২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

ঈদমেলা ॥ মুঘলদের কীর্তি


বাঙালীর মেলার সবচেয়ে বড় আবেদন বৈশাখে। চৈত্রের শেষ প্রহরেই গোনা শুরু হয় কবে বৈশাখী মেলা। এর বাইরে পোর বছর কোথাও না কোথাও কোন না কোন মেলা লেগেই আছে। এলাকা বিশেষে একেক মেলার ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য আলাদা। তবে সবচেয়ে বেশি মেলার দাবিদার রাজধানী ঢাকা, যেখানে বছরে মোট এক শ’ ৪১টি মেলা বসে। সবচেয়ে কম মেলা হয় বান্দরবানে মাত্র দুইটি। ধর্মীয়ভাবে সার্বজনীন যে মেলা প্রতিবছর দেশজুড়ে নির্দিষ্ট দিনে বসে তা হলো ঈদমেলা। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এই ঈদমেলার নির্দিষ্ট কোন জায়গা নেই। রাজধানী থেকে শুরু করে সব জেলা শহর উপজেলা সদর এবং ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে এই মেলা বসে। ঠিক কবে কখন কোথায় এই মেলার সূত্রপাত হয় তা জানা যায় না। অবশ্য দেশের কোন মেলার উৎসের সন্ধান করে পাওয়া যায়নি কিভাবে মেলাগুলো এলো। হাতে গোনা কয়েকটি মেলার সময় কাল ও সেই সময়ের ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করে অনুমানভিত্তিক একটা ধারণা করা যায় মাত্র। এক কথায় বলা যায় বাঙালীর শিকড়ের ঐতিহ্যে বাংলাদেশ মেলার দেশ। সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশে মেলা হয় তো কম। তবে মেজাজ বৈশিষ্ট্য ও মানুষে মানুষের মিলনের বন্ধনে একমাত্র বাংলাদেশই গর্ব করে বলতে পারে সংস্কৃতির পরিম-লে ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছে। সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি মেলা বসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বছরে অন্তত দুই হাজার। আর বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার। তার মধ্যে আড়াই শ’র মতো মেলার নাম পাওয়া যায়। বাকিগুলো এলাকা ও অঞ্চল ভিত্তিক। মেলার বৈচিত্র্যে বাঙালীর মেলার কাছাকাছি কেউ নেই। মেলার গোড়ার ইতিহাস ঘাটলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে তা হলোÑ মানুষের তৈরি বা সংগ্রহ করা পণ্যের বিনিময় তথা বিকিকিনির জন্য সুবিধা মতো কোন জায়গায়, মৌসুমে ও মেয়াদে লোক সমাবেশের আয়োজন। প্রাথমিক অবস্থায় স্থান কাল মেয়াদ নির্ধারণে কোন পরিকল্পনা ছিল না। তখনকার মেলা অপরিকল্পিত অনিয়ন্ত্রিত ও আকষ্মিক। পরবর্তী সময়ে মেলার মুনাফা কড়ি গোনার সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে একটা হিসাব কষে মেলার প্রসার ও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। এই ধরনের মেলার অনেক পথ আছে। অন্যতম একটি পথ হলোÑ ব্যক্তিগত বা প্রতিষ্ঠানের মুনাফা অর্জনে সনদ বা হুকুমে মেলা বসানো। এমন মেলা ইতিহাসে শত সহস্র আছে। প্রথমে এ ধরনের একটি মেলার সনদ দেন ষোড়শ শতকে কেমব্রিজ শহরে ইংল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ এ্যাডওয়ার্ড। মেলার দোকানপাট থেকে যে আয় হয় তার সিংহভাগ চলে যায় শহরের রাজার দরবারে। তখন এই হিসাব ছিল প্রায় সাত শ’ পাউন্ড। এই অর্থ ব্যয় হতো জনকল্যাণে। পুরোপুরি জনকল্যাণের প্রথম মেলা বার্থোনোমিউয়ের মেলা। আয়োজন করে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম হেনরীর বিদূষক রাহিয়ার। এই মেলার আয়ের সবই চলে যেত মঠ ও হাসপাতালে। সাংস্কৃতিক ও বিনোদনের মেলা বিশেষ দিনে বিশেষ স্থানে যেভাবে বসে এর মধ্যে সামাজিক ও গোষ্ঠী অনুষঙ্গ যোগ হয়। এইসব মেলায় লোক সমাগমের পাশাপশি বিভিন্নভাবে আসা পণ্যের বেচাকেনা হয়। সব ধরনের মানুষের পণ্যের চাহিদা থাকে। দোকানিরা পসরা সাজিয়ে বসে। অভিনয় যাত্রাগান পালাগান জারি সারি কবিগান ইত্যাদি সাংস্কৃতিক পণ্যও মেলার আকর্ষণ বাড়ায়। ধীরে ধীরে এমন মেলা সামজিক পরিম-লে যোগ হয়ে সংস্কৃতির শিকড়ের ধারাকে টেনে তোলে। তারপর মেলার যাত্রাপথ আর থেমে নেই। দিনে দিনে এগিয়েই চলেছে। মেলার এতসব পুঁথিপাঠের বাইরে ধর্মীয় ঈদমেলা আপন গতিতেই স্থান করে নিয়েছে। প্রথম কবে কোথায় এই ঈদমেলার সূত্রপাত হয় সেই হিসাব মেলা অনেকটাই কঠিন। কারও মতে মেলার সংখ্যা যখন রাজধানী ঢাকায় বেশি, সেই হিসেবে ঈদমেলার উৎস এই ঢাকা। এবার ইতিহাসের ধারাবহিকতায় কি আসে তা দেখা যাক- চার শ’ বছর বদলে গেল ঢাকার নসিব। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রান্তবর্তী বাংলা সুবার রাজধানীর মর্যাদা পেল বঙ্গীতলোত্তমা ঢাকা নগরী। প্রথম নামকরণ করা হলো জাহাঙ্গীরনগর। পরে জাহাঙ্গীরাবাদ। বাংলা সুবার ভূতপূর্ব সুবাদার জাহাঙ্গীর কুলি খানের আকস্মিক মৃত্যুতে শেখ আলাউদ্দিন ইসলাম খান চিশতির ওপর এই সুবার দায়িত্ব ন্যস্ত হয়। শাসনভার গ্রহণের যাত্রাপথে নতুন সুবাদারের দুই বছর দেরি হয়। শেষপর্যন্ত রাজকীয় নৌবহরে করে অজস্র অমাত্য ও সৈন্যসামন্তসহ সুবাদার ইসলাম খান ঢাকায় পৌঁছান। সুবাদারের শাহী বজরা চাঁদনী নদীর তীড়ে নোঙ্গরের সঙ্গেই সুবাদার যে স্থানটিতে পদার্পণ করেন উল্লসিত জনতা ওই জায়গার নামকরণ করে ইসলামপুর। দিল্লীর মসনদের অমিত পরাক্রমশালী শাহানশাহ নুরুদ্দিন মুহম্মদ জাহাঙ্গীরের সুযোগ্য সিপাহসালার ও সুবাদার ইসলাম খান চিশতি ঢাকায় পৌঁছেই বাংলা সুবার রাজধানী ঘোষণা করেন। দিল্লীর মহামহিম শাহানশাহ্র অতি বিশ্বস্ত ও অমিতবিক্রম সুবাদার শাহী বজরায় বসে জনতার উদ্দেশে বলেন, সামনে রমজান শেষে পবিত্র ঈদের দিনে ঈদমেলা অনুষ্ঠিত হবে। এই ঈদমেলায় সাধারণের সঙ্গে তিনি অংশ নেবেন। আনন্দ উৎসবের পালায় নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হবে। ইসলাম খান চিশতির নৌবহরের প্রধান অধিকর্তা মির ই বহর ইহতিমার খানের ছেলে যুবক সিপাহসালার মীর্জা নাথান ঈদমেলার সার্বিক দায়িত্ব নিয়ে তা সফল করে। বিষয়টি দিল্লীর মসনদে পৌঁছার সঙ্গেই শাহী ফরমান জারি হয়ে যায় সুবা বাংলার রাজধানীতে ঈদমেলা হবে প্রতিবছর। সেদিনের জাহাঙ্গীরনগর পরে জাহাঙ্গীরাবাদ যা আজকের ঢাকা সেখানেই ঈদমেলার সূত্রপাত ঘটে, এমনটি জানা যায়। তবে ইতিহাসবিদদের মতে এর বাইরেও ঈদমেলার কোন ইতিহাস থাকতেও পারে। যেভাবেই থাকুক বাংলাদেশের মেলার যে ২০টি ধর্মীয় উপলক্ষ আছে তার মধ্যে অন্যতম ঈদমেলা। ঈদের দিন দেশের প্রতিটি স্থানে এই মেলা বসে। ঈদ-উল-ফিতরের নামাজ শেষ হওয়ার পরই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে একে অপরের বাড়িতে যায়। দিনভর মানুষে মানুষে মিলন বন্ধনের এই ধারায় সংস্কৃতির আনন্দের পালাও শুরু হয়ে যায়। শহরের পথের ধারে, পার্কে, উন্মুক্ত স্থানে বেলুন খেলনাপাতি মৃৎ শিল্পের নানা ধরনের পসরা নিয়ে বসে দোকানিরা। অনেক শিল্পকর্ম থাকে এই মেলায়। ঈদের দিনে মিষ্টিমুখের ব্যবস্থা থাকে প্রতি বাড়িতে (বিশেষ করে সেমাই) সে জন্য মিষ্টান্ন এই মেলায় থাকে না। এর পরিবর্তে মেলে আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিংকস, চকলেট ইত্যাদি। ঈদেমেলায় একটা সময় গ্রামে লোকজ সংস্কৃতির আসর বসত।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে