতে হয়ত বা গতকালই জল লেগেছিল, অথবা কুয়াশায় গিয়েছিল কিছুটা ভিজে, ব্যস! কার্তুজের মোটা পিসবোর্ডের খোল গিয়েছিল ফেঁপে-দু’এক ফোটা জলও হয়তবা ঢুকেছিল ভেতরে। ০৭টি টিএলজি বুলেটই ড্যাম্প হয়ে ফুলে উঠেছিলÑ বন্দুকের নলে ঢোকাতে হয়েছে জোর করে। কিন্তু কার্তুজ বারুদতো গিয়েছিল অকেজো হয়ে। তাই ঘোড়াকল টানলেও কার্তুজ ফোটেনি। একে একে ০৭টি কার্তুজ মোট ১৪ বার ব্যারেলে পুরে বহু চেষ্টা করেও ফায়ার করা যায়নি।

চারজন হতাশ মানুষ যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মতো চরভূমি পাড়ি দিয়ে নৌকায় উঠল। ওই দুটি পাখি আগামী দু-এক সপ্তাহের মধ্যে আর নামবে না এই তল্লাটে-শিকারির অভিজ্ঞতাই বলে দিল সেটা। দারুণ সতর্ক আর চতুর পাখি এরা। মারা পড়বে বিশাল এই হাওরের অন্য কোনো বিলে। একেই বলে দুর্ভাগ্য। এত কষ্ট-চেষ্টা করেও দারুণ লোভনীয় শিকার নাকের ডগা দিয়ে পার পেয়ে গেল! এরকম ব্যর্থতা যেমন এই শিকারির আছে। সফলতাও আছে অনেক। পাখি শিকারের নেশা যেন মরণ নেশা।

এই ঘটনাটি ১৯৬৬ সালের পৌষ মাসের। শিকারি ছিলেন আমার বাবা। আমি সেবার ক্লাস এইটে পড়ি। সেই আপ্তাব মল্লিক বেঁচে আছেন আজো। তাঁর দাদা কিনাই মল্লিকের ছিল গাঁদার বন্দুক। বাবার ছিল ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বন্দুকÑআমার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। গ্রামের উত্তর পাড়ার সাত্তার শেখেরও ছিল একই বন্দুক। এই তিন বন্ধু মিলে সুপরিকল্পিতভাবে অনেক পাখি শিকার করার জন্য শীতে ঘনঘন উত্তরের হাওরে যেতেন। হাওর তখন ছিল দুর্গম-দুর্ভেদ্য। লাখ লাখ পাখি নামতো তখন। আমিও দেখেছি তা। শিকার আমিও করেছি প্রচুর-১৯৭০ সাল পর্যন্ত। আমার মামাবাড়ি আমাদের খুব কাছে। বড় মামাও একটি বন্দুক কিনেছিলেন। তখন আমাকে আর পায় কে! গ্রামে আরো অনেকের বন্দুক ছিল। বন্দুক ছিল হাওর গায়ের বহুজনের। শীতকালে পাখি মারো আর খাও। আত্মীয়-স্বজনদের বিলাও। কিন্তু আমার চোখের সামনেই বদলে গেল কত কিছু! স্টর্ক জাতীয় বড় বড় পাখিরা দ্রুতহারে কমে গেল এদেশ থেকেÑ কেউ কেউ নেই-ই হয়ে গেল। আজ ৬৪ বছর বয়সে পেছনে তাকালে বুঝিÑখুব ভালভাবেই অনুভব করি। এই কমে যাওয়া বা নেই হয়ে যাবার পেছনে ৯০ ভাগ দায়ী হলো বন্দুকের নির্বিচার শিকার। এ কথা খাটে সারা দেশের ক্ষেত্রে। আমি এ দেশের (আবাসিক ও পরিযায়ী) বড় বড় পাখিদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরবÑ সে দলে থাকবে বুনো, রাজহাঁস (২ প্রজাতি), রাজধনেশ (পাহাড়ি পাখি), বাঁদিহাঁস (গহীন পাহাড়ি বনের বুনোহাঁস), রাজশকুন, ময়ূর, সারস (২ প্রজাতি) গগনবেড় (২ প্রজাতি) ও স্টর্ক জাতীয় পাখিরা। সবার আগে আমি সেই পাখি দুটির পরিচয় দিচ্ছি সংক্ষেপে, যে দুটিকে শিকার করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন আমার বাবাÑ সেই ১৯৬৬ সালের পৌষ মাসে।

পাখিটির বাংলা নাম রাম শালিক, সাদা মানিকজোড়। আরো দু’একটা নামও আছে। ইংরেজি নাম ঙৎরবহঃধষ ংঃড়ৎশ. বৈজ্ঞানিক নাম ঈরপড়হরধ নড়পরধহধ. শরীরের মাপ সর্বোচ্চ ১৫০ সেমি। চোখা সামান্য উর্ধমুখী বল্লমের মতো ঠোঁট এদের, রং লালচে। মাথা-গলা-বুক-পেট দুধসাধা। লেজের উপরিভাগের পালক কালো। গোলাকার লম্বা গলা ও লম্বা পা এদের।

চারণভূমি : মূলত দ্বীপ-চর-মোহনা-হাওর-বাঁওড়সহ ধানের মাঠ। অল্পজলের বিল।

খাদ্য : মূল খাদ্য মাছ-ব্যাঙ-ছোট শামুক ও জলজ পোকা-পতঙ্গ।

সেকালের অবস্থা : ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর খুলনা জেলার কোনো না কোনো হাওর-বিল-জলাশয়ে দেখা মিলত প্রতি শীতেই। প্রতি বছরই ২/৫টি পাখি শিকারের খবর মিলত। তবে, সংখ্যায় এরা বেশি আসত না। আমি শুনেছি আমার বাবা-নানা ও অন্যান্য বয়সী শিকারিদের কাছে এদের গল্প, আমার বাবা শুনেছিলেন তাঁর বাবা-চাচাদের কাছে, আমি নিজেও দেখলামÑ এভাবে ‘পরম্পরা’র মাধ্যমে গেল ১৫০ বছরের কথা আমি জানি। ১৫০ বছর আগে বন্দুক ছিল না সাধারণ মানুষের কাছে। ইংরেজ সাহেব, জমিদাররা শিকার করত। পরে এল গাঁদার বন্দুক। আমাদের গ্রামেও ছিল ৩টি গাঁদার বন্দুক। ৩টিকেই দেখেছি আমি, গুলিও করেছি। আমার জন্মের আগে-১৯৩০-৩১ সালে এই গাঁদার বন্দুক দিয়েই বিশাল একটি রাম শালিক পাখি শিকার করে আজো আমাদের গ্রামে কিংবদন্তি হয়ে সাহা খোন্দকার (পীর সাহেব)। সেই পাখির ঠোঁটটি বহু বছর যাবত খোন্দকার বাড়িতে রাখা ছিল। দেখেছি আমিও। ওটি ছিল এই সাদা মানিকজোড়- যা আবিষ্কার করতে আমার সময় লেগেছিল বহু বছর। পাখিটির পরিচিতি ছিল রাজ ঘোঙ্গল। প্রচুর চর্বি হয়েছিল। মাংসও অনেক। কারো কারো ধারণা পাখিটি প্রচ- ঝড়ের কবলে পড়ে পথ হারিয়ে বাগেরহাটের ফকিরহাটে চলে এসেছিল।

ওটি নাকি ছিল পাহাড়ি পাখি। ইদানীং (২০১৫ সাল) আবার মনে হয়, ওটি ছিল রাজধনেশ। তখনকার আমলে হয়তবা ছিল এরা ঢাকা জেলার শালবনগুলোতে! হিন্দিতে ধনেশদের ঘোঙ্গল বলা হয়। যাক এ প্রসঙ্গ! রামশালিক বা সাদা মানিকজোড় আমার বাবা শিকার করেছিলেন মোট ০৫টি। যথাক্রমে ১৯৬৭ সালে ০৩টি, ১৯৬৮ সালে ০১টি, ১৯৬৯ সালে ০১টি। আগ্রহী-উৎসাহী পাঠকরা আমার লেখা বাংলাদেশের পাখি (দিব্যপ্রকাশ, ২০০৮) পড়ে দেখতে পারেন। ওই বইয়ে আমি বিভিন্ন দুর্লভ ও বড় পাখিদের শিকারের তথ্য সালসহ ছকে উল্লেখ করেছি। উল্লেখ আছে শিকারের স্পট তথা বিল-হাওরের নামসহ শিকারিদের নাম। (

এই সাদা মানিকজোড়েরা ১৫০ বছর আগে যে সংখ্যায় আসত আমাদের বৃহত্তর খুলনা জেলা এলাকায়, ১০০ বছর আগে তা কমে যায়। আর মাত্র ৫০ বছর আগে খুলনা তো বটেই সারা বাংলাদেশের সেটা প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছে যায়। ১৯৯৭ সালে উত্তরের হাওরের বিল কোদালিয়া থেকে অনেক কষ্টে লং শটে একজন পাখি আলোকচিত্রী সাদা মানিকজোড়ের একটি ছবি তুলেছিলেন (০২টি ছিল), ওটিই বাংলাদেশে তোলা এই পাখির প্রথম ছবি। তারপর থেকে প্রতি মৌসুমেই একজোড়া পাখি আসতÑ এসেছিল ২০০৮ সাল পর্যন্ত। বহু বন্দুক শিকারিই ও দুটোর পেছনে লাগত, কিন্তু হুঁশিয়ার পাখি দুটিকে তারা বন্দুকের রেঞ্জে আনতে পারেনিÑ অন্তত ২০০৮ সাল পর্যন্ত। প্রতি মৌসুমেই ঢাকা থেকে আমি গ্রামের বাড়িতে যেতাম শুধুমাত্র ওই দুটি পাখিকে দেখতে, দেখেছিও। ২০০৯-১০-এ এসেছিল একটি করে। তারপর থেকে ২০১৫-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেখা মেলেনি আর। আমরা প্রতিবারই ছবি তোলার অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি, সফল হইনিÑ এমনকী আমার বাবার মতো মাটিতে বাংকার খুঁড়েও আমরা একবারও ক্লিক করতে পারিনি। ১৯৯৭ সালে ওই দুটি পাখিকে বিল কোদালিয়া গিয়ে দেখে এসেছিলেন গরমাণু বিজ্ঞানী ড. রেজাউর রহমান, ড. আ.ন.ম আমিনুর রহমান, সাংবাদিক ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ফরহাদ মাহমুদ প্রমুখ। সাদা মানিকজোড় ৫০/৬০ বছর আগেও সারাদেশেই ক্বচিৎ দেখা যেত। এখন দেখা নেই। আসে না ওরা- কারণ, নিরাপত্তাহীনতা আছে। আবাসভূমি বা চারণভূমি কমে গেছেÑ বন্দুকের নলের আতঙ্ক তো আছেই। ৫০ বছর আগে বৃহত্তর খুলনা জেলায় মোট ০৭টি সাদা মানিকজোড় শিকার করে বন্দুক শিকারিরা, সার তথ্য বাংলাদেশের পাখি বইতে বিস্তারিত উল্লেখ আছে।

মানিকজোড় : সাদা মানিকজোড়ের জাতভাই এই মানিকজোড় ছিল ৫০ বছর আগে বন্দুক শিকারিদের কাছে প্রেস্টিজ শিকার। এরা মারা পড়ত এদের দুটো অনিবার্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে (এই বৈশিষ্ট্যসহ বিস্তারিত উল্লেখ আছে ‘বাংলাদেশের পাখি’ বইটিতে) এর শিকারিদের হাতে মারা পড়ত বেশি। ষাটের দশক পর্যন্ত এরা বাংলাদেশেরই পাখি ছিল। এখন উদ্বাস্তু পরিযায়ীÑ অতি বিরল পাখি। ২০১১ সালের নবেম্বরে আমার গ্রামে (ফকিরহাট, বাগেরহাট) একজোড়া পাখি এসেছিল। ক’দিন পরে এক বন্দুক শিকারির গুলিতে মারা পড়ে একটি। মৃত পাখিটির ছবি আমার সংগ্রহে আছেÑ সংগ্রহে আছে ঠোঁটটিও। এটা নিয়ে ১১/১২/২০১২ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোর ব্যাকপেজ ফিচারে একটি লেখা ছাপা হয়েছিল আমার। ২০১৪ সালের শেষের দিকে বগুড়ার একটি চর থেকে একটি পাখির ছবি তুলেছিলেন ও ভিডিওতে ধারণ করেছিলেন প্রাণীবিজ্ঞানী এসএম ইকবাল। এই পাখিটি নিয়ে তার একটি লেখা ছাপা হয়েছিল দৈনিক সমকালের ব্যাকপেজ ফিচারে গত ০৪-০৫-১৫ ইং তারিখে। অতি বিরল পাখির অতি দুর্লভ ছবি তুলেছিলেন তিনি। স্বাধীনতার আগে এটিÑ বিশেষ করে বৃহত্তর খুলনা এলাকায় দেখা যেত প্রতি মৌসুমেই, এখন ক্বচিৎ দেখা মেলে। এরা গভীর জলাভূমির আশপাশটার চেয়ে মাঠ-বিলের ছোট ছোট ডোবা-নালা জলাশয় বেশি পছন্দ করে। মূল খাদ্য মাছ-কাঁকড়া ও জলজ কীটপতঙ্গসহ মাছ। এরা শকুনের দলে মিশে বৃত্তাকারে আকাশে চক্কর দিত, শিকারিরা শকুনের দলে থাকা মানিকজোড়দের আলাদা করে চিনতেন, গতিবিধি লক্ষ্য করে বুঝতেন- কতদূরে বা কোথায় নেমেছে ওরা। ছুটতেন। শিকার করতেন। এমনিতেও বন্দুক হাতে বেরুলে সামনে পড়ত। ২/৩টি সদ্য উড়তে শেখা বাচ্চা নিয়ে হয়ত চরছে। গুলি খেয়ে মা বা বাবা মারা পড়ল, ছটফট করছে, তা-ও বোকা বাচ্চারা উড়ত না। পরিণামে তারাও গুলি খেত।

আমি নিজে এই পাখি শিকার করেছি মোট ৩টি। সব মিলে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত (সব হিসাব আমি সংগ্রহ করতে পারিনি অনেক চেষ্টা করেও) মারা পড়ে মোট ১৩টি।

মানিকজোড়ের ইংরেজী নাম ডড়ড়ষষু হবপশবফ ংঃড়ৎশ. বৈজ্ঞানিক নাম ঈরপড়হরধ বঢ়রংপড়ঢ়ঁং. মাপ সর্বোচ্চ ১২৫ সেমি।

উলের মতো নরম পালকে মোড়া লম্বা গোলাকার গলাটা-রঙ কার্পাস তুলার মতো সাদা। ঠোঁট-পা লাল। এরা ঠোঁটে ঠোঁটে টক্কর দিয়ে ভাল ‘ঠোঁটতালি’ বাজারে পারে। বুক-পেট সাদা মাথার তালু কালো। পিঠ কালো।

কালাজাঙ : ফকিরহাট অঞ্চলে এটিকেও বলা হয় রামশালিক। লাল বড় ঠোঁট। মাথা-গলা-পিঠের রঙ চকচকে কালো। বুকের উপরিভাগটাও তাই। বুকের নিচ থেকে পেট পর্যন্ত সাদা। এদেরও মূল খাদ্য-ব্যাঙ-কাঁকড়াসহ জলজ পোকা পতঙ্গ। বড় বড় নদীর পাড়, চর-মোহনাসহ হাওর-বাঁওড়ে চরে। ৫০ বছর আগে মোটামুটি দেখা মিলত-বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে প্রতিবারই ২/৪টির দেখা মিলত, শিকারিরা গুলি করে মারত। এই বিরলতর পাখিটিরও ছবি তোলেন প্রাণী বিজ্ঞানী এসএম ইকবাল (একজোড়া পাখি) গত ২০১৪ সালে, এ বিষয়ক তাঁর একটি লেখাও প্রকাশিত হয় দৈনিক জনকণ্ঠের ব্যাকপেজে ফিচারে গত ২৫/০৫/২০১৫ইং তারিখে। আমার বিশ্বাস- বাংলাদেশে তোলা এটিই কালাজাঙের প্রথম ছবি। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে এই পাখি মারা পড়ে মোট ৫টি।

রামশালিক : কেতাবী নাম লোহারজন্দ। ফকিরহাটে নাম ছিল রামশালিক। মাপ ছিল সর্বোচ্চ ১৫০ সেমি। লম্বা- বল্লম ঠোঁট, লম্বা গলা ও লম্বা পা। ডানার কিছুটা ও পিঠের কিছুটা তুলোট-সাদা, গলা-মাথা চকচকে কালো, ঠোঁটও তাই। পা ও পায়ের নখ আলতা-লাল। বুক-পেট চকচকে সাদা।

নদীর চর মোহনা-জলাভূমি-হাওর-দ্বীপে চরে। মূল খাবার। অপেক্ষাকৃত একটু বড় মাছ। যেমন টাকি-শোল-শিং-মাগুরসহ কাঁকড়া, জলজ পোকা ও সুযোগ পেলে ছোট পাখি, ব্যাঙ ও জলসাপ খায়।

৫০ বছর আগে যথেষ্টই দেখা যেত সারাদেশে। এখন অতি বিরল। খোলা জায়গায় চরে যে সব বড় বড় পাখি, তারা তো মানুষের নজরে পড়ে যায় সহজে। শান্তিতে থাকা দায়। বন্দুকের নল মহা আতঙ্কের মতো তাড়িয়ে বেড়ায়।

এটির ইংরেজি নাম ইষধপশ-হবপশবফ ংঃড়ৎশ. বৈজ্ঞানিক নাম ঊঢ়যরঢ়ঢ়রড়ৎযুহপঁং ধংরধঃরপঁং. স্বাধীনতার আগে বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে বন্দুকের গুলিতে শিকার হয় মোট ৬টি।

হাড়গিলা : ১৯৪০ সালে আমার বাবা নিজে দেখেছিলেন বৃহত্তর খুলনা জেলার একটি আখ খেতের পাশের খোলা জমিতে। কলকাতায় যাবার পথে দু-তিনবার দেখেছিলেন পশ্চিম বাংলায়। এছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে আমাদের এলাকার অনেকেই দেখেছেন। বিশাল পাখি, বিশাল ঠোঁট, চাহনিতে কেমন কৌতুক কৌতুক ভাব। হাঁটার সময় পা ফেলে যেন হিসাব কষে। টাক মাথার জন্য একটু প-িত-প-িত লাগে যেন! ২০০৬ সালে পিরোজপুর জেলার ভা-ারিয়া উপজেলার কচানদীর বাঁকের একটা চরে (গ্রামের নাম চরখালী) নেমেছিল একটি পাখি। ওই চরে ২০/২৫ টা মোষ চরে নিয়মিত। চারপাশেই জল-চর না বলে তাই দ্বীপ চরও বলা যায়। অচেনা অতবড় পাখি দেখে মোষেদের ভেতরও বোধহয় একটা কৌতূহল ও আতঙ্ক জেগেছিল। ওরা বারবার তেড়ে যাবার চেষ্টা করছিল। পাখিটি বারবার বিশাল দু’ডানা প্রসারিত করে কেমন যেন ‘ডানা-চড়’ দিতে চাইছিল। ওতেই মোষেরা ভয় পাচ্ছিল। পাখিটি মাঝে মাঝে ‘ঠোঁট তালি’ বাজাচ্ছিল ‘টক্্ টক্্’ শব্দে- বিশ্রী সে আওয়াজ। রাস্তার উপরে বহু মানুষ জড় হয়ে গিয়েছিল। অচেনা পাখিটিকে কেউ বলছিল বিদেশি শকুন, কেউবা বলছিল সারস। মদনটাকও বলছিল কেউ কেউ। বয়সী এক বৃদ্ধ বললেনÑ হাড়গিলে এটা! কিন্তু হাড়গিলার গলায় তো বেগুনাকৃতির চামড়ার কমলা-নীল রঙের থলে থাকে! কই সেটা! আমি সেদিন ওই ভিড়ে উপস্থিত ছিলাম (আমার আপন বড় ভায়রার বাড়ি চরখালীতে) আমিও বুঝতে পারছিলাম না কী ওটা। হাড়গিলা, না মদনটাক! দুটি পাখিকে তো প্রায় একই রকম দেখায়।

এক বন্দুক শিকারি ছোট ডিঙিতে চেপে নামল গিয়ে দ্বীপে। তার স্থির বিশ্বাস-মদনটাক এটা। মৃত একটা মোষের বাচ্চার হাড্ডি-মাংস গিলছে পাখিটা গো-গ্রাসে (নাকি হাড়-গ্রাসে!), মদনটাকও হতে পারে। হাড়গিলা হচ্ছে মদনটাকের আপন বড় ভাই। পেটে হয়ত দারুণ খিদে। সুন্দরবনও তো দূর নয় বেশি। অভাবে পড়লে মানুষ কী-না খায়! আর এটাতো পাখি!

গুলি হল। পড়ল পাখি। ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে মোষের দল দিল কচা নদীতে ঝাঁপ। ওরে বাপ্্ রে বাপ্্! এতবড় শব্দ!

পাখি এল ডাঙ্গায়। হুমড়ি খেয়ে পড়ল সবাই। সেই বৃদ্ধ হাত দিয়ে টেনে বের করলেন- পাখিটির গলার নিচে লুকানো বিশ্রী থলেটা! (হ্যাঁ, হাড়গিলারা এই থলে ইচ্ছে মতন বের করতে পারে। ভেতরে টেনেও নিতে পারে)। তখন শিকারি ঘৃণায় ফেলে দিল ওটাকে জলে। হ্যাঁ, এদের এই হাড্ডিগুড্ডি তথা মরা প্রাণী খাওয়ার কারণে শিকারিরা মারত না বা মাংস খেত না। তবে, মুচি সম্প্রদায়ের লোকেরা খেত।

পাখিটিকে আমি সাকুল্যে ১১ বার দেখেছি গেল ৫০ বছরের জীবনে।

হাড়গিলার ইংরেজী নাম এৎবধঃবৎ অফলঁঃধহঃ যার বৈজ্ঞানিক নাম খবঢ়ঃড়ঢ়ঃরষড়ং ফঁনরঁং. মাপ সর্বোচ্চ ১৫০ সেমি। এদের মাথার টাকটা গোলাপী। ঠোঁট হলুদাভ-ধূসর, গলা হলুদাভ-লালচে, পা হালকা লালচে, বুক-পেট তুলোট সাদা। ঘাড়ের কাছে যেন একগুচ্ছ সাদা কার্পাস তুলো গোঁজা, পিঠ কালচে-বাদামী। পাখিটির উচ্চতাÑদাঁড়ানো অবস্থায় মাথার চাঁদি থেকে পায়ের তলায় মাটি পর্যন্ত ওই ১২০-১৫০ সেমি পর্যন্ত।

মূল খাদ্য এদের ব্যাঙ-সাপের বাচ্চা, ছোট ছোট পাখিদের ডিম-ছানা, আপেল শামুকের মোয়ার মতো লাগানো সাদা রঙের ডিম, মাছ, পোকা-পতঙ্গ-অঞ্জন-গিরগিটি-চিলুসাপ ইত্যাদি। তবে, গরু-মোষ-ছাগলের ‘মড়ি’ পেলে এরা শকুনদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খায় (বলা ভাল যে খেত। এখন শকুন-হাড়গিলা কোনটিই বাংলাদেশে দেখা যায় না। বলতে গেলে, কারণ অজানা!)। শকুনেরা এদেরকে স্বজাতি বা বন্ধুই মনে করত। শুকনো-জলাভূমি-সর্বোত্রই ছিল এদের চলাফেরা। ঠোঁট দিয়ে মাটি খুঁড়ে ইঁদুর ও মাটিতে গর্ত করে বাসা বানানো সুঁইচোরা পাখিদের ডিম-ছানাও খেত।

৫০ বছর আগে ২/১টার দেখা মিললেও এখন এদের খবর মেলে না। এদের এই, বেখবর হওয়ার পেছনে কিন্তু বন্দুক শিকারিদের হাত নেই।

মদনটাক : এটিকে দেখলে হাড়গিলার আপন ছোট ভাই মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। শরীরের গড়ন-ধরন ও ঠোঁট, হাঁটা চলা ও ওড়ার ভঙ্গি প্রায় একই রকম। হলুদ গলা। কালো পিঠ। তাতে লালচে আভা জড়ানো থাকে। পা গোলাপী। বুক-পেট সাদা।

মদনটাকের ইংরেজী নাম খবংংবৎ অফলঁঃধহঃ. যার বৈজ্ঞানিক নাম খবঢ়ঃড়রষড়ং ঔধাধহরপঁং মাপ সর্বোচ্চ ১২০ সেমি। উচ্চতাও একই।

৫০ বছর আগে অল্প সংখ্যায় হলেও সারাদেশে ছিল। হাড়গিলার মতো এরাও আমাদের আবাসিক পাখি। হাড়গিলা তো দেশান্তরী পাখি। মদনটাক কোণঠাসা হয়ে পড়েছে সুন্দরবনে। হেমন্ত শীতে আজো সুন্দরবন থেকে বৃহত্তর খুলনা জেলার বিল-হাওড়-মাঠে ক্বচিৎ ২/১টি এলেও বাঁচতে পারে না। গুলি খায় উত্তরের হাওর পারের মূলঘর গ্রামের এক ভদ্রলোক হাওরের ফাঁদে পড়া একটি পাখিকে এনে গোয়ালঘরে মশারিবন্দী করে পুষেছিলেন কিছুকাল (২০০৭) , তারপরে ছেড়ে দিয়েছিলেন।

এদের খাবার তালিকা ও চারণক্ষেত্রে হাড়গিলাদের মতো। তবে, এরা ‘মড়া’ খায় না। ২০১১ সালে মোরেলগঞ্জের একটা বিলে একজোড়া পাখি শিকার করেছিলেন এক বন্দুক শিকারি। উত্তরের হাওরে আজো হঠাৎ হঠাৎ দেখা মেলে। থাকতে কী পারে! বন্দুকের নলের ভয়ে পালাতে হয়। না হয় রানীঘরের হাঁড়িতে চড়তে হয়। (চলবে)

প্রকাশিত : ১২ জুলাই ২০১৫

১২/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ:
রোহিঙ্গা সমস্যার সৃষ্টি মিয়ানমারের ॥ সমাধান ওদের হাতে || বাবার ফেরার অপেক্ষায় পিতৃহারা অবোধ রোহিঙ্গা শিশুরা || বছরে রফতানি আয় বাড়ছে ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলার || চালের বাজারে স্বস্তি প্রতিদিন দাম কমছে || বিদ্যুতের পাইকারি দর ১১.৭৮ ভাগ বৃদ্ধির সুপারিশ || মিয়ানমারে গণহত্যা বন্ধ নির্ভর করছে নিরাপত্তা পরিষদের ওপর || রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বাস্থ্য সেবায় ২৫ কোটি ডলার চেয়েছে বাংলাদেশ || আরও মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক || অপকৌশলে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা, বিপুল অর্থ আদায় || জেলে মাদক ও মোবাইল ফোন ব্যবহার ॥ সারাদেশে দুই শতাধিক কারারক্ষী গোয়েন্দা নজরদারিতে ||