২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জিডিপির ৪ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসে


অর্র্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, বাংলাদেশে দুর্নীতির কারণে প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে এবং রাজনৈতিক কারণে ক্ষতি হচ্ছে জিডিপির ১ শতাংশ। সব মিলিয়ে প্রায় ২ থেকে ৪ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। তবে দুর্নীতি রোধ করতে তথ্যপ্রযুক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কথা জানান তিনি। অন্যদিকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ও অনিয়ম দূর করার তাগিদ দিয়েছে উন্নয়ন সহযোগীরা। সেই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বৃহস্পতিবার উন্নয়ন সহযোগীদের স্থানীয় পরামর্শক গ্রুপের (এলসিজি) বিশেষ বৈঠকে অর্থমন্ত্রী প্রবৃদ্ধি ক্ষতি হওয়ার এসব তথ্য তুলে ধরেছেন। সেই সূত্র ধরে পরবর্তী আলোচনায় অংশগ্রহণকারী এলসিজিভুক্ত সংস্থা ও দেশের প্রতিনিধিরা এ তাগিদ দিয়েছেন।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের আয়োজনে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরকিল্পনার খসড়া নিয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে বিশেষ এ এলসিজি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেনÑ পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান ও এলসিজিভুক্ত উন্নয়ন সহযোগীরা। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম। এতে কো-চেয়ারের দায়িত্ব পালন করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন ও ডিএফআইডির কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ সারাকো।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী চলতি বাজারমূল্যে দেশের জিডিপির আকার বর্তমানে ১৫ লাখ ১৩ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী জিডিপির ৩ শতাংশ ধরলে দুর্নীতির কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ১ কোটি ৮৭ লাখ কর্মসংস্থানের যে লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছে, তা উচ্চাভিলাষী। এ লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী দেশে বেকারের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। এ সংজ্ঞায় দেশে বেকারের বাস্তব চিত্র আসেনি। বাস্তবে দেশে বেকারের সংখ্যা আরও বেশি। তিনি আরও বলেন, দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মান ‘সন্তোষজনক’ হলেও মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষার মান ‘ভাল’ নয়। তাই মান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে। টানা ছয় বছর ধরে বাংলাদেশ ৬ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার যে কৃতিত্ব দেখিয়েছে তার পেছনে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির হার কমে আসার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। সামাজিক সুরক্ষায় বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ অনন্য। কিন্তু এ দেশে আয় বৈষম্য বেশি। এটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কর্মসংস্থান সষ্টি করা। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বেসরকারী খাতকে কার্যকর করা। তাছাড়া রয়েছে বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই)। এটা সত্য যে, রাজনৈতিক সন্ত্রাস উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করেছে। কিন্তু সরকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে অনেকটা অগ্রগতিও হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের কনফিডেন্স ফিরে এসেছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ নগরায়নের পলিসি গ্রহণ করেছে। শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব কমায় গ্রাম উন্নয়নে নজর দেয়া হয়েছে। তাছাড়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ হলে রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলো থেকে মানুষ এসে ঢাকায় অফিস করে চলে যেতে পারবে।

বৈঠকে অংশ নেয়া বিশ্বব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানান, সুশাসনের ওপর বিশেষ নজর দেয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। সেই সঙ্গে সরকারের আর্থিক খাতের ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম বন্ধে পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আর্থিক খাতে বিভিন্ন সংস্কার, নগরায়ন, নারী উন্নয়ন ও ডেল্টা ম্যানেজমেন্টসহ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।

ড. শামসুল আলম তাঁর উপস্থাপনায় জানান, সপ্তম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রায় ৩ লাখ ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকার বিদেশী সহায়তা প্রয়োজন হবে। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে দেশের দারিদ্র্য ১৮ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় সরকার। সেই সঙ্গে অতিদারিদ্র্য ৮ দশমিক ৯ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য ধরা হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দারিদ্র্য নিরসনের এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে উন্নয়ন সহযোগীদের সামনে তুলে ধরেন তিনি। তিনি জানান, দেশের দারিদ্র্য বর্তমানে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে অর্থবছর ২০১৬-তে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থবছর ২০১৭-তে ২২ দশমিক ৩ শতাংশ, অর্থবছর ১৮-তে ২১ শতাংশ, অর্থবছর ২০১৯-তে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২০ অর্থবছরে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।

অন্যদিকে অতিদারিদ্র্য বর্তমানের ১২ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে অর্থবছর ২০১৬-তে ১২ দশমিক ১ শতাংশে, অর্থবছর ২০১৭-তে ১১ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থবছর ২০১৮-তে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ, অর্থবছর ২০১৯-তে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২০ অর্থবছরে ৮ দশমিক ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে জানান, উন্নয়ন সহযোগীরা বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ নজর দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন। তাঁরা আর যেসব পরামর্শ দিয়েছেন সেগুলো আমরা আগে থেকেই গ্রহণ করার কথা ভেবে রেখেছি। তবে অর্থায়নের বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগীরা সরাসরি কিছু বলেননি।

অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানোর তাগিদ ॥ আগামী পাঁচ বছরে দেশের উন্নয়ন করতে হলে অভ্যন্তরীণ আয় বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে উন্নয়ন সহযোগীরা। এলসিজিভুক্ত (লোকাল কনসালটেটিভ গ্রুপ) সংস্থা ও দেশের প্রতিনিধিরা বলেছেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে ভ্যাট, আয়কর আইনে সংস্কার আনতে হবে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সময় তাঁরা এ তাগিদ দেন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত বিশেষ এলসিজি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নিয়ে স্থানীয় পরামর্শক গ্রুপের (লোকাল কনসালটেটিভ গ্রুপ) ভারপ্রাপ্ত প্রধান সারাহ কুক বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কর্মসংস্থানের সঙ্গে সঙ্গে লিঙ্গ বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, সরকারী অর্থায়ন ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সঙ্গে দক্ষ মানবশক্তি গঠনে গুণগতমান সম্পন্ন শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সিভিল সোসাইটি, সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারী সংস্থার সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্বব্যাংক প্রতিনিধি বলেন, প্রকল্পের গুণগতমান বজায় রেখে সর্বনিম্ন খরচে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে ভ্যাট, আয়কর আইনে সংস্কার আনতে হবে। সকল ক্রয় ই-প্রকিউরমেন্টের আওতায় আনতে হবে। সরকারী সংস্থায় অডিটে বেসরকারী অডিট ফার্মকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্য এখন কম। সরকারকে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবতে হবে।

ডিএফআইডির প্রতিনিধি বলেন, বিচার ব্যবস্থাকে তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় আনা হচ্ছে- এটা ভাল। তবে তথ্যপ্রযুক্তি শুধু যেন কোর্ট পর্যন্ত না থাকে। যে সকল প্রতিষ্ঠান আইনী সহায়তা দিয়ে থাকে তারাও যেন তথ্যপ্রযুক্তির আওতায় আসে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি বলেন, সরকারী অর্থ ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে। সামাজিক খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে আরও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুসরণ করে সব স্তরে সুশীল সমাজকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিদ্যমান ভূমি ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনতে হবে।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, উন্নয়ন সহযোগীরা আর্থিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশংসা করেছেন। তাঁরা বলেছেন, গত কয়েক বছর ধরে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন অন্যতম সাফল্য। সেই সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং এর সফলতার প্রশংসা করা হয়েছে। তাছাড়া সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অনেকগুলো লক্ষ্য পূরণে সফলতা লাভ করেছে এবং আগামীতে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলের (এসডিজি) লক্ষ্য পূরণেও সফলতা আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তাঁরা।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: