১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

প্রবন্ধ ॥ পূর্ব এশিয়ার উত্থান, ধান্যসংস্কৃতির জাগরণ এবং বাংলাদেশ


বদলে যাচ্ছে আমাদের চেনাজানা পৃথিবী, পরিবর্তন বড়ভাবে ঘটছে প্রযুক্তির সুবাদে, প্রযুক্তি কেবল যে নিত্যনতুন উদ্ভাবন বয়ে আনছে তা’ নয়, এইসব উদ্ভাবনের বড় লক্ষ্য যেহেতু মানুষ, মানুষের ব্যবহৃত নিত্যকার সামগ্রী, তাই নিত্যদিনের জীবন বদলে যাচ্ছে রাতারাতি। এমন প্রসঙ্গে চট্ করে মনে পড়বে হাতের তালুতে বন্দি মোবাইল ফোনের কথা, দশ বছর আগের প্রযুক্তির সঙ্গে পাঁচ বছর আগের সেলফোনের কোনো মিল নেই, তার থেকে অনেক আলাদা হালফিলের স্মার্টফোন, স্মার্ট হয়ে উঠে ফোন এখন ছুটছে আরো নানা নতুন পথে, কী তার রূপ হবে পাঁচ বছর পর সেটা হলফ করে বলা মুশকিল। তবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, ফোনের ব্যবহারিক ক্ষমতা ও দক্ষতা আরো বাড়বে, অনেক নতুন নতুন কাজের যোগ্য হয়ে উঠবে সেলফোন এবং মানুষের শরীর-মন ও মননের অঙ্গাঙ্গী অংশ রূপে কাজ করবে ফোন, যেন তা মানব-অঙ্গেরই আরেক সম্প্রসারণ, যিনি রইবেন সেলফোনের বাইরে, তাঁর তো ঘটবে অঙ্গহানি।

তবে প্রযুক্তির চাইতেও বড় পরিবর্তন ঘটছে বিশ্ব-অর্থনীতিতে, পাল্টে যাচ্ছে পরিচিত সমীরকণ, নতুন সম্ভাবনা ও শক্তির উত্থান ও প্রসার যেসব অভিঘাত তৈরি করছে তার প্রকাশ ঘটছে নানাভাবে, বিভিন্ন লক্ষণ শনাক্ত করছেন কেউ কেউ, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বুঝে ওঠা দুষ্কর। অর্থনীতিবিদ ও সমাজতত্ত্ববিদরা পরিবর্তনধারার বিচার-বিশ্লেষণ করতে চাইছেন বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে, একের মতের সঙ্গে অপরের মিল বিশেষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তারপরেও এটা অনুধাবন করা যাচ্ছে, পরিবর্তনই সত্য, পাল্টে যাচ্ছে আমাদের পরিচিত পৃথিবী, প্রতিবেশ, জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি, ফলে টলে উঠছে পরিচিত জগৎ এবং জাগরণ ঘটছে এমন এক বিশ্বের যা পাল্টে দিচ্ছে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের বহুকাল ধরে বিরাজমান সম্পর্ক ও বিন্যাস। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় যখন রাতারাতি উবে গেল বার্লিন ওয়াল, একইরকমভাবে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল সোভিয়েত ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার এমন পরিণতি এর আগে কে ভাবতে পেরেছিল! কেউ না ভাবলেও সেসবের লক্ষণ নিশ্চয় কোনো না কোনোভাবে ফুটে উঠেছিল, কিন্তু দেশ-বিদেশের নামী-দামী পণ্ডিত, গবেষক, ভবিষ্যদ্্বেত্তা কারো মনেই উঁকি দেয়নি পৃথিবীর এমন রূপান্তরের সম্ভাবনা। ঘটনার এপারে দাঁড়িয়ে এখন অনেক বিশ্লেষণ দাঁড় করানো যাচ্ছে এবং হচ্ছে। বর্তমান লেখক কোনো আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক নন, তবে আন্তর্জাতিক পরিভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে একটি চকিত-দেখা বাণী বারবারই মনে জাগে এবং পাঠকদের সঙ্গে তা’ ভাগ করে নেয়া যায়। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বিষয়ে চিরায়ত গ্রন্থ হচ্ছে ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’, টেন ডেজ দ্যাট শুক দ্য ওয়ার্ল্ড। লেখক জন রিড নবীন সাংবাদিক, পরিচয় দিয়েছেন ইতিহাস-সচেতনতার, সেই সঙ্গে অসাধারণ এক গদ্যভঙ্গি তাঁর, রানীর ইংরেজির যে গদাইলস্করি চলন তার বিপরীতে মেদহীন তির্যক শাণিত মার্কিনি গদ্যে তিনি ঘটনার মধ্য থেকে ঘটনাধারার সারসত্য মেলে ধরতে পেরেছিলেন। তো এই বইয়ের সুবাদে জন রিড হয়েছেন জগৎবিখ্যাত, সমাজতন্ত্রের পতন হলেও তাঁর বইয়ের মুদ্রণ এখনও অব্যাহত রয়েছে, ঢাকাতেও মিলবে স্থানীয় প্রকাশকদের মুদ্রিত বাংলা সংস্করণ। কিন্তু জন রিডের যিনি গুরু, মার্কিন সাংবাদিকতা জগতের কিংবদন্তি-পুরুষ লিংকন স্টিফেন্স, তিনি তেমন খ্যাতি পাননি। খুব অল্প মানুষই জানে তাঁর কথা, তবে মার্কিন সাংবাদিকতার বৃত্তান্ত রচনা তাঁকে ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না, সেখানকার সাংবাদিকতার সকল স্কুলে লিংকন স্টিফেন্স অবশ্যপাঠ্য। বিপ্লবের পর রাশিয়া ভ্রমণে এসেছিলেন লিংকন স্টিফেন্স, সব দেখেশুনে নিউইয়র্ক ফিরে গেলে সাংবাদিকেরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, কী তাঁর উপলব্ধি? মার্কিনি কায়দায় লিংকন স্টিফেন্স-এর জবাব ছিল, “আই হ্যাভ সিন দ্যা ফিউচার, অ্যান্ড ইট ওয়ার্কস।” তাঁর এই উক্তি মেমোরেবল কোট্স্-এর নানা বইয়ে ঠাঁই পেয়েছে, অল্পকথায় অনেক ভাব ব্যক্ত করবার এ-এক অনন্য উদাহরণ।

তো আশির দশকে পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিন ঘুরে বেড়াবার সুবাদে বার্লিন ওয়ালের দুই প্রান্ত দেখার সৌভাগ্য বর্তমান লেখকের হয়েছিল। সমাজতান্ত্রিক পূর্ব প্রান্তে দেয়ালের কাছে যাওয়ার জো নেই, তার আগেই তারকাঁটার বেষ্টনি, কিছুদূর পরপর প্রহরা চৌকি, সেখানে সশস্ত্র সৈনিক পাহারারত, এই বাস্তবতা নাগরিককে দেয়াল থেকে দূরে রাখে। পূর্বী মানুষদের প্রলুব্ধ করে পশ্চিমে দেশান্তরী হওয়ার জন্য পেতে রাখা নানা ফাঁদ ও প্রলোভন থেকে নাগরিকদের বিরত রাখার জন্যই এমন ব্যবস্থা। ফলে কংক্রিটের ধূসর দেয়াল কেমন যেন ভীতি ও বিষণœতা সঞ্চার করে। অন্যদিকে পশ্চিমে বার্লিন ওয়াল টুরিস্টদের অন্যতম আকর্ষণ, কোথাও-বা উঁচু পাটাতন তৈরি করা আছে যেখানে দাঁড়িয়ে পূর্বের জীবনধারা লক্ষ করা যাবে। আর আছে দেয়ালজুড়ে নানা গ্রাফিত্তি, কতরকম রঙে দেয়াল রাঙানো, সেখানে লেখা রয়েছে কতই-না মন্তব্য। এক জায়গায় দেয়ালের লিখনে চোখ আটকে গেল, কে লিখেছে কে জানে, উজ্জ্বল বর্ণে দেয়ালে জ্বলজ্বল করছে বাণী, “আই হ্যাভ সিন দা ফিউচার, অ্যান্ড ইট ডাজ নট ওয়ার্ক।”

ইতিহাসের বিচিত্র গতিপথের বিচার-বিশ্লেষণের এ-হচ্ছে এক লোকায়ত রূপ। বিশ শতকের বড় অংশ জুড়ে মনে হচ্ছিল ইতিহাস নির্ধারিত হবে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে লড়াইয়ের নিরিখে। সেই লড়াইয়ের যে এমন পরিণতি হবে তা কে ভাবতে পেরেছিল। নব্বইয়ের দশকে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধেরও অবসান ঘটলো, দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্ব আর রইলো না। তখন প্রত্যাশা জেগেছিল অস্ত্র প্রতিযোগিতার হবে অবসান, বিশ্ব হয়ে উঠবে অনেক শান্তিপূর্ণ এবং পৃথিবীর সম্পদ অস্ত্রের পেছনে অপচিত না হয়ে ব্যবহৃত হতে পারবে মানবকল্যাণে। আমরা জানি সে আশার গুড়ে বালি পড়তে বিলম্ব হয়নি, হানাহানি ও সংঘাত বন্ধ না হয়ে তা বরং ছড়িয়ে পড়ল বিশ্বময়, যুগোশ্লাভিয়া নামক দেশটির বিলোপ হলো নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ ও গণহত্যার ভেতর দিয়ে, খোদ ইউরোপের বুকেই যে ঘটবে এমন নৃশংস রক্তপাত, সেটা তো কারোর কল্পনাতেই ছিল না। সংঘাত দেখা দিল রুয়ান্ডায়, সুদানে, উগান্ডায়, কঙ্গোতে, আর আফগানিস্তানের সংঘাত উপচে পড়ল তালেবানি উত্থানে, মার্কিন টুইন টাওয়ার ধ্বংসের মাধ্যমে তা বার্তা ঘোষণা করলো সংঘাত থেকে মুক্ত নয় পৃথিবীর কোনো দেশ, কোনো ভূমি।

নব্বইয়ের দশক থেকে এই যে পরিবর্তন তা এতোই দ্রুতগতি এবং এতোই ব্যাপক যে এর হদিস করাটাও মুশকিল। গোড়াতে মনে হয়েছিল সমাজতন্ত্রের অবসান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য করে তুলবে নিরংকুশ। স্বীয় সামরিক শক্তির পৃথিবীব্যাপী বিস্তার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য শক্তির অনুপস্থিতি আমেরিকাকে সবচেয়ে বলবান রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল এবং এই শক্তি প্রয়োগে আমেরিকার কোনো দ্বিধা ছিল না, বাধা যা ছিল তা ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে পরোয়া ছিল না। আফগানিস্তানের মাটিতে মার্কিন সৈন্য নেমেছিল ন্যাটোর ছত্রছায়ায়, তেমনিভাবে অনুগত বৃটেনকে নিয়ে সাদ্দাম হোসেনের ইরাকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে অজুহাত হয়েছিল ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্রভাণ্ডার ধ্বংস করে শান্তি নিশ্চিত করবার প্রত্যয়। উয়েপন অব মাস ডেস্ট্রাকশন খুঁজে পাওয়া যায়নি, সে নিয়ে প্রশ্নও কেউ তোলেনি, কিন্তু ইরাকে হামলার মাধ্যমে সেখানকার তেল খনির ওপর ইঙ্গ-মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ঠিকই। সেই সঙ্গে হাত পুড়েছে আমেরিকার, সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্ব ক্রমে ক্রমে হয়েছে উন্মোচিত।

এর পাশাপাশি প্রযুক্তির পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী সংযোগের মধ্যে কোনো বাধা যেমন রাখলো না তেমনি পুঁজির চলাচলেও কোনো রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও দেয়াল আর রইলো না। বিশ্বায়ন অর্থনীতির সাবেকী রীতি-নীতি পাল্টে এক-বিশ্ব ততটা না হলেও এক-বিশ্ববাজার প্রতিষ্ঠার দিকে যাত্রা শুরু করলো। এই বাজারের ওপর পশ্চিমী নিয়ন্ত্রণ নিরংকুশ হবে বলে যে-শঙ্কা গোড়ায় ব্যক্ত হয়েছিল তা এখন আর বাস্তব বলে মনে হচ্ছে না। চীন, ভারত, ব্রাজিল যে অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে তার মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছে চীন এবং চীনের সুবাদেই আগামীর বিশ্ব অর্থনৈতিক বিন্যাস গড়ে উঠবে, সেই সম্ভাবনা ক্রমে জোরদার হচ্ছে। একসময় গুণকীর্তন করা হতো সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডকে এশিয়ান টাইগার হিসেবে, কিন্তু এখন সে বৃত্ত প্রসারিত হয়ে চীন, জাপান, ভারত মিলে এশিয়ার জাগরণের নতুন ছবি দেখতে শুরু করেছেন অনেকে। ইতিহাসের আলোকে ভবিষ্যতের নিরিখে এশিয়ার জাগরণ ও বাংলাদেশের অবস্থান পর্যালোচনাই বর্তমান নিবন্ধের লক্ষ্য।

দুই.

এশিয়ার জাগরণ বিষয়ে আলোচনা বিশ শতকের সূচনাতে প্রথম শ্রুত হতে থাকে। পশ্চিমের শিল্পায়নের পথানুসরণ করে জাপানের অর্থনৈতিক পরিবর্তন প্রায় যেন এক জাগরণের রূপ নেয়। জাপানের সাফল্য পশ্চাৎপদ দেশের কাছে আদর্শ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। তুলনামূলকভাবে অনেক বড় দেশ হলেও চীন এক্ষেত্রে ছিল বহু পিছিয়ে, আর তাই জাপানের সাফল্য চীনামানসেও অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। চীন ও জাপান উপনিবেশিক দাসত্বের বাইরে অবস্থান করছিল বিধায় তাদের ছিল বাড়তি সুবিধা, যদিও অনুন্নয়নের অভিশাপ থেকে দুই দেশের কোনোটাই মুক্ত ছিল না। প্রাচ্য ঘিরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তা-ভাবনার উন্মেষও এইসময় লক্ষিত হয়।

রবীন্দ্রনাথ-ওকাকুরা কাকুজির পরিচয় ও ভাব-বিনিময় বাঙালি কবির অন্তরের আকুতিতে নতুন চিন্তার বিস্তার ঘটিয়েছিল। জাপানের অভিজাত সামুরাই পরিবারের সন্তান ওকাকুরা স্বদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শক্তিতে পাশ্চাত্যের সঙ্গে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় আগ্রহী ছিলেন এবং বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ পক্ষপাত। অন্যদিকে উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান যতটা না ছিল রাজনৈতিক তার চেয়ে বেশি ছিল আত্মিক। তিনি ভারতীয় সভ্যতার নিরিখে বিচার করতে চাইছিলেন উপনিবেশিকতার বিস্তার ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কারণ ও ধরন। উপনিবেশিকতা প্রতিরোধে ভারতের অন্তর্শক্তি খুঁজে ফিরছিলেন তিনি এবং এই চিন্তার সমর্থন খুঁজে পেলেন ওকাকুরার ‘এশিয়া ইজ ওয়ান’ তত্ত্বে। ওকাকুরাও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তবে তা’ ছিল উপনিবেশিক মানসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। জাপান যে পাশ্চাত্যের যন্ত্রসভ্যতার মুগ্ধ অনুগামী হয়ে উঠছে সেটা ওকাকুরার কাছে বড় সমস্যা ছিল না, বড় বিষয় ছিল জাপান কেন পাশ্চাত্যের যন্ত্রকে তার মতো পাল্টে নিতে পারছে না। তাঁর দুই বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দি আইডিয়লস্ অব দা ইস্ট’ (১৯০৩) এবং ‘দি বুক অব টি’ (১৯০৬) সঞ্চার করেছিল বিপুল প্রভাব। দ্বিতীয় গ্রন্থে ওকাকুরা পাশ্চাত্যদৃষ্টিতে পূর্বের সমাজবিচারের অসাড়তা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি লিখেছেন, “ভারতীয় আধ্যাত্মবাদকে হেয় করা হয়েছে অজ্ঞতা হিসেবে, চীনের মিতাচারকে ভাবা হয়েছে বোকামি, জাপানের দেশপ্রেম গণ্য হয়েছে ঈশ্বরের বিধানের কাছে নতজানু হওয়া। বলা হয়ে থাকে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের গঠনের কারণে আমরা ক্ষত ও বেদনা বিষয়ে কম সংবেদনশীল।”

ওকাকুরা কাকুজি ভারতে এসেছিলেন ১৯০২ সালে বিবেকানন্দ দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে এবং তখনই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ-পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। পাশ্চাত্যের সঙ্গে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকালে জাতীয় ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য সর্বদা অন্তরে ধারণ করার গুরুত্ব ওকাকুরা যেভাবে তুলে ধরেছিলেন এবং এই ঐতিহ্য তিনি যেভাবে খুঁজে ফিরছিলেন জাপানি শিল্প-সাহিত্য-জীবন ও সংগঠনে তা রবীন্দ্রনাথকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। স্বকীয়তার সন্ধান বাংলায় তখন সবে অঙ্কুরিত হতে শুরু করেছে। আর তাই ওকাকুরা দ্বারা অনুপ্রাণিত হওয়ার বাস্তব অনেক কারণ রবীন্দ্রনাথ খুঁজে পেয়েছিলেন। ইউরোপীয় সভ্যতার সমালোচনামূলক গ্রন্থ ‘লেটার্স অব জন চায়নাম্যান’ পাঠান্তে তিনি লিখেছিলেন, “এই ছোট বইখানি পড়িয়া আমরা বিশেষ আনন্দ ও বল পাইয়াছি। ইহা হইতে দেখিয়াছি, এশিয়ার ভিন্ন ভিন্ন জাতির মধ্যে একটি গভীর ও বৃহৎ ঐক্য আছে। চীনের সঙ্গে ভারতবর্ষের মিল দেখিয়া আমাদের প্রাণ যেন বাড়িয়া যায়।” সেই সময়ের প্রাণোস্ফূর্তির কথা উল্লেখ করে অনেক পরে তিনি লিখেছিলেন যে, “জন চীনাম্যানের পত্র যখন প্রথম বাহির হয় তখন আমাদের দেশে প্রাচ্যদেশাভিমানের একটা প্রবল হাওয়া দিয়াছিল”। তিনি আরো লিখেছেন, “সমগ্র ইউরোপের চিত্ত যেমন একই সভ্যতাসূত্রের চারদিকে দানা বাঁধিয়াছে তেমনি করিয়া একদিন সমস্ত এশিয়া এক সভ্যতার বৃন্তের ওপর একটি শতদলপদ্ম হইয়া বিধাতার চরণতলে নৈবেদ্যরূপে জাগিয়া উঠিবে, এই কল্পনা ও কামনা আমাদিগকে মাতাইয়া তুলিতেছিল।”

পাশ্চাত্যের উপনিবেশিক মনোভাবের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবস্থান নিয়েছিলেন তাঁর নিজস্ব ধরনে, যেখানে পশ্চিমের সভ্যতায় অবগাহন তিনি কামনা করেছেন, তবে সেই জলস্রোতে ডুবে যাওয়া নয়। ফলে জাপান ও চীনের সঙ্গে মৈত্রী গড়তে তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ। এরই প্রতিফলন মেলে চীন ও জাপানে তাঁর একাধিক ভ্রমণে, শান্তিনিকেতনে প্রাচ্যবিদ্যা অধ্যয়নের কেন্দ্র গড়ে তোলার অভিপ্রায়ে এবং চৈনিক ও জাপানি বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে গড়ে তোলা তাঁর নিবিড় সম্পর্কে। ১৯১৬ সালে প্রথম জাপান এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তখন তিনি সদ্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এশীয়দের মধ্যে সেই প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন, তাই জাপানে তাঁকে বরণ করা হয়েছিল সাদরে। কিন্তু জাপানে জায়মান জাতীয়বাদ যে উগ্র রূপ গ্রহণ করেছিল সেটা লক্ষ করে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে অস্বস্তি জেগেছিল ঠিকই, এবং তা প্রকাশ করা থেকে তিনি বিরত হননি। তবে সামগ্রিকভাবে জাপানের অগ্রগতি মুগ্ধ করেছিল রবীন্দ্রনাথকে, তিনি বলেছিলেন, জাপান একই সঙ্গে সাবেকী ও আধুনিক, সারা পৃথিবীর দৃষ্টি এখন জাপানের দিকে। সতর্কবাণী উচ্চারণ করে কবি বলেছিলেন, “জাপান যদি কেবল পাশ্চাত্যের প্রতিরূপ হয়ে থাকে তাহলে যে আশা সে জাগিয়ে তুলেছে তা সফল হবে না। পাশ্চাত্য সভ্যতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব এখনও দিতে পারেনি,” এ-কথা বলে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন দ্বন্দ্বের উল্লেখ করেন যেমন, ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের দ্বৈরথ, শ্রম ও পুঁজি, নারী ও পুরুষ, বস্তুতান্ত্রিক অর্জনের লোভ ও মানবতার আত্মিক জীবনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। রবীন্দ্রনাথ আশা প্রকাশ করেছিলেন জাপান তার মনীষা ব্যবহার করে এই দ্বন্দ্বের উত্তর দেবে।

উল্লেখ্য, নিউইয়র্কের আউটলুক পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের এই ভাষণের পূর্ণপাঠ পত্রস্থ হয়েছিল এবং তা পড়ে রোম্যা রোলাঁ ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “যেমনটা আশা করা গিয়েছিল, এশীয়বাসীরা ইউরোপের অপকৃষ্টতা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে। গত ১৮ জুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টোকিও রাজকীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন। তিনি জাপানকে ইউরোপের সভ্যতা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেছেন। এই বক্তৃতাটি যা মানুষের ইতিহাসের একটি বাঁককে চিহ্নিত করেছে এবং ইউরোপের কোনো বড় সংবাদপত্রে যার একটি কথারও স্থান হয়নি।”

এরপরে ১৯২৬ সালে চীন ও জাপান সফরকালে পূর্বের সেই রবীন্দ্রমহিমা অনেকাংশে ক্ষুণœ হয়েছিল, কেননা রবীন্দ্রনাথের চৈনিক ও জাপানি শ্রোতৃকূল তখন দাঁড়িয়েছিল ভিন্ন পটভূমিকায়। সেখান থেকে রবীন্দ্রনাথকে তাঁরা সহমর্মী আরেকজন এশীয় হিসেবে বিবেচনা করেননি, দেখেছেন পদানত দেশের এমন এক প্রতিনিধি আধ্যাত্মবোধের ধূম্রজালে যিনি কঠোর বাস্তবকে আড়াল করছেন। আর রবীন্দ্রনাথের কাছে চীনের নবীন শ্রোতাদল প্রতিভাত হয়েছিল উš§ূল আধুনিকতা অর্জনে ব্যগ্র প্রজন্ম হিসেবে যারা স্বদেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য তথা কনফুসিয়াসের বিশ্বদর্শনে মোটেই আগ্রহী নয়। পাশাপাশি জাপান ততদিনে উগ্র জাতীয়তাবাদ দ্বারা বিপুলভাবে আচ্ছন্ন হয়েছে, কোরিয়ায় তার আগ্রাসন এর যে পরিচয় তুলে ধরেছে তা দেখে রবীন্দ্রনাথ শিহরিত না হয়ে পারেননি। সেই শঙ্কার কথা উল্লেখ করে জাপানেও তিনি শ্রোতাদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। ফলে বিশ শতকের শুরু থেকে তিন দশকের মধ্যে এশীয় জাগরণের সম্ভাবনা ও বিনাশ দুই-ই প্রত্যক্ষ করলেন রবীন্দ্রনাথ, তবে তারপরেও ভারতীয়ত্বে ও এশীয়ত্বে তাঁর আস্থা তিনি হারাননি। জীবন সায়াহ্নে ‘সভ্যতার সংকট’ ভাষণে পাশ্চাত্য সভ্যতার ভগ্নস্তুূপ পেরিয়ে প্রাচ্য থেকে নতুন সভ্যতার বিকাশের কথা তাই তিনি ব্যক্ত করেছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টার মতো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন এশিয়ার জাগরণের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোড়িত হয়েছিলেন তখন মহাদেশের বৃহদাংশ জুড়ে ছিল উপনিবেশিক শাসন, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে এশিয়া ছিল পদানত। তবে পদানত দেশের বাঙালি কবির কণ্ঠেই শ্রুত হয়েছিল এশীয় উত্থানের বাণী যা চীন ও জাপানে সৃষ্টি করেছিল বিশেষ প্রভাব। চীনের বিপ্লবী সাহিত্যিক লু সুন রবীন্দ্রনাথের চীন ভ্রমণের বেশ কিছুকাল পরে লিখেছিলেন যে, “তখন বুঝতে পারিনি, কিন্তু পরে আমার উপলব্ধি হয়েছে তিনিও একজন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী।” ইতিহাসের বোধ-সঞ্জাত নৈতিক অবস্থান থেকে চীনে রবীন্দ্রনাথ-উচ্চারিত বাণী বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। চীন ত্যাগের আগে, পাশ্চাত্য-আকর্ষিত চীনা তরুণ চিত্তের কথা স্মরণে রেখে তিনি বলেছিলেন, “চিন্তাচেতনার সড়ক বেয়ে চলাচল ঘটছে একমুখী। দুর্বল চিন্তার নৈরাজ্য থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের অবশ্যই আজ উঠে দাঁড়াতে হবে এবং কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে পশ্চিমকে। আমাদের অবশ্যই ফিরে পেতে হবে নিজস্ব কণ্ঠ, যেন আমরা বলতে পারি পশ্চিমকে, তোমরা তোমাদের পণ্যে জোরপূর্বক আমাদের গৃহ ভরিয়ে তুলছ, তোমরা আমাদের জীবনবিকাশের সম্ভাবনা রুদ্ধ করে দিতে চাইছোÑ তারপরও জানবে, আমরা তোমাদের বিচার করছিÑ বাট উয়ি জাজ ইউ।” পরিস্থিতি যত প্রতিকূল হোক নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজস্বতা নিয়ে পশ্চিমকে বিচার করার সক্ষমতা যেন আমরা কখনোই না হারাই, এই ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশা।

তিন.

১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ রোপণ করে বৃটিশ শাসকেরা বিদায় নেয় উপমহাদেশ থেকে। হিন্দু-মুসলিম বিরোধের ভিত্তিতে ভারত বিভাজনের মধ্য দিয়ে জš§লাভ করে পাকিস্তান। সম্প্রদায়গত বিরোধ অতিক্রমের চেষ্টা না করে বরং স্থায়ী করা হয় এর রাষ্ট্রীয় রূপ। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতার পীঠস্থান যেমন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে, তেমনি এই ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল পশ্চিমের আমলাতন্ত্র-সামরিক চক্র-ধনী ব্যবসায়ী ও ভূস্বামী গোষ্ঠীর হাতে। এর বিপরীতে জাতীয় অধিকার সচেতন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল পূর্ব পাকিস্তান। ফলে এক দেশের অন্তর্ভুক্ত হলেও পশ্চিম ও পূর্ব কেবল অঞ্চলগতভাবে নয়, ইতিহাসগতভাবেও ছিল আলাদা এবং তার অভিযাত্রা অর্জন করেছিল আলাদা মাত্রা। গোড়া থেকে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান দুই ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছিল, পাকিস্তানের রাষ্ট্রাদর্শ হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের সাম্প্রদায়িক বিষময়তা ফেনিয়ে তোলা, আর পূর্ব বাংলা নিয়েছিল অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের পথ যেখানে সকল ধর্মের মানুষ সম্প্রীতির আবহে বসবাস করবে, সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান থাকবে না, ধর্ম প্রতিবন্ধক হবে না জাতীয় চেতনার।

বাংলা ছিল ইংরেজ প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের প্রথম কলোনি। দুইশ’ বছরের উপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতের স্বাধীনতা তাই অর্জনকালীন সংকট সত্ত্বেও এশিয়াজুড়ে উপনিবেশবাদ-বিরোধী আন্দোলন জোরদার করে তুলেছিল। একে একে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল ইন্দোনেশিয়া, মালয়, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, সিংহল, বার্মা ও অন্যান্য দেশ। চীনের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন বয়ে এনেছিল মুক্তি আন্দোলনের নতুন বার্তা। অন্যদিকে পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্ব এশিয়ায় এক নতুন আবর্তন তৈরি করলো এবং কোরিয়া ও ভিয়েতনামে অক্ষরেখা বরাবর দেশটি বিভক্ত হয়ে পড়লো পশ্চিমী পৌরহিত্যে।

এমনি বাস্তবতায় এশীয় জাগরণের সম্ভাবনা স্তিমিত হয়ে পড়লেও সেই সম্ভাবনা একেবারে বিলুপ্ত হয়নি। বিলুপ্ত যে হয়নি তার ছাপ রয়ে গেছে ১৯৭০ সালে লন্ডন থেকে পেঙ্গুইন বুকস প্রকাশিত এক গ্রন্থে, এশিয়ার জাগরণ বা ‘এশিয়া অ্যাওয়াকস্’ শীর্ষক গ্রন্থের রচয়িতা ডিক উইলসন, দীর্ঘকাল যিনি সাংবাদিকতা করেছেন এশিয়া অঞ্চলে, ১৯৫৮ সালে হংকং-ভিত্তিক ‘ফার ইস্টার্ন ইকনোমিক রিভিউ’-এর সম্পাদক হয়েছিলেন তিনি, আর ১৯৬৫ সাল থেকে স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে বিভিন্ন পশ্চিমী পত্রপত্রিকায় প্রেরণ করতে থাকেন এশীয় অঞ্চল-বিষয়ক রিপোর্ট। ঢাকা-করাচি-ইসলামাবাদের সঙ্গে তাঁর ছিল বিশেষ যোগ, জয়নুল আবেদিন বিষয়ে স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর রচনা অনেক দিক দিয়ে ছিল উল্লেখযোগ্য। আরো উল্লেখ্য, ডিক উইলসন তাঁর বইটি উৎসর্গ করেছিলেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে, লিখেছিলেন, তিনিই প্রথম আমার মানসপটে এশিয়াকে উদ্ভাসিত করেন।

ডিক উইলসন এশীয় দেশসমূহের জাগরণের নতুন পর্ব নিয়ে আলোচনা করেছেন, যে-পর্বকে বড় দাগে আমরা চিহ্নিত করতে পারি উত্তর-উপনিবেশিক কাল হিসেবে। এই কালের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য সাধন। কী করে নানা ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ তাদের জাতিরাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় ও সম্প্রীতি গড়ে তুলতে পারে সেটা ছিল যুগের চ্যালেঞ্জ এবং এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মধ্যে নিহিত ছিল এশীয় জাগরণের সূত্র। ডিক উইলসনের মতে, এই পর্ব হচ্ছে অ্যান্টি-কলোনিয়ালিজম থেকে নেশন-বিল্ডিং-এ প্রবেশের পর্ব, এই নতুন পর্বের বাস্তবতা ব্যাখ্যায় ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন বিদেশমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়েছেন ডিক উইলসন। বিদেশমন্ত্রী বলেছিলেন, “উপনিবেশ হিসেবে পদলিত দেশের বাস্তবতা সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা নেই। আমরা ঐক্যবদ্ধ ছিলাম কেবলমাত্র ওলন্দাজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। স্বাধীনতার পর পরিস্থিতি দাঁড়াল দ্বীপের বিরুদ্ধে দ্বীপ, প্রদেশের বিরুদ্ধে প্রদেশ, বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী, ধর্মের বিরুদ্ধে ধর্ম।” স্বাধীন দেশের বহুত্ববাদী বাস্তবতার স্বীকৃতি এমনকি পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকেও দিতে হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন, “আদর্শগতভাবে আমরা ছিলাম মুসলমান, কিন্তু অঞ্চল বিবেচনায় আমরা ছিলাম ভারতীয়, আরও ছোটভাবে দেখলে অন্তত এগারোটি ছোট ছোট প্রদেশের একত্র রূপ। তাই যখন পাকিস্তান বাস্তবে প্রতিষ্ঠা পেল... আমাদের সামনে কর্তব্য দাঁড়াল ঐতিহ্যগত, অঞ্চলগত, রাজনীতিগত সকল আনুগত্যকে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের মহা-আনুগত্যে রূপান্তর।” ডিক উইলসন-এর গ্রন্থ প্রকাশকালে বাংলাদেশের আবির্ভাব ঘটেনি, কিন্তু নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও জাতীয় অধিকার জলাঞ্জলি দিয়ে ধর্মীয় সত্তা একমেবাদ্বিতীয়ম করে পাকিস্তানি মহা-আনুগত্যে সামিল হতে বাঙালির অনীহা নানাভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল। ডিক উইলসন তাই লিখেছিলেন যে, আইয়ুব-ব্যক্ত এই আশা পূরণ আদতে অতি বিশাল এক চ্যালেঞ্জ, “মনে হয়, মানুষ কোন্ রাজনৈতিক ইউনিট বা গঠনরূপের সঙ্গে নিজেকে একান্ত করে দেখতে চাইবে তার আকার ও বৈচিত্র্যের একটা সীমানাও রয়েছে।” বস্তুত পাকিস্তান একরূপত্ব অর্জন করতে চেয়েছিল সমস্ত বৈচিত্র্য ও নাগরিক অধিকার অস্বীকার করে, এমনকি হাজার মাইলের ভৌগোলিক পার্থক্য বিস্মৃত হয়ে। আর তাই বলপ্রয়োগই হয়েছিল তার প্রধান অবলম্বন, একাত্তরে যা হয়ে উঠলো একমাত্র অবলম্বন এবং পর্যবসিত হলো নিষ্ঠুর গণহত্যায়। এক রক্তসাগর পেরিয়ে উদ্ভব ঘটলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের বিপরীতে সকল ধর্মের সম-অধিকার সম্পন্ন জাতীয় ঐক্যের দেশ হিসেবে, যে ঐক্য মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যে-মূল্যবোধ প্রতিফলিত হয়েছে ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে।

চার.

সত্তরের দশকের সূচনায় ডিক উইলসনের বই যখন প্রকাশিত হয়, তার পরপর অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এবং এখন সেই পর্ব থেকে দীর্ঘ পথ পার হয়ে এসেছে পৃথিবী ও এশিয়া। আজকে নতুনভাবে উচ্চারিত হচ্ছে এশীয় জাগরণের কথা, যা কেবল কথার কথা হয়ে নেই, কিংবা হয়ে নেই নিছক আশাবাদিতা। কারণ এশীয় এই জাগরণের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও বাস্তবতা নানাভাবে স্বীয় শক্তির জানান দিচ্ছে। এশিয়ার এই জাগরণ কয়েক শতাব্দীর পশ্চিমী আধিপত্য মোচন করে নতুন এক বিশ্ব-ব্যবস্থার জš§ দিতে চলেছে। বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এক্ষেত্রে বড়ভাবে নিবদ্ধ হয় চীনের ওপর, তবে ভারতের ভূমিকাও ক্রমে জোরদার হয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তবে ভারতের পিছুটান রয়েছে অনেক বেশি, যার একটি ভারতের দারিদ্র্য ও ধনী-গরিব বৈষম্য এবং আরেকটি অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় ফারাক ধারণে সমাজের ব্যর্থতা। সাম্প্রতিককালে ভারতে গ্রামীণ দারিদ্র্যমোচনে বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়া হলেও কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জনে তা সফল হয়নি। অন্যদিকে ধর্মের তাস নিয়ে খেলতে গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদরা সবসময়ে পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছে, গুজরাট দাঙ্গা ও বিজেপির উত্থান তাই হাতে হাত ধরে চলেছে। এই পথ যে ভারতীয় সমাজবিকাশের পথ হতে পারে না, সেই স্বীকৃতিও ক্রমে জোরদার হচ্ছে এবং মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের বহুত্ববাদ রক্ষা ও প্রসারে তাদের অঙ্গীকার এক ধরনের জাতীয় ঐকমত্যই প্রকাশ করে।

ভারত-চীনসহ এশীয় অর্থনীতির শক্তি অর্জনের এই প্রবণতা ব্যাখ্যাকালে ঐতিহাসিক মার্কিন উলফের উক্তি এখানে পেশ করা যায়। তিনি বলেছেন, “বিগত কয়েক দশকের মতো এশিয়ার উত্থান যদি অব্যাহত থাকে তাহলে ইউরোপ এবং পরবর্তীকালে উত্তর আমেরিকার দুই শতাব্দীর আধিপত্যের অবসান ঘটবে। একদা জাপান ছিল এশীয় জাগরণের সূতিকাগার। কিন্তু দেশটি ছিল অতি ক্ষুদ্র এবং অনেকটা ভেতরমুখী, দুনিয়া পাল্টাবার উপযোগী নয়। ইউরোপ ছিল অতীত, আমেরিকা হচ্ছে বর্তমান এবং বিশ্ব-অর্থনীতির আগামী হচ্ছে চীন-প্রভাবিত এশিয়া। এই ভবিষ্যৎ অবশ্যই প্রতিষ্ঠা পাবে, প্রশ্ন হলো কত তাড়াতাড়ি এবং কত সুস্থিরভাবে সেটা ঘটে।”

এশীয় জাগরণের বড় দেশগুলো কিংবা বড় অর্থনৈতিক শক্তির ওপরই বিশ্লেষকদের দৃষ্টি বিশেষভাবে নিবদ্ধ থাকে। এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান তাই বৈশ্বিক বিবেচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় না। কিন্তু এশীয় জাগরণে বাংলাদেশের ভূমিকা কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় হতে পারে না। প্রথমত এশীয় জাগরণ যদি ডিক্লাইন অব দা ওয়েস্ট হয়ে থাকে, তবে এর প্রথম লক্ষণ বাংলাদেশের অভ্যুদয়, যা পশ্চিমী শক্তিকে অস্বীকার করে আবির্ভূত হয়েছিল। সত্তরের দশকের পৃথিবীতে কোনো রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে নতুন রাষ্ট্রের উদ্ভব মানতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রস্তুত ছিল না। তদুপরি পাকিস্তানের ভেঙে যাওয়া মানতে মার্কিন প্রশাসন মোটেই সম্মত ছিল না। পাশ্চাত্যের প্রবল বাধা মোকাবিলা করে উদ্ভূত স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের বিগত চার দশকের অভিযাত্রা তাই দাবি করে বিশেষ মনোযোগ।

নতুন যে অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকাশ ঘটছে পূর্ব এশিয়াজুড়ে তার বিস্তার আসলে জাপান থেকে ভারত পর্যন্ত বিশাল ভূখণ্ড। এই বিস্তারকে আরেকভাবে আমরা ধানের সংস্কৃতির অঞ্চল হিসেবে অভিহিত করতে পারি, যে-সংস্কৃতি জাপান থেকে যাত্রা করে বাংলাদেশে এসে শেষ হয়েছে এবং ভারতে উপচে পড়ে রূপ নিয়েছে ধান ও গমের মিশ্র সংস্কৃতির। তো ধান্যসংস্কৃতি অঞ্চলে দরিদ্রতর দেশও রয়ে গেছে যেমন বলা চলে নেপাল-লাওস অথবা মায়ানমারের কথা। অঞ্চলের সমৃদ্ধি পিছিয়ে-থাকা দেশেও যে অভিঘাত সঞ্চার করবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। তবে এই জাগরণের স্বরূপ ও সম্ভাবনা আমরা সম্যক উপলব্ধি করতে পারছি সেটা বলা যাবে না। কেননা আমাদের প্রাচ্যবিদ্যা অত্যন্ত দুর্বল এবং চীন বা কোরিয়া অথবা ভিয়েতনামের সাম্প্রতিক পরিবর্তনময়তা সম্পর্কে আমাদের যা কিছু জ্ঞান তার বেশিরভাগ পশ্চিমী সূত্রে প্রাপ্ত। তদুপরি চীনের উন্নয়ন পাশ্চাত্য নানাভাবে রাখঢাক করে রাখছে এবং চীনের অগ্রগতি নয়, তার সমস্যা নিয়ে শোরগোল পাকিয়ে তুলছে। চীনের উন্নয়নের সাম্প্রতিক দুই অভিব্যক্তি এটা বলিষ্ঠভাবে প্রকাশ করেছে যে আগামীতে এশীয় উন্নয়নে চীন আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে চলছে। এর একটি অভিমুখ হচ্ছে চীন ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্যের ঐতিহাসিক রেশমপথ বা সিল্ক রুটের পুনরুজ্জীবন। এই সিল্ক রুট ইতিহাসের বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে নির্মিত হবে নতুনভাবে এবং তা আসলে এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ নিবিড় করবে, ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছবার অভিলাষ তাতে মুখ্য নয়। সিল্ক রুটে স্থলপথ ছাড়াও থাকবে রেলপথ। সুউচ্চ পর্বত পাড়ি দিয়ে তিব্বত পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করে এবং সাংহাই-বেইজিং অতি দ্রুতগতিসম্পন্ন ট্র্যাক বসিয়ে চীন সম্প্রতি প্রমাণ করেছে রেল যোগাযোগ স্থাপনে তাদের দক্ষতা কোন্ পর্যায়ে পৌঁছেছে। নতুন রেশমপথ পুরনো পথরেখা অনুসরণ করবে বটে, তবে তৈরি করবে নতুন অনেক পথ। এর ফলে পশ্চিমবাংলা-বাংলাদেশ-মায়ানমার-থাইল্যান্ড হয়ে চীনের হুনান প্রদেশের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। ফলে চীনের এই বিশাল প্রদেশের জন্য চট্টগ্রাম হতে পারে সমুদ্রমুখ ও বন্দর। অন্যদিকে হিমালয় পর্বতের তলদেশ দিয়ে রেল এসে পৌঁছবে নেপালের সীমানায়, পরবর্তীকালে পৌঁছে যাবে কাঠমান্ডু। তারপর কোনো দূর ভবিষ্যতে কাঠমান্ডু থেকে নিশ্চয় রেল পাতা হবে বাংলাদেশের সীমানা অবধি, তখন বাংলাদেশ রেলওয়ে বাইরের আরেক দুনিয়ার সঙ্গে হবে সংযুক্ত, যে-যোগাযোগ এখন ভারতের সঙ্গে সংযুক্তির মাধ্যমে পাচ্ছে নতুন বিস্তার। বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম, মংলা, পায়রা ও গভীর সমুদ্রবন্দর তখন পূর্ব এশিয়ার এক বিশাল অঞ্চলের জন্য পণ্যের যোগানদার হয়ে উঠতে পারবে। সমুদ্র তীর ঘেঁষে কনটেইনারবাহী ফিডার জাহাজের চলাচল সংক্রান্ত চুক্তি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে যোগাবে নতুন মাত্রা। বঙ্গোপসাগর যে অর্থনৈতিক এলাকা হিসেবে বিকশিত হতে পারে সেই সম্ভাবনা বাংলাদেশকে আগামীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করবে। কেননা নামেই যেমন প্রকাশিত, বঙ্গোপসাগর তো বাংলারই উপসাগর, আর এর মধ্যমণি হয়ে আছে বাংলাদেশ, তবে এসব সুফল আহরণের জন্য দরকার হবে উপযুক্ত প্রস্তুতির।

চীনের বর্ধিত ভূমিকা পালনের দ্বিতীয় অভিমুখ আরো অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ পরবর্তীকালে ব্রেটন উড্স্ সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক নামেই বিশ্বরূপ ধারণ করেছে, বাস্তবে তা মার্কিন নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক। প্রতিষ্ঠার পর সত্তর বছর পার হয়ে গেলেও ব্যাংকের কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনেনি এর নিয়ন্ত্রক শক্তি। এই পটভূমিকায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়েছে চীন। প্রাথমিক পুঁজি বড়ভাবে যোগান দিয়েছে চীন এবং আমেরিকার বারণ উপেক্ষা করে এই ব্যাংক গঠন প্রয়াসে সামিল হয়েছে বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানিসহ কতক ইউরোপীয় দেশ। এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বা এআইআইবি শীর্ষক আর্থিক প্রতিষ্ঠান মার্চ ২০১৫ থেকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে। আশা করা যায়, আগামী দুয়েক বছরের মধ্যে ব্যাংকের বাস্তব কার্যক্রম শুরু হবে এবং বাংলাদেশসহ বিভিন্ন এশীয় দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে এই ব্যাংক কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি নতুন মাত্রা নিয়ে আবির্ভূত হবে এশীয় উন্নয়নের আরেক শক্তিমান ব্যাংক পশ্চিমী প্রভাবের বাইরে প্রাচ্যের সক্ষমতার প্রকাশ। বিশ্ব অর্থনীতির নতুন সমীকরণ এভাবে ক্রমেই আরো অধিকভাবে বাস্তব হয়ে উঠছে।

বলা হয়ে থাকে কোনো দেশ তার বন্ধু বেছে নিতে পারে, কিন্তু প্রতিবেশী নির্বাচনের ক্ষমতা তার নেই, এটা ইতিহাস-নির্ধারিত, প্রায় বুঝি বিধিদত্ত। বাংলাদেশ তার স্থল সীমানার সিংহভাগ জুড়ে ভারত দ্বারা বেষ্টিত, ফলে বাংলাদেশের বিকাশের প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে মিত্রতা ও সংযুক্তি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। উপমহাদেশে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিষময়তার বিপরীত মতাদর্শ তুলে ধরে জš§ নেয় বাংলাদেশ, যে বহুত্ববাদী সমাজ গঠন ভারতেরও রাষ্ট্রীয় আদর্শ। ফলে মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে মৈত্রীবন্ধন গড়ে ওঠে তা ছিল অভিন্ন এক আদর্শের ভূমিতে রোপিত। তাই ভারতের সঙ্গে বন্ধুতা কেবল প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখার তাগিদ থেকে উদ্ভূত নয়, উপমহাদেশকে সংঘাত ও সাম্প্রদায়িক হানাহানি থেকে মুক্ত করে সম্প্রীতির সমাজ-নির্মাণের জন্যও এর তাৎপর্য সবিশেষ। ধর্মের নামে যে বিদ্বেষ ও ঘৃণা সঞ্চার করা হয় অপর ধর্মানুসারীর বিরুদ্ধে তা মানবিক বোধ বিলুপ্ত করে মানুষকে ঠেলে দেয় অমানবিকতার পথে, সেই পিচ্ছিল পথে যে অধঃপাত শুরু হয় সেটা পরধর্মে সীমিত থাকে না, নিজ ধর্মের মানুষের বিরুদ্ধেও ঘৃণা ও বিদ্বেষের হলাহল ফেনিয়ে তোলে। আজকের পাকিস্তান এমনি অধঃপতিত সমাজের জ্বলন্ত উদাহরণ, যেখানে অব্যাহতভাবে চলছে মুসলমান কর্তৃক মুসলমান নিধন।

ঐতিহাসিক ও আদর্শগত ভিত্তির বাইরে বাংলাদেশ-ভারত সহযোগিতা নিবিড়করণে বড় তাগিদ হলো অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভারতের আবির্ভাব, যা বহুভাবে আঞ্চলিক সুফল বয়ে আনতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বিস্তারের জন্য ভারতের সঙ্গে সংযুক্তি বা কানেক্টিভিটির কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা হলো এই সংযুক্তি ঘটতে পারে সড়ক, রেল, নদী ও সমুদ্রপথে। উপনিবেশবাদ বাংলা ও বৃহত্তর ভারতবর্ষকে একটি একক দেশ হিসেবে শাসন করেছিল দীর্ঘকাল। ফলে সংযুক্তির অনেক সূত্র গড়ে উঠেছিল অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার স্বাভাবিক চাপে, দেশভাগ ও রাষ্ট্রীয় বৈরিতা যার অনেকগুলো ছিন্ন করেছে, অনেক সূত্রের বিলোপ ঘটিয়েছে। আজ এশিয়ার ধান্যসংস্কৃতির উত্থানকালে বাংলাদেশকে তাই বড় পরিসরে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে।

এখানে উল্লেখ করা দরকার, সহযোগিতার যে-অঞ্চল আমরা বিবেচনায় নেয়ার অভিপ্রায়ী তার বিস্তার সুবিশাল, এশিয়ার বৃহদংশ জুড়ে এর অধিষ্ঠান। ফলে মৈত্রী বা সহযোগিতার কোনো পদক্ষেপই এই বিস্তার অস্বীকার করে ফলপ্রসূ হতে পারে না। এটা তাই বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব চীনের বিনিময়ে নয়, আবার চীনের সঙ্গে মৈত্রী ভারতের বিকল্প নয়। কানেক্টিভিটির যে-ধারণা বাংলাদেশ জোরের সঙ্গে তুলে ধরছে সেটা ধানের সংস্কৃতির মধ্যে মিথষ্ক্রিয়তার বিপুল সম্ভাবনা মেলে ধরে। অন্যদিকে এই বিস্তারের এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যেও শ্রুত হয় সমরূপত্বের সুর, আমরা খুঁজে পেতে পারি মিলনের নানা সূত্র। প্রাচীনকালে পূর্ব ভারত থেকে উদ্ভূত হয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গোটা অঞ্চলজুড়ে প্রসার লাভ করেছিল। মধ্যযুগে শ্যাম, কাম্বোজ হয়ে দ্বীপময় ভারত তথা ইন্দোনেশিয়ায় হিন্দু ধর্মের বিস্তার অঞ্চলে আরেক যোগসূত্র রচনা করেছিল। পরবর্তীকালে আরব বণিক ও সুফি ধর্মবেত্তাদের সুবাদে ঘটে ইসলামের প্রসার, বাংলাদেশের পর যার প্রধান আশ্রয় হয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া, তা’ ছাড়াও থাইল্যান্ডের দক্ষিণাংশে, কাম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের চম্পা রাজ্যে, ফিলিপাইনের মিনদানাও দ্বীপে, চীনের সিনকিয়াং প্রদেশে ইসলাম আপন ভিত্তিভূমি খুঁজে পায়।

আধুনিককালে এসে ধানের সংস্কৃতির অভিন্নতা ও যোগসূত্র অন্যতর রূপে উদ্ভাসিত হয়েছে যা বিশ শতকের ষাটের দশকে জাপানি পদ্ধতির ধানচাষ হিসেবে প্রথম আমাদের দেশে অভিঘাত সৃষ্টি করে। নিবিড় চাষের পরিবর্তে সারিবদ্ধ চারা রোপণের এই রীতি ফলন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং চাষীদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। এই পথ বেয়েই আসে পাওয়ার টিলার, পাশ্চাত্যের ট্রাক্টরের বিপরীতে জাপানিদের ক্ষুদ্রায়তন স্বাদেশিক উদ্ভাবন। মনে হতে পারে শতাব্দীর শুরুতে ওকাকুরা কাকুজি প্রযুক্তির যে রূপান্তর প্রত্যাশা করেছিলেন এ-যেন তারই রূপায়ন পঞ্চাশ বছর পরে হলেও অর্জিত হলো। বাংলাদেশে পাওয়ার টিলার জনপ্রিয় হতে সময় লাগেনি, অধিকন্তু বাংলার চাষীর উদ্ভাবনী ক্ষমতা এই যন্ত্রকে কত বিচিত্ররকম কাজেই-না ব্যবহার করলো এবং করছে। তবে অভিন্ন ধান্যসংস্কৃতিতে বড় ধরনের অভিঘাত বয়ে আনলো ফিলিপাইনের আন্তর্জাতিক রাইস রিসার্চ ইন্সটিটিউট উদ্ভাবিত নতুন বীজধান যা ইরি নামে গোটা ধানের সংস্কৃতি অঞ্চলে অর্জন করে অশেষ জনপ্রিয়তা।

বিশ শতকের সূচনা থেকে যে এশীয় জাগরণের বাণী উচ্চারিত হতে শুরু করেছিল শত বছর পেরিয়ে আজ তা’ বাস্তব রূপ নিয়ে উদ্ভাসিত হতে চলেছে। এই বাস্তবতা নির্মাণে চীন, ভারত, কোরিয়া, কাম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান কী ভূমিকা পালন করছে বা করবে তা যেমন আমাদের বিবেচ্য তেমনি বড়ভাবে দেখতে হবে বাংলাদেশ এখানে কোন্ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর কোনো সহজ উত্তর নেই। তবে ধানের সংস্কৃতির জাগরণে উপযুক্ত ভূমিকা পালন করবার জন্য বাংলাদেশ যে প্রস্তুত সেটা আজ দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করা যায়। একাত্তরে ধ্বংসপ্রাপ্ত রক্তপ্লাবিত ভূমিতে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছিল বাংলাদেশ। দেশটি তখন ছিল বৈদেশিক সাহায্যের ওপর একান্ত নির্ভরশীল, খাদ্যে ঘাটতির দেশ হিসেবে মার্কিন খয়রাতি গমের জাহাজ বন্দরে নোঙর করা না-করার ওপর নির্ভর করছিল বহু মানুষের বাঁচা-মরা। আজ জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেলেও বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, বৈদেশিক সহায়তাদানের ক্ষমতা কমে এসেছে পশ্চিমের এবং সেই সাহায্যের ওপর নির্ভরতাও আর নেই বাংলাদেশের। পদ্মা সেতুর মতো বিশালাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তায় এগিয়ে এসেও নানা অজুহাত দাঁড় করিয়ে বিশ্বব্যাংক যখন তার হাত গুটিয়ে নেয় পুরোপুরি তখন সেটা প্রাচ্যের অর্থনৈতিক বিকাশে পাশ্চাত্যের অসংবেদনশীলতার উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। তার চেয়েও বড় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় ভিন্নতর বাস্তবতা, আর কোনো দেন-দরবার কাকুতি-মিনতি না করে একদা তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে চিহ্নিত ও তৎপরবর্তীকালে ঘুরে দাঁড়ানো বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে এমনি মেগা-প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং তা বাস্তব করে তোলার বিশাল কর্মযজ্ঞে ঝাঁপ দেয়। এই ঘটনা ধানের সংস্কৃতির দেশের জাগরণ তথা এশিয়ার জাগরণের অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে এবং উদাহরণ হওয়ার আরেক বাড়তি কারণ হলো বিশালাকার সেতু নির্মাণের প্রযুক্তি ও দক্ষতা এখন আর কেবল পাশ্চাত্যের করায়ত্ত নেই, চীন-কোরিয়া-ভারতও এক্ষেত্রে বিপুল অগ্রগতি সাধন করেছে, পদ্মা সেতু নির্মাণে চীনের সংশ্লিষ্টতা সেই সাক্ষ্যই প্রদান করছে।

বাংলাদেশ নানাভাবে অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরিচয় দিয়ে চলেছে, বহুভাবে প্রকাশ পাচ্ছে অগ্রগতি ও বিকাশের পরিচয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভের পরিমাণবৃদ্ধির পেছনে এখনও প্রবাসী শ্রমিক প্রেরিত রেমিটেন্স পালন করছে বড় ভূমিকা। রেমিটেন্স প্রেরণকারীরা অর্থনীতির সচলতা বৃদ্ধি করছেন, বিকাশের অনেক সম্ভাবনা তৈরি করছেন, তবে এঁরা প্রায় সর্বাংশে গ্রামীণ কৃষক কিংবা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। শহুরে শিক্ষিতজন যাঁরা বিদেশে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টায় রত, তাঁরা দেশে প্রেরণ করেন সামান্যই অর্থ। অর্থনীতির চাকা সচল রাখার আরেক কারিগর পোশাক-শ্রমিক নারী, যাঁরা প্রায় সর্বাংশে গ্রাম থেকে আগতা, কিন্তু সীবনশিল্পী হিসেবে দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে আগামী গ্রীষ্মের পাশ্চাত্য ফ্যাশনদুরস্ত পোশাক নিপুণভাবে সেলাই করে দিচ্ছেন আজকের বাংলাদেশে। এর সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের যে নবীন উদ্যোক্তাদল তাঁরা পশ্চিমী বাজারে দেশজ পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু বাজার-নিয়ন্ত্রক পশ্চিমী একচেটিয়া গোষ্ঠীর কাছ থেকে এখনও ন্যায্যমূল্য আদায় করতে পারছেন না।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও অর্থনীতির সক্ষমতাবৃদ্ধি অনেক দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে আমাদের। এক্ষেত্রে একটি বড় দিক হলো অর্থনীতির বিকাশের সুফল যেন এর মূল চালিকাশক্তি দেশের সাধারণ মানুষ পেতে পারে, তাদের মানবিক জীবনযাপন ও জীবনবিকাশের সুযোগ যেন নিশ্চিত করা যায়। অধিকন্তু, পরিবর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশ যেন তার যথাযোগ্য স্থান করে নিতে দূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হতে পারে। এখানে স্বকীয় ও সৃজনশীল চিন্তা এবং প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গির বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রশ্ন রাষ্ট্রিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, বৈশ্বিক, আঞ্চলিক এবং সাংস্কৃতিকও বটে। আমরা যত বিকশিতই হই শেষ বিচারে আমরা ধানের সংস্কৃতির মানুষ ও দেশই রয়ে যাব, সেই সাধন-ভজন থেকে বিচ্যুত হওয়ার অবকাশ আমাদের নেই। আমরা নতুন এক বিশ্ববাস্তবতার মুখোমুখি হতে চলেছি, এই বাস্তবতায় আমাদের অবস্থান ও ভূমিকা আমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে। সেই চিন্তা ও বিতর্ক উস্কে দিতেই বর্তমান আলোচনার অবতারণা।

পাদটীকা

ধানের সংস্কৃতির অভিযাত্রা যেমন আমরা লক্ষ্য করি না, তেমনি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হই এর প্রত্যাবর্তন। দু’হাজার বছরে আগে কলিঙ্গ যুদ্ধের পর চন্ডাশোক যখন ধর্মাশোকে পরিণত হলেন, তখন গোটা সাম্রাজ্য জুড়ে শান্তির বাণী-খচিত স্তম্ভ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সম্রাট অশোকের সাম্রাজ্যভুক্ত বাংলা অঞ্চল জুড়েও ছিল এমনি কতক শান্তিস্তম্ভ যা ইতিহাসে অশোকস্তম্ভ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। বছর তিনেক আগে রামুর অদূরে পাহাড় ঘেঁষা প্রাচীন এক বৌদ্ধ মন্দির দেখার সৌভাগ্য লেখকের হয়েছিল। এর প্রাচীনত্ব সম্পর্কে সন্দিহান হওয়ার অবকাশ নেই, কেননা নকশা-খচিত সুপ্রাচীন কিছু প্রস্তুর ও স্তম্ভের ভগ্নাংশ মন্দির-অভ্যন্তরে পৃথকভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। মঠের সন্ন্যাসীরা দাবি করেন চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ পঞ্চম শতকে বাংলায় অবস্থানকালে এই বৌদ্ধ উপাসনালয়ে এসেছিলেন। তাঁদের দাবি খুব অযৌক্তিক নয়, কেননা হিউয়েন সাঙ চট্টগ্রাম বন্দরে নেমে বাংলা পরিভ্রমণ শুরু করেছিলেন। তাঁদের আরেক দাবি মহামহিম সম্রাট অশোক এই মন্দিরেও শান্তির বাণী খচিত স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পুণ্যাত্মা অশোকের মহিমা অথবা শান্তিস্তম্ভের কল্যাণে হোক কিংবা নিকটবর্তী সেনাক্যাম্পের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, যে-কারণেই হোক রামুর বৌদ্ধ উপাসনালয়গুলো যখন একুশ শতকের বাংলার বর্বর এক জনগোষ্ঠী দ্বারা আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছিল তখন সুপ্রাচীন এই মন্দির শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায়, থাকতে পারে অটল। বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক অধ্যায়গুলো রচনার ভার আমাদের ওপরই ন্যস্ত হয়েছে। কোন্ নতুন অধ্যায় আমরা যুক্ত করবো ইতিহাসের মহাগ্রন্থে সেটা আমাদের দায়। প্রসঙ্গত আমরা স্মরণ করতে পারি প্রখ্যাত মার্কিন মহাকাশবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানের অভিজ্ঞতা, দক্ষিণ আমেরিকার এক বৌদ্ধমন্দিরের দেয়ালে লেখা বাণী তিনি উদ্ধৃত করেছিলেন তাঁর এক গ্রন্থে, “প্রত্যেক মানুষ জন্মাবার সময় স্বর্গের চাবি হাতে নিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়, সমস্যা হলো এই চাবি দিয়ে নরকের দ্বারও খোলা যায়।” ইতিহাস-চাবি দিয়ে বর্তমানকালে কোন্ দুয়ার আমরা খুলব সেটা আমাদের দ্বারাই নির্ধারিত হবে।

অশোক-স্তম্ভের দেশ আমরা, আজ হয়তো সেই স্তম্ভের কোনো চিহ্নই বাংলায় খুঁজে পাওয়া যাবে না, তবু তো ইতিহাস থেকে কোনো কিছু চিরতরে হারিয়ে যায় না। হারিয়ে যে যায় না তার প্রমাণস্বরূপ দু’হাজার বছর পর শান্তিস্তম্ভ আবার ফিরে এসেছে। বাংলায়Ñজাপানি বৌদ্ধসংঘের সদস্যরা তাদের শান্তিব্রতী সাধনায় বিশ্বের নানা দেশে সরল শ্বেতশুভ্র অনাড়ম্বর শান্তিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র ভবনের সামনের চত্বরে রয়েছে এমনি এক স্তম্ভ খুবই সাধারণ আটপৌরে, তবে ইতিহাসের পরম্পরা ও অপরিমেয় শক্তির প্রকাশ বটে। খচিত রয়েছে বাণী, “শান্তি বিরাজিত হোক বিশ্বে, সকল বসতিতে।”

তাই ভোলার উপায় নেই, ধান্যসংস্কৃতি আমাদের আশ্রয়, ইতিহাস আমাদের নিয়তি, শান্তি আমাদের অনিষ্ট।