১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শিক্ষামন্ত্রী ॥ ‘পপুলিস্ট’ ও ‘কোয়ালিটি’ শিক্ষাব্যবস্থা


সংসদে বাজেট আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছিলেন, শিক্ষা খাতে বাজেট আরও বাড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষা খাতের ওপর সুবিচার করা হয়নি। দেশের অধিকাংশ মন্ত্রী ও এমপি বাজেট নিয়ে যে আলোচনা করেন তা নিয়ে দেশের মানুষ কিন্তু কোন মাথা ঘামায় না। কারণ সত্য হোক মিথ্যে হোক দেশের মানুষ ধরেই নিয়েছে, অধিকাংশ মন্ত্রী ও এমপি বাজেট না পড়ে না বুঝে গৎবাঁধা কিছু কথা বলেন। আর তার সঙ্গে বিরোধী কয়েকটি দল সম্পর্কে দু-চার কথা বলেন যা বাজেটের সঙ্গে সমঞ্জস নয়। ওই অনেকটা গরুকে নদীতে ফেলে নদী রচনা বড় করে ফেলেন আর কি!

স্বাধীনতার পঁয়তাল্লিশ বছরে এ অবস্থা হবার কথা ছিল না। বরং পার্লামেন্টারিয়ানদের মান অনেক উঁচু থাকার কথা ছিল। দেশের দুর্ভাগ্য হলো, যুক্তবঙ্গের পার্লামেন্ট বা স্বাধীনতা পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর পার্লামেন্ট থেকে বর্তমানে পার্লামেন্টের মান অনেক নিচে। অধিকাংশ এমপির কোয়ালিটি নেমে যাবার মূল কারণ রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন। সামরিক শাসনের ভেতর দিয়ে দেশে যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে তা থেকে দেশ বের হতে পারেনি। এই না পারার প্রধান কারণ সামরিক শাসনের উত্তরাধিকার রাজনীতিতে থেকে যাওয়া। আর তাদেরকে শর্টকাট পথে মোকাবেলা করতে গিয়ে দুর্বৃত্তায়নকে কিছুটা দুর্বৃত্তায়ন দিয়ে ঠেকানো হচ্ছে। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের পাশাপাশি নেমে গেছে শিক্ষার কোয়ালিটি। বাজেট আলোচনার কোয়ালিটি নেমে যাওয়ার এও একটি বড় কারণ।

বর্তমানের বাজেটে শিক্ষার জন্য বরাদ্দের আওতা ও বাজেট-উত্তর অর্থমন্ত্রীর এ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেশের শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য একটি বড় সূচনা। যার ফলে দেশের ভবিষ্যত মন্ত্রী ও এমপি এমনকি আমাদের মতো যারা সাংবাদিকতা করবে তাদের কোয়ালিটিও আমাদের থেকে বাড়বে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, অর্থমন্ত্রী এমন একটি পদক্ষেপ তাঁর বাজেটে নিয়েছেন অথচ শিক্ষামন্ত্রী তাকে ধন্যবাদ না দিয়ে উপরন্তু তাঁর মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ কম হয়েছে বলে এমন বক্তব্য রাখলেন কেন? এ উত্তর শিক্ষামন্ত্রীই ভাল দিতে পারবেন। তবে সার্বিক বিচারে বাইরের থেকে যেটা মনে হয়, এখানে বিষয়টি ঘটে গেছে চিন্তার স্তরের সংঘাত। আমাদের অর্থমন্ত্রী ম্যান অফ কোয়ালিটি অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী আগে ছিলেন সাধারণ লেফটিস্ট এখন ম্যান অফ অপারচুনিস্ট না হোক পপুলিস্ট। ধরেই নিলাম তিনি পপুলিস্ট। কারণ, গত ছয় বছর তিনি একটি পপুলিস্ট শিক্ষা ব্যবস্থার নির্বাহী হিসেবে কাজ করেছেন।

পপুলিস্ট এই শিক্ষাব্যবস্থাটি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে দরিদ্র ও জনঘনত্বপূর্ণ অনেক দেশে বেশ জোরেশোরে চালু হয়েছে। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকা অবস্থায় অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের রমরমা সময়েও অনেক দেশে কিছুটা এ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল। পপুলিস্ট এই শিক্ষা ব্যবস্থা অর্থাৎ একটি বিশেষ লেভেল অবধি বিনামূল্যে বই দেয়া, টিউশন ফিস হ্রাস করা বা মাফ করা, বিনামূল্যে বা কম মূল্যে শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা, শিক্ষার্থীদের পোশাক ও খাবার সরবরাহ করা এমনি নানান সুযোগ দেয়া হয়। এর ভেতর দিয়ে শিক্ষার প্রতি অশিক্ষিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করা হয়। যাতে তারা শিক্ষা নিতে আসে। ফলও পায়। দেশের শিক্ষার হার দ্রুত বাড়ে। পপুলিস্ট এই শিক্ষা ব্যবস্থায় সাধারণ দুটো দিক থেকে সরকারের লাভ হয়, এক. ওই সরকার দ্রুত দেশের শিক্ষার হার বাড়াতে সক্ষম হয়, দুই. শিক্ষার এই সুযোগ সরকার থেকে দেয়ার কারণে ওই সরকারী দলটির জনপ্রিয়তা বা ভোট বাড়ে।

আবার পপুলিস্ট এই শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু খারাপ দিকও আছে। পপুলিস্ট এই শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখতে গিয়ে শিক্ষার মানের থেকে শিক্ষার সহযোগী কিছু বিষয়ের দিকে সরকারের জোর দিতে হয় বেশি। খরচও করতে হয় সেখানে। ফলে শিক্ষার মান নেমে যায়। এই নিম্ন স্তরে পপুলিস্ট শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখার ফলে তার ধাক্কা গিয়ে পড়ে শিক্ষার মূল মানটিতে অর্থাৎ গ্রাজুয়েশানে। প্রথমত প্রকৃত গ্রাজুয়েশানে ভর্তির উপযোগী শিক্ষার্থী মেলে না। বরং তার থেকে নিম্নমানের শিক্ষার্থীরা ভিড় করে। বাধ্য হয়ে তাদের ভেতর দিয়ে একটি বিশেষ ধরনের গ্রাজুয়েট তৈরি করতে হয়। সে ধাক্কাটি কত বড় তার প্রমাণও ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি বিভাগে ভর্তি উপযোগী কোন ছাত্র পাওয়া যায়নি। যদিও এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি অনেক বিষোদগার অনেকে করেছেন। যারা বিষোদগার করেছেন তাদের ভেতর শিক্ষামন্ত্রীও আছেন। কিন্তু তাঁরা ভেবে দেখেননি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের থেকে মান নেমে যাওয়ার পরেও তারা যোগ্য ছাত্র পাচ্ছে না। অতএব বিষয়টি নিয়ে সজাগ হওয়া প্রয়োজন। বাস্তবতা হলো এটা পপুলিস্ট শিক্ষার একটি খারাপ দিক।

পপুলিস্ট শিক্ষা ব্যবস্থার আরো একটি খারাপ দিক হলো, দেশের উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের একটি অংশ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নিজেদের সন্তানদেরকে সরিয়ে ফেলে। গণতন্ত্র মাস পিপলের হলেও রাষ্ট্র পরিচালনা করে মধ্যবিত্ত। এমনকি গণতন্ত্র টিকে থাকেও মধ্যবিত্তের কাঠামোটির ওপর। তাই দেশের মধ্যবিত্ত যখন নিজ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে তাদের সন্তানকে সরিয়ে ফেলে তা খুবই ভয়াবহ। তাতে করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর থেকে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনায় ও সমাজ পরিচালনায় প্রতিনিধি আসা কমে যায়। প্রতিনিধি আসে নিম্নবিত্ত থেকে-যেখানে কালচারের ঘাটতি থাকে। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজ জীবন কালচারের বদলে অন্য কোন কিছু দ্বারা পরিচালিত হয়Ñ যা ইতোমধ্যে ঘটছে। অর্থাৎ কালচারের জায়গা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে ধর্ম। আর ধর্ম যখন মনের থেকে সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনে এসে স্থান নেয় তখন তা অনেক সময় মৌলবাদে রূপ নেয়। যা ভারত, বাংলাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যে এমনকি আফ্রিকাতে দেখা যাচ্ছে।

তবে এই খারাপ দিকগুলো আছে বলে এ নয় যে- কোন অশিক্ষা ভারাক্রান্ত রাষ্ট্র একটি সময় অবধি পপুলিস্ট শিক্ষা ব্যবস্থা নেবে না। অবশ্যই গ্রহণ করবে। তবে এর মন্দ দিকগুলো মাথায় নিয়ে চলবে। সমাজবিজ্ঞানে যেহেতু শতভাগ সঠিক কোন পথ নেই। তাই তুলনামূলক ভাল পথগুলোকে বর্জন ও গ্রহণের ভিতর দিয়ে কখনও কখনও দুইয়ের মিলন ঘটিয়ে চলতে হয়। সেটা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এমনকি শিক্ষাব্যবস্থাই হোক। এই গ্রহণ ও বর্জনের ভেতর দিয়ে চলার পরেও কিছু খারাপ দিক যে সমাজে ও রাষ্ট্রে প্রবেশ করবে না তা নয়। করবেই। সমাজ বিজ্ঞানের এটাই নিয়ম। তবে এখানে গুরুদায়িত্ব পড়ে যিনি মাঝি তার হাতে। তিনি যেন স্রোতের ঢেউ বেছে বেছে চলতে পারেন। তিনি যদি ঢেউয়ের তালে মাতাল হয়ে যান তাহলে নৌকায় অনেক পানি উঠে যায়। এমনকি ঢেউয়ের তোড়ে নৌকা ছিদ্রও হয়ে যায়।

মাঝি হিসেবে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী গত ছয় বছর ঢেউ বেছে বেছে চলতে পারেননি। বরং তিনি ঢেউয়ের তালে মাতাল হয়ে গিয়েছিলেন এবং এখনও সে অবস্থায় আছেন। হয়ত তিনি সাধারণ লেফটিস্ট বলে পপুলিস্টকে তাঁর চোখে বামপন্থার মতো একটা বিষয় মনে হয়েছে। বুঝতে পারেননি পপুলিস্ট পদ্ধতি ও বামপন্থার পার্থক্য। তাই কেউ খাবে তো কেউ খাবে না, তা হবে না, তা হবে না সেøাগানে যেমন রাজপথে মত্ত ছিলেন এখানেও একে একই সেøাগান মনে করেছেন। শিক্ষার মতো একটি জটিল বিষয়ের গভীরে তাঁর বামপন্থী মৌলবাদী মন ঢুকতে পারেনি। যেমন পপুলিস্ট শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিনি কোয়ালিটি শিক্ষা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে পারতেন। পপুলিস্ট শিক্ষা ব্যবস্থা রেখেও জেলাস্কুলগুলোর মান উন্নয়ন করতে পারতেন, রাজধানীর মানসম্পন্ন স্কুলগুলোর মান রক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার যে ভুল করেছিল সেই একই ভুল তিনিও করেছেন। নিচুকে সুযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে উঁচু করে উঁচুর সমানে না নিয়ে গিয়ে তিনিও পশ্চিমবঙ্গের বাম সরকারের মতো উঁচুর মাথা কেটে নিচুর সমান করে সমতা এনে দিলেন শিক্ষা ব্যবস্থায়। যে কারণে পশ্চিমবঙ্গ আজ শিক্ষার মানের দিক থেকে মিজোরামেরও নিচে নেমে গেছে (যদিও গত কয়েক বছরে আবার একটু উন্নতির দিকে যাচ্ছে)।

বামফ্রন্টের ওই ধাক্কা কত বড় তা এখন পশ্চিমবঙ্গের ছেলেমেয়েরা সর্বভারতে তুলনামূলক যোগ্যতার পরীক্ষায় গিয়ে বুঝতে পারছে। পশ্চিমবঙ্গের থেকে আমাদের জন্যে বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যদি ভারতকে পরিচালনার যোগ্য ছেলেমেয়ে না বের হয় তাতে খুব ক্ষতি নেই কারণ আরো ২৯টি রাজ্য তাদের আছে। আর আমাদের দেশটি আমাদের যোগ্যতা দিয়েই চালাতে হবে। তাই আমাদের উচিত ছিল আমরা যেন কোয়ালিটিকে নষ্ট না করি এবং পপুলিস্টকে ধীরে ধীরে কোয়ালিটিতে রূপান্তরিত করতে পারি। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষানীতির আউট লাইন লক্ষ্য করলে কিন্তু তেমনটি দেখা যায়। ছয় বছর পেরিয়ে আজ এ সত্য স্বীকার করতে হবে, শিক্ষামন্ত্রী সেখানে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। বরং উনি পপুলিস্টকে কমিউনিজম ও রিলিজিয়নের এক জগাখিচুড়ি তৈরি করেছেন। তাই এখন দেশের সচেতন মানুষ মাত্রেরই প্রশ্ন, আসলে উনি কী শিক্ষানীতি পরিচালনা করছেন তা নিজে বুঝেছেন কিনা? যেমন ছোট্ট একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, যা থেকে বোঝা যায়- প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও উদ্দেশ্য উনি আসলে বুঝতে পারেননি। প্রধানমন্ত্রী সারাক্ষণ বলছেন, মুক্তিযূুদ্ধের চেতনায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বাস্তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো আকাশ থেকে নামবে না ছাত্রদের মনে। এর জন্যে মুক্তিযুদ্ধের, বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস পড়াতে হবে। ইসলামের ইতিহাস, ইউরোপের ইতিহাস বা আফ্রিকার ইতিহাস পড়িয়ে কি প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা যাবে? যাবে না। অথচ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আদৌ কি পড়ানো হয়? ইতিহাসের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনকে জিজ্ঞেস করলে তিনিই সঠিক উত্তর দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী কিন্তু শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য রাখার জন্য বলেন না মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়তে হবে। পিতার রাজনীতি অনুসরণ করে বা রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞানী শেখ মুজিবুর রহমানকে উপলব্ধি করেই তিনি এ কথা বলেন। নিজস্ব চেতনায় দেশ না গড়লে কী হয় তার আরেক প্রমাণ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ। বিদ্যাসাগর, রামমোহন এমনকি একটা সময় অবধি সুভাষ বোসকেও তাড়িয়ে সবকিছু ‘বামময়’ করতে গিয়ে আজ বাঙালী সংস্কৃতির আধুনিকতার পীঠস্থান কলকাতায় বাঙালী সংস্কৃতি দুষ্প্রাপ্যের তালিকায়। এমনকি ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামে যেহেতু কংগ্রেসের মূল ভূমিকা, তাই তারা সেটাও রেখেছিল দূরে সরিয়ে। ঠিক একই কাজ করে উত্তর ভারতের ও দক্ষিণ ভারতের কিছু অকংগ্রেস শাসিত রাজ্য। আর স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস থেকে দূরে রাখার ফলে তাদের ভেতর দেশপ্রেম থেকে ধর্মপ্রেম বড় হয়ে উঠেছে। উত্তর ভারত ধর্মবাদীরা দখল করে নিয়েছে- দক্ষিণ ভারতে হাত বাড়িয়েছে আর পশ্চিমবঙ্গের ভবিতব্য সেদিকেই। শিক্ষামন্ত্রী কিন্তু চোখ কান খোলা রেখে এগুলো দেখেননি। তেমনি তিনি বুঝতেও পারেননি শেখ হাসিনার ভাষা। তিনি মনে করেছেন, আমরা যেমন এক সময়ে সমাজতন্ত্র-সমাজতন্ত্র করতাম, আবার সোভিয়েত বন্ধ তো সমাজতন্ত্র বন্ধ। শেখ হাসিনাও মনে হয় ওই রকম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে থাকেন। তিনি যে রাষ্ট্রনায়ক, সমাজনায়ক, তার প্রতিটি কথা যে জাতির ভবিষ্যতের জন্য- এই সত্য শিক্ষামন্ত্রী উপলব্ধি করতে পারেননি। পারলে তিনি উপলব্ধি করতে পারতেন, কেন শেখ হাসিনার নির্দেশে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মানসম্পন্ন শিক্ষার দিকে দেশকে নিয়ে যেতে শুরু করেছেন।

অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেটে যে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মান বাড়ানোর বা মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীকে সার্বিকভাবে মানসম্পন্ন শিক্ষা দেয়ার নীতি গ্রহণ করেছেন, বাংলাদেশের জন্য এটাই এখন সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। মানসম্পন্নভাবে উন্নীত মাধ্যমিক শিক্ষার্থীই ভবিষ্যতে ভালো গ্রাজুয়েট হবে। তারা একদিন মানসম্পন্ন শিক্ষক, এমপি বা মন্ত্রী হবে। প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী কতটা দূরদর্শী তা বোঝা যায়, এই বাজেট যখন প্রণীত ও উপস্থাপিত হয়েছে তখনও কিন্তু দেশ নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। অথচ প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী ঠিকই বুঝেছেন, দেশের অবস্থান এখন কোথায় এবং শিক্ষা পদ্ধতিকে এখন পপুলিস্ট থেকে স্তরে স্তরে কোয়ালিটিতে নিয়ে যেতে হবে।

দেশের মানুষ সন্তুষ্ট হতো যদি শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বাজেট আলোচনায় শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম এই চিরাচরিত কথা বা যা তিনি রাস্তার রাজনীতির জীবনে বলতেন তা না বলে ব্যাখ্যা করতেন, কেন বাজেটে এই কোয়ালিটি শিক্ষার দিকে যাওয়া হচ্ছে? এর প্রয়োজনীয়তা কি এবং কিভাবে তিনি সে পথে এগোবেন। তার বদলে তিনি বাজেট আলোচনায় যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে বোঝা যায় হয় তিনি বাজেট পড়েননি, শুধু পত্রিকা পড়েছেন- না হয় তিনি পপুলিস্ট শিক্ষা ব্যবস্থা ও কোয়ালিটি শিক্ষাব্যবস্থাকে উপলব্ধি করার সময় পাননি। বই প্রকাশনা থেকে পরীক্ষার হলে শূটিংসহ নানান কাজে ব্যস্ত থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থার মৌল বিষয়টি তিনি ভেবে দেখার অবকাশ পাননি। এই আরেক দুর্ভাগ্য এ দেশের, অনেক মন্ত্রী নীতিনির্ধারণী কাজের থেকে সুপারভাইজারের কাজটি পছন্দ করেন বেশি। যাহোক হয়ত দেশ একদিন এ সমস্যা থেকেও মুক্তি পাবে।

তাই এখন যতই কঠিন হোক একটি সত্য প্রধানমন্ত্রীকে ভাবতে হবে, তিনি যে কোয়ালিটি শিক্ষাব্যবস্থার দিকে যাচ্ছেন তা বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও আবুল মাল আবদুল মুহিতের মতো একজন ম্যান অফ কোয়ালিটির দরকার। একটা বিষয় নির্মম হলেও সত্যÑ জনতা, জনগণ যত বড়ই হোক, ব্যক্তিই কিন্তু শেষ অবধি। লেনিন, মাও বা ক্যাস্ট্রো না হলে যেমন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতো না, বঙ্গবন্ধু না হলে বাংলাদেশ হতো না। শেখ হাসিনা না হলে এই মৌলবাদের উগ্র সময়ে বাংলাদেশ টিকে থাকত না। ম্যান অফ কোয়ালিটি আবুল মাল আবদুল মুহিতকে না পেলে শেখ হাসিনার অর্থনীতিতে এখানে পৌঁছাতে কষ্ট হতো। তাই নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ বাংলাদেশকে এখন কোয়ালিটি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যে সে ধরনের শিক্ষা নির্বাহী নিয়োগ করতে হবে। কারণ, এখন অনেক কঠিন ও জটিল সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়। যেমন কোয়ালিটি শিক্ষা কখনই গণহারে হয় না। যে কারণে কুদরত-ই খুদা শিক্ষা নীতিতে ৫+৩ পদ্ধতিতে গণ শেষ করে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যককে কোয়ালিটির দিকে নিয়ে যাওয়ার রূপরেখা আছে। বাস্তবে আমাদের কুদরাত-ই খুদা শিক্ষানীতির পরে কিন্তু ওই হিসেবে সত্যিকারে কোন শিক্ষানীতি হয়নি। আর কুদরাত-ই খুদা শিক্ষানীতি এখনও খুব পুরনো হয়ে যায়নি। কেন এই শিক্ষামন্ত্রী গত ছয় বছর কেবল নানান স্তরে পরীক্ষা আর তা নিয়ে শূটিং এসবে ব্যস্ত থাকলেন -কুদরাত-ই খুদা শিক্ষা নীতি থেকে পপুলিস্ট ও কোয়ালিটি নীতির সমন্বয় গ্রহণ করলেন না ঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী বিপ্লব নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তাই হয়ত বঙ্গবন্ধুকে চেনেন ও জানেন না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের কাজ পর্যালোচনা করলে দেখতে পাবেন, শত বছরের বাংলাদেশের রূপরেখা উনি তৈরি করে দিয়ে গেছেন। তাঁর তৈরি রূপরেখায় সমুদ্র বিজয়, যুদ্ধাপরাধীর বিচার সবই হচ্ছে। শিক্ষানীতিও তিনি দিয়ে গেছেন। আজ পৃথিবীর অনেক দেশ যে পপুলিস্ট ও কোয়ালিটি শিক্ষানীতির মিশেল চিন্তা করছেন সে কাজটি বঙ্গবন্ধু আমাদের জন্য অনেক আগেই করে রেখে গেছেন। দুর্ভাগ্য হলো শিক্ষামন্ত্রী ছয় বছরে সেটা পড়ার সময় পাননি।

swadeshroy@gmail.com