২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ২ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

জলদস্যু গ্রুপের বেশ কিছু আস্তানা নিশ্চিহ্ন


শংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে ॥ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অব্যাহত অভিযানে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে সুন্দরবনভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় জলদস্যুরা। আতঙ্ক ছড়ানো বেশ কয়েকটি জলদস্যু গ্রুপের আস্তানা রীতিমতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। নিহত হয়েছে কয়েকটি বাহিনীর প্রধানসহ দলের বহু সক্রিয় সদস্য। ভেঙ্গে টুকরো হয়ে পড়েছে জলদস্যুদের অনেক দল। জলদস্যু বাহিনীগুলোর সশস্ত্র তৎপরতা কমে যাওয়ার ফলে চলতি মৌসুমে বঙ্গোপসাগর অনেকটাই ভীতিমুক্ত হয়েছে। সমুদ্রগামী জেলেদের মাঝে দেখা দিয়েছে স্বস্তি। বেড়েছে ইলিশ আহরণের পরিমাণ। টার্গেট ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ জেলেদের সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। জেলেরা অভিযোগ করেছে, সুন্দরবনভিত্তিক জলদস্যুদের সশস্ত্র তৎপরতায় বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা জেলেদের কাছে চরম বিপদজ্জনক পেশায় রূপ নিয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে গহীন অরণ্যে আস্তানা গেড়ে জলদস্যুরা নামে-বেনামে গ-ায় গ-ায় বাহিনী তৈরি করে। চাঁদাবাজি, লুটপাট, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, নিরীহ জেলেদের হত্যাসহ নানাবিধ নৃশংস পন্থায় জলদস্যুরা জেলেদের মাঝে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে ইলিশ শিকারী জেলেরা সাগরে যাওয়ার সাহস পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। কমে যায় ইলিশ আহরণ। এ অবস্থার নিরসনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুরু করে সমন্বিত অভিযান। বিশেষ করে এলিট ফোর্স র‌্যাবের দুঃসাহসিক অব্যাহত অভিযানে সুন্দরবনসহ বঙ্গোপসাগরের পরিস্থিতি এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে। বঙ্গোপসাগরে ফিরে আসছে ভীতিমুক্ত পরিবেশ। র‌্যাব-৮ এর বরিশাল দফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সাল থেকে চলতি বছরের ২২ জুন পর্যন্ত র‌্যাব সুন্দরবনের গহীনে ৫৯টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২০১২ সালে ১৫টি অভিযান হয়েছে। চলতি বছরে এ যাবত ৯টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে ৭৫ জন জলদস্যু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১১ সালে সর্বাধিক ১৮ জন, ২০১২ সালে ১৭ জন, ২০১৩ সালে ১৩ জন, ২০১৪ সালে ১০ জন ও চলতি বছরে ৯ জন নিহত হয়েছে। নিহত জলদস্যুদের মধ্যে বাহিনী প্রধান রয়েছে ১৭ জন। ২০১০ সালে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ডাক্তার মানিক বাহিনী প্রধান মোঃ মানিক আকন ওরফে ডাক্তার মানিক ওরফে ডাকাত মানিক। ২০১১ সালে নিহত হয়েছে সাগর বাহিনী প্রধান অলিয়ার রহমান ওরফে আলী ফকির ওরফে কৃষ্ণ সাগর, মোতালেব বাহিনী প্রধান মোঃ মোতালেব শেখ ওরফে মোতালেব ও জুলফিকার বাহিনী প্রধান মোঃ জুলফিকার বাবুল ওরফে জুলফিকার ওরফে জুলফু। ২০১২ সালে নিহত হয়েছে জিহাদ বাহিনী প্রধান জিহাদ শেখ, সোহাগ বাহিনী প্রধান সোহাগ ফরাজী ও আকাশ বাহিনীর বাংলাদেশী অংশের প্রধান নবকুমার হালদার। ২০১৩ সালে নিহত হয়েছে ছোট্টু বাহিনী প্রধান জাকির ওরফে ছোট্টু, নটো বাহিনী প্রধান মোঃ শহিদুল ইসলাম ওরফে নটো শহিদুল, বাকি বিল্লাহ বাহিনী প্রধান মুজিবুর রহমান ওরফে মুজিবুর, আমজাদ বাহিনী প্রধান মোঃ আমজাদ সরকার ওরফে বাপ্পি, সাইজ্জা বাহিনী প্রধান মোঃ মাহমুদ ফকির ওরফে মাহবুব ওরফে সাইজ্জা, মর্তুজা বাহিনী প্রধান মোঃ মোর্তুজা হোসেন রানা। ২০১৪ সালে নিহত হয়েছে ধলু বাহিনী প্রধান মোঃ হামিদ মোল্লা ওরফে ধলু, নাসির বাহিনী প্রধান নাসির ওরফে রাসেল, দারোগা বাহিনী প্রধান এমাদুল হাওলাদার ওরফে দারোগা এবং চলতি বছরে নিহত হয়েছে জামাল বাহিনী প্রধান নুরুজ্জামান হাওলাদার ওরফে জামাল। নিহত অন্যরাও প্রায় সকলে এসব বাহিনীর সাথে যুক্ত ছিল। এছাড়া, এসব অভিযানের সময়ে র‌্যাবের হাতে আটক হয় ৫৩ জন জলদস্যুসহ বাঘ ও হরিণের চামড়া পাচারকারী। র‌্যাব জলদস্যুদের আস্তানা এবং ঝড়ের কবলে ডুবে যাওয়া ট্রলারের ৫৬ জন জেলেকে উদ্ধার করে। র‌্যাব জলদস্যুগুলোর আস্তানা থেকে প্রায় ৬ হাজার গোলাবারুদ ও ৪০৪টি অস্ত্র উদ্ধার করে। উদ্ধার করা অস্ত্রের মধ্যে থ্রিনটথ্রি রাইফেল থেকে শুরু করে বন্দুক, পিস্তল, লঞ্চার, এলজি, শটগান ও শাটারগান পর্যন্ত রয়েছে। দেশী অস্ত্রশস্ত্র তো রয়েছেই। জলদস্যু বাহিনীগুলোর আস্তানা থেকে র‌্যাব নগদ অর্থ, ফিশিংবোট, ইঞ্জিনচালিত নৌকা, বাইনোকুলার, বাঘ ও হরিণের চামড়া, মোবাইল ফোনসহ প্রচুর মালামাল উদ্ধার করে।

জলদস্যুদের তৎপরতা দমন প্রসঙ্গে র‌্যাব-৮ এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান জানান, বঙ্গোপসাগরকে জেলেদের কাছে নিরাপদ রাখতে র‌্যাব সর্বদাই তৎপর রয়েছে। সুন্দরবনে তাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জলদস্যু তৎপরতা নিশ্চিহ্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মোটকথা জেলেরা যাতে নিশ্চিতে মাছ ধরতে পারে তার জন্য যা করা দরকার, তার সবকিছুই করা হচ্ছে। এদিকে, বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে ব্যস্ত জেলেদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি ইলিশ মৌসুমে এখন পর্যন্ত ২/১টি ছোট বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের জলদস্যুতার ঘটনা ঘটেনি। জেলেরা নির্বিঘেœ ইলিশ আহরণে ব্যস্ত রয়েছে। র‌্যাবের পাশাপাশি কোস্টগার্ড সাগরে টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে। পুলিশও তাদের তৎপরতা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে পুলিশের গোয়েন্দা তৎপরতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতার কারণে সাগরে ইলিশ আহরণ গত বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে অনেক বেড়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে কলাপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ কামরুল ইসলাম জানান, গত দু’মাস সাগর যেভাবে জলদস্যুমুক্ত রয়েছে, তা এর আগে ভাবাও যেত না। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে এ মৌসুমে ইলিশ আহরণ বেড়ে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।