২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

আবদুল আহাদ ও দেবিকা রানী


বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন দুই মেরুর দু’জন। দু’জনেই পেয়েছেন কবিগুরুর সান্নিধ্য। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে। অপরজন আত্মীয়তার সূত্রে। একজন সঙ্গীত সাধক, সুরকার, রবীন্দ্র সঙ্গীতের শিক্ষক, সংগঠক, গায়ক ও পরিচালক। অপরজন উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে প্রথম বিদেশী শিক্ষায় শিক্ষিত চিত্রনায়িকা, প্রযোজক এবং স্টুডিও স্বত্বাধিকারী। দু‘জনেরই দেখা হয়েছে। কথা হয়েছে। তবে কাজের সম্পর্ক আর গড়ে ওঠেনি। জীবনের শেষ দিকে এসে দুজনে মুখোমুখি হলেও দ্বিতীয়জন আর চিনতে পারেননি প্রথমজনকে। দু’জনের জীবন দুই ভিন্ন তরঙ্গে প্রবাহিত হয়েছে।

শান্তিনিকেতনের প্রথম বাঙালি মুসলমান ছাত্র ছিলেন আবদুল আহাদ। বাংলা সঙ্গীত জগত ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের কিংবদন্তি আবদুল আহাদ জন্মেছিলেন ১৯১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহীতে। পিতার আদি নিবাস ফরিদপুরের ভাঙা থানার ফুকুরহাটি গ্রামে হলেও স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন পাবনায়। তাদের পরিবারটি ছিল সে যুগের অত্যন্ত শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা মুসলীম পরিবার। ছয় ভাইবোনের মধ্যে আবদুল আহাদ ছিলেন সবার বড়। নানা খান বাহাদুর মোহাম্মদ সোলায়মানের বদলির চাকরি সুবাদে শৈশবেই ঘুরে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন স্থানে। পারিবারিক সাংস্কৃতিক আবহাওয়ার মধ্যে লালিত পালিত হওয়ার কারণে ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন সাহিত্য ও সঙ্গীতের অনুরাগী। প্রায়দিনই ভোরে আধো ঘুমে আর আধো জাগরণে শুনতে পেতেন খালা মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার কণ্ঠে ওমর খৈয়ামের কবিতা কাান্তিচন্দ্র ঘোষের অনুবাদে। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে নবম শ্রেণীতে পাঠকালে সহপাঠী ছিলেন হীরেন ভাদুড়ি ও রাধিকামোহন মৈত্র। ভাদুড়ী ছিলেন গায়ক আর রাধিকা তবলা বাজাতেন। পরবর্তীকালে তারা সঙ্গীতে খ্যাতি কুড়ান। এসএসসি বা ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করার পর আবদুল আহাদ কলকাতা সিটি কলেজে ভর্তি হন। এ সময় তিনি ওস্তাদ জমিরউদ্দিন খাঁর পুত্র বালি খাঁ ও ওস্তাদ মঞ্জুর কাছে সঙ্গীতে তালিম নেন। কিন্তু আইএ ক্লাশের শেষদিকে এসে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন এবং এখান থেকে পরীক্ষায় পাস করেন। এরপর অসুস্থ মাতামহর সঙ্গে চলে যান অন্ধ্র প্রদেশে। ১৯৩৮ সালে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্র সঙ্গীত পাঠের জন্য সরকারী বৃত্তির আবেদন করেন এবং মনোনীতও হন। শান্তিনিকেতনে তিনি দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর,শৈলজারঞ্জন মজুমদার, শান্তিদেব ঘোষের কাছে গান শেখার এবং স্বয়ং গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের কাছে যাওয়ার বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেন। প্রায় প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার জন্য কবিগুরুর সান্নিধ্য লাভ করেছেন অতি নিকটে বসে। রবীন্দ্রনাথের সামনে বসে কবির গান গেয়ে শুনিয়েছেন। তার সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন রাজেশ্বরী দত্ত, কণিকা ব্যানার্জী, অরুন্ধতী দেবী, নীলিমা স্যান্যাল(পরে আকাশবাণীর খবর পাঠিকা), নীলিমা সেন বাচ্চু, মৃণালিনী, সুবিনয় রায় প্রমুখ। কবিগুরুর কাছ থেকে তিনি গানও শিখেছিলেন। কবিগুরুকে গেয়ে শুনিয়েছিলেন, ‘যদি এ আমার হৃদয় দুয়ার বন্ধ রহে গো প্রভু।’ সেদিন তার নিজেকে ধন্য মনে হয়েছিল। কবির শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাওয়ার শেষ দৃশ্যটি তার মনে গেঁথেছিল। ১৯৪১ সালে শান্তিনিকেতনের শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর আহাদ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি বোম্বে যাবেন। সেখানে সিনেমার গানে সুর করবেন। বাজপাই নামে এক গুজরাটি শান্তিনিকেতনে সহপাঠী ছিলেন। সে ব্যবস্থা করে দেয় বোম্বেতে থাকার। শান্তিনিকেতনের কলাভবনের ছাত্র চিত্রকর শঙ্খ চৌধুরী তার অগ্রজ হিতেন চৌধুরীকে চিঠি দিয়েছিলেন, আহাদকে কাজে লাগানোর জন্য। হিতেন তখন বোম্বের সুধী সমাজে বেশ পরিচিত। হিতেন কাজ করতেন বোম্বে টকিজে। এই টকিজের মালিক তখন বিখ্যাত অভিনেত্রী দেবীকা রানী। দেবিকা রানী জন্মেছিলেন মাদ্রাজে এক সমৃদ্ধ ও শিক্ষিত বাঙালি পরিবারে। তার পিতামহ ছিলেন পাবনার জমিদার। পিতা কর্নেল মম্মথনাথ চৌধুরী ছিলেন মাদ্রাজের প্রথম ভারতীয় সার্জন জেনারেল। তার তিন পিতৃব্য খ্যাতিমান আশুতোষ চৌধুরী ছিলেন কলকাতা উচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি, যোগেশচন্দ্র চৌধুরী কলকাতার বিশিষ্ট আইনজীবী এবংঅপর পিতৃব্য বিখ্যাত বাঙালি লেখক প্রমথ চৌধুরী। রবীন্দ্রনাথেরও আত্মীয়া দেবীকার পিতামহী সুকুমারী দেবী কবিগুরুর সহোদরা, মা লীলা দেবী চৌধুরীর মাতামহী সৌদামনী দেবী কবিগুরুর আরেক ভগ্নী। দেবিকার পিতা ও মাতামহী ছিলেন পরস্পর খুড়তোতো ভাই বোন। নয় বছর বয়সেই দেবিকা এবং তার ভাইকে ইংল্যান্ডের বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়। স্কুলজীবন শেষ হলে ১৯২০ সালে লন্ডনের রয়্যাল একাডেমী অব ড্রামাটিক আর্ট ও রয়্যাল একাডেমী অব মিউজিক নামক দুটি প্রতিষ্ঠানে অভিনয় ও সঙ্গীত বিষয়ে শিক্ষা নেন। এরপর টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করেন।

নির্বাক যুগকে পেছনে ফেলে যখন সবাক যুগের দৌঁড় মোটামুটি ভালোভাবেই শুরু হয়ে গিয়েছে; সেই সময় চলচ্চিত্র শিল্পে দেবিকা রাণীর আবির্ভাব । হামাগুঁড়ি দেওয়া ভারতবর্ষের চলচ্চিত্রকে তিনিই সযতেœ হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন। দেবিকা রাণীর সময়ে ফিল্ম-নাটকের মেয়েরা সমাজে অচ্ছুৎ ছিল। সাধারণ ঘরের মেয়েরা অভিনয়ে আসতই না। তাই পৃথি¦রাজ কাপুরকেও এক নাটকে নারী চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছিল। সমাজে তখন অভিনেত্রীরা বারবণিতারূপে পরিচিত ছিল। আর তা অনেকটা সত্য ছিল। অথচ তাদের যা লাজ-লজ্জা ছিল, আজকের দিনে সভ্যসমাজেই তার বিন্দুমাত্র দেখা যায় না। তারা কখনও শাড়ি ছাড়া খোলামেলা পোশাক পরেননি। অন্তরঙ্গ দৃশ্যে কাজ করলে যথেষ্টই সংকোচবোধ করতেন। দেবিকা রানী ছিলেন অতি আধুনিক চিন্তাধারার এক বেপরোয়া স্বাধীনচেতা। সমাজকে উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন। তাই ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রথম চুম্বনের দৃশ্যে অভিনয় করে আলোড়ন তৈরি করেন। হিন্দি ও ইংরেজি দ্বিভাষিক প্রথম ভারতীয় ছবি ‘কর্মা’তে নায়ক ছিলেন তারই স্বামী হিমাংশু রায়। নিজের প্রডাকশন হাউস বম্বে টকিজ এরও এটা প্রথম ছবি। ল-নে থাকাকালে কলকাতার ছেলে হিমাংশুর সঙ্গে সাক্ষাত এবং প্রণয়। সে সময় দেবিকা জার্মান ও ফরাসী ভাষাও রপ্ত করেন। জার্মানে বছর খানেক অবস্থানকালে নাটকেও অভিনয় করেন। শিখে ফেলেন রুশ ভাষাও। হিমাংশু দেবিকা বিয়ের পর মুম্বাই-এ গড়ে তোলেন স্টুডিও, বম্বে টকিজ। জার্মান ও ইংল্যা-ে থেকে সর্বাধুনিক সরঞ্জাম আনান। জার্মান থেকে নামী দামী ক্যামেরাম্যানও। এটাই হয়ে ওঠেছিল ভারতবর্ষের সর্বোত্তম স্টুডিও। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলেই ব্যবসার হাল ধরেন। এই স্টুডিওর মাধ্যমে অনেক নামীদামী নায়ক-নায়িকাই যেমন দীলিপ কুমার, অশোক কুমার, রাজকাপুরও ‘ক্ল্যাপার বয়’ হিসেবে এ স্টুডিওতে কিশোর বয়সে যোগ দিয়েছিলেন।

১৯০৭ সালে দেবিকা রানী অভিনীত ‘জওয়ানি কি হাওয়া’ ছবির প্রিমিয়ার চলছিল কলকাতার রক্সি হলে। নায়ক নবাগত নাজমুল হাসান। সুন্দর চেহারা, জ্ঞান ও চমৎকার কথাবার্তা শুটিংয়ের সময় দেবিকাকে মোহিত করেছিল। কলকাতায় প্রিমিয়ার শো শেষে নায়ক-নায়িকা হারিয়ে যান। দিন পাঁচেক পর মোহভঙ্গ হতেই দেবিকা নাজমুলের সঙ্গ ত্যাগ করে বম্বেতে এসে গোপন আস্তানায় ওঠেন। নিজেকে সবকিছু হতে আড়াল করে নিয়েছিলেন। মাসখানেক পর স্ত্রীর খবর পেয়ে হিমাংশু তাকে ঘরে ফিরিয়ে আনেন। বছর খানেক পর দেবিকা আবার অভিনয়ে ফিরে আসেন। স্টুডিওর কর্মী কুমুদকে অশোক কুমার নামে নায়ক ও নিজে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করে নির্মাণ করেন ‘জীবন নাইয়া’ ছবিটি । সুপারহিট হয়। এরপরও ওই জুটি আরো কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন। এর মধ্যে ‘অচ্ছ্যূত কন্যা’ সুপারহিট। একের পর এক নায়িকা প্রধান ছবিতে অভিনয় করে দেবিকা সমকালের সব নায়িকাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। স্বামী হিমাংশুর ১৯৪০ সালে মৃত্যুর পর অভিনয় থেকে ক্রমে প্রযোজনায় মনোযোগ দেন। ১৯৪৩ সালে ‘হামারি বাত’ চলচ্চিত্রে শেষবারের মত অভিনয় করেন। ১৯৪৪ সালে তার প্রযোজিত ‘জোয়ার ভাটা’ নামক চলচ্চিত্রে নবাগত দিলীপ কুমারকে সুযোগ দেন। ফ্লপ হিরো দেবানন্দকে দিয়ে নির্মাণ করেন ১৯৪৮ সালে ‘জিদ্দি’। দেবানন্দ হয়ে ওঠেন জনপ্রিয়।

সারা ভারতের আলোড়নকারী চলচ্চিত্র নির্মাতা বম্বে টকিজ আবদুল আহাদকে আকর্ষণ করেছিল। তিনি যখন বোম্বে যান, তার কিছুদিন আগে হিমাংশু রায় মারা যান। দেবিকা রাণীর বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা চালান। কিন্তু সফল হন নি। কারণ, বাসায় তিনি অচেনা কারো সঙ্গে দেখা করেন না।আহাদের সঙ্গে রয়েছে দেবিকার ভাই নিখিল চৌধুরীর লেখা একটি চিঠি। ফিরে এসে হিতেন চৌধুরীকে বলেন, তার সমস্যার কথা। তিনি আশ্বাস দিলেন যে, দেবিকা রাণীকে দেখা করার জন্য বলে দেবেন। যাতে আহাদকে সাক্ষাত দেন। হিতেন চৌধুরী এবং দেবিকার মধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল। পরে আবার একদিন গেলেন বোম্বে টকিজে। যেতেই বেশ খাতির করে একজন লোক দেবিকারাণীর কক্ষে নিয়ে গেলেন। ভারতজোড়া এই নামকরা অভিনেত্রীর সামনে গিয়ে একটু অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন আহাদ। সাদা শাড়ি পরে একটি টেবিলের সামনে বসে আছেন সুন্দর ব্যক্তিত্ব নিয়ে। বেশ সুশ্রী দেখতে, যদিও রঙটা খুব পরিষ্কার নয়। আহাদকে বললেন, একটু চা খান। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি জন্য এসেছেন। আহাদ জানালেন, বহুদিনের বাসনা চিত্রজগতে সঙ্গীত পরিচালনা করবো। খুব সাহসের কাজ করেছিলেন, কলকাতায় না গিয়ে হঠাৎ করে সুন্দর বোম্বেতে চলে যাওয়ার মধ্যে। দেবিকারাণী কয়েকটি গান আহাদকে দিয়ে বললেন, এগুলো আপনি সুর করে আনবেন, আমরা শুনব। সময়ও বলে দিলেন, কবে আবার যেতে হবে। একটি কথা দেবিকা রাণী তাকে বলেছিলেন, দেখুন আমি যে ছবি করি সবসময়ই আমাকে মনে রাখতে হয় চারআনা ক্লাসের দর্শকদের কথা। কারণ এরাই সবচেয়ে বেশি ছবি দেখে। তখন সিনেমায় চারআনা ছিল সর্বনিম্ন টিকেটের মূল্য। যেহেতু আহাদ শান্তিনিকেতন হতে গিয়েছিলেন। সম্ভবত সে কারণেই সেবিকা বেশী সময় কথা বলেছেন আহাদের সঙ্গে। দেবীকা রাণীর সঙ্গে সাক্ষাত শেষে আহাদ বিচলিত হয়ে পড়েন। কোথায় বসে গানগুলোর সুর করবেন। অবশেষে গেলেন একদা সহপাঠী অরুদ্ধতী দেবীর বাসায়। বরিশালের বিখ্যাত গুহঠাকরতা পরিবারের কন্যা অরুšধতী পরবর্তীকালে চিত্র নায়িকা এবং পরিচালক হয়েছিলেন। অরুন্ধতীকে বললেন আহাদ, তোমার এখানে বসেই এ গানগুলোর সুর করতে হবে। অরুন্ধতী জানালেন, আপনার যতক্ষণ ইচ্ছে আপনি এসে সুর করবেন। হিতেন চৌধুরীকে সব জানালেন আহাদ। হিতেন বললেন, আপনি তার ভাইয়ের চিঠি নিয়ে এসেছেন, ও চিঠিতে কোন কাজ হতো না। কারণ দেবিকা ও তার ভাই নিখিলের মধ্যে কোন কারণে সম্পর্কটা বোধহয় ভালো নয়। আহাদ ক’দিন অরুন্ধতীর ফ্লাটে গিয়ে গানগুলোতে সুরারোপ করলেন।

কর্মাশিয়াল লাইনে সুর করার অভিজ্ঞতা আহাদের একেবারেই ছিল না। কাজেই কতটুকু উৎরাতে পেরেছেন , তা বুঝতে পারেন নি। শান্তিনিকেতনে শিখতেন ও গাইতেন রবীন্দ্র সংগীত । একলাফে একবারে ছায়াছবির জগতে প্রবেশ করা তো সহজ নয়। বেশ কিছুদিন অভিজ্ঞতা অর্জন করে এ লাইনে পা বাড়ানো উচিত ছিলো বলে তার মনে হতে থাকে। তা-ও আবার বাংলা নয়, একেবারে হিন্দি। একটু বেশী সাহসই যেন করে ফেলেছিলেন। বোম্বেতে শান্তিনিকেতনের পরিচিত একটি মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সে বেড়াতে এসেছে বোম্বাই। বলল, তার অগ্রজ একটা স্কুল করেছে ছবি আঁকা ও গান শেখার। শান্তিনিকেতনের কলাভবন থেকে পাশ করা ওর ভাইয়ের নাম সুনীতি। সে বলল, আমি তো স্কুলটা শুরু করলাম। আপনি এখানে গানের ক্লাস নেন। এই স্কুলটিতে আহাদ বেশ কিছুদিন গান শিখিয়েছিলেন। বেশীর ভাগ ছাত্রীই ছিল গুজরাটি। শান্তিনিকেতনে থাকাকালে কলেজের একটি ছাত্রী কৃষ্ণকান্ত চর্তুবেদীর সঙ্গে পরিচয় ছিল। সে আহাদের আগেই বোম্বেতে এসেছিল এবং একটি স্টুডিওর সঙ্গে মাসিক হারে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল।তবে তখন পর্যন্ত কোন ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পায়নি।

দেবিকা রাণীর দেওয়া গানগুলো সুর করা হয়ে গেলে নিদিষ্ট দিনে বিকেলের দিকে বোম্বে টকিজে হাজির হন আহাদ। তাকে একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। যেখানে সংগীতের মহড়া হয়। দেবীকারাণী এবং নায়ক- গায়ক অশোককুমারও হাজির ছিলেন। দেবীকা বললেন, এবার আপনি কী সুর করেছেন শোনান।আহাদ শোনানোর পর বুঝলেন তাদের খুব মনঃপূত হয়নি সুর। গান শোনানোর পর গেলেন দেবীকারাণী কক্ষে। দেবিকা খুব সুন্দর ও ভদ্রভাবে তার অক্ষমতা প্রকাশ করলেন। প্রথমদিকে আহাদের মনে হয়েছিল কৃতকার্য হবেন। কিন্তু জীবনে প্রথম কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের মুখেই পেলেন বাধা। বোম্বে টকিজে যে কাজ হলো না, সে কথা হিতেন চৌধুরীকে জানালে তিনি বললেন, আহাদকে আবার আরেকজনের কাছে পাঠাবেন। দেখা যাক সেখানে কিছু হয় কি না। যার কাছে পাঠান, তার নাম অনিল বিশ্বাস। সারা ভারতের নামকরা সঙ্গীত পরিচালক। আহাদ তার ওখানে যাতায়াত শুরু করেন। অনিল বিশ্বাস প্রায়ই আহাদের কাছ থেকে রবীন্দ্র সংগীত শুনতেন এবং একটি গান শিখেও নিয়েছিলেন।একই সময় বোম্বে রেডিওতে ভজন পরিবেশন শুরু করেন। বাঙালি চিত্র পরিচালক ফণী মজুমদার আহাদকে একটি ছবিতে ছোট ভূমিকায় অভিনয় করান। যে ছবিতে ছিলেন জয়রাজ, লীলা দেশাই, জগদীশ শেঠী এবং সংগীত পরিচালক কৃষ্ণচন্দ্র দে, যার সহকারী ছিলেন তার ভাইপো মান্না দে। আ›েধরী স্টুডিওতে সুটিং হতো। তামান্না ছবিতে আহাদ কৃষœচন্দ্র’র পালক পুত্রের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। হিতেন চৌধুরী আহাদকে দু’একটি গানের টিউশনিও ঠিক করে দিয়েছিলেন। অনিল বিশ্বাস আহাদকে একটি ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ করে দেন। ডুয়েট গান। নতুন একটি মেয়ে সহশিল্পী রেকর্ডিং-এর পর দেখা গেল ত্রুটি রয়ে গেছে। জায়গায় জায়গায় গলা সুরের উপর। সুতরাং তা বাতিল হয়ে গেল । অনিল বিশ্বাস আহাদকে বললেন, সিনেমাতে তোমাকে সুযোগ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তোমার অদৃষ্ট মন্দ। আমার দ্বারা আর কিছু করা সম্ভব নয়। হতাশ হলেন আহাদ ।তখন বোম্বে আর ভাল লাগছিল না। যেদিন বোম্বে ছাড়লেন সেদিন গান্ধীজির ডাকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ভারত ছাড়’র শেষ আন্দোলন শুরু হয়েছে। ট্রেনে চড়ে মান্থলী টিকিটটা ছিঁড়ে ফেললেন। আবার শান্তিনিকেতনে ফিরে আসা আহাদের।

হিমাংশু রায়ের মৃত্যুর পর স্ত্রী দেবীকা রাণী নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। একদিন এক বিখ্যাত রুশ চিত্রশিল্পীর চিত্রপ্রদর্শনীতে গেলেন দেবিকা। শিল্পীর কাজ দেখে তো যার পর নাই মুগ্ধ। শিল্পীকে দেবীকা রুশ ভাষায় একের পর এক প্রশ্ন করে যেতে লাগলেন। আর শিল্পী রোয়েরিচ পরিষ্কার হিন্দিতে একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলেন। দেবিকার রুশ ভাষায় কথা বলা এবং রোয়েরিচের হিন্দিতে কথা বলা শুনে সবাই দারুণ অবাক হয়ে গিয়েছিল। দেবিকার সঙ্গে রোয়োরিচের ঘনিষ্ঠতা অনেক দূর গড়ায়। এবং তারা প্রেম থেকে পরিণয়ে আবদ্ধ হন। আর দেবিকা ছেড়ে দেন চলচ্চিত্র জগত।

১৯৭৫ সালে আব্দুল আহাদ বাংলাদেশের পাঁচ সদস্যর একটি উচ্চপর্যায়ের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন যান। লেনিনগ্রাদের যাদুঘরে চিত্রকর্ম দেখছিলেন। হঠাৎ দেখেন শাড়ি পড়া এক ভদ্র মহিলা, সঙ্গে কয়েকজন লোক। তাকে খুবই ব্যস্ত মনে হলো। আহাদদের দেখে তিনি বললেন, নীচের তলায় তার শ্বশুর অর্থাৎ নিকোলাস রোয়েরিকের ছবির একটি প্রদর্শনী হচ্ছে এবং তারা যেন তা দর্শন করেন। পরিচয়ে জানলেন, ইনিই সেই দেবীকারাণী, যাকে দেখেছিলেন ১৯৪১ সালে বম্বে টকিজে। প্রথমে চিনতেই পারেন নি। বয়সের ভারে অন্যরকম হয়ে গেছেন, কেমন যেন ছোট মনে হচ্ছিল। নেই সেই লাবণ্য। দেবীকাও চিনতে পারেন নি আহাদকে। ইচ্ছে করেই পরিচয় দেন নি।

আবদুল আহাদ ও দেবিকা রাণী স্ব-স্ব ভুবনে স্ব-মহিমায় প্রতিভাত হয়েছিলেন ।দেবীকা রাণী চাইলে আব্দুল আহাদের জীবন ধারা হয়তো বদলে যেতো। কিন্তু বাঙালার সঙ্গীত জগত পেতো না মহান প্রতিভাধর এক সংগীতজ্ঞকে।