মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১১ আশ্বিন ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

মোয়াদোত্তীর্ণ রাইডার চলছে জোড়াতালি দিয়ে

প্রকাশিত : ১১ জুলাই ২০১৫

আনোয়ার রোজেন ॥ ‘ঝুলন্ত চেয়ার’ থেকে মুখভার করেই নামল সাত বছরের অদৃজা। কারণ চেয়ারে ‘ঝুঁকিমুক্ত’ অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য রাইডচালকের পাশাপাশি বাবাও একাধিকবার অদৃজাকে ঠিকঠাক মতো বসানোর চেষ্টা করেছেন। আবার অদৃজার ইচ্ছে ছিল ভাই লাবিবের পাশে বসার। কিন্তু ভাইয়ের ‘নিরাপত্তার’ জন্য জোড়া চেয়ারের একটিতে বসে ছিলেন মা। তাই খুশির পরিবর্তে ঝুলন্ত চেয়ার চক্রাকারে ঘুরার সময় সে সারক্ষণ ভয়ে ছিল- এই বুঝি পড়ে গেল! এই চিত্র শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশুপার্কের। প্রতিবছর ঈদে রাজধানীতে অবস্থানকারী মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় পার্কটি। অন্য বিনোদনকেন্দ্রগুলো মূল শহর থেকে দূরে ও ব্যয়বহুল হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরা তাদের সন্তানদের নিয়ে এখানেই ভিড় করেন। কিন্তু বছরের পর বছর একই চিত্র দেখছেন তারা। কোন উন্নতি নেই পার্কের। মেয়াদোত্তীর্ণ রাইডগুলো চলছে জোড়াতালি দিয়ে। পার্কে সর্বশেষ রাইডটি বসানো হয় ১৯৯৭ সালে। এরপর ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও যুক্ত হয়নি আকর্ষণীয় কোন রাইড। তাই এবারের ঈদেও থাকছে না নতুন কোন বিনোদনের ব্যবস্থা।

১৯৭৯ সালে পর্যটন কর্পোরেশনের অধীনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ১৫ একর জমির ওপর শিশুপার্কটি নির্মিত হয়। একই বছরের ১১ জুলাই আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় পার্কটির। অবিভক্ত ডিসিসির পর বর্তমানে পার্কটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। পার্কে মোট রাইড সংখ্যা মাত্র ১৩টি। শুরুতে পার্কে আনন্দঘূর্ণি, লম্ফঝম্প, ঝুলন্ত চেয়ার, রোমাঞ্চ চক্র, এসো গাড়ি চড়ি, চাকা পায়ে চলি, ফুলদানি আমেজ, রেলগাড়ি, বিস্ময় চক্র ইত্যাদি খেলনা স্থাপন করা হয়। এরপর উড়ন্ত বিমান ও উড়ন্ত নভোযান নামে দুটি নতুন খেলনা সংযোজন করা হয় ১৯৯২ সালে। সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে এক আসনবিশিষ্ট এফ-৬ জঙ্গী বিমানটি পার্কে বসানো হয়। জানা গেছে, জাপান থেকে আনা এ রাইডগুলো ব্যবহারের মেয়াদ ছিল ১০ বছর। মেয়াদোত্তীর্ণ এসব রাইডের প্রত্যেকটির এখন লক্কড়-ঝক্কড় অবস্থা। জীর্ণ ও আকর্ষণহীন রাইডগুলো মেরামত করে চালানো হচ্ছে। চালানোর সময়ই ‘ম্যার ম্যার’ শব্দে রাইডগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দৈন্যদশা প্রকট হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ রাইডই যে শতভাগ নিরাপদ নয় তা স্বীকারও করেছেন কয়েকজন চালক। কিন্তু বিকল্প না থাকায় দুর্ঘটনার শঙ্কা নিয়েই এগুলোতে চড়ছেন শিশু ও তাদের অভিভাবকরা।

সোমবার দুপুরে শিশুপার্ক ঘুরে দেখা যায়, সিটবেল্ট না থাকায় ঝুলন্ত চেয়ারে বাচ্চাদের ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত’ করার স্বার্থে এতে বড়রাও চড়ছেন। নিজ হাতে গাড়ি চালানো শিশুদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি রাইড। পার্কের একপাশে অনেকটা জায়গা ঘেরাও দিয়ে রেখে বাচ্চাদের আকৃষ্ট করার জন্য বোর্ডে লেখা ‘এসো গাড়ি চড়ি’। পার্ক সূত্রে জানা গেল, শুরুতে দুই আসনের ব্যাটারিচালিত গাড়ি ছিল এক ডজন। এখন আছে মাত্র তিনটি। দেখা গেল, কিছুক্ষণ চালানোর পরই একটি শিশুর গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। কাছেই থাকা রাইডের রক্ষণাবেক্ষণকারী সেটি মেরামত করে দিলেন। আবার চললেও শিশুটি ততক্ষণে চালানোর উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে।

পশ্চিম পার্শে¦ থাকা শেকলে ঝুলানো তিনটি চেয়ারের দুটিই ব্যবহার অনুপযোগী। লোহার কাঠামোয় তৈরি ‘ঢেঁকির’ প্রতিও কারোর আকর্ষণ দেখা গেল না। বেবি সাইকেল চালানোর জায়াগাটি নির্ধারিত থাকলেও সেখানে একটিও সাইকেল নেই। টানানো ক্যানভাস শতচ্ছিন্ন হওয়ায় ‘লম্ফঝম্ফ’ নামের রাইডটি এখন বন্ধ। ‘চাকা পায়ে চলা’ খেলনাটি বর্তমানে আর কোন অস্তিত্বই নেই। তবে সোনামণিদের রেলগাড়িটার অবস্থা তুলনামূলক ভাল। বেশিরভাগ দর্শনার্থী শিশু ও তাদের অভিভাবকরা ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে এটাতে চড়েন। রেলের প্লাটফর্মের পাশেই ম্যাজিক বোট ও নাগরদোলা। নৌকার কৃত্রিম দুলুনিতেই বেশি আনন্দ পেতে দেখা গেল শিশু ও অভিাভাবকদের। এছাড়া পার্কে ভ্রাম্যমাণ বিনোদনের ব্যবস্থা হিসেবে ৯-ডি মুভি উপভোগের সুযোগ থাকলেও দর্শনার্থীদের ওটাতে তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি।

রমজান মাসে সন্ধ্যার আগেই পার্ক বন্ধ হয়ে যায়। তবে ঈদের দিন ও পরবর্তী আরও পাঁচদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পার্ক খোলা রাখা হয় । জানা গেছে, সন্ধ্যার পর পার্কের ভেতরে যে আলো থাকে তা পর্যাপ্ত নয়। তাই সে সময় অনেকেই যথাযথ নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন। একসঙ্গে প্রচুর লোকসমাগম হওয়ায় পার্কের পরিবেশও তখন অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তবে জানা গেছে, মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের জন্য কম খরচে বিনোদনের জন্য রাজধানীতে তেমন কোন ব্যবস্থা না থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা এখানে আসেন।

জানা গেছে, নানা রকম সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত পার্কটি বেশ লাভজনক। বর্তমানে পার্কের প্রবেশমূল্য মাত্র আট টাকা। আর ৯-ডি মুভি (৬০ টাকা) ও ম্যাজিক বোট (২৫ টাকা) ছাড়া প্রতিটি রাইডের টিকিট মাত্র ছয় টাকা। পার্কের ব্যবস্থাপক মো. নুরুজ্জামান জনকণ্ঠকে বলেন, ব্যবসার উদ্দেশ্যে নয়, সাধারণ মানুষকে বিনোদন সুবিধা দেয়ার জন্য টিকেটের নামমাত্র মূল্য রাখা হয়ে থাকে। তবুও প্রতিদিন (পার্কের সাপ্তাহিক বন্ধের দিন ছাড়া) ১০ হাজার এবং ছুটি বা উৎসবের দিনগুলোতে আয় দুই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা পার্কের সব বিনোদন সুবিধা পায় বিনামূল্যে। লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও পার্কে নতুন কোন রাইড কেন যুক্ত করা হচ্ছে নাÑ এ প্রশ্নের জবাবে নুরুজ্জামান বলেন, উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশের কারণে পার্কের আধুনিকায়ন, নতুন রাইড সংযোজন ও সংস্কার কাজ ঝুলে ছিল। তবে এখন সে সমস্যা মিটেছে। শীঘ্রই এ সংক্রান্ত প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শুরু হবে। উৎসব পার্বণে সাধারণ রাজধানীবাসীর আনন্দে মেতে উঠার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ এ নগরীতে নেই। তাই এই শিশুপার্কের পাশাপাশি রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানা, শ্যামলীর শিশুমেলা, পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লাই তাদের বিনোদনের অন্যতম ভরসা। জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে এসব বিনোদন কেন্দ্রে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ধোয়া মোছার কাজ। নতুন কোনো বিনোদন উপকরণ না থাকলেও ঈদে সব বিনোদনকেন্দ্রই রঙিন আলোয় আলোকিত হবে।

প্রকাশিত : ১১ জুলাই ২০১৫

১১/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: