মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
১৮ আগস্ট ২০১৭, ৩ ভাদ্র ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

আর্জেন্টিনার জার্সিতে ০ বার্সিলোনায় ১০০

প্রকাশিত : ৮ জুলাই ২০১৫
  • অতশী রহমান

ক্লাব ফুটবলে সাফল্যের পরশে থাকলেও জাতীয় দল আর্জেন্টিনার হয়ে বলার মতো কিছুই জিততে পারেননি লিওনেল মেসি। বার্সিলোনার এই সুপারস্টার গত হওয়া মৌসুমে ক্লাবের হয়ে রেকর্ড চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ট্রফি জিতেছেন। এরপর মিশন ছিল দেশের জার্সি গায়ে কোপা আমেরিকা ফুটবলের শিরোপা জয়। কিন্তু স্বাগতিক চিলির কাছে হেরে আরেকবার ব্যথায় কেঁদেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এই ব্যর্থতার পর এখন বলা হচ্ছেÑ মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে ‘০’ আর বার্সিলোনার হয়ে ‘১০০’।

দিয়াগো ম্যারাডোনার সেই কান্না আজও ভোলেনি ফুটবলবিশ্ব। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে বিতর্কিত পেনাল্টিতে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল জার্মানি। সেই জার্মানদের কাছে আবারও ১-০ গোলে হেরে ২০১৪ সালের ১৩ জুলাই ব্যথার সাগরে ভাসে আর্জেন্টাইনরা। ২৮ বছরের হাহাকার ঘুচিয়ে তৃতীয় শিরোপার আশায় বুক বেঁধেছিলেন আকাশি-সাদা জার্সিধারীরা। লিওনেল মেসি নামের ক্ষুদে জাদুকরের কারণেই স্বপ্নটা ছিল আকাশচুম্বী। ম্যারাডোনা হওয়ার সুযোগও হাতছানি দিচ্ছিল আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে! কিন্তু স্বপ্নপূরণের কাছাকাছি পৌঁছেও নিজের ক্ষমাহীন ব্যর্থতার জন্যই কিংবদন্তির কাতারে পৌঁছতে ব্যর্থ হন টানা চারবারের ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার।

এক বছর আগে ব্রাজিল বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়া আর্জেন্টিনার ওই ক্ষতে প্রলেপ দেয়ার সুযোগ এসেছিল এবারের কোপা আমেরিকা ফুটবলে। ফাইনালে পৌঁছে ২২ বছরের শিরোপা খরা কাটানোরও কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু এবারও ফাইনালে হারের বেদনায় জ্বলতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। এই পরাজয়ের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করা হচ্ছে অধিনায়ক লিওনেল মেসিকে। এই হারের পর আবারও সেই প্রশ্নটা এসেছেÑ ‘মেসি আসলে বার্সিলোনার, আর্জেন্টিনার না’। জাতীয় দলের জার্সিতে ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণেই আবারও সবাই মেসির ম-ুপাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন! অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এবারের কোপায় ছয় ম্যাচে মেসির গোল মাত্র একটি। তাও আবার গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে পেনাল্টি থেকে। গোল পেয়েছেন শেষ ম্যাচেও। তবে সেটা টাইব্রেকারে। অথচ স্প্যানিশ পরাশক্তি বার্সিলোনার হয়ে গোলের পর গোল করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন মেসি। জাতীয় দল আর ক্লাবের হয়ে এমন দ্বৈত পারফর্মেন্সে অবাক গোটা ফুটবলবিশ্ব। যে কারণে নিজ দেশ আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে এখন ‘ভিলেন’ মেসি।

নব্বইয়ে ম্যারাডোনার কান্না এখনও চোখে ভাসে ফুটবলপ্রেমীদের। সেই কান্না ব্রাজিল বিশ্বকাপে মুছে দেয়ার দায়িত্ব বর্তেছিল মেসির ওপর। পারলে পেলে ও ম্যারাডোনার কাতারে নিজের নামটি বসাতে সক্ষম হতেন ২০১৪ বিশ্বকাপের ‘গোল্ডেন বল’ বিজয়ী মেসি। সুবর্ণ এই সুযোগ হারিয়ে হাপিত্যাশ করেন বার্সিলোনা সুপারস্টার। জার্মানির বিরুদ্ধে ফাইনালে আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকাররা একাধিক সহজ সুযোগ নষ্ট করেন। যার মাশুল দিতে হয় আরেকবার শিরোপা খুইয়ে। এর দায়ভারটা মেসির কাঁধেই বর্তায়। ম্যাচে তিনটি সহজ সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে দুটি ছিল লোপ্পা। কিন্তু অবিশ্বাস্য ব্যর্থতার নিদর্শন রাখেন তিনি। বিশ্বকাপের মতো এবারের কোপাতেও ব্যর্থ হলেন মেসি। তবে পার্থক্য হচ্ছে, বিশ্বকাপের ফাইনালের গোলের সহজ পেলেও কোপার ফাইনালে একেবারেই নিষ্ক্রিয় ছিলেন তিনি! ম্যাচের তার বলার মতো পারফর্মেন্স হচ্ছে, প্রথমার্ধে চিলির ডি বক্সের বাইরে থেকে নেয়া একটা ফ্রিকিক। যা থেকে সার্জিও এ্যাগুয়েরের হেড অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন স্বাগতিক গোলরক্ষক ক্লাউডিও ব্রাভো। বাকি সময়ে আরও কয়েকটি ফ্রিকিক নেন মেসি। কিন্তু বার্সার সেই ক্ষুরধার মেসিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ক্লাব পর্যায়ের খেলায় যে তারকার দাপটে প্রতিপক্ষের সব কচুকাটা হয়ে যায়, সেই তিনিই আবার নিজ দেশের পক্ষে খেই হারিয়ে ফেলেন। এমন দাবি অনেক ভক্ত-সমর্থকের। ২০০৪ সাল থেকে বার্সিলোনার মূল দলে খেলছেন মেসি। পরের বছর থেকে খেলছেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে। বার্সিলোনার হয়ে পরিসংখ্যান ঘাটলে যতটা উজ্জ্বল দেখা যায়, ঠিক ততটাই হতাশায় মুষড়ে পড়তে হয় আর্জেন্টিনার হয়ে হিসাবের খাতা খুললে। এক দশকে ক্যাটালানদের হয়ে দলের ও নিজের ব্যক্তিগত যে সাফল্য, সেটি ঘাঁটলে যে কোন ফুটবলারই ঈর্ষায় কাতর হবেন। পরিসংখ্যান বলছে, বার্সিলোনার হয়ে ৪৮২ ম্যাচ খেলেছেন মেসি। গোল করেছেন রেকর্ড ৪১২টি। দলকে জিতিয়েছেন ৭টি লা লীগা শিরোপা, ৩টি কোপা ডেল রে, ৬টি স্প্যানিশ সুপার কাপ, ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, ২টি উয়েফা সুপার কাপ, ২টি ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ। ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে জমা হয়েছে হ্যাটট্রিকসহ রেকর্ড সর্বোচ্চ ৪টি ব্যালন ডি’র, ১টি ফিফা ওয়ার্ল্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার, ৩টি ওয়ার্ল্ড সকার প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার, ৩টি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন সু, একটি উয়েফা বেস্ট প্লেয়ার ইন ইউরোপ এ্যাওয়ার্ড, ৪টি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ টপ গোলস্কোরার, টানা ৫টি এলএফপি বেস্ট প্লেয়ার, হ্যাটট্রিক লা লীগা বিদেশী প্লেয়ার অব দ্য ইয়ারসহ ইউরোপিয়ান ও স্প্যানিশ ক্রীড়াজগতের অসংখ্য পদক ও সম্মাননা।

কিন্তু মেসির জাতীয় দলের পরিসংখ্যান বলছে, আর্জেন্টিনার হয়ে ম্যাচ খেলেছেন ১০৩টি। গোল ৪৬টি। ক্লাবে প্রায় প্রতি ম্যাচ হিসেবে তার গোল থাকলেও জাতীয় দলে দুটি করে ম্যাচেও মেসির একটি গোল থাকছে না। এ ভারসম্যহীন পারফর্মেন্সে ফুটবলের ‘ক্ষুদে জাদুকর’ আর্জেন্টিনা দলকে কোন শিরোপা উপহার দিতে পারেননি। যে কারণে আর্জেন্টিনাও ম্যারাডোনা যুগের পর থেকে এখনও কোন আন্তর্জাতিক শিরোপার দেখা পায়নি।

শিরোপা, সম্মান সবই খুইয়েছেন মেসি! কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের ম্যাচে স্বাগতিক সমর্থকদের কাছে লাঞ্ছিত হয়েছেন মেসির ভাই ও পরিবার। এমনিতেই শিরোপা হেরে মনোঃকষ্টে ছিলেন মেসি। ম্যাচ শেষে অনভিপ্রেত এই ঘটনা শুনে আরও বেশি মর্মাহত হয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোর স্টাডিও ন্যাসিওনাল স্টেডিয়ামে প্রথমার্ধের খেলা শেষ হওয়ার কিছু আগে মেসির ভাই রডরিগোকে অপদস্ত করেন উগ্র চিলিয়ান সমর্থকরা। শুধু তাই নয়, গ্যালারির একটি অংশে দর্শকসারিতে বসা মেসির পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে শুরু হয় অশ্রাব্য কটুবাক্য। যে কারণে মধ্যাহ্ন বিরতির সময় বাধ্য হয়ে মেসির পরিবার আশ্রয় নেয় স্টেডিয়ামের একটি টেলিভিশন কেবিনে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের উদ্ধৃতিতে জানা গেছে, রডরিগোকে নাকি শারীরিকভাবেও আঘাত করা হয়েছে। মেসির পরিবারের পাশাপাশি লাঞ্ছিত হয়েছেন সার্জিও অ্যাগুয়েরোর পরিবারের সদস্যরাও।

স্টেডিয়ামে একরকম অস্তিত্বহীনই ছিল আর্জেন্টিনার সমর্থকরা। শুরু থেকেই লাল জার্সি পরা সমর্থকরা হৈ-হুল্লোড় করে পুরো স্টেডিয়াম মাত করে রাখে। তাদের মধ্যে অতি উৎসাহী কেউ কেউ হামলা চালিয়েছে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের পরিবারের ওপর। আর মাঠে তাদের স্বদেশীরা হামলা করেছে লিওনেল মেসির ওপর। খেলার প্রথমার্ধের শেষের দিকে চিলির ডিফেন্ডার গ্যারি মেডেল ডান পায়ে লাথি মারেন মেসির বুকে। গোটা ম্যাচেই চিলির খেলোয়াড়রা আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের ওপর এভাবে চড়াও হয়েছেন। মাঠ ও মাঠের বাইরে সমানতালেই আর্জেন্টাইনরা নির্যাতিত হয়েছেন। তবে পারফর্মেন্সে ঠিকই এগিয়ে থেকে বাজিমাত করেছে চিলি।

প্রকাশিত : ৮ জুলাই ২০১৫

০৮/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: