২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

৮০ ভাগ দুর্ঘটনার কারণ


খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥ ঈদে ঘরমুখী দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের জন্য স্পেশাল সার্ভিসের নামে প্রস্তুত করা হচ্ছে চলাচলের অযোগ্য, লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা শতাধিক লঞ্চ। ত্রুটিপূর্ণ নকশায় নির্মাণ করা আর অদক্ষ চালকের এসব আনফিট লঞ্চে আগামী ১৫ জুলাই থেকে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করা হবে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে দেশের ৮০ ভাগ লঞ্চ দুর্ঘটনা হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ নকশা ও অদক্ষ চালকের কারণে।

সূত্রমতে, লঞ্চ মালিকরা বিআইডব্লিউটিএ থেকে লঞ্চ নির্মাণের জন্য নকশা পাস করিয়ে নিলেও ডকইয়ার্ডে গিয়ে নিজেদের মতো করে লঞ্চ তৈরি করেন। দেড়তলার অনুমোদন নিয়ে তৈরি করছে তিন থেকে সাড়ে তিনতলা লঞ্চ। ত্রুটিপূর্ণ এসব লঞ্চ সামান্য দুর্যোগে একটু কাত হলেই ডুবে যায়। গত ১৫ বছরে ত্রুটিপূর্ণ নকশায় নির্মাণ করা আর অদক্ষ চালকের কারণে শতাধিক লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৫ সহস্রাধিক মানুষ। সূত্রে আরও জানা গেছে, দেশের ১৩ হাজার লঞ্চের মধ্যে যাত্রীবাহী নৌযান ২ হাজার ২২৫টি। যাত্রীবাহী নৌযানের মধ্যে বছরে ফিটনেস পরীক্ষা বা সার্ভে করা হয় মাত্র ৮৫০ থেকে ৯শ’টির। সার্ভে না করার কারণে ফিটনেসবিহীন নৌযান চলাচল করায় প্রতিবছরই ঘটছে নৌ দুর্ঘটনা, মৃত্যু হচ্ছে শত শত মানুষের। ফলে সারাবছরই নৌপথে চলাচলকারী যাত্রীরা থাকেন চরম ঝুঁকির মধ্যে। ঈদ উপলক্ষে ঢাকা-বরিশাল, চাঁদপুর, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে নিয়মিত যতগুলো লঞ্চ চলাচল করে এবার তার চেয়েও ৪/৫ গুণ বেশি স্পেশাল সার্ভিসে লঞ্চ চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন ওইসব ক্রটিপূর্ণ নকশায় নির্মিত লঞ্চ মালিকরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোমধ্যে বিভিন্ন ডকইয়ার্ডে আনফিট লঞ্চগুলোকে জোড়াতালি দিয়ে রং করার মাধ্যমে চাকচিক্যের কাজ শেষ করে প্রস্তুত করা হয়েছে ঈদে দক্ষিণবঙ্গের ঘরমুখী মানুষের ঘরে ফেরার পথে বহনের জন্য। কিন্তু ঈদের আনন্দে ঘরমুখী দক্ষিণাঞ্চলবাসীর ঘরে ফেরা কতটা নিরাপদ হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ এসব লঞ্চে নেই দক্ষ ও যোগ্য চালক। তারপরেও ত্রুটিযুক্ত নৌযানগুলোকে ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিটের মাধ্যমে চলাচলের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের (ডিজি শিপিং) ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা এসব নৌযানকে বৈধতা দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অপরদিকে জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সংস্থা দুটির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছেন ওইসব অসাধু কর্মকর্তারা। অভিযোগ উঠেছে, ডিজি শিপিংয়ের কতিপয় দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার ১০ হাজার থেকে শুরু করে লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চের ফিটনেস সনদ দিচ্ছেন। ওই সদন অনুযায়ী রুট পারমিট ও সময়সূচীর অনুমোদন করছেন বিআইডব্লিউটিএ’র ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। এ ক্ষেত্রেও বড় অংকের টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে জানা গেছে। লঞ্চ মালিকরা টাকা দেয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবে কর্মকর্তাদের ওপর চাঁপ তৈরি করেও কাজ আদায় করে নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী লঞ্চ মালিকদের যোগসাজশে ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চগুলো চলাচল করায় দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন শত শত মানুষ। সরকারী হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭৬ সাল থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত ৪০ বছরে ৫৬৭টি বড় নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪ হাজার ৬৩৫ জন। প্রায় ৫শ’ জন নিখোঁজ ও আহত হয়েছেন প্রায় ৪৬২ জন। তবে বেসরকারী হিসাবে নৌ-দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা অনেকবেশি। জানা গেছে, গত ৪০ বছরে এসব দুর্ঘটনায় ২০ হাজার মামলা হয়েছে। এরমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৪১টি। বাকি ১৯ হাজার ৯৫৯টি মামলার কোনো হদিস নেই। তাছাড়াও যেসব মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে তার কোনটির শাস্তি হয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ চলাচলের অনুমোদন প্রসঙ্গে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক এম. জাকিউর রহমান ভূঁইয়া বলেন, অনেক ছোট ছোট লঞ্চ চলাচল করছে সত্য। এগুলোর কাঠামোও ভাল নয়। হঠাৎ করে এসব লঞ্চ বন্ধ করাও সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, এবারের ঈদকে অধিকতর নিরাপদ করতে বিআইডব্লিউটিএ’র একাধিক মোবাইল টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিম লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই বন্ধসহ সবরকমের অনিয়ম ঠেকাবে।