মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১০ আশ্বিন ১৪২৪, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

আক্রান্ত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ও ধর্মের দুর্বৃত্তায়ন

প্রকাশিত : ১২ জুলাই ২০১৫
  • মুনতাসীর মামুন

মদিনায় এক সন্ধ্যায় হাঁটতে বেরিয়েছি। সদর রাস্তার এক পাশে দেখি মেলার মতো কিছু একটা হচ্ছে। গেলাম। শামিয়ানার নিচে ফলের পশরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। এক কোণে সাদা একটি স্ক্রিন। সামনে কিছু চেয়ার। ডকুমেন্টারি দেখানো হচ্ছে। লোকজন নেই। আমি একা দর্শক হয়ে বসলাম। হজের ওপর চলচ্চিত্র। হযরত মোহাম্মদ (দ.)-এর আগেও মানুষ কিভাবে হজ পালন করত তা দেখানো হচ্ছে। এক সময় দেখা গেল উটে চড়েও কাবা শরীফ প্রদক্ষিণ করছেন কয়েকজন।

এতটুকু পড়ার পর যদি কেউ বলেন, না এটি ঠিক নয়। মোহাম্মদ (দ.) ইসলাম প্রবর্তন করেছেন, হজ তিনিই চালু করেছেন। অতএব যারা এসব বলে তারা মুরতাদ। খারিজ হয়ে গেল ধর্ম থেকে। আপনি তখন কী বলবেন? কী উত্তর হবে এই অজ্ঞতার, মূর্খতার? তাদের এই হুঙ্কার আমাকে মেনে নিতে হবে? হযরত ইব্রাহীম বায়তুল্লাহ নির্মাণ করেন, যাকে বলা হয়ে থাকে আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত প্রথম ঘর বা কাবা। তিনি হযরত ইব্রাহীমকে নির্দেশ দেনÑ ‘আমার গৃহকে পবিত্র রাখিও তাদের জন্য যারা তাওয়াব করে এবং যারা সালাতে দাঁড়ায়, রুকু করে ও সিজদা করে এবং মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দাও, ওরা তোমার কাছে পদব্রজে ও সর্বপ্রকার দ্রুতগামী উস্ট্রের পৃষ্ঠে, ওরা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ কাবাকে কেন্দ্র করে তিনিই হজের প্রবর্তন করেন। হযরত মোহাম্মদ (দ.) নয়। এই সত্য বললে কি আমি খারিজ হয়ে যাব?

ধর্ম বিষয়ক এ আলোচনা তুলতাম না, কারণ আমি ধর্মজ্ঞ নই। ধর্মের অপব্যাখ্যা আর ধর্মীয় সূত্রের সাহায্যে নাকচ করে বিতর্ক করাও আমি চাই না; কারণ তাহলে ধর্ম নিয়ে যারা ব্যবসা করছে তাদের সঙ্গে আমার পার্থক্য থাকবে না। কিন্তু কখনও কখনও বাধ্য হয়ে বলতে হয়। সম্প্রতি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে এবং তা জিইয়ে রাখতে চাচ্ছে হেজাবিরা। তার প্রতিবাদের জন্যই আমাকে লিখতে হচ্ছে। কারণ আরেকটি আছে। বর্তমানে ধর্ম অপব্যবহারকারী এবং স্বার্থগত গোষ্ঠী দাঁড়িয়ে গেছে, যাদের সাংগঠনিক নাম হেফাজত ইসলাম, জামায়াত ইসলাম ও বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। সংক্ষেপে হেজাবি। এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্ম সম্পর্কে যাদের জ্ঞান নেই কিন্তু নিজেদের বেজায় ধার্মিক হিসেবে তুলে ধরতে চান এবং অজ্ঞ ও মূর্খ কিছু লোক। তারা বলতে চান তাদের কথা বার্তায় ও আচরণে যে, বাংলাদেশে তারাই একমাত্র ইসলামের হেফাজতকারী এবং বাংলাদেশ বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যারা আছে তারা হচ্ছে ইসলাম ধ্বংসকারী। সে জন্য প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য তারা যত্রতত্র ফতোয়া দিচ্ছেন। খাসজমি দখল করে মসজিদ বানাচ্ছেন, পরে যা মার্কেট হয়। ধর্মের নামে পয়সা নিয়ে নিজেদের পার্থিব সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন। তাদের কোন আচরণের আমরা প্রতিবাদ করি না। এ কারণেই আজ তারা সমাজে-রাষ্ট্রে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আমি এবং আমরা অনেকে মনে করি, ইসলাম তাদের কাছে লিজ দেয়া হয়নি এবং আল্লাহ তাদের ইসলামের হেফাজতকারীও বানাননি। ইসলাম তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি নয়। একইভাবে বাংলাদেশও তাদের লিজ দেয়া হয়নি। আমরা ছিলাম তাই বাংলাদেশ হয়েছে। তারা বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে। তাদের এ দেশে মাথা তুলে কথা বলার কোন অধিকার নেই। হেফাজতে ইসলামের নেতা ছিলেন ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সৈন্যদের সহযোগী মুজাহিদ। ১৯৭১ সালে মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ করেছিলেন। ১৯৭২ সালে মসজিদকে আবার মন্দিরে রূপান্তরিত করেছেন। জামায়াতে ইসলামের নেতারা ১৯৭১ সালে বাঙালীদের নির্বিচারে হত্যা করেছেন। বিএনপির জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া এই খুনীদের রক্তাক্ত হাতের সঙ্গে করমর্দন করে খুনীদের নির্দোষ ঘোষণা করেছেন। এদের এ ধরনের কোন কার্যকলাপ ইসলাম সমর্থন করে না। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী কয়েকদিন আগে নিউইয়র্কে একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তারই সূত্র ধরে হৈ হট্টগোল শুরু করেছে একটি পক্ষ। নিউইয়র্কেই উত্তাপটি বেশি। নিউইয়র্কে যারা হেজাবি মতবাদে দীক্ষিত, তারাই হৈ হট্টগোল করছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তা প্রতিরোধে যথেষ্ট সচেষ্ট ছিলেন এমন কোন খবর পাওয়া যায়নি। হেজাবিরা এটি করছে তার কারণ যতটা না ইসলাম তার চেয়ে বেশি শেখ হাসিনার কারণে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের সমর্থক, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একজন আইকন বা সেনানী। সুতরাং ‘ওই ব্যাটাকেই ধর’। কারণ হেজাবিদের রাজনীতি এখন হালে পানি পাচ্ছে না। তাদের নায়ক তারেক রহমান দুর্বৃত্ত হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছেন। আমাদের ধারণা ছিল পাকিস্তান ও সৌদি আরব এদের পৃষ্ঠপোষক। কিন্তু উইকিলিকসের কল্যাণে জানা গেল, সৌদি আরব তাদের এখন সমর্থন করছে না, এমনকি খালেদা জিয়াকেও! হয়ত সে কারণে সৌদি বাদশার রুটিন আমন্ত্রণে সৌদি সফরও খালেদা স্থগিত করেছেন, তারেকও। নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার জন্য হৈ হট্টগোল করতে হয়। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এই সময়ে পড়ে গেছেন।

নিউইয়র্কে মুুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বা আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তেমন প্রতিরোধ করেননি তার কারণ শেখ হাসিনা বা তার পরিবারের কেউ সেখানে নেই। সুতরাং ডেমনেস্ট্রেশনটা দেখাবেন কাদের? আবদুল গাফফার চৌধুরীর প্রতি শেখ হাসিনার বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি কী, তাও তাদের জানা নেই। সুতরাং ভুল হয়ে গেলে কাফফারা দেবে কে? লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে তারা একবার হাত পুড়িয়েছে। বারবার কেন হাত পোড়াবে তারা? সবশেষে হলোÑ এই সব ঝুট-ঝামেলায় যাওয়ার কী দরকার? অন্তিমে এত অজুহাতের মৌল বিষয় হলোÑ ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় দেয়া।

বাংলাদেশেও মূলত হেজাবীরা কয়েকদিন বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতির মূল বক্তব্যÑ আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ধর্মদ্রোহী অর্থাৎ মুরতাদ। তিনি খারিজ হয়ে গেছেন ইসলাম থেকে এবং তাকে দেশে ঢুকতে দেয়া হবে না। খুনীরা দেশে থাকতে পারবে; মুক্তবুদ্ধির মানুষ নন।

এখানেও একই জিনিস লক্ষ্য করি। মুক্তিযোদ্ধাদের যে কী একটা সংস্থা আছে, নামও ভুলে যাই তার বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লড়াকু সংগঠনের নেতা বা ব্যক্তিবর্গ বা লেখককুল, রাজনৈতিক দল, এমনকি আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ঢাকায় এলে তার জন্য যে নেমন্তন্নের আয়োজন করা হয়, সেখানে যারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন তাদেরও সক্রিয় হতে দেখিনি। কারণ ওইগুলোই। প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নন। তারা এমন কিছু করতে চান না যাতে বর্তমান বা ভবিষ্যতের পদ-পদবী হারায়। তাছাড়া ধর্মটর্ম নিয়ে ঝামেলায় যাওয়ার দরকার নেই। হেজাবিরা কখন কী করে তার ঠিক নেই। বিখ্যাত সেই ১৫ সাংবাদিক শেখ হাসিনার সব বিষয়ে সমালোচক, আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত শক্তিশালী, তারাও কি হেজাবি নেতার জন্য আকুল হয়ে বিবৃতি দেননি! এটিও এক ধরনের প্রশ্রয় দেয়া। আমি যে লিখছি তার কারণ এ নয় যে, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আমাকে স্নেহ করেন তার কারণে এ লেখা। বরং আমার মনে হয়েছে হেজবিরা যা করেছে তা অন্যায় এবং এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত।

॥ দুই ॥

আবুল গাফ্ফার চৌধুরী কী বলেছেন?

তিনি সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের কথা বলেছেন ইসলাম ধর্মের আলোকে এবং যা বলেছেন তার একটিও অতিরঞ্জন নয়। তার বক্তব্য নিয়ে তিনি একটি বিবৃতিও দিয়েছেন। বিবৃতিতে কয়েকটি প্রসঙ্গ আছে। আমি আগে পাঠককে তা পড়তে বলব। তারপর তা নিয়ে প্রাসঙ্গিক আলোচনা করব। আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরী লিখেছেনÑ

১. ‘আমি আল্লাহর ৯৯ নাম সম্পর্কে দেবতাদের নাম বলিনি। আমি বলেছি, কালচারাল এসিমিলেশন কিভাবে প্রত্যেকটি সভ্যতা, এক সভ্যতা থেকে আরেক সভ্যতা উপকরণ গ্রহণ করে। বাংলা ভাষাকে হিন্দুদের ভাষা বলা হয়। এটা যে সত্য না এটা প্রমাণ করার জন্য বলেছিলাম যে, আরবী ভাষাও ছিল এককালীন কাফেরদের ভাষা। এটা বলা কি আরবী ভাষার অবমাননা?’

২. ‘তারপর বলেছি যে, আল্লাহর গুণাত্মক নামগুলো আগে কাফেরদের দেবতাদেরও নাম ছিল। তা না হলে রাসূলুল্লাহর পিতার নাম আবদুল্লাহ কি করে হয়? এটা তো আর মুসলমান নাম নয়। সেখানে আল্লাহ আছে, সে আল্লাহ ছিল কাবা শরিফের কাবার প্রতিষ্ঠিত মূর্তিগুলোর ভেতরে প্রধান মূর্তির নাম। অবশ্য কেউ কেউ এটাকে ইলাহ বলেন, ইলাহ থেকে আল্লাহ শব্দের উৎপত্তি। এভাবে আল্লাহর রাসূল আরবের যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেটা ধর্মবিরোধী নয় সেটাকে তিনি গ্রহণ করেছেন।’

‘এমনকি হজও ইসলামের হজ নয়, এটাও সেই দু’হাজার তিন হাজার বছর আগের কাফেরদের দ্বারা প্রবর্তিত হজ, তিনি সেখানে এক ঈশ্বর বার্তাটি যুক্ত করেছেন। এটাই আমি বলেছি যে, এটা হচ্ছে একাডেমিক আলোচনা এবং আমি সাহাবাদের সম্পর্কে কোন কটূক্তিই করিনি।’

৩. ‘আমি বলেছি যে, আমরা আরবী ভাষা না জেনে, আরবীতে সন্তানদের নামকরণ করি, সেটা ভুল। আমাদের নামকরণটার অর্থ জানা উচিত। যেমন আবু হোরায়রা। এটা রাসূলুল্লাহর সাহাবার প্রকৃত নাম নয়। রাসূলুল্লাহ তাঁকে ঠাট্টা করে বিড়ালের বাবা ডাকতেন। এখন আমরা যেহেতু আরবী জানি না, সেই বিড়ালের বাবার নামটা আমরা রাখি। যার কাশেম বলে কোন ছেলে নাই তিনি তার ছেলের নাম রাখেন আবুল কাশেম। এভাবে আরবী ভাষা না জানার জন্য অনেক বিভ্রান্তি হয় আমাদের দেশে।’

৪. ‘মোজাক্কার মোয়ান্নাস বুঝতে পারি না আরবের। সেজন্য আমরা স্ত্রীলোকের নাম রাখি, তারও উদাহরণ দিয়েছি। তারপর আবার রাসূল শব্দকে মনে করি রাসূল বললেই বুঝি আমাদের রাসূলুল্লাহকে অবমাননা করা হয়।’

“অথচ প-িত নেহেরু যখন সৌদি আরবে যান তখন তাকে বলা হয়েছিল মারহাবা ইয়া রাসূলে সালাম, ‘হে শান্তির দূত তোমাকে সংবর্ধনা জানাই।’ অথচ বাংলাদেশে গিয়ে যদি কেউ বলেন, রাসূল মানে এ্যাম্বাসেডর তাকে মুরতাদ বলা হবে।”

এর মধ্যে ভুল কি আছে তা তো কেউ উল্লেখ করেননি। তিনি মাদ্রাসা এবং সেক্যুলার দু’ধরনের প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা করেছেন। হজ করেছেন। নিউইয়র্কে যাওয়ার আগে ওমরাহ করেছেন। মাদ্রাসা যদি ধর্ম শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে থাকে তাহলে ধর্ম শিক্ষা তিনি ভালভাবেই করেছেন। নিউইয়র্কে যেসব হেজাবি হৈ হট্টগোল করছেন তাদের কয়জন মাদ্রাসায় ধর্মশিক্ষা করেছেন বা হজ করেছেন?

॥ তিন ॥

একবার পিয়ংইয়ংয়ে খবরের কাগজ দিয়ে কিছু একটা মুড়াচ্ছিলাম। সঙ্গের দোভাষী হা হা করে উঠলেন। কারণ কাগজে কিম ইল সুংয়ের একটি ছবি ছিল। তারা এমনই কন্ডিশন্ড যে, এটিকে তারা ব্ল্যাশফেমি তুল্য অপরাধ মনে করেন। আমাদেরও হয়েছে তেমনি। আরবী কাগজ দেখলে অনেকে ভক্তি ভরে তা মাথায় ঠেকান। আরবীতে কি খালি কোরান শরীফই লেখা হয়েছে, অন্যকিছু নয়? নামের শুরুতে মোহাম্মদ লিখলেই কি শুদ্ধ হলো, মুসলমান পরিচয় পেলাম? আর যে সব নাম আরবী হিসেবে আমরা রাখি তা কি যুক্তিযুক্ত?

একটি হাদিসে আছে, রসূল (সা.) বলেছিলেন, পুত্র সন্তানের নাম যেন আবুল কাশেম না রাখা হয়। তিনি বলেছিলেন, আমার নাম রাখো [অর্থাৎ মোহাম্মদ] কিন্তু আমার কুনইয়ার নাম [পুত্রের নাম] রেখ না। সুতরাং, আমাদের আবুল কাশেম যখন আরবি জগতে যান তখন ধরে নেয়া হয় তার পুত্রের নাম কাশেম। তাহলে ব্যাপার কী দাঁড়ায়?

আল্লাহ নিয়ে তারা যা বলেছেন, তা আকাট অজ্ঞতা। জনাব চৌধুরী ইতিহাসের সত্যটিই বলেছেন এবং তাতে কোন অন্যায় হয়নি। আমাদের দেশে কোন মুসলমান যদি ‘ভগবান’ বলে আপনি তাকে মুরতাদ বলবেন। ঠিক আছে। ‘খোদা’ বললে কী করবেন? মেনে নেবেন কেন? ইরানে যারা অগ্নিপূজক ছিলেন তারা তাদের উপাসককে বলতেন ‘খোদা’। আমাদের দেশে পারস্য সংস্কৃতির প্রভাব বেশি। অগ্নিপূজক ইরানিদের অনেকে পরে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সর্বশক্তিমানকে পুরানো উপাস্য ‘খোদা’ হিসেবেই সম্বোধন করতে থাকেন। তাহলে কি ঐ ইরানিরা মুসলমান ছিলেন না? কোরআনে ‘খোদা’ শব্দটি নেই।

আল্লাহু আকবর। এই আকবর তাই নাম হিসেবে ব্যবহার করা অনুচিত মনে করেন অনেকে। আমাদের এখানে সম্রাট আকবরের পর থেকে আকবর নামটি জনপ্রিয় হয়েছে। মুসলিম শরীফে দেখুন, রাসূলের (সা.) এক সাহাবীর নাম ছিল আকবর। তিনি তাঁর নাম পাল্টে রাখেন বাশীর। এখন আমি কি বলব, এই দেশে যাদের নাম আকবর রাখা হয়েছে তারা অনুচিত কাজ করেছেন?

আল্লাহর বন্ধু হচ্ছেন নবী ইব্রাহীম খলিলউল্লাহ। এখন আমরা যাদের ইব্রাহিম নামে ডাকি তারা কি আল্লাহর বন্ধু? আমার এক ভাইয়ের নাম কলিমউল্লাহ। ইসলামে কলিমউল্লাহ একজনই আছেন তিনি হলেন মুসা কলিমউল্লাহ যিনি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন। আমার ভাই কি সেই গোত্রীয়?

আমরা খালেক-মালেক বলে ডাকি না আমাদের অনেক বন্ধুকে। এ শব্দ দুটির অর্থ কী? অধীশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা। আপনার ছেলেদের নাম যদি ঐ রকম রাখেন তাহলে কী দাঁড়ায়? আমার এক অনুজপ্রতিম মারুফ সেনাবাহিনীতে ছিলেন। তিনি জানালেন, কুয়েতে তারা কয়েকজন গেছেন প্রশিক্ষণে। তার এক সহকর্মীর নাম মোহাম্মদ জামাল। এ নাম শুনে সবাই ঠাট্টা হাসাহাসি শুরু করল। কারণ জিজ্ঞাসা করার পর আরবীয় একজন বললেন, জামাল নামের অর্থ উট।

খায়রুল বাশার নাম তো আপনি রাখতেই পারেন না। কারণ সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ তো রসূল (সা.)। অনুজপ্রতিম আবদুল হান্নান এই নামকরণ নিয়ে একটি সুন্দর বই লিখেছেন। সেখানে তিনি বাশীর বিন মুহাম্মদ বিন আবদুল হামীদ আল মাসুমীর ‘ইসলামে নামকরা পদ্ধতি’ নিয়ে যে বই লিখেছেন যা মক্কা থেকে প্রকাশিত হয়েছে তা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। যিনি লিখেছেন তিনি বাঙালী, নাম ছিল খায়রুল বাশার। হান্নান তাঁর বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেনÑ

‘১৯৭৮ সালে সপরিবারে হজের আগে মক্কায় চলে এলাম।... কিছুদিন পরে মক্কায় উন্মুল কুরা ইউনিভার্সিটিতে আরবি ভাষা শিক্ষা কেন্দ্রে ভর্তি হলাম। কিন্তু নাম নিয়ে সেখানেও বড় গোলমাল। শিক্ষকগণ স্নেহমিশ্রিত উপদেশে বলেন, ইয়া বুনাইয়া, হাযাল ইস্্ম লা ইয়াজুক’ [হে বৎস, এই নাম জায়েজ নয়]। সহপাঠীরা টিপ্পনী কেটে বলে হা আনতা খায়রুর বাশার [তুমি ই কি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ!] কেউ কঠিন সুরে বলে, ‘হাযা হারাম, ইয়া আলী’ [ভাই সাহেব! এটা হারাম]... এসবের ঊর্ধ্বে যখন কেউ নির্দয় হয়ে বলত, ‘বাল হুয়া খায়রুল বাশার [বরং সে অমানুষ] তখন দুঃখ আর অভিমানের অন্ত থাকত না।... সয়ুদী আরবে সর্বত্রই আমাকে নাম নিয়ে নাজেহাল হতে হয়েছে।’ তিনি তারপর সউদী সরকারের অনুমতি নিয়ে নাম বদল করেন।

হান্নান আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক দিকের উল্লেখ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন ফার্সি, সংস্কৃতির প্রভাব আমাদের ওপর বেশি, শিয়া সম্প্রদায়ের সেই অর্থে। ফলে, নামকরণের ক্ষেত্রে অনেক সময় আমরা শিরক করি, শিয়ারা আলী (রা) কে অনেক সময় সবার ওপরে স্থান দেয়। যেমন ‘দমাদম মাস্কালন্দার, আলী-কা পহেলা নাম্বার।’ এটি শিরক এই অর্থে যে, সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূল (সা.), আলী (রা.) নন। সেই অর্থে গোলাম আলী বা গোলাম নবী নামকরণও তো ঠিক নয়। আমরা আল্লাহর বান্দা, নবী বা আলীর বান্দা হতে পারি না। সাজ্জাদ আলী হচ্ছেন আলীর সেজদাকারী। সেই অর্থে হেজাবিদের পরলোকগত নেতা গোলাম আযমের নাম কতটা যুক্তিযুক্ত? হাননান লিখেছেন, গোলাম আযম তার ছেলেদের নামের সঙ্গে আযমী যুক্ত করেছেন। “আযমী শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘অনারব’। প্রকৃতপক্ষে একজন বাঙালী শুধু অনারব নয়, একজন ‘অইংরেজ’, ‘অভারতীয়’ একজন ‘অচৈনিক’ ইত্যাদিও। নামের শেষে শুধু ‘অনারব’ চিহ্ন একটি ভুল শুধু নয়, বিভ্রান্তিকরও, বিশেষ করে তা যদি হয় মুসলমান আলেমদের পরিবারে।” নাহিদ নামের অর্থ জানেন? উচ্চবক্ষের মহিলা। মোসাম্মাদ-এর কোন মানে নেই। খাতুন বলা যেতে পারে বিবাহিতা হলে, আমরা বালিকা শিশুর নামের শেষেও ইসলামী ভাব আনার জন্য চোখ বুজে ‘খাতুন’ যোগ করি। এসব ক্ষেত্রে হেজাবিরা কী বলেন জানতে চাই। (চলবে)

প্রকাশিত : ১২ জুলাই ২০১৫

১২/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: