মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

এ্যাশেজ- ইতিহাসের লড়াই

প্রকাশিত : ৮ জুলাই ২০১৫
  • মোঃ নুরুজ্জামান

আজ থেকে শুরু হচ্ছে ক্রিকেটের বহু পুরনো লড়াই এ্যাশেজ সিরিজ। ঐতিহ্যের দ্বৈরথে মুখোমুখি কুলীন দুই প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। পাঁচ টেস্টের মর্যাদার আসরে এবার স্বাগতিক ইংল্যান্ড। কার্ডিফে প্রথম ম্যাচ দিয়ে মাঠে গড়াচ্ছে প্রতীক্ষার এ লড়াই। একদিকে তারুণ্যনির্ভর এ্যালিস্টার কুকের ইংল্যান্ড। অন্যদিকে ওয়ানডের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। মাইকেল ক্লার্কের দল গতবার ঘরের মাটিতে তিন মৌসুম পর এ্যাশেজ জয় করে। সুতরাং ক্লার্কদের জন্য এবার ট্রফি ধরে রাখার লড়াই। ইংল্যান্ডের মাটিতে হলেও অতিথি অসিরাই তাই ফেবারিট হিসেবে মাঠে নামবে।

যেটি স্বীকার করে নিলেও ভাল করার প্রত্যয় ঝরেছে কুকের কণ্ঠে। ইংলিশ সেনাপতি বলেন, ‘এবার এ্যাশেজ পুনরুদ্ধারের ভাল সুযোগ রয়েছে আমাদের। সিরিজটা দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। তবে এটা ঠিক যে আমরা আন্ডারডগ হিসেবেই মাঠে নামব! কারণ অস্ট্রেলিয়া বর্তমান বিশ্বের অন্যতমসেরা দল। কিন্তু হোম কন্ডিশনের সুবিধাটা আমরাই পাব। তারুণ্যের সঙ্গে এটিই হতে পারে আমাদের বড় শক্তি।’ ১১৪ টেস্টে ২৭ সেঞ্চুরির মালিক। এ্যাশেজ নিয়ে সুখ-দুঃখ দু’টির স্বাদই আছে কুকের। অধিনায়ক হিসেবেও। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের অধিনায়কত্ব পান কুক। এরপর ভারত ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে সিরিজ শেষ করে এ্যাশেজ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। দেশের মাটিতে ২০১৩ সালের সিরিজে মতো এ্যাশেজে ইংল্যান্ডকে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ পেয়ে যান। প্রথমবারেই বাজিমাত করেন। ৩-০ ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইংল্যান্ডকে ‘হ্যাটট্রিক’ এ্যাশেজ জয়ের আনন্দে ভাসান কুক। সুখটা দীর্ঘ হয়নি। বিশ্বকাপের জন্য অনেক আগেভাগে মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে ফিরতি এ্যাশেজে (২০১৩-২০১৪) অস্ট্রেলিয়া থেকে ৫-০তে হোয়াইটওয়াশ হয়ে দেশে ফিরতে হয় ‘হ্যাটট্রিক’ শিরোপাধারীদের! সমালোচনাবানে বিদ্ধ হন আধুনিক ইংল্যান্ডের অন্যতম সফল ব্যাটসম্যান। বড় কঠিন সময় ছিল সেটি। এ বছর দুটি টেস্ট সিরিজ খেলেছে কুকের দল। প্রথমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর ও পরে ঘরের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। দুটি সিরিজেই ভাল অবস্থায় থেকেও শেষ পর্যন্ত ড্র করতে হয়েছে তাদের। এক ঝাঁক নবীন ক্রিকেটারের অন্তর্ভুক্তিতে দলে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন, যেটিকে বলা হচ্ছে বদলে যাওয়া ইংল্যান্ড। দুটি সিরিজ ড্র করলেও সার্বিক পারফর্মেন্স একেবারে মন্দ নয়। কুক তাই আশাবাদী। ‘সিরিজের পঞ্চম ও শেষ টেস্ট ম্যাচটি হবে ওভালে। আর ওই শেষের সময়টাই আমাদের জন্য স্মরণীয় অর্জনের সুযোগ। কারণ, ওই ম্যাচ শেষে আমরা ট্রফি পুনরুদ্ধারের উল্লাস করতে চাই। এমনটাই প্রত্যাশা করছি। সেটি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে আসন্ন এ্যাশেজ সিরিজ জয় হবে ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন। গোটা ইংল্যান্ডবাসী এখন সেদিকে তাকিয়ে। এ জন্য নিজেকে অনেক গর্বিতও মনে করব।’ আরও যোগ করেন তিনি। কেনা এই লড়াই? ইংরেজী এ্যাশ-এর বহুবচন থেকে হয়েছে এ্যাশেজ, পরিষ্কার বাংলায় যার অর্থ ছাই বা ছাই-ভস্ম। প্রশ্ন ছাই-ভস্মের জন্য কেন এ লড়াই? ক্রিকেট পাগাল অগণিত মানুষের অনন্ত জিজ্ঞাসা। জানতে ফিরে যেতে হবে ১৩১ বছর পূর্বে। ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৪৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। নিউইয়র্কের সেন্ট জর্জ ক্লাব গ্রাউন্ডে সে ম্যাচে কানাডা ২৩ রানে হারিয়েছিল ইউএসএকে। মনে করা হয় সেটিই ছিল আন অফিসিয়ালি পৃথিবীর প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ। আর অফিসিয়ালি প্রথম টেস্ট হয়েছিল ১৮৭৭ সালের ২৫ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার মোলবোর্নে। দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথমটিতে অস্ট্রেলিয়া ৪৫ রানে এবং দ্বিতীয়টিতে ইংল্যান্ড ৪ উইকেটে জয়লাভ করলে (১-১) এ নির্ধারিত হয়েছিল ফলাফল। তারও দুই বছর পর ১৮৮২ সালের আগস্টে একমাত্র টেস্টটি খেলতে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমায় অস্ট্রেলিয়া। ২৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত সে ম্যাচের সঙ্গেই জড়িয়ে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহাসিক ‘এ্যাসেজ স্মৃতি।’ তিন দিনে সমাপ্ত ম্যাচে স্বাগতিক ইংল্যান্ড মাত্র ৭ রানে হেরে গেলে ক্ষুব্ধ ইংলিশ দর্শকরা মাঠে প্রবেশ করে ‘ক্রিকেট বেল’ এ (তর্কসাপেক্ষে স্ট্যাম্পে) আগুন ধুরিয়ে দেয়। যার ছাই বা ভস্মকে আবৃত করে পরবর্তী ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া ধারাবাহিক টেস্ট লড়াইয়ের জন্য ‘ট্রফি’ তৈরি করা হয়। ইতিহাসের নবম সেই টেস্টের পর ক্রিকেটের কুলীন এ দু’দেশের মধ্যেÑ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ঐতিহ্যের এ্যাসেজ টেস্ট সিরিজ। এ্যাসেজ তাই মোটেই আর দশটা সিরিজ বা টেস্ট লড়াইয়ের মতো নয়। যার সঙ্গে জড়িয়ে ক্রিকেটের জন্মদাতা কুলীন ইংল্যান্ড ও আভিজাত্যের অস্ট্রেলিয়ার মান-সম্মান। পারিপার্শ্বিক অবস্থা যাই হোক, এই লড়াই ঘিরে জেগে ওঠে দু’দেশের ক্রীড়াঙ্গন। গোটা বিশ্বও। পুরনো এই লড়াইর সঙ্গে ফিরে আসে সেøজিংও! সেøজিংই যদি না থাকে, তবে ক্রিকেটের আনন্দ কোথায়? স্বভাবজাতভাবে অসিরা এটি পছন্দ করেÑ এমনটা বলে এ্যাশেজ মাঠে গড়ানোর ঠিক আগে উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার মারকাটারি ব্যাটসম্যান ডেভিড ওয়ার্নার। ‘প্রত্যেক দলেই এমন দু-একজন প্রয়োজন আছে, যাঁরা এটা করতে পারেন। স্বীকার করছি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে অনেক সময় আমি-ই প্ররোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হই! ইংল্যান্ডে যেমন জিমি এ্যান্ডারসন। যুদ্ধের ময়দানে আমরা সবাই সেøজিং পছন্দ করি এবং আমার মনে হয়, জিমি যেহেতু বোলার তাই সে-ই এটা করতে পারে!’ বলেন ওয়ার্নার। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমার একান্ত ধারণা মাঠে খেলার আনন্দ বাড়িয়ে দিতে সেøজিংয়ের ভূমিকা থাকে, তবে অবশ্যই আপনি সীমা অতিক্রম করতে পারেন না।’

সেøজিং বন্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল) কঠোর অবস্থান ক্রিকেটের উত্তেজনা শেষ করে দেবে বলেও মনে করেন ২৮ বছর বয়সী অসি তারকা। ‘আমিই আইসিসির কাছ থেকে শেষবার সতর্কিত হয়েছি। কিন্তু নতুন নিয়মে খেলাটার উত্তেজনা কমে যাবে। প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানকে আউট করেও বোলার মন খুলে আনন্দ করতে পারবে না, ব্যাটসম্যানের দিকে দৌরে গেলে আম্পায়ার ফাইন করবেÑ এটা আমার মোটেই পছন্দ নয়।’ সেøজিংয়ের গলা চেপে ধরলে ক্রিকেটের আনন্দ অনেকটা ম্লান হয়ে যাবে বলে মনে করেন ওয়ার্নার। ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটের ভাবমূর্তি ফেরাতে গত অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপের ঠিক আগে সেøজিং নিয়ে কড়া বার্তা দেন আইসিসির চিফ এক্সিকিউটিভ ডেভ রিচার্ডসন। এরপরও এ্যাশেজ সামনে রেখে মুখ খুললেন অসি ওপেনার। মাঠ ও মাঠের বাইরে আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে গত ১৮ মাসে দুবার ফাইন হয়েছে ওয়ার্নারের। দক্ষি আফ্রিকা সিরিজে বল বিকৃতি এবং ভারতের বিরুদ্ধে রোহিত শর্মার সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের জন্য জরিমানা গুনতে হয় অস্ট্রেলিয়ার ক্রেজি এই ক্রিকেটারকে। ব্যাট-বলের পাশাপাশি ঐতিহাসিক সিরিজে সেøজিংও যে থাকছে, তা অনুমান করে নেয়া যায়!

প্রকাশিত : ৮ জুলাই ২০১৫

০৮/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: