১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

একজন আজাদ আবুল কালাম


মঞ্চসফল অভিনেতা ও নির্দেশক আজাদ আবুল কালাম। টেলিভিশন নাটকে সমান তালে কাজ করলেও কখনও ভুলে যাননি মঞ্চকে। নাটক, চলচ্চিত্রে তাঁর শক্তিশালী অভিনয় দক্ষতায় দর্শক মন জয় করেছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি নাটক রচনা ও নির্দেশনা দিচ্ছেন দক্ষ হাতে। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই তারকার সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন পান্থ আফজাল

উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র থাকা অবস্থায় নাট্যদল আরণ্যকের সঙ্গে যুক্ত। মঞ্চনাটকের দুর্দান্ত অভিনেতা। এরপর ১৯৯৫ সালে ‘বিশ্বাস’ নাটক দিয়ে টেলিভিষন জগতে পদার্পণ। এরপর একে একে অনেক নাটক ও চলচ্চিত্র অভিনয় করছেন। পাশাপাশি নাটক লিখছেন এবং নির্দেশনা দিচ্ছেন এই শক্তিমান অভিনেতা। তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র কীর্তনখোলা, গেরিলা, মেহেরজান, অনিশ্চিত যাত্রা, লালন, আমরা একটা সিনেমা বানাবো এবং নাটক বিশ্বাস, চুপকথা, নায়িকা বৃত্তান্ত, রেস্টুরেন্ট-২১, ক্ষণিকালয়, ধোয়াঘর, কেন এলে অবেলায়, আর আসিব না ফিরে ইত্যাদি। নাটক ‘সবুজ ভেলভেট’র জন্য সেরা নাট্যকার হিসেবে তিনি মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার লাভ করেন।

সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতায় প্রদর্শিত প্রাচ্যনাট মঞ্চনাটক ‘ট্রাজেডি পলাশবাড়ী’ শোটি কেমন হলো?

খুবই ভাল। এর আগে ইন্ডিয়ায় আমরা যেসব নাটকের শো করেছি, সেগুলো ছিল কিছুটা বড় কাস্টের। প্রায় ৩০-৪০ জনের। আর এটা হলো কাস্ট ও ক্রু মিলে সর্বমোট ১২ জনের একটা টিম। তবে ওদের ফেস্টিভ্যালটা অনেক বড়, সত্যিকার অর্থে ইন্টারন্যাশনাল। ফ্রেঞ্চ দল, আফ্রিকান দল, কেরালার দল, শ্রীলঙ্কান দল, পাকিস্তান দলের মতো বড় বড় দলের মধ্যে আমাদের দল ছিল সবচেয়ে ছোট এবং ইনফ্যাক্ট সবচেয়ে জুনিয়র একটা গ্রুপ। নেপালি দল প্রতি বছর আসে, কিন্তু এবার আসতে পারেনি। আমাদের গ্রুপকে দেখেই ওরা সবাই শঙ্কায় ছিল যে, এরা কিই বা করবে! কিন্তু আমাদের শো দেখার পরে ওরা খুবই স্যাটিসফাইড। আর দর্শকও ছিল অডিটোরিয়াম ভর্তি, যাকে বলে হাউসফুল! উপরন্তু শো শেষ হওয়ার পরও ওরা প্রায় ২ ঘণ্টা আমাদের সঙ্গে ছিল। চারিদিকে শুধু হলভর্তি দর্শকদের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। সবাই অনেক কথা জিজ্ঞাসা করেছে, উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে।

একইসঙ্গে মঞ্চ বা ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় অভিনয়, নির্দেশনা, লেখালেখি এবং ভয়েজ ওভার কিভাবে সমন্বয় করেন?

এগুলো আসলে একেকটা এক এক রকম; একই কাজ। সবই ধরা যায় অভিনয়। ভয়েজ দেয়া একটা টেকনিক্যাল বিষয়। মঞ্চ বা ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় অভিনয়, লেখালেখি বা নির্দেশনা যাই করি না কেন, সবই আমার কাছে এক। এসবই আলাদা কোন কাজ বলে আমার মনে হয় না। আসলে সবই একটাই কাজ, বিভিন্নভাবে আমাদের করতে হয়।

আপনার মিডিয়াতে আসার পেছনের গল্পটা জানতে চাই?

মঞ্চে ১০ বছর কাজ করে তারপর আমি মিডিয়ায় কাজ করি। তখন মামুনুর রশিদের লেখা ও নির্দেশনায় ‘বিশ্বাস’ নাটকে প্রথম অভিনয় করি আমি। আর বলা চলে, আমি মিডিয়াতে কাজ করতে এসেছি শুধু টাকার জন্যে; আর কোন কারণ নেই। সেই সময় অলরেডি আমি বিবাহিত আর বাবা রিটায়ার্ড করেছেন। যেহেতু বাবার প্রতি আমি নির্ভর করতে পারছিলাম না, সেই কারণেই অভিনয়কে পছন্দ করতে হয়েছে পেশা হিসেবে। পাশাপাশি আমি পার্টটাইম শিক্ষকতা করতাম স্কলাস্টিকা স্কুলে। কিন্তু ওটা আসলে সাফিসিয়ান্ট ছিল না। তখন আমাকে টেলিভিশনে অভিনয় করতে হয়েছে। আর মূল উদ্দেশ্যই ছিল অর্থ উপার্জন। অন্যদিকে অলরেডি আমি একটি থিয়েটার দল গঠন করে ফেলেছি। সেই সময় অনেকেই আমাকে টিভিনাটকে অভিনয় করতে বলেছে, কিন্তু করা হয়ে ওঠেনি।

নির্দেশক হিসেবে চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে আপনার আগামীর ভাবনা কী?

আস্তে আস্তে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে করতে আসলে এই নির্দেশনায় আসা। আমি সিনেমায় একসময় এ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছি মামুনুর রশিদ ও বাদল রহমান সাহেবের সঙ্গে। তখন থেকেই সিনেমার প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ ছিল; সিনেমা মেকিংয়ের প্রতি আকর্ষণ ছিল। তারপর টুকটাক ডকুমেন্টারি মাঝে মাঝে আমি করেছি। তাই মনে হলো দেখি না, একটা-দুইটা কাজ করে আগে দেখি! ভাল লাগলে হয়ত এইটা কনটিনিউ করব!

মঞ্চে কাজ করার ক্ষেত্রে নতুনদের কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আসলে প্রত্যেক মঞ্চকর্মীদের ধরেই নিতে হবে যে, তারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে এখানে এসেছে। সে এখান থেকে শুধু আনন্দটাই পাবে। সে যদি শুধু আনন্দ নিয়ে সেটিসফাইড থাকে, তাহলেই সে থিয়েটার করতে পারবে। অন্যথায় তার এটা স্থান নয়। এটা হচ্ছে একটা মিশন। মানসিক ও শারীরিকভাবে এখানে কাজ করার সাধনা থাকতে হবে; সম্পূর্ণ সঁপে দিতে হবে।

ঢাকার বাইরের থিয়েটারকর্মীদের বড় স্থানে কাজের প্রতিবন্ধকতাকে কিভাবে দেখছেন?

এই প্রতিবন্ধকতা দূর করা একক মানুষের পক্ষে সম্ভব না। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক অবস্থা একটা আরেকটার সঙ্গে রিলেটেড। মফস্বলের একটা ছেলে বা মেয়ে যে থিয়েটার করবে, তার সামাজিক নিরাপত্তার একটা বিষয় আছে। ঢাকায় যারা আসে, তারা আসলে সারভাইভ করার জন্যে আসে। তাকে করে খেতে হয়; নতুন আবহাওয়ায় খাপ খাওয়াতে হয়। ঢাকার বাইরের কর্মীদের কাজ করার ক্ষেত্র অনেক কম। ঢাকার বাইরের শহর বা মফস্বলের সকলের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই সবার দৃষ্টি কম থাকে। নিজেকে তো চলতে হবে, থিয়েটার দিয়ে সে তো চলতে পারবে না। ফলে বড় স্থানে কাজ করা তার জন্য কঠিন হয়ে যায়। এটা বাংলাদেশে প্রায় প্রতিষ্ঠিত সত্যের মতো হয়ে গেছে।

বর্তমানে আপনার কাজের ব্যস্ততা সম্পর্কে কিছু বলেন?

আমি আসলে সব সময়ই ব্যস্ত থাকি। ঈদ বা কোন উপলক্ষ বলে কিছু নেই। কাজ তো সব সময় করি, তবে ঈদে টিভিতে একটু বেশি যায় আর কি! আছে, অনেকই আছে। এই যে এখন যেমন এবিএস জেমের টেলিফিল্ম ‘বাইসাইকেল’-এ কাজ করছি। কাজ তো থাকেই, কোন অবসর নেই।

মঞ্চকর্মীদের ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার প্রতি আকর্ষণকে কিভাবে দেখছেন?

ভাল করছে, খুবই ভাল করছে। কেন তোমরা গাড়িতে চড়বা-চালাবা আর সে বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে ঝুলে যাবে? তাদের মিডিয়ার ভাল ভাল প্রতিটি সেক্টরে ইনভলভ হওয়া উচিত, টিভি বা সিনেমায় যাওয়া উচিত। তাদেরই তো মূলত কাজ করা দরকার মিডিয়ার সব স্থানে।

বাংলাদেশের মিডিয়াজগত নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

মিডিয়ার ভাল হলো কিছু লোক করে খেতে পারছে আর খারাপ দিক হচ্ছে এটি একটি দুর্বৃত্তায়নের স্থান। কতগুলো চালাক-চতুর-রংবাজ, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, রাহাজানি করা লোক, অশিক্ষিতÑ এদের হাতে মূলত মিডিয়া জিম্মি হয়ে পড়েছে। এর ফাঁকেই কিছু লোক করে-পরে খেতে পারছে।

আপনার কাছে আপনার শ্রেষ্ঠ কাজ কোনটি?

এটা বলা খুবই ডিফিকাল্ট। কারণ মিডিয়া বা মঞ্চে অনেক কাজই করেছি। হয়ত আজকে যেটাকে শ্রেষ্ঠ কাজ বলে মনে হচ্ছে, পরবর্তীতেই আরেকটা ভাল কাজ করলাম। যেমন প্রথমদিকে ‘বিশ্বাস’ যখন করলাম তখন এটাকে শ্রেষ্ঠ কাজ মনে হয়েছিল। কিন্তু এরপরেই আবার যখন ‘শিল্পী’ সিরিয়ালে কাজ করলাম। তখন তাকেই শ্রেষ্ঠ কাজ বলে মনে হয়েছিল। আসলে প্রতিদিনই নতুন নতুন কাজ করা হচ্ছে। তাই বলা যায় না একজন শিল্পীর কোনটা শ্রেষ্ঠ কাজ। শ্রেষ্ঠ কাজটা আসলে কারও করা হয় না, শ্রেষ্ঠ কাজের জন্য সে অপেক্ষা করে।

উল্লেখ করার মতো এমন কোন ইচ্ছা আছে কি, যা এখনও পূরণ হয়নি?

পৃথিবীর সব মানুষেরই কত রকম ইচ্ছা থাকে, কিন্তু সব তো পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে হ্যাঁ, এ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল, যা পূরণ হয়নি (মুচকি হেসে)। এরকম মানুষের ইচ্ছার কি শেষ আছে? মানুষ হচ্ছে প্রচ- সম্ভাবনাময়; তার মস্তিষ্কের মধ্যে যে কল্পনাগুলো চলতে থাকে অর্থাৎ ডিজায়ার, তার তো কোন শেষ নেই। তাই বলতে গেলে হাজারটা ইচ্ছার কথাই বলতে হবে।

অবসরে সময় কাটাতে চাইলে কোথায় ঘুরতে যেতে চাইবেন?

দেশের বাইরে আমার পছন্দের একটা জায়গা হলো রোম আর সুইজারল্যান্ডের লুজান। আর দেশের মধ্যে অবসর সময় কাটাতে যেতে চাইব বান্দারবান, বরিশালে।