২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

প্রমঙ্গ ইসলাম ॥ ইতিকাফের গুরুত্ব ও তাৎপর্য


ইতিকাফ হচ্ছে দুনিয়াবাদী থেকে কিছুদিনের জন্য নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে একাগ্রমনে আল্লাহ্র নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আল্লাহ্র ইবাদতে মশগুল হওয়া। মাহে রমাদানের শেষ দশকে মসজিদে ইতিকাফ করতে হয়। এই ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কিফায়া।

ইতিকাফ মানব সৃষ্টির আদিকাল হতে ব্যক্তি সত্তা আপন সত্তাকে জানবার এবং তার স্রষ্টাকে উপলব্ধি করবার উপায় হিসেবে গ্রহণ করে। মানব জাতির আদি পিতা হযরত আদম আলায়হিস সালাম জান্নাতে তাঁর বিবি সাহেবা হযরত হাওয়া আলায়হাস্ সালামকে নিয়ে সুখেই বসবাস করছিলেন। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : এবং যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে খলীফা (প্রতিনিধি) সৃষ্টি করছি, তারা বললো : আপনি কি সেখানে কারো সৃষ্টি করছেন যে অশান্তি ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? আমরাইতো আপনার সপ্রশংস স্তুতি ও পবিত্রতা ঘোষণা করি। তিনি বললেন : নিশ্চয়ই আমি যা জানি তোমরা তা জানো না।

আর তিনি (আল্লাহ্) আদমকে যাবতীয় নাম (বস্তু জগতের তাবত্ জ্ঞান) শিক্ষা দিলেন, তারপর সে সমুদয় ফেরেশতাদের সম্মুখে প্রকাশ করলেন এবং বললেন : এ সমুদয়ের নাম আমাকে বলে দাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। তারা বললো : আপনি মহান পবিত্র। আপনি আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের তো কোনো জ্ঞানই নেই। নিশ্চয়ই আপনি জ্ঞানময় ও প্রজ্ঞাময়। তিনি বললেন : হে আদম। তাদের এ সবের নাম বলে দাও। সে (আদম) তাদের এ সবের নাম বলে দিলে তিনি বললেন : আমি কি তোমাদের বলিনি যে, আকাশ ম-ল ও পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তু সম্বন্ধে আমি নিশ্চিতভাবে অবহিত এবং তোমরা যা ব্যক্ত করো বা গোপন রাখো আমি তাও জানি? যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম : আদমকে সিজ্দা করো, তখন ইবলীস ব্যতীত সবাই সিজ্দা করলো, সে (ইবলীস) অমান্য করলো ও অহঙ্কার করলো। সুতরাং সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলো।

এবং আমি বললাম : হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো এবং যেখানে ইচ্ছে স্বচ্ছন্দে আহার করো, কিন্তু এই বৃক্ষটির নিকটবর্তী হইও না, হলে তোমরা অন্যায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু শয়তান তা থেকে তাদের পদস্খলন ঘটালো এবং তারা যেখানে (জান্নাতে) ছিলো সেখান থেকে তাদের বহিষ্কৃত করলো। (সূরা বাকারা : আয়াত ৩০-৩৬)।

শয়তান মানব জাতির প্রকাশ্য দুশমন। হযরত আদম (আ) ও মা হাওয়া আলায়হাস্ সালামকে প্ররোচিত করে নিষিদ্ধ বৃক্ষের কাছে নিয়ে যায় এবং নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ায়। তাদের থেকে জান্নাতী পোশাকাদি খুলে নেয়া হয় এবং তাদের পৃথিবীতে অবতরণ করানো হয়। হযরত আদম (আ) বর্তমান শ্রীলঙ্কার একটি সুউচ্চ পর্বত চূড়ায় এসে পড়েন এবং মা হাওয়া আলাহাস্ সালাম এসে পড়েন লোহিত সাগর উপকূলবর্তী জেদ্দার সমতল ভূমিতে। ওইভাবে দু’জন প্রায় সাড়ে তিন শ’ বছর তাঁদের ভুল ক্ষমা করে দেয়ার জন্য তওবা ইস্তিগফার করেন। তাঁরা পাঠ করেন রব্বানা জলামনা আন্ফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফিরলানা ওয়া তারহাম্না লানা কুনান্না মিনাল খাসেরীন।

এভাবেই ইতিকাফের দীর্ঘ সফর চলতে থাকে। ইতিকাফের মাধ্যমে মানুষ একান্তভাবে আল্লাহ্র নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে। আমরা দেখতে পাই হযরত মুসা আলায়হিস্ সালামকে আল্লাহ্ জান্না শানুহু তওরাত কিতাব নাযিলের প্রাক্কালের ৪০ দিন তুর পাহাড়ে সিয়ামসহ অবস্থান অর্থাৎ ইতিকাফ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ৪০ দিন দিবারাত ইতিকাফ অবস্থায় থাকার পর হযরত মূসা (আ) তওরাত কিতাব কয়েকখানি পাথর ফলকে লিখিত অবস্থায় প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এমনিভাবে ইতিকাফ করার দৃষ্টান্ত বিভিন্ন নবীর জীবনে পরিলক্ষিত হয়। আরব দেশের মক্কা নগরীতে কুরাইশদের মধ্যে গ্রীষ্মকালে কা’বা চত্বরে ইতিকাফ করার রেওয়াজ প্রচলিত ছিলো। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কা’বা শরীফ থেকে প্রায় তিন মাইল উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত হিরা পর্বতের গুহায় ইতিকাফ হালতে প্রথম ওহী লাভ করেন, কুরআন শরীফ নাযিলের সূত্রপাত হয়। সেই হিরা পর্বতের নামকরণ হয় জাবালুন নূর বা নূরের পর্বত। যে দিন প্রথম নাযিল হয় সেদিন ছিলো রমাদান মাসের ২৭ তারিখ রাত।

ইতিকাফের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামে বৈরাগ্যের কোনো স্থান নেই। ইতিকাফের মাধ্যমে মু’মিন জীবনরোধে অনন্য জ্যোতির ছোঁয়া পায়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ২১ রমাদান রাত থেকে শাওয়ালের চাঁদ উদয়ের আগ পর্যন্ত মসজিদে নববীর তওবার খুঁটির নিকট ইতিকাফ করতেন এবং তাঁর বিবিগণ যাঁর যাঁর হুজরা শরীফে ইতিকাফ করতেন। হুজুর (সা)-এর ইতিকাফের জন্য তওবার খুঁটির নিকটে তাঁবু টাঙ্গিয়ে দেয়া হতো এবং মেঝেতে বিছানা পেতে দেয়া হতো। হযরত জিবরাইল আলায়হিস সালাম ঘন ঘন সেখানে আসতেন এবং কুরআন মজীদ শোনাতেন এবং শুনতেন। এ সময় হুজুর (সা) বার বার দান-খয়রাত করতেন।

ইতিকাফ অবস্থায় দুনিয়াবী কোনো কথাবার্তা বলা যায় না। ইতিকাফ স্থল পরিত্যাগ করা যায় না। তবে প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে তা সেরে দ্রুত ইতিকাফ স্থলে আসতে হবে। খাওয়া-দাওয়া ইতিকাফ স্থলেই করতে হবে। স্ত্রী গমন করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় তাদের (স্ত্রীদের) সঙ্গে সঙ্গত হইও না। (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)।

কুরআন মজীদে আরও ইরশাদ হয়েছে : এবং ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে তওয়াফকারী, ইতিকাফকারী, রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য আমার গৃহকে পবিত্র রাখতে আদেশ করেছিলাম। (সূরা বাকারা : আয়াত ১২৫)

যুগ শ্রেষ্ঠ সূফী পীর তোয়াজউদ্দীন আহমদ (রহ) বলেছেন : ইতিকাফ অবস্থায় শবে কদরকে নিকট থেকে অবলোকন করা যায়।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট

অব হযরত মুহম্মদ (সা:), সাবেক পরিচালক

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ