২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

তিন মন্ত্রী নিয়ে দিনভর আলোচনা


বিশেষ প্রতিনিধি ॥ এলজিআরডি, খাদ্য ও ত্রাণমন্ত্রী- সরকারের এই তিন মন্ত্রীই ছিলেন মঙ্গলবার দিনভর সর্বত্র আলোচনায়। সেক্ষেত্রে আলোচনার শীর্ষে ছিলেন স্বভাবতই স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ। তিনি মন্ত্রী পদে বহাল রয়েছেন, নাকি তাঁকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে এ নিয়ে গুঞ্জন ছিল সর্বত্র। তবে গুঞ্জন শেষ পর্যন্ত সত্য হয়নি। সৈয়দ আশরাফ নিজেই গুজবে কান না দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যদিকে ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া কোন ক্ষমতাবলে মন্ত্রী ও এমপি পদে বহাল রয়েছেন- মঙ্গলবার হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন এক আইনজীবী। অন্যদিকে পচা গম নিয়ে বেকায়দায় পড়া খাদ্যমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, গম আমদানি নিয়ে গণমাধ্যমে মিথ্যাচার চলছে। সৈয়দ আশরাফ আর মন্ত্রী আছেন কি না এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয় সকাল থেকেই। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রায়ই অনুপস্থিত থাকায় মঙ্গলবার একনেক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার একটি মন্তব্য মূহূর্তেই খবর হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। কয়েকটি টিভির স্ক্রলে সংবাদটি দেয়া হলে অল্প সময়ের মধ্যে এটি সারাদেশের জন্য গরম খবরে পরিণত হয়। মঙ্গলবার দুপুরে একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফকে অব্যাহতি দিতে বলেছেন বলে কোন সূত্রের নাম উল্লেখ না করে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলো খবর প্রকাশ করে। এ ব্যাপারে বিকেলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব অবশ্য সাংবাদিকদের বলেন, এই বিষয় আমার কাছে বলার মতো কোন খবর নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাজধানীর এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (্একনেক) সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের ৬ হাজার ৭৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। এ সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, এত বড় একটি প্রকল্প অনুমোদন হচ্ছে অথচ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী একজনও উপস্থিত নেই। জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ঠিক মতো মিটিংয়ে থাকে না। এটা ঠিক নয়। আপনারা যদি চান তাহলে পরিবর্তন করতে পারি। ক্যাবিনেট সচিবকে কাগজপত্র ঠিক রাখার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, সময়মতো আমি নির্দেশ দেব।

সাত বছর ধরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সামলে আসা ৬৩ বছর বয়সী সৈয়দ আশরাফ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও। ২০০৭ সালে জরুরী অবস্থা জারির পর শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের বন্দী হওয়ার প্রেক্ষাপটে দলে সাধারণ সম্পাদকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ভার আসে জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে আশরাফের ওপর। দায়িত্ব পালনে আশরাফের সফলতার মধ্যে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল পরে মুক্তি পেলেও দায়িত্বে আর ফিরতে পারেননি। পরে ২০০৯ সালে কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন আশরাফ। এর আগে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার সরকারে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন আশরাফ। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনা পুনরায় সরকার গঠন করলে একই দায়িত্বই তাকে দেন শেখ হাসিনা।

কিশোরগঞ্জের সংসদ সদস্য আশরাফ ছাত্রজীবনে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর জেলখানায় সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর লন্ডনে চলে যান আশরাফ। সেখানে আওয়ামী লীগে সক্রিয় ছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার ওই সরকারে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হন আশরাফ। ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতিটি সংসদ নির্বাচনেই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছেন তিনি।

সারাদিনের জল্পনা-কল্পনার প্রেক্ষিতে কিশোরগঞ্জে অবস্থানকারী সৈয়দ আশরাফ স্থানীয় সাংবাদিকের গুজবে কান না দেয়ার পরামর্শ দেন। মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়ার খবর রটে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। ঘটনার সময়ে নিজ জেলা কিশোরগঞ্জ শহরের খড়মপট্টিতে নিজ বাসায় অবস্থান করছিলেন সৈয়দ আশরাফ। সেখানে স্থানীয় সাংবাদিকরা অব্যাহতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গুজবে কান না দেয়াই ভাল। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের ইফতার মাহফিলে অংশ নিয়ে এ বিষয়ে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম কথা বলবেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া কোন ক্ষমতাবলে মন্ত্রী বা এমপি পদে বহাল আছেন তা জানতে চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী এ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ রিট আবেদনটি দায়ের করেন। বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এটি উপস্থাপন করা হবে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চেয়ে এর আগে একটি আইনী নোটিস পাঠিয়েছিলেন এই আইনজীবী। মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও জাতীয় সংসদের স্পীকারকে রিটে বিবাদী করা হয়েছে। এর আগে দুর্নীতির মামলায় খালাসের রায় বাতিল হওয়ার পর কোন কর্তৃত্ব বলে এখনও মন্ত্রী ও এমপি পদে রয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মায়ার কাছে সে বিষয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জানতে চেয়ে গত ৩০ জুন মায়াকে একটি উকিল নোটিস পাঠিয়েছিলেন এই আইনজীবী। সে নোটিসের জবাব না পেয়ে তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে।

নোটিসে বলা হয়, সংবিধানের ৬৬ এর ২ (ঘ) দফা অনুসারে দ-িত ব্যক্তি সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী পদে থাকতে পারেন না। সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়, সংসদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়ে বলা হয়েছে, যদি কেউ নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদ-ে দ-িত হন এবং তার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছরকাল অতিবাহিত না হয়ে থাকে, তবে তিনি সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না। কারণ গত ১৪ জুন একটি দুর্নীতি মামলায় মায়াকে খালাস করে হাইকোর্টের দেয়া রায় বাতিল করে নতুন করে আপীল শুনানির আদেশ দেন আপীল বিভাগ।

আপীল বিভাগের এই রায়ের পরে মায়ার পদে থাকা নিয়ে দুই রকম বক্তব্য আসে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেছেন মন্ত্রী পদে মায়া থাকবেন কি না তা নির্ধারণ করবে হাইকোর্ট। অপরদিকে মায়ার আইনজীবী আবদুল বাসেত মজুমদারের দাবি, যেহেতু আপীল বিচারাধীন, সেহেতু মন্ত্রিত্ব ও সংসদ সদস্য পদ নিয়ে ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদটি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে খাদ্যমন্ত্রী দাবি করেন, পত্রিকায় পোকাসহ যেসব গমের ছবি ছাপা হচ্ছে তা ব্রাজিল থেকে সরকারের আমদানি করা গম নয়। এই গম আমদানির পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে নিজে জড়িত নন দাবি করে তিনি বলেছেন, আমদানির চূড়ান্ত বিলও তিনি দেখেননি। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পীর ফজলুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে ফের গম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এসব কথা বলেছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল। ব্রাজিলের গম আমদানির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কাগজে যে সব ছবি আসছে, এগুলোর কোন ভিত্তি নেই। পোকার কথা বলা হচ্ছে, যে ছবি আসছে, এই ছবির সঙ্গে আমাদের গুদামের গমের কোন সাদৃশ্য নেই। এই ছবি আমাদের গমের ছবি না। অনেকেই বলে থাকেন, পোকা খাওয়া গম। পরিচর্যা না করলে পোকা যে কোন গুদামে, আপনার বাড়িতে রাখেন, চাল রাখেন, গম রাখেন, সুষ্ঠু পরিচর্যা না করেন, ওষুধ না দেন, সেখানেও পোকা ধরবে।’

ব্রাজিলের আমদানি করা গম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। এমনকি এতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উষ্মা প্রকাশ করেন। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে খাদ্যগুদাম থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষা রিপোর্টে একে খাওয়ার উপযোগী বলা হয়। এই গমের বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালত খাদ্য সচিব ও খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকে গমের নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়। যথা সময়ে তারা আদালতে এই প্রতিবেদনও জমা দেন। আদালত আজ বুধবার এ বিষয়ে আদেশ দেবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: