২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ভারত ইন্ডাস্ট্রিয়াল জায়ান্ট হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করছে, তবে... -অর্ম


মঞ্জুলা : আমাকে বলতেই হবে যে, আমি পুরো বইটি পড়িনি..

সেন : আপনি পুরো ৬০০ পাতা পড়েননি? আমি হতাশ (হেসে)। যাই হোক, আপনি আমাকে কি জিজ্ঞেস করতে চান...

মঞ্জুলা : আপনি শেষবার যখন এখানে এসেছিলেন, সে সময়টার সঙ্গে এখন অনেক ফারাক। অনেক কিছুই বদলে গেছে।

সেন : হ্যাঁ। আমি টাইমস অব ইন্ডিয়ার বিষয়টা নিয়ে কিছুটা হতাশ। এরা অনেক পুরনো বিষয় নিয়ে মাতামাতি করেছে, বিশেষ করে আমার নালন্দা ত্যাগের বিষয়টি নিয়ে। নিউইয়র্ক রিভিউও অন্য অনেক কিছু বলেছে কিন্তু তারা ঐ বিষয়টার ওপর এত গুরুত্বারোপ করেনি। যাক, নালন্দা বিষয়ে আলোচনা না করাই মঙ্গল ( হাসি)।

মঞ্জুলা : বেশ, দেশে পরিবর্তন এসেছে।

সেন : হ্যাঁ। দেশের মধ্যে পরিবর্তন ঘটে গেছে। বর্তমান সরকারের গুজরাট মডেলের দিকে মনোযোগের বিষয়টি আমি বইতে তুলে ধরেছি। আমার আশা ছিল, তারা গুজরাট মডেলের সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করতে পারবে। গুজরাট রাস্তাঘাট ও বিদ্যুত সরবরাহের ক্ষেত্রে সাফল্য দেখাতে পারলেও এখানে বিহারের চেয়েও কম রোগ প্রতিষেধক ব্যবস্থা, কম স্বাস্থ্য সেবা এবং শিক্ষা বিদ্যমান। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমার আশা ছিল তারা বুঝতে পারবে যে, তাদের আরও বিস্তৃত এমন এক উন্নয়ন মডেল দরকার যেটার মূল বিষয় থাকবে মানুষ। কিন্তু তা সত্যি হয়নি। এমনকি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বাজেট কমানো হয়েছে এবং বিদ্যুত ও রাস্তাঘাটের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও সম্পন্ন করা হয়নি। বিষয়টি এ মুহূর্তে অত্যন্ত দুঃখজনক।

মঞ্জুলা : আপনার নতুন বইটির উপক্রমণিকায় আপনি আমাদের সাধারণ পক্ষপাতিত্বের বিষয়টি, যা আমাদের অন্ধ ও একইসঙ্গে বিভাজিত ( ধনী ও গরিব ) করে, তা তুলে ধরেছেন। এটাকে আপনি আমাদের সকল সমস্যার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সেন : অবশ্যই। এখানে শুধু একটি বিভাজন নয়, একের অধিক বিভাজন রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বিভাজনটি হলো ধনী ব্যক্তি যারা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন করে এবং সাধারণ মানুষ যারা উপযুক্ত স্কুলে যেতে পারে না, উপযুক্ত স্বাস্থ্য সেবা এমনকি রোগ প্রতিষেধক ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারে না। এটি খুবই বড় বিভাজন। ভারতের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশে এই বিভাজন যে কত বড় সমস্যা, সে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান কিংবা ধারণার অভাব আছে। আমি মনে করি, আমাদের জন্য উন্নয়ন হওয়া উচিত সমন্বিত সামাজিক সংযুক্তির ভিত্তিতে। কিন্তু এটা যে হচ্ছে না, এর দোষ শুধু সরকারের না, জনগণেরও। তারা সরকারকে চাপ দেয় না বলেই শাসনব্যবস্থায় এই ঘাটতি দেখা যায়। এগুলোকে অবশ্যই সংশোধন করতে হবে।

মঞ্জুলা : মাঝেমাঝে আমার মনে হয় দেশের বিভাজন থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব।

সেন : না, এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব নয়। আমার মনে হয়, আমাদের বিষয়গুলোর ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। আপনি দেখেন, কিছু বিষয় আছে যেগুলোকে খুব সহজেই গণমাধ্যমে নিয়ে আসা যায়। গণমাধ্যম তা করেও। একইভাবে অন্য এক মোদি নিয়ে কি ঘটছে.... তার নাম কি? তিনি এমন একজন যিনি দেশের আইনের হাত থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। লোলিত মোদি। আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে, এই বিষয়গুলোকে রাজনৈতিকীকরণ করা খুবই সহজ এবং তারা তা করেও। কিন্তু তারা ভারতের সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যারা নানা যন্ত্রণায় ভুগছে, তাদের দিকে তেমন একটা মনোযোগ দেয় না। বিষয়টি তাদের মনেই তেমন একটা স্থান পায় না, সংবাদপত্র তো দূরের কথা।

মঞ্জুলা : দারিদ্র্য বিষয়টি সেক্সি নয়।

সেন : ঠিকই বলেছেন।

মঞ্জুলা : আপনি আপনার বিভাজন সম্পর্কিত ধ্যানধারণায় ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের বিভাজনকে সংকীর্ণতা বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। কিন্তু এখন আমরা আবার সেদিকেই বেশি যাচ্ছি যেখানে আমাকে, আপনাকে আমার আপনার ধর্ম কিংবা গোত্রের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

সেন- আমিও এই বিষয়টি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। আপনি দেখবেন, কিছু কিছু বিভাজন সেকেলে। বিভাজন করা হয় হিন্দু-মুসলমান হিসেবে, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ হিসেবে। কে সম্মান পাবে, কে পাবে না তা এই বিভাজনের মাত্রার ওপরই নির্ভর করে। অন্যদিকে কিছু কিছু বিভাজন করা হয় ধনী-গরিব, নারী-পুরুষের ভিত্তিতে। এখানে আমরা যদি বিষয়টিকে কে শ্রদ্ধা পাবে কিংবা কে উদ্বিগ্ন হবে এর ভিত্তিতে না দেখি, তাহলে আমি মনে করি বিভাজন অধিক উৎপাদনমুখী ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু যখন কোন একজন বর্ণপ্রথার পক্ষে লেখেন এবং এটি ক্ষতিকারক নয় বলেন, তখন আমার মনে হয় ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব হিস্ট্রিক্যাল রিসার্চের নতুন প্রধান বলছেন (হাসি)...। আমি মনে করি বর্ণপ্রথা ভারতকে চিরকালের জন্য অসমতার মধ্যে রেখে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে যা ভাল একটি সমাজ গড়ার সম্পূর্ণ বিপরীত।

মঞ্জুলা : আপনি অভিযোগের সুরে বৈদিক গণিতের কথা উল্লেখ করেছেন।

সেন- আপনি জানেন, আমি বেদের একজন ভক্ত। আমি এটি পড়তে প্রচুর সময় ব্যয় করেছি। এটি বেশ কঠিন। আমি ক্লাসিক্যাল সংস্কৃত বেশ ভাল জানি। কালিদাস বা শূদ্রক কিংবা আর্যভট্টতে আমার কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু বৈদিক সংস্কৃত ভিন্নরকম। আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে যখন আমি ঋগবেদ পড়েছিলাম। আমি অথর্ববেদ পড়ার পেছনেও কিছু সময় ব্যয় করেছি। আমার দাদা বৈদিক সংস্কৃত বেশ ভাল জানতেন। তিনি আমাকে এটি পড়তে সাহায্য করেছেন। এবং এর কিছু ছত্র অসাধারণ, কিন্তু তা বৈদিক গণিত নয়। অথর্ববেদে খুব অল্পই গণিত আছে, তবে তা ইন্টারেস্টিং।

কিন্তু আপনি দেখবেন যারা বৈদিক গণিত নিয়ে কথা বলে তারা সংস্কৃত পড়ে না। শুধু বৈদিক সংস্কৃতই নয়, তারা অন্য কোন সংস্কৃতই পড়ে না। বিভিন্ন সময়ে ভারতবাসী গণিতে যে সৃজনশীল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। গুপ্ত আমল এবং আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত, ভাস্কর সত্যিই গণিতের ইতিহাসে মহীরুহ। তাদের অবজ্ঞা করা গণিতের জন্য সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।

মঞ্জুলা : আপনি বেদের শক্তিশালী অজ্ঞেয়বাদের আত্মীকরণ নিয়েও কথা বলেছেন।

সেন : আমি মনে করি, প্রথম দিককার বুদ্ধিভিত্তিক ভাবনা অজ্ঞেয়বাদ। এখানে এটাও বলা হয়নি যে,‘ তিনি আছেন?’ এখানে বলা হয়েছে, ‘তিনি কি জানেন; তিনি যদি থাকতেন তবে তিনি জানতেন?’এখানে দুটি ইস্যু। মানুষ এই বিষয়গুলো সাড়ে তিন হাজার বছর আগে চিন্তা করেছিল এবং এখনও করছে। আমাদের সংস্কৃতিতে যুক্ত সহনশীলতার বিষয়টি নিয়ে আমি গর্ব অনুভব করি। তাই, মানুষ যদি ধৈর্য ও আগ্রহ নিয়ে বেদ পড়ে, তাহলে গণিতের অনেক অজানা ইতিহাসের অনেক কিছুই জানা হয়ে যাবে। এটি সত্যি খুবই বড়মাপের কাজ।

(বাকী অংশ আগামীকাল)