২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

নিবন্ধ ॥ রাজরানী


মফস্বলের এক ছোট্ট মহকুমা শহর টাঙ্গাইলে কেটেছে শৈশব-কৈশোর। তখন রাজা-রানীর যুগ শেষ, তাহলেও ছোটবেলা থেকেই জানি ক’জন রানী-মহারানীর নাম। এক রানী বিন্দুবাসিনী, তাঁর নামে ১৮৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হাই স্কুলে পড়েছি ১৯৫৫-৬২ সালে। তাঁর নামে একটি গার্লস স্কুলও আছে শহরে। তিনি টাঙ্গাইলের উপকণ্ঠে অবস্থিত সন্তোষের মহারাজা দ্বারকানাথ রায় চৌধুরীর পতœী। তাঁদের পুত্র মহারাজা স্যার মন্মথনাথ রায় চৌধুরী (১২৮৬-১৩৪৫ বঙ্গাব্দ) ছিলেন বিখ্যাত ফুটবলার, পর পর ছয়বার ছিলেন ইন্ডিয়ান ফুটবল এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। ১৯৪১ সাল থেকে ভারতের বার্ষিক ফুটবল টুর্নামেন্ট ‘সন্তোষ ট্রফি’ চালু হয়েছে তাঁরই অবদানে। সন্তোষের স্কুলটি রানী জাহ্নবী রায় চৌধুরীর নামে প্রতিষ্ঠিত। শুনেছি তিনি ছিলেন নিষ্ঠুর প্রজাশাসক। এজন্য প্রজামহলে কুখ্যাতি পেয়েছিলেন ‘জানমারা রানী’ নামে। চালের অভাবে প্রজাদের চিনা খেতে দেখে ক্ষেপে গিয়েছিলেন রানী জাহ্নবী। বলেছিলেন, ‘ওরা এত সরু চালের ভাত খায়?’ তিনি মহারাজা গোলকনাথ রায় চৌধুরীর পতœী। তাঁরা ছিলেন নিঃসন্তান, তাই পোষ্য নিয়েছিলেন বৈকুণ্ঠনাথ রায় চৌধুরীকে। তাঁর পতœী রানী দিনমণি। রানী বিন্দুবাসিনীর জ্যেষ্ঠ পুত্র মহারাজা প্রমথনাথ রায় চৌধুরী (১৮৭২-১৯৪৯) ছিলেন সেকালের খ্যাতিমান কবি ও নাট্যকার। ‘সুহৃদ’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন তিনি, ঘনিষ্ঠ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- দীপালী, গীতিকা, আক্কেল সেলামী, গৌরগীতিকা, পদ্মা, যমুনা, লীলা, স্মরণ এবং নাটক- জয়পরাজয়, ভাগ্যচক্র, চিতোরোদ্ধার, দিল্লী অধিকার। এছাড়া টাঙ্গাইল শহরে আছে রানী পদ্মমণি দীঘি। এ রানীর পরিচয় জানতে পারিনি কোন সূত্রে। ‘মানদায়িনী লজ’ বা এ রকম যে বিলাসবহুল ভবনগুলো ছিল বিভিন্ন পুরাঙ্গনাদের নামে তাঁরাও নিশ্চয়ই রানী ছিলেন বলে ভাবতাম আমি।

তবে এই রানীরা তো সেকালের এক প্রত্যন্ত ও পশ্চাৎপদ এলাকার, কিন্তু কারা ছিলেন বিশাল বাংলার রাজেশ্বরী? ইতিহাসের পাতায় পাতায় আছে কোন কোন রাজরানীর কথা ও কাহিনী, কিংবদন্তি-আখ্যান লোককথা-উপকথায় খোঁজ মেলে কোন রূপবতী গুণবতীদের? প্রতœযুগের পরে বাংলার জ্ঞাত ও প্রামাণিক রাজকাহিনী শুরু হয় পাল বংশের রাজা গোপালের (রাজত্বকাল ৭৫০-৭৭০) কীর্তিকথা দিয়ে। তাঁর পতœী দেদ্দদেবীকে বলতে পারি বাংলার প্রথম রাজরানী। তিনি ছিলেন ভদ্র রাজবংশের কন্যা। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার খালিমপুর গ্রামে প্রাপ্ত তাম্রশাসনে উৎকীর্ণ আছে দেদ্দদেবীর প্রশস্তি। সংস্কৃত ভাষায় রচিত ওই অভিলেখের বাংলা অনুবাদ এ রকমÑ ‘চাঁদের যেমন রোহিণী, অগ্নির যেমন স্বাহা, শিবের যেমন সর্বাণী, কুবেরের যেমন ভদ্রা, ইন্দ্রের যেমন শচী, বিষ্ণুর যেমন লক্ষ্মী; তেমনই রাজা গোপালের প্রিয়তমা মহিষী ছিলেন দেদ্দদেবী। তিনি ছিলেন রাজার বিনোদনের উৎস।’

খালিমপুর তাম্রশাসন রচিত হয়েছে তাঁদের সন্তান ধর্মপালের (রাজত্বকাল ৭৭০-৮১০) নির্দেশে। তাঁর পতœী রন্নাদেবী বাংলার পরবর্তী রাজরানী। বিহারের মুঙ্গের জেলায় প্রাপ্ত সংস্কৃত ভাষায় রচিত তাম্র্রশাসনে তাঁর সম্পর্কে যা উল্লেখ করা হয়েছে তার বাংলা অনুবাদ এ রকমÑ ‘গৃহীর ধর্ম গ্রহণ করে রাজা ধর্মপাল বিয়ে করেছিলেন রন্নাদেবীকে। তিনি ছিলেন (মধ্য ভারতের) রাষ্ট্রকূট বংশের রাজা পরবলের কন্যা। তাঁর স্বভাব ছিল গম্ভীর। অতিরিক্ত গুণের অধিকারী ছিলেন বলে অন্তঃপুরের কোন নারীই ছিলেন না রন্নাদেবীর সমকক্ষ। শুদ্ধ স্বভাব ছিল তাঁর। তিনি আসলে কেÑ এ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল প্রজাদের মধ্যে। তিনি সাক্ষাত লক্ষ্মী নাকি নারীরূপী পৃথিবী দেবী, নাকি রাজার মূর্তিমতী কীর্তি, নাকি রাজার ঘরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সমুদ্রের ঝিনুক যেমন মুক্তা ও রতœ জন্ম দেয়, সেভাবে রন্নাদেবীও জন্ম দিয়েছেন দেবপাল দেবকে। ... তিনি ছিলেন সকল প্রশংসার যোগ্য ও পতিব্রতা।’ তবে ধর্মপাল-রন্নাদেবীর আরও এক পুত্র ছিল ত্রিভুবনপাল নামে।

ঘনরাম চক্রবর্তী (১৬৯৯-?) তাঁর ‘ধর্মমঙ্গল’ (১৭১১) কাব্যে লিখেছেনÑ কোন পুত্রের জন্ম না দিতে পারায় ধর্মপাল বনবাসে পাঠিয়েছিলেন তাঁর বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী স্ত্রী বল্লভ দেবীকে। সেখানে সমুদ্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন তিনি। তিব্বতী পণ্ডিত লামা তারনাথের (১৫৭৫-১৬৩৪) মতে, রাজা গোপালের এক উত্তরাধিকারীকে ‘সমুদ্রের সার্বভৌম অধিপতি’ নাগরাজ সাগরপাল জন্ম দিয়েছিলেন তাঁর কনিষ্ঠা মহিষীর গর্ভে। ঐতিহাসিকরা এসব বিবরণকে বলেছেন ‘অবাস্তব গল্প’।

মুঙ্গের লিপি উৎকীর্ণ হয়েছিল দেবপালের (রাজত্বকাল ৮১০-৮৫০) নির্দেশে। তাঁর পতœী মাহটা দেবী বাংলার পরবর্তী রাজরানী। তিনি ছিলেন দুর্লভ রাজকন্যা। মাহটা দেবী বারানসীতে শিবমন্দির নির্মাণ করেছেন বলে ধারণা করেন ঐতিহাসিকরা। উত্তরপ্রদেশের মির্জাপুরে প্রাপ্ত প্রথম শূরপালের (রাজত্বকাল ৮৫০-৮৫৩) নির্দেশে খোদিত তাম্রশাসনে উল্লেখ করা হয়েছে, রানীমাতা মাহটা দেবীর অনুরোধে দুটি গ্রাম ওই শিবমন্দিরের জন্য এবং আরও দুটি গ্রাম শৈবাচার্য পরিষদের জন্য দান করেছিলেন তিনি।

দেবপালের পর রাজা ছিলেন দুই ভাইÑ প্রথমে মহেন্দ্রপাল পরে প্রথম শূরপাল। মহেন্দ্রপালের তাম্রলিপি পাওয়া গেছে মালদহ জেলার জগজ্জীবনপুর মৌজার তুলাভিটা গ্রামে। এতে ধর্মপালের পতœী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রাজরানী নীতির নাম। শ্রী মাহটা দেবী সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি চাহমান বংশের শ্রেষ্ঠ নরপতি দুর্লভরাজের সাধ্বী, ধর্মপরায়ণা ও সুলক্ষণা কন্যা। প্রথম শূরপালের মির্জাপুর তাম্রশাসনে বলা হয়েছে, রাজা দুর্লভরাজের কন্যা, দ্বিতীয় পৃথিবীর মতো শ্লাঘনীয়, শ্রী মাহটা দেবী ছিলেন তাঁর প্রিয় স্ত্রী। পবিত্র অমৃতধারার মতো আচরণের দ্বারা সেই পতিব্রতা দেবীর গুণগাথা হিমালয়কন্যা সতী, অরুন্ধতী ও সাবিত্রীর মতোই প্রশংসনীয়। এই সম্মানিত নারী ছিলেন রামবিজিতা সতী, জয়ার ভগিনী ও সর্বমঙ্গলার সমান। তাঁর জন্ম হয়েছিল সদ্বংশে, আর তিনি ছিলেন সুলক্ষণা। তাঁকে পেয়ে সুখী হয়েছিলেন সদাশয় পরমেশ্বররূপী রাজা। শত ইচ্ছা সত্ত্বেও দান, বুদ্ধি, কীর্তি, চরিত্র ও সত্যনিষ্ঠায় তাঁর সমকক্ষ ছিলেন না কোন কুলস্ত্রী।

প্রথম শূরপালের পর সিংহাসনে বসেন প্রথম বিগ্রহপাল। তখন রাজরানী ছিলেন লজ্জাদেবী। বিহারের ভাগলপুরে প্রাপ্ত তাঁদের পুত্র নারায়ণপালের (রাজত্বকাল ৮৫৪-৯০৮) তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন সমুদ্রের স্ত্রী জাহ্নবীর মতো এবং (উত্তর ভারতের) হৈহয় বংশের অলঙ্কারের মতো। তাঁর পিতা ও স্বামীর বংশ পবিত্র করার মহান উপায় বলে গণ্য হয়েছিল তাঁর বিশুদ্ধ চরিত্র।

নারায়ণপালের পতœী সম্পর্কে কোন তথ্য নেই ইতিহাসে, তবে তাঁর পুত্র রাজ্যপালের (রাজত্বকাল ৯০৮-৯৪০) রাজমহিষী ছিলেন ভাগ্যদেবী। তিনি মধ্য ভারতের রাষ্ট্রকূট বংশের অধিপতি এবং ‘অনেক উঁচুতে মুকুটধারী’ তুঙ্গরাজের কন্যা। দিনাজপুরের মনহলি গ্রামে প্রাপ্ত রাজা মদনপালের (রাজত্বকাল ১১৪৪-৬২) তাম্রলিপিতে পাওয়া গেছে এ তথ্য। উত্তরবঙ্গের কম্বোজ রাজবংশের বৃত্তান্তেও এক রাজ্যপাল ও তাঁর রানী ভাগ্যদেবীর উল্লেখ রয়েছে। তবে তাঁর রাজত্বকাল ৯৮০-১০০৫ সালে। পাল রাজবংশে এরপর রানী হিসেবে পাওয়া গেছে যৌবনশ্রীর নাম। তিনি তৃতীয় বিগ্রহপালের (১০৫৪-৭২) পতœী। তাঁর পিতা মধ্য ভারতের কলচুরি বংশের রাজা কর্ণ (১০৪১-৭২)।

এছাড়া জগজ্জীবনপুর অভিলেখে মহেন্দ্রপালের বংশধর নারায়ণ দেবের পতœী কল্যাণ দেবী সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি ছিলেন ‘সার্থকনামা লক্ষ্মীস্বরূপিণী’। তাঁর শরীর বহন করত ত্রিভুবনের অলঙ্কার, আর ত্রিবর্গের সার্থকতা মূর্তিমান ছিল তাঁর মধ্যেই। তিনি কি উত্তানপাদের স্ত্রী সুনীতি, যিনি কুলকমলিনী চঞ্চলা লক্ষ্মী নাকি পতিসোহাগিনী অরুন্ধতী না হলে এই মাঙ্গলিক কাজে মন্দির নির্মাণ করে মনস্তুষ্টি করলেন সকলের? প্রজাদের মধ্যে এখন এসব নিয়েই আলোচনা।

পাল রাজবংশের আরও দুই কন্যার উল্লেখ আছে ইতিহাসে। একজন শঙ্কর দেবী, অন্যজন কুমার দেবী। শঙ্কর দেবীর পিতা মথন রাজা রামপালের (রাজত্বকাল ১০৭৭-১১৩০) মাতুল। কুমার দেবী এই শঙ্কর দেবীর কন্যা এবং গাঢ়বাল (বর্তমানে উত্তরাখণ্ড)-রাজ গোবিন্দচন্দ্রের (১১১৪-৫৫) পতœী। মনহলি অভিলেখে রামপালের (রাজত্বকাল ১০৭৭-১১৩০) মহিষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মদন দেবীর নাম। তাঁদের পুত্র মদনপালের মহিষী চিত্রমতিকা সম্পর্কে ওই অভিলেখে বলা হয়েছে, “পণ্ডিতভট্টপুত্র শ্রীবটেশ্বর শর্মাকে দিয়ে বেদব্যাস রচিত ‘মহাভারত’ পাঠ করিয়েছিলেন তিনি।”

দিনাজপুরের বাদাল গ্রামে প্রাপ্ত নারায়ণপালের গরুড় স্তম্ভলিপিতে স্থান পেয়েছে পাল বংশের রাজকার্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ব্রাহ্মণ বংশীয়দের কীর্তিকথা। একই সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে রাজমহিমায় উল্লিখিত তাঁদের পতœীদের। বীরদেবের পতœী ইচ্ছা, তাঁদের পুত্র রাজমন্ত্রী দর্ভপাণির পতœী শর্করা দেবী, তাঁদের পুত্র সোমেশ্বরের পতœী রল্লা দেবী, তাঁদের পুত্র কেদারমিশ্রের পতœী বব্বা (দেবগ্রামে জন্মগ্রহণকারী) রাজরানী না হলেও ভূষিত ছিলেন রাজৈশ্বর্যে। প্রশস্তির সূত্রধার বিষ্ণুভদ্র লিখেছেন, ‘লক্ষ্মী চঞ্চলা বলে এবং সতী অপুত্রক বলে তাঁদের সঙ্গে তুলনীয় নন বব্বা দেবী।’ তাঁদের পুত্র গুরবমিশ্র ছিলেন সেকালের খ্যাতিমান গ্রহ-নক্ষত্র বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী।

পাল বংশীয় রাজরানীদের মধ্যে একজনই পড়েছিলেন বিশেষ বিপদে, তিনি রাজা দ্বিতীয় গোপালের (রাজত্বকাল ৯৪০-৯৫৭) মহিষী। যুদ্ধে স্বামী পরাজিত হওয়ায় এক বিশেষ পরিস্থিতিতে তাঁকে অবরুদ্ধ হতে হয়েছিল হরিকেলের চন্দ্র বংশীয় রাজা শ্রীচন্দ্র (রাজত্বকাল আ. ৯৩০-৯৭৫) দ্বারা। পরে অবশ্য তাঁকে সসম্মানে পৌঁছে দেয়া হয় স্বামীর কাছে।

পাল আমলের এক ক্ষুদ্র রাজ্যের পাটরানী বিক্রমদেবীর নাম-পরিচয় জানা গেছে লক্ষ্মীসরাইয়ের অদূরে লৈ গ্রামে প্রাপ্ত এক মূর্তিলেখের সূত্রে। তাঁর স্বামী যশঃপাল ছিলেন শেষ পাল রাজা পলপালের (রাজত্বকাল ১১৬৫-৯৯) ‘বাসাগারিক রাণক’ (বাসভবনের তত্ত্বাধায়ক)। অভিলেখটির কাল ১২ শতক।

বাংলার পাল বংশীয় আর কোন রানীর নাম-পরিচয় ও জীবনকাহিনী মেলে না ইতিহাসে।

তাহলে দেখছি পাল আমলে (৭৫০-১১৯৯) বাংলার রাজরানীদের বেশিরভাগই ছিলেন বহির্বাংলার, বিশেষ করে কর্ণাটক রাজ্যের অর্থাৎ কন্নড়ভাষী। তাঁরা ছিলেন পতিব্রতা ও ধার্মিক, পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়ে তাঁরা রক্ষা করেছেন রাজবংশকে। তবে কেমন ছিলেন সেন আমলের (১০৭০-১২৩০) রাজরানীরা? তাঁদের নামই বা কী? কর্ণাটক থেকে আগত হেমন্তসেনের (শাসনকাল ১০৭০-৯৬) পতœী যশোদেবী, তাঁদের পুত্র বিজয়সেনের (শাসনকাল ১০৯৬-১১৫৯) পতœী বিলাসদেবী, তাঁদের পুত্র বল্লালসেনের (শাসনকাল ১১৫৯-৭৯) পতœী রামদেবীর পর বাংলার রানী ছিলেন তিনজনÑ অহ্বণদেবী, শ্রিয়াদেবী ও কল্যাণদেবী। তাঁরা পরবর্তী রাজা লক্ষ্মণসেনের (শাসনকাল ১১৭৯-১২০৬) পতœী। স্বামীদের মতো তাঁরাও কি কন্নড়ভাষী? বিলাসদেবী অবশ্য দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার শূরবংশীয় রাজকন্যা। জাতিতে কায়স্থ। উল্লেখ্য, সেন রাজাদের নিজ নিজ সমাজভুক্ত বলে দাবি করে বাংলার বৈদ্য ও কায়স্থরা।

রানী বিলাসদেবী আচারনিষ্ঠ ও দানশীল ছিলেন বলে জানা যায় বিজয়সেনের বিক্রমপুর তাম্রশাসন থেকে। চন্দ্রগ্রহণকালে তাঁর তুলাপুরুষ দান উপলক্ষে হোমকর্মের দক্ষিণা হিসেবে নিষ্কর ভূমি দেয়া হয়েছিল মধ্যদেশ থেকে আগত কান্তিজোঙ্গবাসী উদয়কর নামের এক বৎস গোত্রীয় ব্রাহ্মণকে। ওই ভূমি খণ্ডটি পৌণ্ড্রবর্দ্ধন ভুক্তির খাড়ী বিষয়ের ঘাসসম্ভোগের অন্তর্গত ভাট্টবডা গ্রামে। প্রদত্ত ভূমির পরিমাণ সমতট দেশীয় নলের মাপে ৪ পাটক। এর বার্ষিক আয় ছিল ২০০ কপর্দক পুরাণ (কড়িতে গোনা রৌপ্য মুদ্রা)। খাড়ী বিষয় বর্তমানে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় অবস্থিত। এছাড়া সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে বিলাসদেবীর গঙ্গা¯œানকালে হেমাশ্ব মহাদানের দক্ষিণা হিসেবে বর্দ্ধমান ভুক্তির উত্তর রাঢ়া মণ্ডলের স্বল্পদক্ষিণ বীথির বাল্লহিটঠা গ্রাম নিষ্কর দান করা হয় এক ভরদ্বাজ গোত্রীয় ব্রাহ্মণকে। বৃষভশঙ্কর নলের মাপে ওই গ্রামের ভূমি পরিমাণ ছিল ৭ পাটক ৯ দ্রোণ ১ আঢ়ক ৪০ উন্মান ৩ কাক, রাজস্ব ছিল বার্ষিক ৫০০ কপর্দক পুরাণ। চন্দ্রগ্রহণকালে রাজরানী থাকলেও সূর্যগ্রহণকালে বিলাসদেবী ছিলেন রাজমাতা।

রামদেবী দাক্ষিণাত্যের চালুক্য বংশীয় রাজকন্যা। কিংবদন্তি মতে, বল্লালসেনের মহিষী ছিলেন আরও।

মহাস্থানে অবস্থিত শৈবমঠের মহন্ত ধর্মগিরি অপমান করেছিলেন সেনরাজপুরোহিতকে। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে রাজ্য থেকে শিষ্যসহ মহন্তকে তাড়িয়ে দেন বল্লালসেন। ধর্মগিরি তখন আশ্রয় নেন ম্লেচ্ছ রাজা বায়াদুম্বের। পরে তাঁর প্ররোচনায় বায়াদুম্ব আক্রমণ করেন সেন রাজধানী বিক্রমপুর। যুদ্ধযাত্রার আগে দুটি কবুতর সঙ্গে নেন বল্লালসেন। মহিষীদের ও পরিজনদের বলেন, যুদ্ধে হেরে মারা যাওয়ার আগে কবুতর দুটিকে ছেড়ে দেবেন তিনি। তখন মান-সম্মান বাঁচাতে তাঁরা যেন প্রাণ বিসর্জন দেন অগ্নিকুণ্ডে। কিন্তু কিভাবে যেন খাঁচা থেকে বেরিয়ে উড়ে চলে গেল কবুতর দুটি। তাদের দেখে আসন্ন বিপদ বুঝে আগুনে ঝাঁপ দেন মহিষীরা। ওদিকে যুদ্ধে ম্লেচ্ছদের সম্পূর্ণ পরাজিত করে দ্রুত রাজধানী রামপালে ফেরেন বল্লালসেন। তখন সব শেষ। শোকে-দুঃখে তিনিও প্রাণ ত্যাগ করেন আগুনে লাফিয়ে পড়ে।

এ কাহিনীতে বল্লালসেনের দুটি রাজধানীর উল্লেখ করা হয়েছে- বিক্রমপুর ও রামপাল। আর তাঁর সময়ে ম্লেচ্ছ বা মুসলমানদের আক্রমণ নিতান্তই অসার কল্পনা।

রামদেবী সম্পর্কে অন্য একটি কাহিনীতে বলা হয়েছে, জ্যোতিষীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন- শুভলগ্নে জন্ম হলে তাঁর সন্তানের (লক্ষ্মণসেন) রাজত্বকাল হবে ৮০ বছর। কিন্তু এর দু’ঘণ্টা আগে প্রসবব্যথা শুরু হলে তাঁকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখে বিলম্বিত করা হয়েছিল প্রসব।

লক্ষ্মণসেনের তিন মহিষীর মধ্যে প্রধান অহ্বণদেবী। সেন বংশের পরবর্তী রাজা তাঁর পুত্র বিশ্বরূপসেন (রাজত্বকাল ১২০৬-২৫)। অন্য দুই মহিষী শ্রিয়াদেবী ও কল্যাণদেবীর পুণ্যের জন্য ফস্ফগ্রাম থেকে নিষ্কর ভূমি দান করেছিলেন লক্ষ্মণসেন। ওই ভূমিখণ্ড পৌণ্ড্রবর্দ্ধন ভুক্তির বাশ্চসা আবৃত্তির অন্তর্গত বটুম্বী চতুরকে অবস্থিত। এর বার্ষিক আয় ছিল ৪০০ কপর্দক পুরাণ। দানগ্রহীতা ছিলেন মৌদগল্য গোত্রের সামবেদী ব্রাহ্মণ পদ্মনাভ পাঠক।

প্রাচীন বাংলার আরও ক’জন রানীর নাম-পরিচয় পাওয়া যায়, তাঁদের কথা বলছি এখন।

পাল রাজাদের সমকালে পূর্ববঙ্গের চন্দ্রদ্বীপে ও বিক্রমপুরে রাজত্ব করেছে চন্দ্র বংশ (৯০০-১০৫০)। এই বংশের এক রাজরানী ছিলেন কাঞ্চিকা বা কাঞ্চনা। তিনি চন্দ্র রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ত্রৈলোক্যচন্দ্রের (শাসনকাল ৯০০-৯৩০) পতœী। সমতট ও বঙ্গের দেব রাজবংশের এক রানীর নাম পাওয়া যায় কুমিল্লা জেলার পাকামোড়া গ্রামে প্রাপ্ত তাম্রশাসনের সূত্রে। তিনি ওই বংশের পঞ্চম ও শেষ রাজা দশরথের (রাজত্বকাল ১২৮১) পতœী। তাঁর নাম কন্দর্পদেবী। ওই তাম্রশাসনটি তিনি দিয়েছিলেন পরাশর গোত্রীয় সামবেদী ব্রাহ্মণ রমাপতিকে।

বিক্রমপুরের বর্মা বংশের দ্বিতীয় রাজা জাতবর্মার (রাজত্বকাল আ. ১০৫৫-৭৩) মহিষী ছিলেন কলচুরি-রাজ কর্ণের কন্যা বীরশ্রী। ওই বংশের চতুর্থ রাজা সামলবর্মার (রাজত্বকাল আ. ১১২৭-৩৭) পাটরানী ছিলেন মালব্যদেবী।

শ্রীহট্ট অঞ্চলের দুই রাজরানীর নাম-পরিচয় আছে ইতিহাসে। তাঁরা হলেন রায়ারি ত্রৈলোক্যমল্লের (রাজত্বকাল ১১২৫-৫০) পতœী বসুমতী এবং অন্যজন তাঁদের পুত্র উদয়করনিঃশঙ্কসিংহের (রাজত্বকাল আ. ১১৫০-৭৫) পতœী অহিয়বদেবী।

বাংলার ইতিহাস চর্চা এক সময় ছিল কিংবদন্তিনির্ভর। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, যদুনাথ সরকার, রমাপ্রসাদ চন্দ, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখের আগে লোককথাভিত্তিক বৃত্তান্ত-বিবরণের ছিল ব্যাপক প্রভাব। বঙ্কিমচন্দ্র তাই গভীর খেদ প্রকাশ করেছিলে বাংলা ও বাঙালীর প্রকৃত ইতিহাসচর্চার অভাব প্রসঙ্গে। এখন সেই ‘সামাজিক ইতিহাস’ থেকে উদ্ধার করতে হবে বাংলার রানীদের লুপ্তপ্রায় কাহিনীকথা। ওই কাহিনী অনুযায়ী, মগধ রাজ্যের অধীনে থাকাকালে পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মাবলম্বী। স্বাধীন হওয়ার পর শৈব হয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু পাল বংশীয়দের গণ্য করা হতো শূদ্র হিসেবে। রামপালের পতœী ও পুত্রবধূ ছিলেন কায়স্থ বংশীয়। ওই সময় রাজ্যের সকল প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন কায়স্থ। কথিত আছে, রাজাদের মধ্যে রামপালের বিশেষ খ্যাতি ছিল ন্যায়বিচারক হিসেবে। পুত্র যক্ষপাল এক প্রজার পতœীকে ধর্ষণ করায় তাকে প্রাণদণ্ড দিয়েছিলেন তিনি। তখন শোকে কাতর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন তাঁর পতœী ও পুত্রবধূ।

কিংবদন্তি মতে, পাল রাজরানী চিত্রমতিকা ছিলেন নষ্টা ভ্রষ্টা দুষ্টা। মন্ত্রীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে তিনি বিষপ্রয়োগে হত্যা করেছিলেন স্বামী মদনপালকে। ওই অপরাধে সেনাপতি শূরসেন বন্দী করেন তাঁদের, পরে হত্যা করেন আগুনে পুড়িয়ে। রাজা নিঃসন্তান থাকায় সেনাপতি নিজেই বসেন সিংহাসনে। তিনি পরে খ্যাতি পান আদিশূর হিসেবে। তাঁর পতœী কান্যকুব্জ-রাজ চন্দ্রকেতুর কন্যা চন্দ্রমুখী। একবার রাজ্যে অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে রাজার সামনেই রানী বলেন, রাজার পাপে রাজ্যে দুর্যোগ আসে। তাই রাজার চান্দ্রায়ণ প্রায়শ্চিত্ত করা কর্তব্য। রাজা ও রাজমন্ত্রী সকলে একমত হন তাঁর সঙ্গে। রাজকার্যে রানী চন্দ্রমুখীর কতখানি প্রভাব ছিল এ ঘটনা তার প্রমাণ।

আরেক রানী প্রভাবতীকে নিয়েও অনেক গল্পকথা আছে সেকালের বিবরণীতে।

আদিশূরের উত্তরসূরি গৌড়রাজ চন্দ্রসেন ছিলেন অপুত্রক। একমাত্র কন্যা প্রভাবতীকে তিনি বিয়ে দিয়েছিলেন বিজয়সেনের কাছে। আশা ছিল, পুত্রের স্থান নেবে জামাতা। কিন্তু না, বিবাগী স্বভাবের বিজয়সেন একমত নন শ্বশুরের সঙ্গে, তিনি গঙ্গাতীরে পৌঁছতে সন্ন্যাসীবেশে রওনা হন কংসহট্টের (কানসাট) পথে। তখন তাঁর সঙ্গে চলেন প্রভাবতী। বিজয়সেন জিজ্ঞেস করেন, তুমি আবার কোথায় চললে?

প্রভাবতী বলেন, তুমি যেখানে যাবে, আমি সেখানে যাব। তুমি যেভাবে থাকবে, আমিও সেভাবে থাকব।

তুমি এত কষ্ট সইতে পারবে না।

তুমি যা সইবে, তা আমিও সইব। তুমি এখানে ছিলে, তাই আমি বাপের বাড়ি ছিলাম। এখন তুমি আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাও, না হয় আমাকে হত্যা করে যাও। আমি প্রাণ থাকতে তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারব না।

তবে তুমি দামী অলঙ্কার সব রেখে যাও।

সঙ্গে সঙ্গে শাঁখা, খাড়ু ছাড়া সব অলঙ্কার খুলে রেখে প্রভাবতী বলেন, আর কী করতে হবে?

বিজয়সেন এবার হেসে বলেন, বুঝেছি তুমি আমার প্রকৃত ধর্মপতœী। তুমি আমার সঙ্গে চলো।

প্রভাবতী তখন পিছু নেন স্বামীর।

কানসাটে গিয়ে এক কুঁড়েঘর নির্মাণ করেন বিজয়সেন। সেখানে বাস করতে থাকেন স্ত্রী প্রভাবতীসহ। প্রতিদিন বন-জঙ্গল থেকে ফলমূল, কাঠ, লতাপাতা এনে বাজারে বিক্রি করে যা পান তা তুলে দেন স্ত্রীর হাতে, আর সারাক্ষণ জপ করেন শিবমন্ত্র। প্রভাবতী দাসীর মতো নিজ হাতে করেন সংসারের সকল কাজ, সেই সঙ্গে দিনরাত জপ করেন শিব-দুর্গা নাম। রাজা ও রানী গোপনে দেখা করেন মেয়ের সঙ্গে, বলেন সাহায্য-সহযোগিতা নিতে। কিন্তু প্রভাবতী বলেন, যত গোপনেই সাহায্য নেই না কেন স্বামী ঠিকই জানতে পারবেন একদিন। তার চেয়ে বাজারে আমার স্বামীর জিনিসগুলো বেশি দামে কিনে নেয়ার ব্যবস্থা করুন, তাতে আমার সাহায্য হবে, আবার কোন অপরাধ হবে না।

সে ব্যবস্থাই হয়। বাজারে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধিতে বিস্মিত হলেও এর কারণ বুঝতে পারেন না। এভাবে কাটে ১১১১ দিন। তখন স্বপ্নাদেশ পেয়ে রাজা রামপাল তাঁর উত্তরাধিকারী নির্দেশ করেন বিজয়সেন ও প্রভাবতীকে, তারপর আত্মবিসর্জন দেন গঙ্গায়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সিংহাসনে বসেন বিজয়সেন, তবে রাজকাজে কোন মনোযোগ ছিল না তাঁর। দুপুরের খাবারের পর রাজকাজে সময় দিতেন মাত্র চার দণ্ড, বাকি সময় কাটিয়ে দিতেন জপ-তপে। এ অবস্থায় মন্ত্রী দামোদরের সহযোগিতায় রাজ্য পরিচালনা করতেন রানী প্রভাবতী নিজে।

চন্দ্রসেন গুরুতর অসুস্থ হলে তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতে গৌড়ে যান প্রভাবতী। কিন্তু চন্দ্রসেন বলেন, ‘তোমার কোন ত্রুটি হয়নি। তুমি আদর্শ স্ত্রীর কাজই করেছ।’ বিজয়সেন-প্রভাবতীর পুত্র বল্লালসেনকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে তিনি গঙ্গাযাত্রা করেন কানসাটে। সেখানে তাঁর মৃত্যু চিতায় সহমরণে যান গৌড়ের রানী।

ইতিহাস-স্বীকৃত নয় এমন অনেক কাহিনীর আরেকটি বল্লালসেনের সঙ্গে সুন্দরী পদ্মিনীর প্রেমকাহিনী। এতে অত্যন্ত কুপিত হন রাজরানী রামদেবী। তাঁর নির্দেশে পুত্র লক্ষ্মণসেনও তৎপর হন পিতার বিরুদ্ধে। এতে স্ত্রী ও পুত্র উভয়কে অভিশাপ দেন বল্লালসেন। তাঁর মৃত্যুতে অনুতপ্ত হন লক্ষ্মণসেন। ওই সময় কুষ্ঠরোগ দেখা দেয় রামদেবীর গলায়। তখন লক্ষ্মণসেন বলেন, তুমি স্বামীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছ। তোমার কুপরামর্শে আমিও দুর্ব্যবহার করেছি পিতার সঙ্গে। তোমার এই ব্যাধি সেই পাপের ফল।

তাঁর এ কথায় ক্রুদ্ধ হয়ে শাপ দেন রামদেবী, আমার নামে কলঙ্ক দিলি? তোর নামে হবে চিরস্থায়ী কলঙ্ক!

১৫ শতকের দুই রানী ত্রিপুরা ও নবকিশোরীকে নিয়ে গল্পকথা অনেক। কিংবদন্তি মতে, প্রথমজন ভাদুড়ী বংশের রাজা গণেশনারায়ণ খাঁর (রাজত্বকাল ১৪১৪-১৫, ১৪১৬-১৮) পতœী, অপরজন তাঁদের পুত্র যদুনারায়ণ খাঁর (রাজত্বকাল ১৪১৫-১৬, ১৪১৮-৩৩) পতœী। যদু পরিচিত ছিলেন প্রথমে যদুমল্ল ও পরে জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ নামে। চলনবিল অঞ্চলের কুখ্যাত শ্যামা ও রামার দস্যুদলকে দমনের উদ্যোগ নিয়ে বিরোধ বেধেছিল ভাদুড়িয়ার রাজা গণেশের সঙ্গে সাঁতোড়ের রাজা অবনীনাথের। শ্যামা-রামার গুরুঠাকুর কোলা গ্রামের কালীকিশোর আচার্য্যরে হস্তক্ষেপে অবসান ঘটে সে দ্বন্দ্বের। যদুর সঙ্গে বিয়ে হয় অবনীনাথের কন্যা নবকিশোরীর। তাঁদের সন্তান অনুপনারায়ণ খাঁ। এর আগে থেকেই যদুর সঙ্গে আশনাই ছিল শাহজাদী আসমানতারার। গণেশ গৌড়েশ্বর হওয়ার পর সে সম্পর্ক গভীর হয় আরও। যদু রাজা হওয়ার তিন বছর পর ইসলাম ধর্ম গ্রহণের মাধ্যমে বিয়ে করেন আসমানতারাকে। নিজের নাম রাখেন জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহ। খবর পেয়ে রানী ত্রিপুরা ও নবকিশোরী উপস্থিত হন গৌড়ে। কিন্তু প্রাসাদ দুর্গে প্রবেশ করতে না পেরে ফিরে যান তাঁরা। এরপর রানী ত্রিপুরা ঘোষণা করেন, জাতি নাশের কারণে যদুর স্বত্ব নাশ হয়েছে। কাজেই এখন এ রাজ্যের অধিকারী তার শিশুপুত্র অনুপনারায়ণ।

রাজ্যের দেওয়ান তাহিরপুরের রাজা জীবন রায় সম্পর্কে যদুর মাসতুতো ভাই, আবার দূর সম্পর্কে নবকিশোরীর মামাতো ভাই। তিনি বলেন, ভাদুড়ী বংশ আসলে একটাকিয়ার রাজবংশ। আপনারা সেখানকার রাজা করুন অনুপনারায়ণকে। আসমানতারার সন্তানকে গৌড়ের বাদশাহী করতে দিন।

এই পরামর্শ গ্রহণ করে দুই রানী ফিরে যান সাতগড়ায়। সঙ্গে নিয়ে যান কয়েক নৌকা বোঝাই মূল্যবান ধনসম্পদ। সেখানে গিয়ে ভাদুড়িয়া ও রাজচতুষ্টয় দখল করেন তাঁরা। পরে দখল করেন ছিন্দাবাজুসহ তিনটি পরগনা। গৌড়ে নজরানা ও রাজস্ব পাঠানো বন্ধ করে রানী ত্রিপুরা রাজ্য শাসন শুরু করেন অনুপনারায়ণের অভিভাবক হিসেবে। এরমধ্যে যদুর কুশ নির্মিত মূর্তি দাহ করেন অনুপ। জাতিভ্রষ্টের শ্রাদ্ধ হয় না বিধায় তিনি মাথা ন্যাড়া করে স্বর্ণ উৎসর্গ করেন প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে। তখন থেকে বৈধব্য ব্রত গ্রহণ করেন নবকিশোরী।

রাজগদিতে না বসে বাইরের দরবারে পৃথক আসনে বসে রাজকাজ সামলাতেন রানী ত্রিপুরা। অনুপনারায়ণের বয়স ১৬ বছর হলে মহাধুমধামে তাঁর বিয়ে দেন তিনি। তখন বর ও বধূকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন সিংহাসনে। এরপর কঠোর থেকে কঠোরতর ব্রত পালন করতে থাকেন রানী নবকিশোরী। মাসে উপবাস করতেন প্রায় আঠারো দিন। ক্রমশ শুষ্ক ও দুর্বল হয়ে পড়ে তাঁর শরীর। চতুর্থ বছরে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

ভাদুড়ী বংশের রাজা মুকুন্দনারায়ণ খাঁ ছিলেন বিহারের শাসক ও পরে দিল্লির সুলতান শের শাহ সুরির (রাজত্বকাল ১৫৪০-৪৫) সহযোগী। তাঁর মৃত্যুতে শিশুপুত্র জগৎনারায়ণ খাঁ হয় রাজ্যের উত্তরাধিকারী। তখন তার মা রানী সুধামণি অভিভাবক হলেও কোন কর্তৃত্ব পাননি রাজ্য শাসনের। মুকুন্দনারায়ণের পাঁচ ভাই করতেন রাজ্য শাসন ও সংরক্ষণ। জনশ্রুতি অনুযায়ী, রানী সুধামণি ছিলেন স্খলিত চরিত্রের নারী। রাজপুরোহিত গুরুদাস চক্রবর্তীর সঙ্গে ছিল তাঁর গোপন প্রণয়। একপর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা হলে বৈরাগ্যের কথা বলে কাশীবাসী হন তিনি। তখন জগৎনারায়ণের দেখাশোনার ভার দিয়ে যান ভাণ্ডারনবিশ স্বরূপচন্দ্র সরকারের হাতে। সুধামণি কাশীতে জীবিত ছিলেন বহু বছর। জগৎনারায়ণের প্রথম বিবাহ উপলক্ষে দেশে এসেছিলেন মাত্র একবার।

ভাদুড়ী বংশের আরও অনেক রানীর নাম-পরিচয় পাওয়া যায় লোককথায়। জগৎনারায়ণের তিন রানীর মধ্যে প্রথমজন পাটরানী হিসেবেই খ্যাত। তাঁর বড় ছেলে রাজ্য-অধিকার হারায় মুসলমান হওয়ায়, ছোট ছেলে উপেন্দ্রনারায়ণ তখন শিশু। এ কারণে ছোট রানীর বয়োজ্যেষ্ঠ পুত্র মহেন্দ্রনারায়ণ অভিষিক্ত হন সিংহাসনে। পাটরানী মেনে নিতে পারেন না এ ব্যবস্থা, উপেন্দ্রকে সিংহাসনে বসাতে যুদ্ধযাত্রা করেন, কিন্তু পরাজিত হন শোচনীয় রূপে। তবে মহেন্দ্র কোন বিরূপতা দেখাননি এতে, তাঁদের যথাসম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন। উপেন্দ্র পলাতক ছিলেন, দেশে ফেরেন মহেন্দ্রের মৃত্যুর পর। রাজগদিতে বসার পর বিয়ে হয় তাঁর। রানী হন পরগনা সোনাবাজুর রাজা কাশীশ্বর রায়ের কন্যা সৌদামিনী দেবী। তাঁদের কন্যার নাম সর্বমঙ্গলা। তাঁকে ভাদুড়ী বংশের উত্তরাধিকারী করার ইচ্ছা ছিল উপেন্দ্রর। কিন্তু মহেন্দ্রর রানী পবিত্রার আপত্তি ছিল এতে। ঘরজামাই রাখার উদ্দেশ্য নিয়ে সর্বমঙ্গলার বিয়ে দেয়া হয় দামনাশের নৃসিংহের সঙ্গে। কিন্তু চক্রান্তের মাধ্যমে লক্ষ্মী আসে সর্বমঙ্গলার সতীন হিসেবে। এতে স্বামীর সঙ্গে সাময়িক বিচ্ছেদ ঘটে তাঁর। পরে মিলন ঘটলেও তিনি প্রথমে শিকার হন সতীন লক্ষ্মীর বিদ্বেষের, কিন্তু সে অবস্থারও অবসান ঘটে এক সময়। ওদিকে ভাওলীর ভাদুড়ী বংশীয় এক শিশুকে দত্তক নিয়ে তার নাম রাখা হয় রূপেন্দ্রনারায়ণ খাঁ। রানী সৌদামিনীর বিরোধিতা সত্ত্বেও সাবালক হওয়ার পর তিনিই হন রাজ্যের অধিকারী। তাঁর পাটরানী জগদম্বা, ছোট রানী তাহিরপুরের রাজকন্যা পূর্ণিমা।

রানী সর্বমঙ্গলা ছিলেন অসামান্য রূপসী। শেষ যৌবনেও ছিলেন যথেষ্ট আকর্ষণীয়। বিধবা হওয়ার পর সংসার-সম্পত্তি পরিচালনার জন্য নিয়োগ করেছিলেন কয়েকজন কর্মচারী। তাদের একজন সোনাপাতিল গ্রামের দুর্গানাথ শর্মা চৌধুরী। মাসিক ১৫ টাকা বেতন ও খোরাকিতে নিযুক্ত এই মুৎসুদ্দি রানীর যাবতীয় আদেশ-নির্দেশ পালন করত অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। কিন্তু কিছুদিন পর তার কুদৃষ্টি পড়ে সর্বমঙ্গলার প্রতি। তাকে উপপতœী হিসেবে পাওয়ার জন্য সচেষ্ট হয় সে।

এক সন্ধ্যায় ঠাকুর আরতি করে দুর্গানাথ বসে জলপানে। তাঁকে পরিবেশন করতে থাকেন সর্বমঙ্গলা। তখন অন্য কেউ ছিল না ঘরে। সুযোগ বুঝে দুর্গানাথ হঠাৎ সর্বমঙ্গলার হাত ধরে হাসতে হাসতে বলে, ওঁ স্বস্তি।

সর্বমঙ্গলা জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে বলেন, নিমকহারাম! তোর কি প্রাণের ভয় নাই? তুই জানিস আমি কে?

দুর্গানাথ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাতজোড় করে বলে, মা! আমাকে রক্ষা করো!

তোর এ দুর্বুদ্ধি কেন?

সবই ভগবানের ইচ্ছা! তিনি ছাড়া আর কে? সুন্দরী দেখলেই পুরুষ পাগল হয়। তখন ন্যায়-অন্যায় জ্ঞান থাকে না, প্রাণের ভয় থাকে না।

তোকে আর বিশ্বাস করা যায় না।

আমিও তা-ই মনে করি। এখন বিপদে পড়ে মা বললাম বটে, কিন্তু মুখে মা বললেই মন শুদ্ধ হয় না। তোমার চেয়েও আমার বয়স বেশি হলেও তোমার আমার যৌবন যায় নাই। এক স্থানে থাকলে মন খারাপ হতেই পারে। আমি চলে যাচ্ছি, তবে একটি পরামর্শ দিয়ে যাই।

তোমার উচিত পিতৃতুল্য কাউকে মুৎসুদ্দি করা। আমার জ্ঞাতি জ্যেঠা রাধামোহন চৌধুরীকে নিয়োগের বিষয় বিবেচনা করতে পারো। তিনি অবশ্য পারসি ভাষা জানেন না, কিন্তু তোমার কাজে পারসির প্রয়োজনও নাই।

এ পরামর্শ গ্রহণ করেন সর্বমঙ্গলা।

রূপেন্দ্রনারায়ণ খাঁ ছিলেন অপব্যয়ী। খিজমত খাঁসহ বেশকিছু ইয়ার জুটেছিল তাঁর। নেশা ও অন্যান্য দোষও ছিল অনেক। রাত কাটাতেন বাইরে, বিশেষ করে বাইজি সংসর্গে। পাটরানী জগদম্বা শান্ত স্বভাবের ছিলেন, তিনি কিছু বলতেন না স্বামীকে। কিন্তু ছোট রানী পূর্ণিমা স্বামীর মতিগতি ফেরাতে হন বদ্ধপরিকর। সেনাপতি কামতার খাঁ-ও একদিন রূপেন্দ্রনারায়ণের মুখের ওপর বলে বসেন, তুমি যখন বাইরে হাওয়া খাও তখন অন্য কেউ তোমার ঘরে হাওয়া খেলে কি একটাকিয়ার ইজ্জত থাকবে?

এরপর বাইজি সংসর্গ ত্যাগ করে উপপতœীদের নিয়েই মত্ত থাকতেন রূপেন্দ্রনারায়ণ, কিন্তু তাঁর অপব্যয়ের রাশ আর টেনে থামানো সম্ভব হয়নি কারও পক্ষে। শেষে তিনি পরিণত হন লুটেরা ডাকাতে। একপর্যায়ে বাকি মালগুজারির দায়ে নিলামে ওঠে একটাকিয়ার দুটি পরগনা- কালীগাঁও ও প্রতাপবাজু। রায় রঘুনন্দন রায় তা কিনে নেন নাটোরের মহারাজা রামজীবনের নামে। দখল নেয়ার সময় এ নিয়ে যুদ্ধাবস্থা সৃষ্টি হয় রূপেন্দ্রনারায়ণের অনমনীয়তার কারণে। পাটরানী জগদম্বা সন্ধির পক্ষে ছিলেন, কিন্তু রানী পূর্ণিমা কঠোর অবস্থান নেন যুদ্ধের পক্ষে। যুদ্ধে রূপেন্দ্রনারায়ণ নিহত হন, আর ধ্বংস হয় একটাকিয়া। মন্ত্রী-রাজন্য সবাই বন্দী হন, তাদের দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। তখন সর্বমঙ্গলা নাটোরে গিয়ে দেখা করেন মহারাজা রামজীবনের সঙ্গে। তাঁর আবেদনে সাড়া দিয়ে বন্দীদের মুক্তি দেন রামজীবন, সদয় বিবেচনা করেন অন্যান্য বিষয়েও। শুধু তা-ই নয়, রাজকুমারী বিশ্বেশ্বরীর সঙ্গে বিয়ে হয় সর্বমঙ্গলার সপতœীপুত্র কাশীদাসের।

এই রামজীবনের পোষ্যপুত্র, একটাকিয়ার সন্তান রামকান্ত পরে হন নাটোরের রাজা। তাঁরই পতœী রানী ভবানী (১৭১৬-১৭৯৫) দানশীলতার কারণে এক কিংবদন্তি হয়ে আছেন।

এই একটাকিয়া রাজবংশের কন্যা সর্বাণী ছিলেন সাঁতোড়ের রানী, মহারাজ রামকৃষ্ণ সান্যালের পতœী। ২১ বছর বয়সে নিঃসন্তান বিধবা হয়ে ৬৭ বছর রাজ্য শাসন করেছেন অসাধারণ যোগ্যতাবলে। সিংহ রাশির জাতিকা ছিলেন, তাঁর বল বুদ্ধি তেজস্বিতা ছিল সিংহের মতো। নারীসুলভ কোমলতা, লজ্জাশীলতা কিছুই ছিল না তাঁর; বস্তুতে নারী হিসেবে সুখকর কিছু ভোগ করেননি তিনি। বিয়ে হয়েছিল ১০ বছর বয়সে, এর কিছুকাল পরেই বসন্ত রোগে শ্রীহীন হয়ে পড়েছিল তাঁর শরীর। স্বামীর প্রিয় ছিলেন না, স্বামীর সঙ্গে কলহ-বিবাদ হতো সব সময়। ওদিকে সকল পৈতৃক সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন বৈমাত্রেয় ভাই। তাঁর সঙ্গে সর্বাণী ও তাঁর মায়ের সম্পর্ক ভাল ছিল না, ফলে সেখানেও শান্তি ছিল না সর্বাণীর।

রামকৃষ্ণের পতœী ছিল চারজন, তবে উপপতœী ছিল অনেক। লাম্পট্য ও মাতলামি দোষে রামকৃষ্ণ মারা যান অল্প বয়সে। দ্বিতীয় পতœীর ঔরসে তাঁর কন্যা ছিল একটি। তবে পাটরানী হওয়ায় রাজ্যভার পান সর্বাণী।

রামকৃষ্ণ ছিলেন অপব্যয়ী, তাই প্রচুর ঋণ রেখে যান মৃত্যুর আগে। বাকি পড়েছিল কর্মচারীদের বেতন, জ্ঞাতি কুটুম্বদের ভাতা। এ অবস্থায় রানী কিনা একজন অল্পবয়সী নারী! কর্মচারীরা নেমে পড়ে রাজসম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টায়। কেউ কেউ চেষ্টা করে রানীদের উপপতি হওয়ার। চারদিকে আশঙ্কা জাগে, সাঁতোড় রাজ্য ধ্বংস হবে অচিরেই। কিন্তু এক মাসের মধ্যেই রাণী সর্বাণী দেখা দিলেন সকলের অপ্রত্যাশিত রূপে। মৃত স্বামীর শ্রাদ্ধের ব্যয় এবং সমস্ত রাজ্যের আয়-ব্যয়ের হিসাব তিনি যেভাবে নিতে থাকেন তাতে সকলেই বুঝতে পারে, তাঁকে ফাঁকি দিয়ে কিছু করা একেবারেই অসাধ্য। এক সুদর্শন যুবক তাঁর সঙ্গে আশনাইয়ের চেষ্টা করায় তাকে কঠোরভাবে শাসন করেন তিনি, সেই সঙ্গে পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন অন্তঃপুরে। তাঁর বুদ্ধি ও তেজস্বিতা দেখে হতাশ হয়ে পড়ে মতলববাজেরা। রামকৃষ্ণ হিসাব-নিকাশ করতেন বহুদিন পর পর, কিন্তু সর্বাণী করেন দৈনিক নিকাশের নিয়ম। এছাড়া তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী, সকল বিষয়ে তদন্ত করতেন নিজে। অনেকের পরামর্শ নিতেন, কিন্তু বশীভূত ছিলেন না কারও। নিজ কর্তব্য তিনি পালন করতেন নিজে। এজন্য মুরশিদকুলি খাঁর মালগুজারি বন্দোবস্তে কোন ক্ষতি হয়নি তাঁর, বরং নিলামে আট পরগনা কিনে বৃদ্ধি করেছিলেন সম্পত্তি।

রানী সর্বাণীর প্রথম দত্তক সূর্যকান্ত, তাঁর স্ত্রী ও পুত্র মারা যান অকালে। পরবর্তী দত্তক চন্দ্রকান্ত-ও মারা যান অকালে। তিনি রেখে যান ১৩ বছরের বধূ সত্যবতীকে। সর্বাণী আর দত্তক না নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন, বংশরক্ষা হবে পুত্রবধূর দত্তক দ্বারা। কিন্তু রানী সর্বাণীর মৃত্যুর পর জটিলতা দেখা দেয় এ নিয়ে। শেষে রানী সর্বাণীর প্রধানমন্ত্রী গুণাকর রায় গুপ্ত নিজে দাক্ষিণাত্যে গিয়ে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে পেশ করেন আরজি। সম্রাট সবকিছু শুনে আদেশ করেনÑ সাঁতোড়ের বাইশ পরগনার রাজ্য ফেরত দিতে হবে রানী সত্যবতীকে। রানীর অভিভাবক ও সরবরাহকার হিসেবে নিযুক্ত হবেন গুণাকর রায় গুপ্ত।

তবে দুই স্বামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছেন দু’জন রানী। এমন ঘটনা এ দেশের ইতিহাসে বিশেষ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে অন্তত দু’বার। প্রথম কাহিনী বর্ধমানের, দ্বিতীয় কাহিনী ভাওয়ালের।

সুবোধ মুখোপাধ্যায় রচিত ‘জাল প্রতাপচন্দ’ (১৯৭৮) নাটকের ভূমিকায় প্রখ্যাত নাট্যকার-গবেষক দেবনারায়ণ গুপ্ত (১৯১০-২০০০) লিখেছেন, ‘... বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দের একমাত্র পুত্র কুমার প্রতাপচন্দ বিমাতার চক্রান্তে নিরুদ্দিষ্ট হন। নিরুদ্দেশ ইচ্ছাকৃত নয়। অসুস্থ নিস্পন্দ প্রতাপচন্দকে মৃত মনে করে গঙ্গাতীরে সৎকারের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য শ্মশানযাত্রীরা দাহ না করেই প্রতাপচন্দের নিস্পন্দ দেহটাকে ফেলে রেখে ফিরে আসে। এই ঘটনার চৌদ্দ বৎসর পরে, একদা এক সাধুর আবির্ভাব হয় বর্ধমান রাজপ্রাসাদে। ঘটনাচক্রে প্রকাশ পায়, এ সাধু আর কেউ নন স্বয়ং মহারাজ কুমার প্রতাপচন্দ। এদিকে সুদীর্ঘ চৌদ্দ বৎসরের মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে বর্ধমান রাজপরিবারে। (ক্ষমতায়) মহারাজ তেজচন্দের শ্যালক পরাণচন্দ এবং মহিষী মহারানী কমলকুমারী। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন ইংরেজ রাজত্বের গোড়ার দিকে... ঐতিহাসিক মামলার সৃষ্টি হয়েছিল...।’

প্রতাপচন্দ নিরুদ্দেশ হন ১৮২১ সালে। তখন তাঁর বয়স ছিল ৩০ বছর। সাধু নিজেকে প্রতাপচন্দ ঘোষণা করেন ১৮৩৫ সালে। হুগলি জজকোর্টে মামলা শুরু হয় ওই বছরই।

সাধু যে জাল তা প্রমাণ করার জন্য বর্ধমানের ক্ষমতাসীন রাজপরিবার ও তাদের সমর্থক ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী সচেষ্ট ছিল প্রথম থেকেই। তবে সাধারণ মানুষ ছিল সাধুর পক্ষে। এ অবস্থায় কালনায় সাধুর সমর্থকদের এক শান্তিপূর্ণ সমাবেশে গুলি চালায় গোরা পল্টনের ক্যাপটেন লিটিল। এতে নিহত হন ১৮ জন। সমাবেশ থেকে গ্রেফতার করা হয় ২৯৪ জনকে। আর পাঞ্জাবের মহারাজা রণজিৎ সিংহের (১৭৮০-১৮৩৯) লোক হিসেবে প্রচার করে রাজদ্রোহের অভিযোগে সরকার মামলা দায়ের করে সাধুর বিরুদ্ধে।

ইতিহাসে এ মামলা ‘জাল প্রতাপচন্দের মামলা’ হিসেবে বিখ্যাত। এ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘জাল প্রতাপচন্দ’, রাখালদাস মুখোপাধ্যায়ের ‘রাজবংশানুচরিত’, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সংবাদপত্রে সেকালের কথা’ প্রভৃতি গ্রন্থে। অনেক লেখক প্রতাপচন্দকে অবশ্য ‘প্রতাপচাঁদ’-ও লিখে থাকেন।

মামলায় প্রতাপচন্দের সুপরিচিত খ্যাতিমান ব্যক্তিদের মধ্যে সাধু যে প্রতাপচন্দ এই মর্মে সাক্ষ্য দেন হরধামের রাজা নরহরিচন্দ্র, বিলকুলির নবাব আনোয়ার আলি, জাহানাবাদের রামদীন সিং, বল্লালদীঘির হাফেজ ফতে আলি, বিষ্ণুপুরের রাজা ক্ষেত্রমোহন সিংহ, মহাত্মা ডেভিড হেয়ার (১৭৭৫-১৮৪২) প্রমুখ। তবে রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৭৯৪-১৮৪৬) আদালতে বলেন, ‘ওই সন্ন্যাসীকে আমি প্রতাপচন্দ বলে চিনতে পারছি না।’ এ নিয়ে অনেক সমালোচনা হয় প্রিন্সের। বর্ধমানের রাজক্ষমতা দখলকারী পরানচন্দের (প্রতাপচন্দের বিমাতা কমলকুমারীর ভাই এবং অপর বিমাতা বসন্তকুমারীর পিতা) লোক ও ইংরেজঘেঁষা হিসেবে। তবে আরও কারণ ছিল। প্রিন্সের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাজা রামমোহন রায়ের (১৭৭২-১৮৩৩) সঙ্গে ঘোরতর বৈরিতা ছিল প্রতাপচন্দের পিতা মহারাজ তেজচন্দের (১৭৬৪-১৮৩২)। সে বিষয়টিও প্রিন্সের সাক্ষ্যে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলে আশঙ্কা করা হয়।

বর্ধমান রাজ্য গ্রাসের জন্য পরানচন্দ (১৭৮১-১৮৪৪) সকল জালই ফেলেছিলেন সুকৌশলে। মহারাজার শ্যালক হিসেবে প্রাসাদে জায়গা নিয়ে পরে হয়েছিলেন তাঁর শ্বশুর। আবার প্রতাপচন্দ নিখোঁজ হওয়ার পর নিজ পুত্র মহতাবচন্দকেও (১৮২০-১৮৭৯) পোষ্য নিতে বাধ্য করেছিলেন মহারাজাকে। এভাবে বালক মহতাবকে সামনে রেখে প্রকৃত রাজক্ষমতা ভোগ করেছেন তিনি।

মামলায় সাক্ষ্য দেননি প্রতাপচন্দের দুই স্ত্রী প্যারীকুমারী ও আনন্দকুমারী। বলা চলে দিতে পারেননি। তাঁরা প্রকৃত অর্থে বন্দিনী ছিলেন রাজপ্রাসাদে। আনন্দকুমারী বিশেষ চেষ্টা করেও দেখা করতে পারেননি সাধুর সঙ্গে। তবে তাঁর পিতা গুলাবচন্দ ‘দামাদ’ বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তাঁকে।

মামলায় পরাজিত হন সাধু। জজসাহেব যে রায় দেন তা এ রকম ‘আমি সমস্ত সাক্ষ্য বিবেচনা করিলাম। (কালনার দারোগা) মহিবুল্লাহর সাক্ষ্য বিবেচনা করিলাম। (তার) সাক্ষ্য বিবেচনার যোগ্য নহে। প্রধান সাক্ষী ক্ষেত্রমোহন সিংহের সাক্ষ্যও নিরপেক্ষ নহে। তাঁহাকে মধরহবফ ড়াবৎ করা হইয়াছে। বাবু দ্বারকানাথ ঠাকুর বিরুদ্ধে গিয়াছেন। উভয় পক্ষের কাউন্সিলের কথাতে আমি এই সিদ্ধান্ত করিলামÑ যে ব্যক্তি রাজত্ব লাভের আশায় নিজেকে মহারাজ-পুত্র প্রতাপচন্দ বলিয়া পরিচয় দিতেছে তাহাকে কেহ কেহ (সাধু) কৃষ্ণলাল ব্রহ্মচারী অথবা (বিদ্রোহী) আলোক শাহ বলিয়াছে। এই ব্যক্তি যে কেহ হইতে পারে কিন্তু মহারাজপুত্র প্রতাপচন্দ নহে ইহা নিশ্চিত। মহারাজপুত্র প্রতাপচন্দের সত্যই মৃত্যু হইয়াছে এই ব্যক্তি জাল প্রতাপচন্দ। এই ব্যক্তি অন্যের নাম লইয়া নিজেকে প্রতাপচন্দ বলিয়া জাহির করিয়াছে এবং অনেক মানুষকে ঠকাইয়াছে এই অপরাধে এই আসামির পাঁচ বৎসর কারাদণ্ড হওয়া উচিত। কিন্তু যাহার কোন নাম স্থির হইল না, যাহার কোন পরিচয় পাওয়া গেল না তাহার কি নামে শাস্তি হইবে এই সন্দেহের অবকাশে আসামিকে কোন শাস্তি দেওয়া হইল না। বেকসুর খালাস দেওয়া হইল। তবে ভবিষ্যতে আসামি আর কখনও নিজেকে প্রতাপচন্দ বলিয়া কোন স্থানে মামলা করিতে পারিবে না। কারণ সে যে জাল প্রতাপচন্দ তাহা এখনই প্রমাণিত হইল।’ (‘জাল প্রতাপচন্দ’, সুবোধ মুখোপাধ্যায়)

ভাওয়াল সন্ন্যাসীর মামলায় অবশ্য জয়ী হয়েছিলেন রাজ্যের দাবিদার সন্ন্যাসী। আর সে মামলার প্রথম ও প্রধান বিবাদী ছিলেন রানী বিভাবতী স্বয়ং। তিনি স্বামী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাননি ওই দাবিদারকে।

১৯০৯ সালের ৭ই মে ঢাকার ভাওয়াল এস্টেটের মেজো কুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী মারা যান দার্জিলিংয়ে। তাঁর শ্রাদ্ধশান্তি অনুষ্ঠিত হয় ১৮ই মে। তবে গুজব রটে মৃতদেহ সৎকারের জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হলেও সৎকার হয়নি। কয়েক বছর পর আরও গুজব রটে তিনি নাকি বেঁচে আছেন এবং সন্ন্যাসী হিসেবে জীবন কাটাচ্ছেন।

১২ বছর পর ১৯২১ সালের জানুয়ারি মাস নাগাদ ঢাকার বাকল্যান্ড বাঁধে আবির্ভাব হয় এক সাধুর। তাঁকে নিয়ে গুজব রটে যায় সন্ন্যাসী হয়ে ফিরে এসেছেন রমেন্দ্রনারায়ণ। লোকজনের জিজ্ঞাসাবাদে প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে সন্ন্যাসী নিজেকে ভাওয়ালের মেজো কুমার বলে ঘোষণা দেন, এ ঘোষণার পক্ষে বিভিন্ন প্রমাণও দেন। অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া, গোপন জীবনযাপন করা, অবশেষে ফিরে আসা প্রভৃতি বিষয়ে বহু কৌতূহলী প্রশ্নেরও জবার দেন তিনি। তবে তাঁর দেহের বিভিন্ন চিহ্ন, ভাবভঙ্গি ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখে কুমারদের বড় বোন জ্যোতির্ময়ী দেবী নিশ্চিত হন এ সন্ন্যাসী তাঁরই ভাই রমেন্দ্রনারায়ণ। এ ঘটনা ঘটে ৭ই মে মেজো কুমারের মৃত্যুর তারিখে। পরে এ সব ঘোষণা প্রকাশ্যে হাজার হাজার প্রজাসাধারণের সামনেও দেয়া হয় রীতিমতো সভা-সমাবেশের আয়োজন করে (১৫ই মে)। তখন ঢাকার কালেক্টর জে এইচ লিন্ডসে। দু’জন উকিল ও স্থানীয় এক জমিদারকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন সন্ন্যাসী। ৩রা জুন ভাওয়াল জমিদারিতে বাংলায় এক ইশতেহার জারি করেন লিন্ডসে ‘... ভাওয়ালের দ্বিতীয় কুমারের মৃতদেহ বারো বৎসর পূর্বে দার্জিলিং শহরে ভস্মসাৎ হইয়াছিল। সুতরাং যে সাধু দ্বিতীয় কুমার বলিয়া পরিচয় দিতেছে সে প্রতারক। যে কেউ তাহাকে খাজনা অথবা চাঁদা দিবেন তিনি তাহার নিজের ঝুঁকিতে দিবে...।’

১০ই জুন মির্জাপুর হাটে ঢোলসহরৎ দিয়ে ওই বিজ্ঞপ্তি প্রচার করার সময় রীতিমতো ক্ষিপ্ত হয়ে প্রজারা চড়াও হন এস্টেটের কর্মচারীদের ওপর। পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটলে গুলি চালায় পুলিশ। নিহত হন প্রজা ঝুমর আলি। শুরু হয় সরকার ও জনতার মধ্যে বিরোধ। সরকার ও বিভাবতী দেবী যত বোঝাবার চেষ্টা করেন ইনি সেই তিনি নন, জনতা তত পাগল হয়ে ওঠে তাঁর নামে। একপর্যায়ে ব্রিটিশ কালেক্টরকে খাজনা দেয়া বন্ধ করেন প্রজারা।

শেষে সাধু কি ভণ্ড না প্রকৃত কুমার তা নিষ্পন্ন করতে ১৯৩০ সালের ২৪শে এপ্রিল মামলা শুরু হয় ঢাকা কোর্টে। বাদীপক্ষের দাবি সন্ন্যাসীই কুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী, ভাওয়াল এস্টেটের সমুদয় সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ তাঁর প্রাপ্য। বিভাবতী দেবী কুমন্ত্রণার চাপে এবং সম্পত্তির লোভে একবারও স্বামীকে চাক্ষুষ না দেখেই তাঁর পরিচয় মানতে অস্বীকার করছেন এবং বিভিন্নভাবে তাঁর এখতিয়ারভুক্ত বিষয়ে মাথা গলাচ্ছেন।

বিবাদীপক্ষে রয়েছেন মেজো রানী বিভাবতী দেবী, তাঁর মুখপাত্র ভাওয়াল এস্টেটের ম্যানেজার বিনওল্ড, বড় রানী সরযূবালা দেবী, ছোট রানী আনন্দকুমারী দেবী ও ছোট রানীর দত্তক পুত্র রামনারায়ণ রায়চৌধুরী।

ঢাকার ফার্স্ট এডিশনাল জজ পান্নালাল বসুর (১৮৮২-১৯৫৬) কোর্টে পরিচালিত এ মামলায় বাদীপক্ষের পরামর্শদাতা ছিলেন ব্যারিস্টার বিজয়চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আর বিবাদীপক্ষের পরামর্শদাতা ছিলেন ব্যারিস্টার অমিয়নাথ চৌধুরী। মামলার শুনানি শুরু হয় ৩০শে নভেম্বর। রায় ঘোষণা হয় ১৯৩৬ সালের ২৪শে আগস্ট। ৫২৫ পৃষ্ঠার রায়ের চূড়ান্ত বক্তব্য ‘ফরিয়াদিই কুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায়, ভাওয়ালের প্রয়াত রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ রায়ের দ্বিতীয় পুত্র।’

রানী বিভাবতী দেবী ও তাঁর ভাই সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় হাইকোর্টে আপিল করলেন এ রায়ের বিরুদ্ধে। সেখানে পুনর্বিচার শুরু হয় ১৯৩৮ সালের ১৪ই নভেম্বর, চলে ১৯৩৯ সালের ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয় ১৯৪০ সালের ২৯শে আগস্ট : ‘ঢাকার ফার্স্ট এডিশনাল জজের রায় যে পালটানো দরকার, আপিলকারীরা তথ্য-সহযোগে এমন কথা প্রতিষ্ঠা করতে অসমর্থ হয়েছেন।’

রানী বিভাবতীর আপিল বাতিল হয় ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। মে মাসে হাইকোর্টে জয়ী হওয়ার পর ভাওয়ালের এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি আসে রাজা সন্ন্যাসীর দখলে। সে সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য পাওয়ার অব এ্যাটর্নি দিয়ে পি কে ঘোষকে ম্যানেজার নিয়োগ করেছিলেন তিনি।

রানী বিভাবতী কিন্তু দমেননি তবু। তিনি আপিল করেন লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে। তাঁর পক্ষে লড়েন ডব্লিউ ডব্লিউ কে পেজ। সন্ন্যাসীর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন ডি এন প্রিট। ১৯৪৬ সালের ৩০শে জুলাই রায় ঘোষণা করা হয়। এবারও বাতিল হয়ে যায় আপিল। এরপর সম্পত্তির হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত হওয়ার পর ভাওয়াল এস্টেটের রানী হিসেবে প্রাপ্য আট লক্ষাধিক টাকা নিতে অস্বীকার করেন তিনি। বলেন, তাহলে ওই প্রতারককে স্বীকৃতি দেয়া হবে।

হাইকোর্টে আপিলের সময় থেকে সন্ন্যাসীকে দেবর রমেন্দ্রনারায়ণ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন বড় রানী সরযূবালা দেবী। তিনিই দেখভাল করতেন তাঁর। বিচার-সংক্রান্ত সব রকম আর্থিক ও ব্যবস্থাপনার ভার তুলে নিয়েছিলেন নিজের হাতে। উকিল-এ্যাটর্নিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতেন, নিজের মতামতও দিতেন।

সম্পত্তির অধিকার ফিরে পেলেও স্ত্রীর ওপর অধিকার পাননি সন্ন্যাসী। এ অধিকার যে আর পাওয়ার নয় তা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল আগেই। এ অবস্থায় ১৯৪২-৪৩ সালে সরযূবালা দেবী উদযোগ নিয়ে দেবরের বিয়ে দেন ধারা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কনে ধারার বয়স তখন তিরিশের কোঠায়। বিয়ে হয় কাশীতে, যথেষ্ট ধুমধামের সঙ্গে।

ওদিকে বিভাবতীর সঙ্গে নাম জড়িয়ে গিয়েছিল মামলায় তাঁর সহায়তাকারী ও একান্ত অনুগত আশুতোষ দাশগুপ্তের। দু’জনের সম্পর্ক নিয়ে যথেষ্ট কানাঘুষা আর হাসাহাসি হতো সেই সময়ে। তবে এজন্য সম্ভবত আশুতোষের অদ্ভুত হাবভাবই দায়ী ছিল বেশি।

প্রিভি কাউন্সিলের রায়ের খবর পরদিন (৩১শে জুলাই, ১৯৪৬) পৌঁছায় কলকাতায়। সেদিন সন্ধ্যায় সন্ন্যাসী যাচ্ছিলেন ঠনঠনিয়া কালীবাড়িতে পূজা দিতে। রাস্তায় বেরোনোর সময় হঠাৎ তিনি আক্রান্ত হন হৃদরোগে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে নেয়া হয় তাঁকে। পহেলা আগস্ট ৬৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ভাওয়ালের রাজা সন্ন্যাসী।

রানী বিভাবতী বেঁচেছিলেন আরও কুড়ি বছর। সব সময় তিনি বলতেন, পৃথিবীর বিচারকদের বিচারে পরাজিত হলেও উপরের বিচারকের বিচারে হার হয়নি তাঁর। বহু বছর আগে যাঁর মৃত্যু হয়েছে তাঁর পরিচয় নিয়ে যে প্রতারক যাচ্ছিল দেবীকে পূজা দিতে তাকে সমুচিত শাস্তি দিয়েছেন দেবী।

রানী থাকতেন ১৯ ল্যান্সডাউন রোডে। তাঁর বিলাসবহুল ভবনের কোন চিহ্ন এখন আর নেই সেখানে। তবে পাশের এক গলিতে রানীর ভাই সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাতি-নাতনিরা আছেন এখনও। এ পরিবার ভাওয়ালের ওই রাজা সন্ন্যাসী সম্পর্কে যে কাহিনী লালন করে আসছে তা হলোÑ ওই ব্যক্তি আসলে জয়দেবপুরের আস্তাবলের সহিসের ছেলে। গোটা রাজবাড়ির ইতিহাস ছিল তাই তার নখদর্পণে। আসল রহস্য লুকিয়ে আছে তার জন্মদাতার পরিচয়ের মধ্যে। সেকালের জমিদারবাড়িতে যেমন ঘটত সহিসের ছেলে হলেও তার জনক ছিলেন রাজা রাজেন্দ্রনারায়ণ স্বয়ং। এজন্যই মেজো কুমারের সঙ্গে এত বেশি দৈহিক সাদৃশ্য ছিল তার।

ভাওয়াল সন্ন্যাসীর কাহিনী এ দেশের লোকমানসে সৃষ্টি করেছিল এক বিরাট মানসিক অভিঘাত। এ নিয়ে অনেক পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়ে চলেছে তখন থেকে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকও লেখা হয়েছে প্রচুর। এখনও হচ্ছে। এক সময় ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’ ছিল বিপুল জনপ্রিয়তায় ধন্য পালাগান। চলচ্চিত্রেও সাফল্যের সঙ্গে রূপায়িত হয়েছে এ কাহিনী। ঢাকায় ‘রাজা সন্ন্যাসী’ (পরিচালক : খান আতাউর রহমান) ও ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’ (পরিচালক : রওনক চৌধুরী) নামে দুটি ছবি মুক্তি পায় ১৯৬৬ সালে। প্রথমটিতে মুখ্য দুই চরিত্রে অভিনয় করেন আজিম ও শবনম, দ্বিতীয়টিতে করেন খলিল ও রেশমা। কলকাতায় একই কাহিনী অবলম্বনে পীযূষ বসুর পরিচালনায় নির্মিত ‘সন্ন্যাসী রাজা’ মুক্তি পায় ১৯৭৫ সালে। এতে মেজো কুমার ও বিভাবতীর চরিত্রে রূপ দিয়েছেন উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবী।

অলঙ্করণ : আইয়ুব আল-আমিন