২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

নদীর মতো


সবার বেলায় নয়; মাঝে মাঝে আমার ক্ষেত্রে এ রকমটা ঘটে।

সবকিছু ওলটপালট কিংবা গুবলেট হয়ে যাওয়া যারে কয়, সেরকম কিছু একটা।

অন্যকে মনে হয় আমি আর আমি নিজে হয়ে যাই অন্য।

সুনীল পড়তে গিয়ে আমার এ রকমই হলো। মাইজগাঁওর যে কাজলদিঘিটা ও ফেলে গিয়েছিল শৈশবে, ওটা তো আমিও চিনি। দুই পাড়জুড়ে ঘন গাছের সারি আর পাখির কলকাকলি আমিও তো কোথায় যেন রেখে এসেছি। ওর প্রথম আলো, সেই সময়, পূর্ব-পশ্চিম পড়তে পড়তে সত্যি বলছি আমি সুনীল হয়ে গেছি; হয়ে পড়ি মাঝে মধ্যে!

জুবায়ের আমার লন্ডনপ্রবাসী বন্ধু; ঢাকায় এসে কিছুদিন আমার সঙ্গে ফ্ল্যাটে থেকে গেছে। এখান থেকেই যে কদিন ছিল সে ঘুরে দেখেছে পুরো বাংলাদেশ।

সব শুনে ও বলল, ‘সুনীলের মতো তুইও তো ছিন্নমূল এক মানুষ। আমিও তাই।’

‘কী রকম? ’

‘তুই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাড়িটা বিক্রি করে ঢাকায় দামি ফ্ল্যাট কিনে বসবাস করছিস। তোর মনে তো নির্জন-নিরিবিলি সেই মফস্বল শহরটা ঠিকই রয়ে গেছে।’

‘তুই?’

‘আমিও তো নোয়াখালীর সেই বজরা গ্রামের বাড়িটা জলের দরে বেচে দিয়ে চলে গেছি সুদূর লন্ডনের টেমস নদীর পাড়ে। বজরা গ্রামটা কি আমাকে টানে না ভাবিস বন্ধু?’

‘সুনীলের সাথে আমাদের তফাৎ নেই কিছু?’

জুবায়ের লন্ডনে অর্থনীতির খটমটে সব তত্ত্ব পড়িয়ে থাকে একটা স্কুলে। ওর ভাবনার মুদ্রাগুলো আগে চেনা গেলেও এখন এগুলো প্রায় বিদেশীদের মতোই।

একটু পর জুবায়ের বলল,‘দোস্ত, সুনীল বাধ্য হয়েছেন এদেশ ছেড়ে চলে যেতে। রাজনীতিবিদদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কারণে তাদের রিফিউজি হয়ে নিদারুণ জীবন বেছে নিতে হয়েছে। আর আমরা ভাল থাকার জন্যে দেশান্তরী হয়েছি। আমাদের বেলায় আমাদের উচ্চাশাটাই নিয়ামক হয়ে কাজ চালিয়ে গেছে। কিন্তু আবেগের জায়গাটা প্রায় এক রকম। আমরা তিনজনই পুরনো দিনের কথা ভেবে কষ্ট পাই। নষ্টালজিয়ার আঁচড় দেখো আমাদের তিনজনেরই অন্তর বয়ে বেড়াচ্ছে। ও লেখক, আমরা পাঠক।’

এরপর সুনীলকে নিয়ে জুবায়েরের সঙ্গে আর কথা হয়নি। সাত-আট বছর হলো ও আর ঢাকায় আসে না। এর মাঝে ওর মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। জামাতা তামিল ব্যবসায়ী। ভালোবাসার টানে মেয়েটা আপ্রাণ চেষ্টা করছে ওদের সবকিছু আয়ত্তে নিয়ে আসতে। মাঝে মাঝে অতসী বাবার কাছে বেড়াতে এলে তামিল ভাষা আর সংস্কৃতির অত্যাচার সইতে হয় জুবায়ের আর ওর স্ত্রীকে, হাসিমুখে। ছেলেটা ডক্টরেট করবার পর এক সিলেটের মেয়ের সঙ্গে লগ্ন হয়ে থেকেছে কদিন। কালে-কালে সেটি আর টেকেনি। ছেলে বুবাই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে ভেকান্ট হয়ে।

এসব সে আমাকে জানায় ই-মেইলে। আমি জানাই আমার কথা। আমার কথা তো আটকে থাকে মেয়ে, মেয়েজামাই আর একমাত্র নাতির গল্পে। মেয়ে আর মেয়েজামাই আমার ডাক্তার। পাঁচ বছরের নাতিটা আমাদের কোলেকাঁখে বেড়ে উঠছে। গল্প বলতে আমি-সুমাইয়ার জীবনে এখন এই নাতি। যা কিছু আমাদের আমোদ, আহ্লাদ আর আনন্দ সব তন্ময়কে ঘিরে।

জুবায়ের জিজ্ঞাসা করে, ‘তোর চাকরি কেমন চলছে? বাড়িটা কমপ্লিট হলো? কী বই পড়ছিস? ব্যাংকের কেরানি হয়েও তোর বই পড়বার নেশটা কাটল না। ঠিক রয়ে গেলি আগের মতো।’

এসব কথায় আমার এখন আর তেমন কিছু হয় না। কারণ, আমি বুঝে গেছি মানুষ আসলে খুব একটা বদলায় না। প্রথম ষোল-সতেরো বছরের ভেতর ও যা করে এর রকম-সকম বদল হলেও মূল মানুষটা ঠিক ওই রকমই থাকে। আমি বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র হয়েও সারাজীবন প্রেমে পড়ে রয়েছি সাহিত্যের। সুনীল বলতে আমি পাগল। ও যা বলে তা-ই ভাবি নিজের; মানুষটা এমন সেঁধিয়ে গেছে আমার ভেতর যে কোথাও ওর কথা শুরু হলে মনে হয় লোকজন বুঝি আমাকে নিয়েই গল্প বলছে। খুব আপ্লুত বোধ করি। এক অপূর্ব আবেশের ভেতর আমি নিজেকে আবিষ্কার করি। এমনি গভীর ও গহীনভাবে তার বসবাস আমার ভেতর। আমি অস্বীকার করি কী করে?

যে অব্দি মাইজগাওর সেই কাজলদিঘিটা ওর কল্পনার রং দিয়ে মেশানো ছিল আমি খুব উপভোগ করতাম। কাকচক্ষু জলের সেই দিঘিটাকে ঠিক আমিও খুঁজে পেতাম। এ রকম অবিনশ্বর স্মৃতি তো কতই থেকে যায় আমাদের ভেতর। হারানো বাড়ির আঙিনায় বেড়ে ওঠা ডালিম বা তুলসীতলা নিয়ে কতজনের কত রকমের অবসেশন; আমার বন্ধু লন্ডনপ্রবাসী জুবায়ের তো বজরা গ্রামের একটা কিশোরী মেয়েকে ওর এখনও, এক-দুপেগ পেটে পড়লে, ঠিক খুঁজে পায়।

‘ওর গায়ের রং ছিল কষ্টিপাথরের মতো। কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি। পৌষের বিকেলবেলায় মেয়েটা ওদের বাড়ির সামনে কাঁঠালগাছ তলায় এসে রোদ পোহাত। ওই সময়টায় আমি ইচ্ছে করে ওই পথ অতিক্রম করতাম ওকে এক ঝলক দেখব বলে। আহা! চোখের তীর কাকে বলে! সেই এলোকেশীর চোখের তীর বিশ্বাস করো বন্ধু আমি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি।’

জুবায়েরের হাই-পাওয়ার চশমা ভেদ করে ও চলে যাচ্ছে ওর কৈশোরে। পৃথিবীর তিন ভাগের প্রায় দুই ভাগ ঘুরে নিয়েছে জুবায়ের। তবু সে ভুলতে পারে না তাকে, যে লুকিয়ে রয়েছে ওর বজরা গ্রামের কোন এক ভাঙা বাড়ির কোণায়।

‘তুই খুঁজিসনি ?’

‘কী বলিস? তন্ন-তন্ন করেছি সবকিছু ওর জন্যে।’

‘পেলি কিছু?’

‘জেনেছি। বিয়ের পর ও লন্ডনেই আছে। আমি ঠিকই খুঁজে নেব। দেখিস।’

এ বয়সে এসেও জুবায়েরের ভেতর যেরকম আত্মবিশ্বাসের চমক লক্ষ করেছি তা রীতিমতো বিস্ময়কর। আমি আশা করছি সে একদিন বজরা গ্রামের হারিয়ে যাওয়া সেই কৃষ্ণকলিকে টেমস নদীর তীরে খুঁজে পাবে।

সুনীলও একদিন ওর বন্ধুদের বলেছিল, ‘ওই দিঘিটা খুব টানে আমায়। জলের লতা-গুল্ম আর রূপালি পাখনার মাছগুলো স্বপ্নের মতো হানা দেয় আমার ভেতর। সেই দীঘল তালগাছটা, ধনুকের মতো বাঁকানো সুপারি গাছের সারি সব মনে আছে। আহ! একটিবার যদি ফের সেখানে বসে নীরবে জীবন নামের অসম্পূর্ণ আবেগের জাবর কাটতে পারতাম। কোলকাতার কফিহাউজ, বসন্তকেবিন সব ফিঁকে হয়ে গেলে তো ওই কাজলদিঘিটাই ভরসা আমার।’

সুনীলের ঘরের টেলিফোনটা বেজে উঠল গভীর রাতে। ওর বউ স্বাতী ধরল সেটি, ‘হ্যালো?’

‘আমি রাজ্জাক। সুনীলদাকে দেয়া যাবে ফোনটা?’

স্বাতীর ভুরুজোড়ায় বিরক্তি; এত রাতে রাজ্জাক হয়ে কে বিড়ম্বনা শুরু করল।

‘এই রাজ্জাক বলে কাউকে চেন?’

‘রাজ্জাক? কে?’ ঘুমঘুম চোখে প্রশ্ন ভেসে উঠল সুনীলের।

‘কে?’ প্রশ্নের ভেতর প্রচ্ছন্ন হয়ে রইল একরাশ চরম অবজ্ঞা। কিছু একটা কঠিন কথাও হয়তোবা বের হয়ে আসতে পারে ওর থেকে। সেরকম সম্ভাবনাই ওর সমস্ত মুখাবয়বের কুঞ্চনসমগ্রের ভেতর।

‘দাদা? আমি মাদারিপুরের মাইজগাঁওর লোক। চিনছেন? বিদেশে থাকি। আমিই আপনারে কাজলদিঘিটা দেখামু। হাছা কইতাছি।’

সুনীলের চোখেমুখে এক অপার্থিব আনন্দের ছোঁয়া। ওর স্বপ্নের ভেতর ঘোরাফেরা করা ওই দিঘিটার কথা এই রাজ্জাক নামের ছেলেটা জানল কী করে? ও কি আসলে দেবদূত?

দিঘিটা কলকল করে ওর বোধের গভীরে বইতে থাকে। এর গভীর কালো জলে পা ডুবিয়ে মেঘলা আকাশ দেখার জন্যে সুনীলের ভেতরকার শিশুটা কঁকিয়ে ওঠে, ‘আমি যাবো। আমি যাবো।’

লন্ডন থেকে জুবায়ের রিং করল আমাকে, ‘হঠাৎ নীরার জন্যে ছায়াছবিটা দেখেছিস? তোর সুনীলের গল্প। মজা পাবি।’

আমি কিঞ্চিৎ চমকালাম। জুবায়ের আমার সেই বন্ধু যে সাহিত্য-সংস্কৃতির পরতে পরতে বাস করলেও কখনো এর আঁচ ওকে স্পর্শ করে নি। উদাসীন অথচ ক্ষুরধার এক অনুভব নিয়ে ওকে দেখেছি এগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে। নিয়মিত ডুবছে-ভাসছে আবেগের ভেতর; কিন্তু পাঁকাল মাছের মতো এতটুকু আবেগের কাদা ওর গায়ে লাগতে দিচ্ছে না। এমনি বৈষয়িক প্রেমিক সে। তার কাছ থেকে সিনেমার কথা শুনলে তো কিঞ্চিৎ হতবাক হতেই হয়।

‘তুই দেখলি ছবিটা ?’

‘ছবিটা তো আমাকেই নিয়ে দোস্ত ?’ বলে হোঃ হোঃ করে হেসে উঠল জুবায়ের।

আমি কথা না বাড়িয়ে সিডি আনিয়ে দেখে নিলাম ছবিটা। দেখে-টেখে বেশ মাস্তিভরা মন নিয়ে জুবায়েরকে ধরলাম ইন্টারনেটের আলাপচারিতায়।

‘কী, কলির কথা মনে হলো?’

‘দ্যাখ, কলেজ-জীবনে ছেলেটার একটা মোহ ছিল মেয়েটার প্রতি। প্রেম হতে পারত, দোস্তিতে আটকে রইল। পরে যে মেয়েটাকে বিয়ে করবে বলে ছেলেটা এগিয়ে এল সে আর এগোতে পারছে না। কেবলি মনে হচ্ছে ওর কলেজ জীবনের সেই নবীনার কথা। যাকে সে পেতে পারত শরীর দিয়ে, পায়নি। ’

‘অন্তর্দাহ।’ আমি বললাম।

‘অন্তর তো কথা কয় শরীর সম্বল করে। এটা শরীরের দহন, যা অন্তরকে একসময় পঙ্গু করে দেয়।’ জুবায়ের দার্শনিকের মতো মন্তব্য ঝাড়ে।

‘গল্পটার শেষটা বড় চমৎকার।’ আমি বললাম।

‘হ্যাঁ। ছেলেটা শরীর আর মনের অবদমন থেকে তখনি মুক্তি পেল যখন কলেজ জীবনের নারীটির সঙ্গে মিলিত হবার সুযোগ এল। বিশেষ এক নারীর প্রতি ওর যে জৈবিক অবসেশন গড়ে উঠেছিল যৌবনে তা থেকে ছেলেটা বেরিয়ে গেল এবং নিজের গার্ল-ফ্রেন্ডের সঙ্গে আচরণের স্বাভাবিকতা ফিরে পেল। গুড। ভেরি গুড।’ নির্মোহ গলায় জুবায়ের মন্তব্য

করল।

‘কলির সঙ্গে মিলল?’

‘ওর সঙ্গে দেখাই তো হয়নি; মোহমুক্তি তো অনেক পরের কথা। হাঃ হাঃ হাঃ।’

আমি জানি এই অট্টহাসির ভেতর জুবায়ের কলিকে উড়িয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু যা সে সেই বলক-তোলা কৈশোর-সময় থেকে বহন করে চলেছে তা কীভাবে সে অস্বীকার করবে? তাহলে তো নিজের সঙ্গে প্রতারণা হয়ে যায়, লন্ডন প্রবাসী নিপাট ভদ্রলোকের পক্ষে তা কি কোনোদিন সম্ভব?

আমি সুনীলের একটা বই পড়ছি। অর্ধেক জীবন। পুরো জীবনের কথা কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়; তাই হয়তো এই শিরোনাম।

বইটা পড়তে গিয়ে একটা গল্পের কথা মনে পড়ে গেল।

‘জুবায়ের?’

‘হ্যা। বল।’

‘সুনীলের খরা গল্পটা খুব টানছে আজ। কলেজে থাকতে পড়েছিলাম। গল্পটার কুশীলবের সঙ্গে একেবারে মিশে গিয়েছিলাম আমি। গল্পটার শুরু থেকে যে লোকটাকে আমার রীতিমতো ভালগার বলে মনে হচ্ছিল, মদ-মেয়েমানুষ ছাড়া যাকে ভাবা যাচ্ছে না, শেষে এসে সেই মানুষটাই বাংলোর ইঁদারা থেকে জল তুলে খরাপীড়িত নারীদের মাঝে দিতে শুরু করে। মানব চরিত্রের ওঠা-নামার এরকম সূক্ষ্ম চিত্রটা এখনো আমার মগজে এক ধরনের মহান আবেশ হয়ে বেঁচে আছে। বিশ্বাস কর, মাঝে মাঝে নিজেকেই লাহিড়ী বলে মনে হয়।’

‘আবার দ্যাখ, নীরা ভাল নেই বলে পুরো কলকাতা পুড়ছে। বাস-ট্রাম সব। মনটা যে কিরকম উদাস হয়ে যায়। উফ!’ জুবায়েরের মতো অর্থনীতির ছাত্রের মুখের ভাষা এ রকম আবেগঘন হওয়ায় আমার সামান্য খটকা লাগল।

‘খুব আবেগ ফলাচ্ছিস? কলির দেখা পেলি?’

‘খুঁজছি। পেলে সবার আগে তোকেই খবরটা দেবো। দেখিস।’

‘অপেক্ষায় রইলাম।’

আমরা যখন এ রকম কথাবার্তা বলছি তখনি একখানা ফ্রেন্ড-রিকোয়েস্ট পেলাম ফেইসবুকে। নামটা বেশ। অথৈ অনন্ত। এরকম কতই অুনরোধ জমা হয় প্রতিদিন। গা করলাম না।

দুদিন পর ছুটির দিনে ফেইসবুক খুলে বসতেই চ্যাটবক্সে একটি বাক্য ভেসে উঠল,‘ চিনতে পারছিস?’

‘কে?’

‘আমি অনন্ত দাশ। তোর ছোটবেলার বন্ধু। মনে পড়ে?’

সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরে থাকা সুনীলকে বলে উঠলাম, ‘এও একটা কাজলদিঘি। আমার কৈশোরের বন্ধু। বন্ধুত্ব আর কাজলদিঘির জলের ভেতর তফাত কী?’

আমি অনন্তর করা প্রশ্নটার উত্তর দিতে পারলাম না। চট করে আমার কী মনে হলো, আমি ফেইসবুক থেকে বেরিয়ে এলাম। বন্ধ করে দিলাম আমার ল্যাপটপ। একটু পর আমি আমার বিছানায় চোখ বুজে শুয়ে ফিরে যেতে চাইলাম কাজলদিঘিটার পাড়ে।

‘মৌমাছি হইবি শিমুল?’ কিশোর অনন্তর অদ্ভুত প্রশ্ন।

‘মানুষ কোনদিন মৌমাছি হতে পারে?’

‘অত শুদ্দ কতা কইবি না। তরে জলে ফালাইয়া দিতে ইচ্ছা করে। চল আমার লগে।’

আমরা তিতাসের পাড় ঘেঁষে একটা ঘন আড়া-জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়লাম। একটা করবি ফুলের গাছের নিচে এসে ও বলল,‘গাছে উঠতে পারছ তো ? নাকি হিডাও পারছ না ?’

আমার বাবা এলাকার গণ্যমান্য একজন উকিল। আমাকে তিনি লেখাপড়া ছাড়া অন্য কোনো কাজে কখনোই সম্পৃক্ত করেননি। এজন্য আমাদের এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষকের ছেলে দুরন্ত অনন্তের দৃষ্টিতে আমি এক হাবাগোবা বালক। ও আমার মতো ভাল ছাত্র না হলেও ওর মতো সাহসী ও এ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় আকর্ষণীয় ছেলে আর দুটি নেই আমাদের ক্লাসে। ওর সঙ্গ আমার ভীষণ ভাল লাগত। ও যা বলত তা মনে হতো অদ্ভুত।

আমি তরতর করে গাছের ডগায় উঠে পড়লাম। এবার ও নির্দেশ দিল, ‘একটা করবি ফুল ছিঁইড়া ল। নিছস? এইবার পিছের ডাটাটা ছিঁইড়া মুখ দিয়ে শুইষা ল। কী, মধুর মতো লাগে না ? ’

‘হা।’

অনন্ত বড় মানুষের মতো হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল। এরপর যে কত করবি ফুলের মধু শুষে খেয়েছি!

এ ছিল এক অদ্ভুত আনন্দÑ মৌমাছি হওয়া।

একদিন বিকেলবেলায় অনন্ত আমাকে নিয়ে নদী পাড়ি দিয়ে চলে এল কাশীপুর গ্রামে। দিগন্তের দিকে চোখ রেখে বলে উঠল, ‘দেখছস আকাশ কত বড়।’

একদিন একটা মালগাড়িতে করে আমরা ভর দুপুরবেলায় চলে এলাম শিঙ্গারবিল এলাকায়। নির্জন এক কাঁঠালবাগানের ভেতর ঢুকে গাছে ঝুলে থাকা কাঁঠালগুলোকে আদর করতে লাগল অনন্ত। আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘এরা গাছের পোলা-মাইয়া। হেগো আদর করলে হেরা খুব খুশি অয়। আদর কর না?’

‘তুই ক্যামনে বুজলি গাছেরা খুশি অয়?’

‘এরা খুশি অইলে ঠা-া-ঠা-া শ্বাস ফেলায়, এই গরমের ভিতরে তোর শরীলডা এক্কেরে হিম অইয়া যাইব। দ্যাখ না। ’

এরকম যে কত অদ্ভুত খেলা ও জানত। রাস্তা থেকে একটা ছাগল টেনে এনে কোলে বসিয়ে এর মাথায় একটা কচুপাতা দিয়ে বলত,‘দেখবি, ওইটা আর মাথা তুলত না। খালি গুমাইব। ’

সে সারাদিন মগ্ন থাকত এ রকম অজস্র বানানো আনন্দ-বিনোদনে। একবার সবাইকে চমকে দেবার জন্য পুকুরের তলা থেকে ডুব দিয়ে বালি তুলতে গিয়ে একটা নির্বিষ সাপ তুলে নিয়ে এল হাতে করে। সে দৃশ্য দেখে ভয়ে-শঙ্কায় ডাঙায় দাঁড়ানো আমাদের সে কী চেঁচামেচি। কিন্তু ও এতটুকু ভয় পায়নি; মনে হলো হাতে একটা শাপলার ডাঁটা। টের পেতেই ছুড়ে ফেলে দিল দূরে।

একবার একটা উঁচু আমগাছ থেকে একটা কাকের ছানা মাটিতে পড়ে ডানা ঝাঁপটাতে লাগল। কাকেরা সব একত্র হয়ে ছানাটার উপর উড়ে উড়ে কা-কা করতে থাকে। কেউ সেদিকে ভিড়ছে না কাকের ঠোকর খাবে বলে। কেবল অনন্ত ছানাটিকে হাতে নিয়ে আমগাছের মগডালে চড়ে ওর বাসায় রেখে এল। উড়ন্ত হিংস্র কতগুলো কাকের ঠোকর খেল বেশ কটা। তবু সে কাজটা করে এল।

ঘন বর্ষায় স্কুল থেকে ফেরার সময় ও একদিন আমাকে নিয়ে ভিজল। তুমুল বৃষ্টির ভেতর কাকভেজা হচ্ছি আমরা দুজন। অনন্ত লাফাচ্ছে। চেঁচাচ্ছে গলা খুলে। মাঝেমাঝে হা করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টিবিন্দুগুলো গেলার চেষ্টা করছে; কখনো হাতের মুঠোয় সেগুলো ধরবার চেষ্টা করছে। আমার দিকে তাকিয়ে প্রচ- উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে বলে উঠছে, ‘ভগবান তানপুরা বাজাইতাছে আইজ। শোন বন্ধু।

সেই বন্ধুটাকে খুঁজে পেলাম ফেইসবুকে, সম্বিৎ ফিরে পেতে একটুখানি তো সময় লাগবেই।

ফের ফেইসবুকে অনন্তকে ধরলাম, ‘বন্ধু তুমি কোথায়?’

‘আমি ঢাকায় একটা হোটেলে রয়েছি। তুমি চলে আস প্লিজ।

অনন্ত দাশ এখন ঢাকায়? ওরা বাড়িঘর বিক্রি করে যখন নিরুদ্দেশে যাত্রা করে তখন আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী।

পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধপরবর্তী সময়। হিন্দু মানেই ভারতের চর; আমাদের শত্রু। এদেশে বসবাসের কোনো অধিকার এদের নেই। এরকমই এক মানসিকতা সবার অন্তরজুড়ে। সেই সময়টায় অনন্তর চলে যাওয়াটা যে কিরকম কাঁদিয়েছিল আমায় তা এখনো উল্কি-কাটা স্মৃতি হয়ে আমার অন্তরে বেঁচে আছে। ও রকম নিঃস্বার্থ বয়স ছাড়া সম্ভবত আর কোনো কালেই মানুষ শত্রুর জন্যে এভাবে কাঁদতে পারে না। ওদের বাড়িটার সামনে দিয়ে আমার রোজ বাজারে যেতে হতো। চোখ পড়ে গেলেই বুকটা হু-হু করে উঠত। মনে হতো বাড়ির সামনে বড় পেয়ারা গাছটায় দু-পা দুলিয়ে বসে আছে সে; আমাকে চোখে পড়তেই বলে উঠছে, ‘গয়াম খাইবি শিমুল? পাকনা গয়াম। নে।’ বলে ছুড়ে দিত আমার দিকে।

আমি লুফে নিতাম সেই পেয়ারা। হাত ফস্কে গেলে সে বলে উঠত, ‘তুই একটা গাধা। একটা গয়াম লুফতে পারছ না?’

একই রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে কত যে ভাবের বশে হাত উঠে গেছে শূন্যে। আহ! যদি পেয়ারাটা হাত ফস্কে রাস্তায় পড়ে?

সেই হারানো বন্ধুটা ঢাকায়; আমি কি না গিয়ে পারি?

আমি যখন বেরোচ্ছি তখন জুবায়ের ডেকে উঠল সেল ফোনে।

হ্যালো বলাটা ওর এমনি প্রাণবন্ত ও আন্তরিক যে মন ভরে যায় নিমিষে।

আমি বললাম, ‘কী খবর দোস্ত।’

‘খুব খারাপ খবর।’ জুবায়েরর কণ্ঠস্বর চিমসানো, যা সচরাচর ওর বেলায় হয় না। কারণ জুবায়ের বরারবই বন্ধুবৎসল ও উষ্ণ।

আমার মাথায় নানারকমের বাজে চিন্তা ওড়াওড়ি করতে শুরু করে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতর অনেক নেগেটিভ সম্ভাবনা আমাকে ম্রিয়মাণ করে রাখে।

‘কী ব্যাপার ?’

‘কলির সঙ্গে দেখা হলো।’ মনে হলো জুবায়ের একটা দীর্ঘশ্বাস চাপল।

‘কি কইলি? কলির দেখা পেলি তুই? এভাবে বলছিস কেন? তোর তো চীৎকার করে আমাকে জানানোর কথা। হে আল্লাহ্, তোমার পৃথিবীতে এমন ম্যাজিকও ঘটে? অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য, অচিন্ত্যনীয়।’ ভাবের বিস্ফোরণ ঘটাতে গিয়ে যা-যা করা ও বলা দরকার, আমার ঝুলি উগড়ে সব ঝেড়ে দিলাম। তবু মনে হচ্ছে অকিঞ্চিৎকর; বন্ধুর সাফল্য যেন আমার ভেতরকার কাঙাল সুনীলটাকে মাতাল করে দেয়; সমস্ত না-পাওয়ার যন্ত্রণা আর অবদমিত আবেগ একসঙ্গে একই সুরে কথা কয়ে ওঠে। হিপ-হিপ হুররে!

আমি তুমুল এক আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করি জুবায়েরের পরবর্তী কথার।

‘না দেখা হলেই ভালো ছিল দোস্ত। না দেখা হওয়াটাই ভালো ছিল।’ খুব মুহ্যমান সেই কণ্ঠস্বর। কোনো ট্র্যাজেডি ফিল্ম দেখার পর যে মানসিক অবস্থা দাঁড়ায় ওর কণ্ঠ সেকথাই বলছে।

‘মানে?’

‘বুঝে নে। আমি কোন মধ্যবয়েসী নারীর আজেবাজে বর্ণনা দিতে চাই না।’ বলেই লাইনটা কেটে দিল ও।

আমি হ্যালো-হ্যালো করে ওকে অনন্তর কথা বলতে চাইলাম। এর আগেই লাইনটা কেটে দেয়ায় আমি কিছুক্ষণ সেলটার দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম। তারপর হোঁচট খাওয়া কোনো পথচারীর মতো ফের আনন্দ-ভরা মন নিয়ে এগিয়ে গেলাম আমার কৈশোরের বন্ধু অনন্তকে ফিরে পেতে।

ফেইসবুকে এরই ভেতর ওর ছবি ও বায়োডাটা দেখে নিয়েছি। ছবি দেখে ঠিক চেনা দায় এটা আমাদের অনন্ত। আমি কেবল ওর হাসিটা দেখে বুঝতে পারলাম। শরীর বেড়েছে, অভ্যেসও নিশ্চয়ই বদলে গেছে। সেই চেনা মানুষটাকে নিশ্চয়ই আমি আর এখন খুঁজে পাব না। কলিকে খুঁজে পাওয়ার মতোই হয়তো আমাকেও জুবায়েরের মতো বলতে হবে, দেখাটা না হলেই বরং ভালো ছিল। সেই এলোকেশী কৃষ্ণকলি তো এখন আর নেই। সে এখন মধ্যবয়সী পৃথুলা গড়নের অনাকর্ষণীয় নারীর ছবি।

মাথায় এসব বহন করেই আমি অনন্তর হোটেল-রুমে ঢুকে পড়লাম। এসি ছেড়ে শুধু একটা জাঙিয়া পরে কম্বলের তলায় শুয়ে রয়েছে ও। আমাকে দেখে এক ঝটকায় সবকিছু উপড়ে ফেলে উড়ে এল।

‘হ্যারে ব্রাহ্মণবাড়িয়াটা কি আগের মতোই আছে?’

‘প্রচুর বাড়ি-ঘর হয়েছে। তোরা যখন ছেড়ে গেছিস তখন দোতলা বাড়ি ছিল একটা দেখার বিষয়। এখন কেউ পাঁচতলার কম বাড়ি বানায় না। মেডিক্যাল কলেজ পর্যন্ত আছে। সব পাবি, শহরে এক ইঞ্চি জায়গা খালি পাবি না। এক গন্ডা জায়গার দাম এক কোটি টাকা। তোদের বাড়িটাও এখন পাঁচতলা।’ গলগল করে ওকে বলে দিলাম সবকথা। ওদের শহর ছেড়ে দেয়াটা যে ভুল একটা সিদ্ধান্ত ছিল সেটা বুঝাতেই আমি এভাবে বললাম।

একটু পর বললাম, ‘তোরা কেমন আছিস?’

‘বাচ্চাদের খেলনার একটা কারখানা গড়ে ছতলা একটা বাড়ি করেছি কোলকাতার লেকটাউনে। একটাই মেয়ে; ও সরকারি কর্মকর্তা। ইঞ্জিনিয়ার জামাইর সঙ্গে থাকে বেঙ্গালুরুতে। আমার বউ তো টিচার। ওখানকার মেয়ে।’

আমি থ হয়ে ওর সব কথা শুনলাম। কেন যেন এরকম গল্প আমি শুনতে চাইনি। মনে হচ্ছিল ও আমাকে একটা দুঃখের গল্প শোনাবে, যা শুনে আমার ভেতর করুণাবোধের উদ্রেক হবে। ফেরার পথে সান্ত¡না দিয়ে হয়তো বলে উঠব, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাড়াটা তোদের ঠিক হয়নি। এখানে থাকলে এরকম হতো না। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি।’

সেটা বলতে পারলাম না বলে উশখুশ করতে লাগলাম। একটু পর মিনমিন করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এদ্দিন পর কী মনে করে এলি এদেশে?’

‘বারে, তোদের দেখতে ইচ্ছা করে না? এখন পড়ন্ত বয়স; বিদেশের মাটিতে অনেক যুদ্ধ করে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করলাম। এখন তো শেকড়ের কাছে আসতে ইচ্ছা করবেই। তাছাড়া ফেইসবুকে তোকে পেয়ে সেই ইচ্ছাটা খুব চাগিয়ে উঠল। বিশ্বাস কর।’ অনন্ত হাসল। হাসিটা কেন যেন মলিন মনে হলো এ সময়। হয়তো বোঝার ভুল।

‘প্রোগ্রাম কী?’

‘তোকে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাব। সময় দিতে পারবি তো ব্যাংকার সাহেব?’

আমি এতটুকু না ভেবে বলে উঠলাম, ‘বলিস কী? তুই মাতৃভূমি দেখতে এসেছিস আর আমি তেকে সঙ্গ দিতে পারব না? বাংলাদেশের লোকদের তোরা ভাবিস কী?’ মৃদু ধমকের সুর আমার গলায়।

একথা শুনে ও অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। আমার মনে হলো আমরা ফের আমাদের উচ্ছল কৈশোরে ফিরে গেছি।

তারপর তো হৈ-হৈ রৈ-রৈ ব্যাপার। তিন-চারদিনের এক উথাল-পাতাল সময় কাটানো। তিতাসের ওপারে গিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ভারতীয় রাম পান করা, যাত্রাপালা দেখে নৃত্যরতার দিকে টাকা ছুড়ে মারা থেকে শুরু করে গভীর রাতে শ্মশানে গিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ দেখা, নৌকায় তিতাসে ভেসে বেড়ানো আর সেই সঙ্গে কত হাজার গল্প যে আমরা করেছি নিজেদের ভেতর তা বলতে পারব না।

কৈশোর জীবনের এক কিশোরীর কথা মনে পড়ে গেল আমাদের। কী মনে করে অনন্ত হঠাৎ বলে উঠল, ‘চল্, খুঁজে বের করি মালবিকাকে। ’

‘এখন রাত আটটা। মফস্বল শহরের ঝাঁপি বন্ধ হয়ে যায় এ সময়।’

‘তবু চল।’

বেরিয়ে পড়লাম মালবিকার খোঁজে। মাইছপাড়ার যে পুকুরটার পাড় ঘেঁষে ওদের মনোরম বাড়িটি ছিল সেখানে এখন চারতলা। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ওদের পেলাম না। ঘোরাঘুরিটাই সার হলো।

হোটেলে ফিরে উদাত্ত গলায় অনন্ত বলে উঠল, ‘যা, মাফ করে দিলাম তোরে মালবিকা। যেখানেই থাকো, নাতিপুতি নিয়ে সুখে থাকো হে মালবিকা বুড়ি। আমেন।’

হো-হো করে হেসে উঠলাম আমি। চোখের সামনে দোমড়ানো-মুচড়ানো এক বুড়ির ছবি। আমার তালে তালে অনন্তও হাসছে। দুজনার মিলিত হাসির গমকে হোটেলঘরটা পুরো স্বর্গ হয়ে গেল। এত হাসি আর উচ্ছ্বাস লুকিয়েছিল আমাদের ভেতর? অনন্তর দেখা না পেলে হয়তো কোনোদিনই তা টের পেতাম না আমি।

ঢাকায় ফিরে মনে হয়েছে আমি পূর্ণ; আমরা আমাদের পুরো সত্তার সুষমা মেখে সময়কে বুড়ো আঙুল দেখাবার চেষ্টা করে গেছি সারাক্ষণ।

একসঙ্গে এতটা সময় কাটিয়েছি; কিন্তু এক সেকেন্ডের জন্যেও মনে হয়নি এই অনন্ত সেই অনন্ত নয়। ওর উচ্ছ্বাস দেখে আমি ঠিক বুঝতে পারছি মানুষ আসলে বদলায় না; বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সে নিজেকে লুকোবার কূট-কৌশলগুলো শিখে অন্যকে বিভ্রান্ত করে বেড়ায়। সময়-সুযোগ আর বিশ্বস্ত মানুষ পেলে সে ঠিক পুরনো অবয়ব ফিরে পায়। অনন্তর সঙ্গে আমার এই দু-তিনদিনের জমাট আড্ডা অনেকটা নিজেকে খুঁজে পাওয়ার মতো আনন্দময়। নইলে আমি বুঝতেই পারতাম না আমার ভেতরকার কাজলদিঘিটার কথা। হয়তো ভাবতাম, ওটা মরে গেছে; বয়সের খরায় সেটি শুকিয়ে গেছে!

এয়ারপোর্টে এসে অনন্তকে তুলে দেবার সময় জুবায়েরকে একটা রিং দিলাম,‘ জুবায়ের ?’

‘হ্যাঁ। বল।’

‘কাজলদিঘিটা আমি অবিকল সেরকমই পেয়েছি, বহুবছর আগে আমি উল্কি-কাটা স্মৃতি করে যেরকমটি রেখে দিয়েছিলাম সেরকমই ফিরে পেলাম।’ আবেগ ঝরে আমার কণ্ঠ থেকে। অনন্ত আমার পাশে দাঁড়ানো; ওর মুখে মিটিমিটি হাসি।

‘ভালো থাক। তোর আনন্দ দেখে খুব ভালো লাগছে আমার। অনন্তকে শুভেচ্ছা দিস।’

‘কথা বলবি?’ প্রশ্ন করলাম।

‘না।’ বলে ও সেলটা কেটে দিল। আমি ওর সংগোপন দুঃখটা বুঝতে পারছি। মনে মনে বেচারা বলে জুবায়েরের প্রতি কিঞ্চিৎ করুণারসে সিক্ত হতে চাইলাম। পরক্ষণে ভুরু কুঁচকে নিজের দিকে তাকালাম। উত্তর এল, ‘মানুষ আসলে এ রকমই। নিজের পাওনা পুরোটুকু পেয়ে গেলে নিজের মা-বাবাকেও আর মনে রাখতে চায় না।’ এ সময়টায় নিজেকে বড় স্বার্থপর বলে মনে হলো আমার।

অনন্ত এয়ারপোর্টের দরকারি কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত; বোঝা যায় নিয়মিত প্লেনে যাতায়াতের অভ্যেস রয়েছে ওর। ত্বরিত গতিতে নিজের কাজগুলো সেরে ফেলে অনন্ত এসে আমার সামনে দাঁড়াল। মলিন মুখ; চোখ দুটো ছলছল।

‘এবার বিদায় দাও বন্ধু। আমার আর কোন খেদ নেই মনে। ’

‘আমারও। বন্ধু, কবে দেখা হচ্ছে ফের?’

এ প্রশ্নে অনন্ত আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। হয়তো এ প্রশ্নের যুৎসই জবাব কী হবে তাই ভাবছে মনে মনে।

কিন্তু চমকে দিয়ে সহসা আমাকে জড়িয়ে ধরে ছেলেমানুষের মতো হু-হু করে কেঁদে উঠল অনন্ত। সব হারিয়ে গেলে মানুষ যেভাবে কাঁদে ওর কান্নার রকম ঠিক সেই। আমি হতচকিত, হতভম্ব।

‘কী হলো তোর বন্ধু? কোলকাতা-ঢাকা মাত্র এক ঘণ্টার রাস্তা। তুই এমন ভেঙে পড়ছিস ক্যান ? কী হলো?’ আমি ওর ভেতর আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি।

কিন্তু কিছুতেই ওর কান্না থামতে চাইছে না। ওর চশমা কান্নার ঝাপটায় ঘোলা দেখাচ্ছে; পোড়-খাওয়া তামাটে চেহারা বর্ষার মাটির মতো অশ্রু জলে থৈ-থৈ।

পাশ দিয়ে যারা যাচ্ছে সবাই তাকাচ্ছে ওর আর আমার দিকে। হয়তো পরস্পরের সম্পর্কটি মিলাতে পারছে না, সেজন্যে।

আমি ফের বলি, ‘এত ভেঙে পড়বার কী আছে? আমি তোকে দেখে আসব। কথা দিচ্ছি।’

‘আমি আর বাঁচব না রে বন্ধু। ব্লাড ক্যানসার আমার। ডাক্তার বলে দিয়েছে ছমাসের আয়ু রয়েছে আমার। চারমাস খরচ করে ফেলেছি। আমার শেষ সময়ের সবচেয়ে ভালো সময়টা আমি তোর সঙ্গে কাটিয়ে গেলাম। কোন ভুল করে থাকলে আমায় মাফ করে দিস দোস্ত। বিদায়।’ বলেই হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে অনন্ত। তারপর হনহন করে হেঁটে সুইংডোর ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল ও। আমার দিকে একবারও ফিরে তাকাল না আমারই বাল্যবন্ধু অনন্ত।

ভেতরকার সুনীল হু-হু করে উঠছে বারবার। চেঁচিয়ে বললাম, ‘এটা কী হলো সুনীলদা? এটা কী হলো দাদা?’ একটু আগের অনন্তর মতো হাউমাউ করে উঠলাম আমিও।

‘আমিও আমার কাজলদিঘিটা খুঁজে পাইনি রে। একটা হাজামজা ডোবা দেখেছিলাম সেখানে। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন। ওটা দেখতে না পেলেই বরং ভালো হতো। বিশ্বাস কর।’ সুনীলের কণ্ঠস্বর বাষ্পরুদ্ধ।

‘তুমিও?’

‘হ্যাঁ, আমিও।’

সুনীলদার কাছ থেকে উত্তরটা পেয়ে এই প্রথম আমি টের পাচ্ছি আমার দিকে বড় বড় দুটো চোখ মেলে অনন্ত তাকিয়ে রয়েছে; মুখাবয়বজুড়ে কান্না মেশানো হাসির ছটা।