মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১১ আশ্বিন ১৪২৪, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

ইইউর প্রস্তাবে গ্রীসের ‘না’

প্রকাশিত : ৮ জুলাই ২০১৫
  • মুসান্না সাজ্জিল

গ্রীক পুরানের ফিনিক্স পাখির মতোই ঘুরে দাঁড়াল গ্রীসের জনগণ। ইউরোপীয় শক্তির কাছে নতি স্বীকার না করে, বরং ‘না’ ভোট প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের দৃঢ়তা প্রকাশ করল। তবে না ভোটের প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। আদৌ গ্রীস ইউরোজোন ছেড়ে নিজ মুদ্রা ‘দ্রাকমা’য় ফিরে আসবে নাকি ইইউতে থেকে যাবে এ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। আপাতত ‘না’ ভোট বিজয় হওয়ার মাধ্যমে গ্রীসের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সিস সিপ্রাসের জয় হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও, এ সঙ্কট তিনি কিভাবে মোকাবেলা করবেন তা এখনও পরিষ্কার নয়।

না ভোট বিজয়ের মাধ্যমে ঋণদাতাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সব আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। এমনও হতে পারে গ্রীসকে ইউরোজোন থেকে বেরিয়ে আসতে হতে পারে এবং পুনরায় ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা রুদ্ধ হতে পারে। গ্রীসকে কৃচ্ছ্রসাধনের শর্তসংবলিত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রস্তাব (বেইল আউট) গ্রহণ করা হবে কি হবে না, এ সিদ্ধান্ত জানতেই এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

গণভোটে শতকরা ৬১.৩ ভাগেরও মতো ভোটার ঋণদাতাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং ৩৮.৭ ভাগের মতো ভোটার প্রস্তাব মেনে নেয়ার পক্ষে রায় দেয়। হ্যাঁ ভোট প্রদানকারীদের ধারণা যদি গ্রীস ইউরোজোন হতে বেরিয়ে আসে তবে দেশটি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং শুরু হবে সামাজিক সংঘাত। ইতোমধ্যে দেশটির ওষুধ ও পর্যটন শিল্পে হাহাকার শুরু হয়েছে। অসংখ্য পর্যটক ভ্রমণ বাতিল করে নিজ দেশে ফিরে গেছে।

ঋণের কারণে ভূ-মধ্যসাগরের রাষ্ট্রটি আজ যে ঋণখেলাপি তার সঙ্কটের শুরু ২০০৯ সালে। বিশ্বমন্দায় সে সঙ্কটে প্রথম দেশটি স্বীকার করে প্রত্যাশার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ঋণগ্রস্ত হয়েছে দেশটি। এর পেছনের কারণ দেশটির সুশাসনের অভাব ও অপব্যয়ী অর্থনৈতিক নীতি। ২০০৪ সালের অলিম্পিক গেমসেও গ্রীস অঢেল অর্থ ব্যয় করে যার কোন সুফল পায়নি। পাশাপাশি গ্রীসের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতাও এমন মন্দাভাবের অন্যতম কারণ। দেশটি সরকারী খাতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে, সে অনুযায়ী আয়কর আদায়ের দিকে তেমন নজর দেয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার শূন্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বৈশ্বিক মন্দায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সঙ্কট মোকাবেলার যে প্রস্তুতি ছিল গ্রীসের তেমন কোন আয়োজন ছিল না।

বরং ইইউর ভরসায় গায়ে ফুঁ লাগিয়ে ঘুরেছে দেশটি। ইচ্চামতো ব্যয় করেছে এ আশায় যদি গ্রীস কোন সঙ্কটে পড়ে তবে ইইউ অবশ্যই এগিয়ে আসবে।

তবে ইইউ গ্রীস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। দুদফায় ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২৪০ বিলিয়ন ইউরো ঋণ সহায়তা করে। এই ঋণ সহায়তার বিপরীতে ঋণদাতারা গ্রীসকে বেশকিছু শর্তারোপ করে। যেসব শর্ত পূরণ করতে গিয়ে গ্রীসের অবস্থা আরও করুণ হয়। উৎপাদন ব্যাপকহারে হ্রাস পায় এবং দেশে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পায়। এ সঙ্কট উত্তরণে পরবর্তীতে আবারও ঋণ সহায়তা পায় দেশটি। এতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি বরং এ ঋণের বোঝা ক্রমেই দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে এবং ঋণখেলাপি রাষ্ট্রে পরিণত করে। গ্রীসের জনগণ ও সরকার নিজেদের এ অবস্থার জন্য বরাবরই ঋণদাতাদের শর্তারোপকে দায়ী করে আসছে। এসব শর্ত পুনর্বিবেচনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে পার্লামেন্ট নির্বাচনে বড় জয় পায় আলেক্সিস সিপ্রাসের নেতৃত্বাধীন ব্যয় সঙ্কোচন বিরোধী বামপন্থী সিরিজা পার্টি। এ সঙ্কট উত্তরণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী সিপ্রাস সরকার কার্যত কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাজি বাহিনীর প্রসঙ্গে টেনে জার্মান সরকারকে বিব্রত করেছে।

এছাড়া রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার বৈঠকেও ভাল নজরে দেখেনি ইইউ রাষ্ট্রপ্রধানরা। তাই চলতি বছরের ২ জুন সংস্কার প্রশ্নে গ্রীসকে চূড়ান্ত প্রস্তাব এবং ঋণ পরিশোধের শেষ তারিখ দেয় ইইউ ও আইএমএফ। কিন্তু গ্রীস আইএমএফকে ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে বর্তমানে ঋণ খেলাপি রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয় ভোটের আগে ব্যাংক জনপ্রতি ৬০ ইউরোর বেশি উত্তোলনেও বিধিনিষেধ জারি করে। মাত্র ১১ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর দেশে গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ বিলিয়ন ডলার।

ইউরো পরিবারের ‘প্রবলেম চাইল্ড’ গ্রীস বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বসহ বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অন্যতম মাথা ব্যথার কারণ। আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও শুরু হয়েছে আস্থার সঙ্কট। এ সঙ্কট এখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন মন্দা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম মাথা ব্যথার কারণ। এ সঙ্কট উত্তরণে গ্রীসের নতুন করে দুই হাজার ৯১০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা প্রয়োজন।

প্রকাশিত : ৮ জুলাই ২০১৫

০৮/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: