২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

দ্বিতীয় দিনেও ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো


দ্বিতীয় দিনেও ভিড় ছিল চোখে  পড়ার মতো

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঈদে যারা পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়ি যেতে চান তাদের কাছে সোনার হরিণ হলো টিকেট। আর নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে ট্রেনের টিকেটের বিকল্প নেই। তাই তো ১০-১২ ঘণ্টা অপেক্ষা। অর্থাৎ রাতভর প্লাটফরমে। বৃষ্টি আর টানা দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে টিকেট সংগ্রহ করে হাসিমুখে বাড়ি ফিরেছেন অনেকেই। আবার টিকেট না পেয়েও বাড়ি ফেরার নজির আছে। কমলাপুর রেল স্টেশনের কাউন্টারে-কাউন্টারে এখন শুধু টিকেটের খোঁজ। সবারই আপ্রাণ চেষ্টা টিকেটের জন্য। যদি মেলে। ঘুষ দিয়ে এমনটি যে কোন উপায়ে চেষ্টা করেছেন যাত্রীরা...। ঘরমুখো মানুষের জন্য দ্বিতীয় দিনের মতো ট্রেনের অগ্রিম টিকেট বিক্রি হয়েছে শুক্রবার দিনভর। সকাল ৯টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত টিকেট বিক্রি হয়। প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিনে ছিল উপচেপড়া মানুষের ভিড়। তাদের অনেকের মুখে সেই পুরনো অভিযোগ। টিকেট দিতে ধীরগতি, সিøপ সংগ্রহ, এসি কেবিনসহ প্রথম শ্রেণীর টিকেট না পাওয়া। ১৬ ও ১৭ জুলাইয়ের টিকেটের চাহিদা সবচেয়ে বেশি বলে জানান রেলওয়ে কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন (বিআরটিসি) প্রথম দিনের মতো ঈদে ঘরমুখো মানুষের জন্য টিকেট বিক্রি শুরু করেছে। শুক্রবার প্রথম দিনে যাত্রীদের কাছ থেকে খুব একটা সাড়া মেলেনি। করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রথম দিনে ১৪ জুলাইয়ের ৫০ভাগ টিকেটও বিক্রি হয়নি। উত্তরাঞ্চলসহ দূরপাল্লার টিকেট রয়েছে পর্যাপ্ত।

আজ দেয়া হবে ট্রেনের ১৫ জুলাইয়ের টিকেট। ১৩ জুলাই পর্যন্ত অগ্রিম টিকেট দেয়া হবে, যা ছেড়ে যাবে ১৩ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত। আর ফিরতি টিকেট বিক্রি করা হবে ১৬ জুলাই থেকে। ২০ থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ফিরতি টিকেট কাটতে পারবেন যাত্রীরা। জানা গেছে, স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিন বাংলাদেশ রেলওয়েতে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হয়ে থাকে। পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার যাত্রী পরিবহনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে আন্তঃনগর ট্রেনের মোট আসন সংখ্যা ১৪ হাজার ১১২টি। এর মধ্যে অনলাইনে বিক্রি হবে ৩ হাজার ২৭৯টি। ভিআইপি ৭৩৩ ও সংরক্ষিত টিকেট ৭৩২। উন্মুক্ত কোটায় বিক্রিও হয় নয় হাজার ৩৫টি টিকেট। এর মধ্যে একজন যাত্রী চারটি টিকেট সংগ্রহ করতে পারেন।

কাউন্টার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বেশিরভাগ যাত্রীই চারটি কিকেট কিনেন। এই হিসেবে মাত্র দুই হাজার ২৫৮জন যাত্রী একদিনে টিকেট কাটার সুযোগ পান। আর লাইনে দাঁড়ান চার হাজারের বেশি মানুষ। এই হিসেবে প্রতিদিন অর্ধেক মানুষকে টিকেট না পেয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। শনিবারের টিকেট নিতে যাত্রীরা নিজেরাই কাগজে নাম লিখে সিরিয়াল করতে দেখা গেছে শুক্রবার বিকেল থেকেই। বিশেষ করে রাজশাহী, দিনাজপুর, খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রাম রুটের যাত্রীদের ক্ষেত্রে এমন চিত্র লক্ষ্য করা গেছে।

১৪ জুলাইয়ের খুলনার টিকেট নিতে রাশেদ লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা আটটায়। গল্প আর আড্ডায় রাত কেটেছে। এরপর কাউন্টার খোলার অপেক্ষা। তিনি জানান, প্রথম শ্রেণীর এসি টিকেট পেয়েছেন দুটি। শোভন কেটেছেন দুটি। সব মিলিয়ে চারটি টিকেট পেয়ে খুশি তিনি। হাসিমুখে এবারের মতো ঝামেলা এড়িয়ে ছুটলেন বাড়ির দিকে। সিলেটের কোন কেবিন না পাওয়ার অভিযোগ করেন ফকিরাপুলের যাত্রী মোঃ কাসেম। কাকরাইলের যাত্রী মিনার জানালেন, বেলা ১১টায় আসার পর রাজশাহীর কোন টিকেট পাননি। বেলা ২টায় কাউন্টার থেকে কোন টিকেট না থাকার কথা জানানো হয়। বেশি টাকা দিয়েও শেষ পর্যন্ত টিকেট মেলাতে পারলেন না তিনি। রংপুরের চারটি টিকেট পেয়েছেন কল্যাণপুরের বাসিন্দা দিলারা। তিনি জানান, নারীদের লাইনে তেমন ভিড় ছিল না। টিকেট পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।

সকালে কমলাপুরে গিয়ে দেখা গেছে টিকেটের লম্বা লাইন। অগ্রিম টিকেট পেতে হাজারো মানুষের ভিড়। চলতি ট্রেনের লাইনও বেশ। লাইন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বাইরে চলে গেছে। বৃষ্টিতে ভিজে ট্রেনের টিকেটের জন্য অপেক্ষা মানুষের। কখন দেখা মিলবে সেই সোনার হরিণ? সময় যেন আর কাটে না। বৃষ্টিও যেন ছিল নাছোড়বান্দা। সকাল থেকে দফায় দফায় বর্ষণ। লাইনের মাঝামাঝি বা পেছনে যারা দাঁড়িয়ে, তাদের আশঙ্কা বেশি। টিকেট শেষ হয়ে যাবে না তো? রেল কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত টিকেট রয়েছে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। লাইনের মাঝামাঝি চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আলী হায়দার যাবেন পাবনার চাটমোহরে। বলেন, সকাল ছয়টার দিকে লাইনে এসে দাঁড়িয়েছেন। লাইনের মাঝখানে থাকায় টিকেট পাবেন কি না, এ নিয়ে চিন্তা করছেন। একই অবস্থা জহিরউদ্দিনেরও। গতকাল রাত ১০টার দিকে তিনি এসেছেন। লাইনে দাঁড়ানো আরিফের চোখেমুখে বিরক্তি। তার অভিযোগ, খুবই ধীর গতিতে টিকেট দেয়া হচ্ছে। এ কারণে সময় বেশি লাগছে। যাত্রীদের দাবি সকাল ছয়টা থেকে টিকেট বিক্রি করতে।

টিকেট বিক্রিতে কালোবাজারি হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন রেলওয়ের ডিআইজি রুহুল আমিন। তার ভাষ্য, এখানে কোন কালোবাজারি হচ্ছে না। গতকাল থেকে কর্তৃপক্ষ সিসি টিভিতে ফুটেজ সংগ্রহ করছে। সেখান থেকে কেউ শনাক্ত হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে রেল স্টেশনে র‌্যাবের অভিযোগ কেন্দ্রে দ্বিতীয় দিনেও কোন অভিযোগ জমা পড়েনি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টিকেট নিতে কয়েকজন মৌখিক কালোবাজারির অভিযোগ তুললেও প্রমাণ দিতে পারেননি। প্রমাণ দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানান তিনি।

কমলাপুর রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক সীতাংশু চক্রবর্তী বলেন, ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও গতকালের মতো আজও সকাল নয়টা থেকে টিকেট বিক্রি শুরু হয়। টিকেট থাকা সাপেক্ষে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত বিক্রি হবে। এতে প্রত্যাশী সবাই টিকেট পাবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের কাছে পর্যাপ্ত টিকেট আছে। আশা করছেন কেউ বঞ্চিত হবেন না। তিনি বলেন, যাত্রীদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তা পূরণ করে ছাড়তে হয়, যা সেকেন্ড ব্যবধানে সম্ভব হয় না। তাই যাত্রীরা টিকেট দিতে বিলম্ব হওয়ার অভিযোগ করেন। মোহাম্মদপুর থেকে আসা হাসিবুল ইসলাম বলেন, কোন ট্রেনের কয়টা টিকেটের আসন খালি আছে, এটা যদি প্রতিমুহূর্তে জানানো যেত, তাহলে সুবিধা হতো। তাহলে যারা লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, তারা বুঝতে পারতেন, টিকেট পাবেন কি পাবেন না।

বিআরটিসি বাসের যাত্রী কম ॥ প্রথম দিন বিআরটিসি বাসের অগ্রিম টিকেট সংগ্রহে যাত্রীদের কাছ থেকে খুব একটা সাড়া মেলেনি। শুক্রবার দেয়া হয় ১৪ জুলাইয়ের টিকেট। পর্যায়ক্রমে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত টিকেট বিক্রি হবে। মতিঝিল, ফুলবাড়িয়া, গাবতলী, জোয়ারসাহারা, মিরপুর দ্বিতল বাস ডিপো, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ বাস টার্মিনাল থেকে একযোগে টিকেট বিক্রি চলছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল পাঁচ টা পর্যন্ত টিকেট দেয়া হবে। বিআরটিসির ৯০০ বাসের মধ্যে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাবে ৪০০। আন্তঃজেলা রুটে চলবে আরো চার শতাধিক বাস। ৫০টি গাড়ি রিজার্ভ রাখা হবে।

করপোরেশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, এবার প্রথমবারের মতো বিআরটিসি গাড়ি বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য রিজার্ভ ভাড়া দেয়া হচ্ছে। কমলাপুর ডিপো ম্যানেজার নায়েব আলী জনকণ্ঠকে বলেন, প্রথম দিন যাত্রীদের কাছ থেকে খুব একটা সাড়া মেলেনি। ঢাকার আশপাশের জেলার টিকেট বিক্রি হয়েছে সন্তোষজনক। কিন্তু দূরপাল্লার রুটের টিকেট একেবারেই বিক্রি হয়নি। অর্থাৎ উত্তরবঙ্গের জেলাসমূহের পর্যাপ্ত টিকেট রয়েছে। মাত্র ৪৭০ টাকায় উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার টিকেট মিলছে। সাধারণ যাত্রীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারী বাসের চেয়ে টিকেটের দাম কম রাখার কথা জানান তিনি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, টিকেট বিক্রি না হলে গাড়ি লিজ দেয়া হয়। এতে হিতে বিপরীত ঘটনা ঘটে। রাস্তায় রাস্তায় যাত্রী তোলা ও বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে প্রতিষ্ঠানের বদনাম হয়। তিনি সবাইকে বিআরটিসি ডিপো থেকে টিকেট সংগ্রহ করার পরামর্শ দেন

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: