মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১১ আশ্বিন ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

চেন্নাইয়ের পতিতালয়ে অমানুষিক নির্যাতনে কেটে যায় বছর

প্রকাশিত : ১২ জুলাই ২০১৫
  • দেশে ফিরলেন পাচার হওয়া সাত তরুণী

গাফফার খান চৌধুরী ॥ অবশেষে নানা জটিলতা শেষে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের আন্তরিকায় মাতৃভূমিতে ফিরলেন ভারতে পাচার হওয়া সাত তরুণী। শনিবার মালদ্বীপ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামেন। তরুণীদের সঙ্গে ভারতীয় একটি এনজিওর তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলও ঢাকায় এসেছে। বিকেল সোয়া তিনটায় বিমানবন্দরে নামার পর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ তরুণীদের জবানবন্দী রেকর্ড করে। সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত জবানবন্দী গ্রহণ শেষ হয়। জবানবন্দী শেষে তরুণীদের তরফ থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থানায় মানবপাচার সংক্রান্ত সাতটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। তরুণীদের থানা থেকে রাজধানীর তেজগাঁও থানা চত্বরে অবস্থিত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। আজ রবিবার রাজধানীর বনানীতে লাইট হাউস এনজিওর কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে তরুণীদের যার যার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই তরুণীদের পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় পৌঁছেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন লাইট হাউস এনজিওর দলনেতা নিকোলাস বিশ্বাস।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক) আবু হেনা মোঃ রহমাতুল মুনীমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শনিবার সন্ধ্যায় জনকণ্ঠকে বলেন, তরুণীদের হস্তান্তর অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকছেন। তিনি ছাড়াও মাদ্রাজের ওই এনজিওর কর্মকর্তা দীলিপ কুমার ও জে আর সিলভানাস এবং একমাত্র মহিলা সদস্য প্রসন্ন গ্যানোমেনও উপস্থিত থাকছেন।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইম (সংঘবদ্ধ অপরাধ) শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার মীর্জা আবদুল্লাহেল বাকী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জনকণ্ঠকে জানান, সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত সাত তরুণীর জবানবন্দী রেকর্ড সম্পন্ন হয়। জবানবন্দীতে ভারতে পাচার থেকে শুরু করে চেন্নাইয়ের একটি পতিতালয়ে তাদের বিক্রি করে দেয়ার ঘটনাও উঠে এসেছে। তরুণীদের পতিতালয়ের অন্ধকার জীবনে নির্যাতনের নানা লোমহর্ষক কাহিনী প্রকাশ পেয়েছে। পাচারের সঙ্গে জড়িতদের নাম পরিচয়ও প্রকাশ করেছেন তরুণীরা। জবানবন্দী রেকর্ড শেষে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাত তরুণীর তরফ থেকে মানব পাচার সংক্রান্ত পৃথক সাতটি মামলা হয়েছে। মামলাগুলো সিআইডি তদন্ত শুরু করছে। মামলা তদন্তে সিআইডিকে সহায়তা করছে পুলিশ সদর দফতরের টিআইপি (ট্রাফিকিং ইন পার্সন) ও ভারতের একটি টাস্কফোর্স। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে তরুণীদের তেজগাঁও থানা চত্ব¡রে অবস্থিত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখা হয়েছে। এরপর তরুণীদের যার যার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। এমনকি সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেও এসব তরুণীদের নাম পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সামাজিক দিক বিবেচনা করেই এমন শর্ত দিয়েছে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে। বিশেষ এই শর্ত বাংলাদেশের এনজিও লাইট হাউসের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য হবে।

তরুণীদের ভারতের টাস্কফোর্স ও দেশে ফেরার পর দেয়া জবানবন্দীর বরাত দিয়ে সিআইডি সূত্র জানায়, পাচারের পর মাতৃভূমিতে ফিরতে পারা তরুণীদের বাড়ি যশোর ও খুলনা জেলায়। তারা বাংলাদেশে সাত থেকে দশ হাজার টাকা বেতন চাকরি করতেন। সুন্দরী তরুণীদের ভারতের বোম্বেতে মাসিক ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি লোভ দেখায় পাচারকারীরা। স্বাভাবিক কারণেই সেই ফাঁদে পা দেয় তারা। এরপর তাদের দেশের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে সীমান্ত এলাকার একটি বাড়িতে জড়ো করা হয়। সুযোগ বুঝে সীমান্তপথে তাদের পাচার করে দেয়া হয়। বাংলাদেশী মানবপাচারকারীরা সাত তরুণীকে মোটা অঙ্কের টাকায় ভারতীয় মানবপাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। ভারতীয় পাচারকারীরা তাদের বোম্বেতে ভাল চাকরি দেয়ার নাম করে মাদ্রাস নিয়ে যায়। সেখানে চেন্নাইয়ের একটি পতিতালয়ে তাদের মোটা অঙ্কের টাকায় বিক্রি করে দেয়া হয়। প্রায় একবছর সেই পতিতালয়েই তাদের অমানবিক জীবন কেটেছে। কারণে অকারণে তাদের উপর চলত নির্যাতন। সিগারেটের ছ্যাকা, মদ্যপ অবস্থায় খদ্দেরদের বেধড়ক মারধর, ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মস্তানদের মাসে মাসে টাকা আদায়, অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে অবস্থান করে বেআইনী কর্মকা-ে লিপ্ত থাকায় পয়সা না দিয়েই হুমকি ধমকি দিয়ে খদ্দের চলে যাওয়া, লাঠিপেটা, কিল, ঘুষি, লাথি, বেত্রাঘাতসহ নানাভাবে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চলত। এভাবেই অন্ধকার জগতে নির্মম নির্যাতনে কেটে যায় সাত তরুণীর দীর্ঘ একটি বছর।

গত বছর নবেম্বরের শেষ দিকে চেন্নাইয়ের ওই পতিতালয়ে অভিযান চালায় ভারতীয় পুলিশ। ভাষাগত পার্থক্যের কারণে সাত তরুণী ভারতীয় নাগরিক নয় বলে ভারতের পুলিশ নিশ্চিত হয়। পুলিশ সাত তরুণীকে গ্রেফতার করে। ভারতীয় পুলিশ তরুণীদের এমসিসিএসএস (মাদ্রাজ খ্রিস্টান কাউন্সিল ফর সোস্যাল সার্ভিস) নামের একটি এনজিওর সেফহোমে রাখে। বিষয়টি ভারতীয় পুলিশের তরফ থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানানো হয়। সেফহোমে থাকাকালীন ভারতের একটি টাস্কফোর্স তরুণীদের জবানবন্দী গ্রহণ করে। জবানবন্দীতে পাচার হওয়া থেকে শুরু করে পতিতালয়ে নির্যাতন সবই উঠে আসে। তরুণীরা নিজ দেশে ফিরতে ব্যাকুল হয়ে পড়েন। ভারতীয় টাস্কফোর্সের জিজ্ঞাসাবাদে পাচারের সঙ্গে জড়িত বাংলাদেশী ও ভারতীয়দের নামও প্রকাশ পায়। ভারতের তরফ থেকে সেসব তথ্যের অনুলিপি স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো হয়। সাত তরুণীর দেয়া নাম ঠিকানা সঠিক কিনা তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় ভারত। সেই সঙ্গে ভারতীয় টাস্কফোর্সের কাছে তরুণীদের দেয়া জবানবন্দীর অনুলিপিও পাঠানো হয়। সেসব জবানবন্দীর অনুলিপি পুলিশ সদর দফতরের টিআইপি শাখার কাছে সংরক্ষিত আছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে সাত তরুণীর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। তা পাঠানো হয় ভারতে। বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে পাচার হওয়া সাত তরুণীকে দেশে ফেরত আনার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। দুই দেশের সরকারের পাশাপাশি মাদ্রাজের এনজিওর তরফ থেকেও তরুণীদের দ্রুত বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা চলতে থাকে। মাদ্রাজের এনজিওটি বাংলাদেশে এ ধরনের ইস্যু নিয়ে কাজ করে এমন এনজিওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন। লাইট হাউস নামের একটি বাংলাদেশী এনজিওর যোগাযোগ হয় মাদ্রাসের ওই এনজিওর। লাইট হাউস ইতোপূর্বে ভারতে পাচার হওয়া এমন দশ তরুণীকে ইতোপূর্বে সফলতার সঙ্গে দেশে ফেরত আনতে সক্ষম হয়। তারই ধারাবাহিকতায় সাত তরুণীকে দেশে ফেরত আনতে কাজ শুরু করে লাইট হাউস। বাংলাদেশ ও ভারত সরকার এনজিওটিকে সার্বিক সহায়তা করতে থাকে।

লাইট হাউস এনজিওটির দলনেতা নিকোলাস বিশ্বাস জনকণ্ঠকে বলেন, চলতি বছরের শুরুতেই সাত তরুণীর দেশে ফেরার কথা ছিল। এ সংক্রান্ত সমস্ত প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রধান খালেদা জিয়া দেশব্যাপী টানা অবরোধের ডাক দেন। সেই অবরোধ চলে প্রায় তিন মাস। যে কারণে তরুণীদের দেশে ফেরা পিছিয়ে যায়।

লাইট হাউস এনজিওর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হারুণ অর রশীদ জনকণ্ঠকে বলেন, গত ৪ জুলাই তরুণীদের দেশে ফেরার চূড়ান্ত দিনক্ষণ নির্ধারিত ছিল। ওইদিন সাত তরুণীসহ মাদ্রাজের ওই এনজিওর তিনজন প্রতিনিধি চেন্নাই বিমানবন্দরে উপস্থিত হন। চেন্নাইয়ের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তরুণীদের কাছে আচমকা ভারত ত্যাগের ছাড়পত্র চেয়ে বসেন। এ নিয়ে মাদ্রাজের এনজিওর কর্তা ব্যক্তিদের সঙ্গে ইমিগ্রেশনের উর্ধতন কর্মকর্তাদের দেন দরবার চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বুঝতে পারেন। কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করে সবাইকে বাংলাদেশে যাওয়ার অনুমতি দেন। কিন্তু ততক্ষণে বিমানের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায়। বিমান যথারীতি আকাশে উড়াল দেয়। আর তাতেই আটকে যায় সাত তরুণীদের স্বপ্নের মাতৃভূমিতে ফেরা। গত বুধবার রাতেই মাদ্রাজের এনজিওটি সাত তরুণী ও তিন এনজিও কর্মকর্তার শনিবার বাংলাদেশে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করে।

প্রকাশিত : ১২ জুলাই ২০১৫

১২/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: