১৩ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

বৃষ্টির চোখের পানি কারও মন গলাতে পারেনি


শর্মী চক্রবর্তী ॥ অনাগত সন্তানের পিতৃ পরিচয় এবং প্রেমিকের কাছে স্ত্রীর মর্যাদা না পেয়ে আত্মহত্যা করেছেন সরকারী বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থী ফাতেমা-তুজ-জোহরা বৃষ্টি। বাংলা কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি এইচ এম জাহিদ সোহাগের প্রেমের নামে প্রতারণার শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া সেই ফাতেমা-তুজ-জোহরা বৃষ্টি নিজেও কাফরুল থানা ছাত্রলীগের ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদিকা ছিলেন। আর পড়তেন সরকারী বাঙলা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান তৃতীয় বর্ষে। তার প্রেমিক সোহাগ একই কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী ও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি। একই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাধে দু’জনের মধ্যে পরিচয়। পরিচয় থেকে প্রেম ও পরে তার শারীরিক সম্পর্কে গড়ায়। বিয়ের কথা বলাতেই বাদ সাধে সম্পর্কে। প্রেমিকা বৃষ্টি তখন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে আসল চেহারা বেরিয়ে আসে সোহাগের। বৃষ্টি বারবার তাকে বিয়ের জন্য চাপ দিলেও সোহাগ এতে রাজি না হয়ে উল্টো গর্ভপাতের জন্য চাপ দিতে থাকে। এক পর্যায়ে বৃষ্টির সঙ্গে যোগাযোগই বন্ধ করে দেয়।

অনাগত সন্তানের পিতৃ পরিচয়ের দাবি নিয়ে লোকলজ্জা উপেক্ষা করে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় বৃষ্টি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতার কাছেও গিয়েছিলেন তিনি। বৃষ্টির চোখের পানি কারও মনই গলাতে পারেনি। সবাই ‘দেখব’ ‘দেখছি’ বলে লোক দেখানো সান্ত¡নার বাণী শোনান। এমনকি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরাও বিষয়টি জানতেন। কেউ বিষয়টি সুরাহা করার প্রয়োজন বোধ করেননি। এমনকি বৃষ্টির মৃত্যুর পরও তার পরিবারের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। আর যারা তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চাচ্ছে তাদেরকেই হুমকির শিকার হতে হচ্ছে।

যখন কোথাও কিছু হলো না সব হারিয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় বৃষ্টি। ১৩ জুন নিজ বাসার সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে নিয়ে যান হাসপাতালে। সেখানে ৬ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর হার মানে। ১৯ জুন তার মৃত্যু হয় হাসপাতালে। সহপাঠীরা জানায়, বৃষ্টির মৃত্যুর পর জাহিদ ও তার বন্ধু ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অনিকের হুমকির মুখে মামলা না করে বৃষ্টির লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই খুব গোপনে তার নানার বাড়ি পিরোজপুরে নিয়ে দাফন করতে বাধ্য হয় তার পরিবার।

২৭ জুন বৃষ্টির বাবা তোফাজ্জল হোসেন জাহিদের বিরুদ্ধে কাফরুল থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু খবর পেয়ে জাহিদ ও তার সহযোগী অনিক থানায় গিয়ে বৃষ্টির পরিবারের সদস্যদের হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন। মামলা না নিতে চাপ দেয় পুলিশকেও। কিন্তু শেষে উর্ধতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে পুলিশ মামলা নিয়ে গ্রেফতার করে জাহিদকে। পরবর্তীতে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

নিহত বৃষ্টির মামা ও তার সহপাঠীরা জানায়, বৃষ্টি ও জাহিদ দু’জনই ছাত্রলীগের কলেজ শাখার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এর সূত্র ধরেই দু’জনের পরিচয়। পরিচয় থেকে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। প্রায় সময় তারা একসঙ্গে চলাফেরা করত এমনকি দলীয় অনুষ্ঠানেও দু’জনে যেত। তাদের সম্পর্কের কথা কলেজের অধিকাংশ শিক্ষার্থী জানে। এই সম্পর্ক দিনে দিনে গভীর হতে থাকে। একপর্যায়ে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ছাত্রলীগ নেতা জাহিদ বৃষ্টির সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক করেন। এরপর কয়েকবার বৃষ্টি জাহিদকে বিয়ের কথা বলে কিন্তু তা সে এড়িয়ে যায়। কয়েক মাস আগে বৃষ্টি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই জাহিদ বৃষ্টিকে এড়িয়ে চলা শুরু করে।

একপর্যায়ে বৃষ্টিকে বুঝিয়ে এ্যাবরশন করানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বৃষ্টি এ্যাবরশন করতে রাজি হয়নি। এরপর থেকে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দেয় জাহিদ। কিন্তু মাঝেমধ্যেই জাহিদ তার কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান অনিক, জাহিদ মুন্সি, আবদুল আজিজ ওরফে তানভীর, শাকিল আহমেদ ও চঞ্চল দাসসহ বৃষ্টি ও তার পরিবারকে নানারকম ভয়ভীতি দেখাতে থাকে। বিষয়টি নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করতে নিষেধ করা হয়।

এ বিষয়ে গত ২ মে কাফরুল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে বৃষ্টি। জিডি নং ৭২। কিন্তু আসামিরা ছাত্রলীগ নেতা হওয়ায় পুলিশ বিষয়টি আমলে নেয়নি। নিজে ছাত্রলীগের পদধারী নেত্রী হলেও অন্যায়ের কোন বিচার না পেয়ে ক্রমেই বিমর্ষ হয়ে যাচ্ছিলেন বৃষ্টি।

বৃষ্টির বাবা তোফাজ্জল হোসেন জানান, পূর্ব শেওড়াপাড়ার ১৩২০ নম্বর বাড়ির ৫ম তলায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন বৃষ্টি। বাবা তোফাজ্জল হোসেন একজন ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী। ১৩ জুন জাহিদ ও অনিকসহ অন্যরা বৃষ্টির বাসায় যায়। এ সময় তারা বৃষ্টিকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করে। এই অপমান সইতে না পেরে সেদিনই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে সে। পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নিয়ে যায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেখান থেকে নেয়া হয় কেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতালে।

সেখানেই ৬ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মৃত্যু হয় তার। পরিবারের সদস্যরা কেউ তখন সব ঘটনা জানত না তাই ময়নাতদন্ত ছাড়াই মেয়েকে গ্রামের বাড়িতে দাফন করার পর। পরে মেয়ের বান্ধবীর কাছে জানতে পান তার মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা ছিল প্রেমিকের প্ররোচনায় তার মৃত্যু হয়েছে। পরে তিনি মামলা করেন। মামলা নম্বর ৮২। মামলায় সরকারী বাঙলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান অনিককেও আসামি করা হয়েছে। ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, জাহিদ সরকারী দলের এক এমপির ঘনিষ্ঠ। তার রাজনীতি করার কারণেই এত বড় অন্যায় করেও বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছিল সে। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের প্রভাবশালী একজনের বাড়িও জাহিদের এলাকায়। তারও নেপথ্য সহযোগিতা রয়েছে। এদের কারণে পুলিশ প্রথমে মামলাও নিতে চায়নি। পরে মামলা নিলেও কেবল আত্মহত্যার প্ররোচনার ধারাটি উল্লেখ করা হয়েছে। থানায়ও জামাই আদরে ছিলেন জাহিদ।

আদালতের মাধ্যমে তাকে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। কোন রিমান্ডও চায়নি পুলিশ। উল্টো জাহিদকে গ্রেফতারের পর থেকেই একের পর এক হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন নিহত বৃষ্টির পরিবারের সদস্যরা। নিহত বৃষ্টির মামা জুয়েল রানা বলেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।

এসব বিষয়ে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুল আলম জানান, জাহিদকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। যদি প্রয়োজন হয় তবেই তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মেয়ের মৃত্যুর পর দিশেহারা তার পরিবার। আদৌ তারা তাদের মেয়ের হত্যার বিচার পাবেন কিনা তা নিয়ে সন্ধিহান। মেয়ের মৃত্যুর ১৫ দিনেও কোন অগ্রগতি না পাওয়ায় ৭ জুলাই সকালে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে বৃষ্টির পরিবার ও সহপাঠীরা। ভয়ে আতঙ্কে এখন দিন কাটাচ্ছে তারা। এই মামলার আরেক আসামি অনিক বিভিন্ন ভাবে পরিবারের অন্য সদস্যদের মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। এমনকি বৃষ্টির পরিবারের পাশে যারাই দাঁড়াচ্ছে তাদেরকেও হুমকি দিচ্ছে। মানববন্ধনে সন্তান হারানো পিতা আকুতি করে বলেন, আমরা জাহিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। সে আমার মেয়েকে আমার বুক থেকে কেড়ে নিয়েছে। আমার টাকা পয়সা নাই কিন্তু খুব কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা করিয়েছি। গরিবের সন্তানরাও যে পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হতে পারে তাই আমার ছেলে মেয়েকে যত কষ্টই হোক আমি পড়ালেখা করিয়েছি। কিন্তু এই খুনী আমার সব স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে। সে আমার মেয়েকে খুন করেছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত খুনীকে রিমান্ডে নেয়নি পুলিশ। এমনকি আরেক আসামি মজিবুর রহমান অনিককেও গ্রেফতার করা হয়নি। আমি চাই তাদের দ্রুত শাস্তি দেয়া হোক। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতাও কামনা করে।