মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

গল্প ॥ ছায়াসঙ্গীর জবানবন্দী

প্রকাশিত : ৭ জুলাই ২০১৫
  • মোহিত কামাল

প্রতিচ্ছাপ

ইচ্ছে থাকার পরও হাতের কাজটি শেষ করার তাগিদ পেল না রাহুল। ইচ্ছার ফাঁক-ফোকর দিয়ে অনাগ্রহের বিশৃঙ্খল শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে লাগল বিরক্তিকর জঞ্জাল। আবর্জনার স্তূপ চোখে না পড়লেও অদৃশ্য নোংরা ময়লার ভারে ধাপে ধাপে ক্লান্ত হতে হতে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের তাজা শরীরে ক্রমাগত কোপ বসিয়ে দিচ্ছে, সেটাও টের পাচ্ছে না রাহুল। তবে ইচ্ছের সলতেয় মৃদু শিখা এখনও জ্বলছে বলেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর অন্তর্গত সাড়া বিলীন হয়নি। কিন্তু উদ্যমহীন মস্তিষ্কের ভেতর থেকে আসছে না কোনো ধরনের গতিবাহী সংকেত। বসে আছে তো, আছেই। অলসতা, অসাড়তা, শারীরিক দুর্যোগ না পরিবেশের চাপ, বোঝার চেষ্টাও করল না সে। ঠায় বসে রইল। উদ্দেশ্যহীন বসে থাকাও নয়, লক্ষ্য স্থির আছে, কোনো সন্দেহ নেই। তবুও গতি নেই, উদ্যম নেই। আনন্দের বিন্দুমাত্র সাড়া টের পেল না সে। অনুভব-অনুভূতির সমুদ্রে উত্তাল ঢেউ ছিল এক সময়। এখন অনুভবের জলধারায় নড়চড় নেই, উত্তাল ঢেউ দূরের কথা স্থির অনড় জলস্তরও ডুবতে দিচ্ছে না, ভাসিয়ে রাখছে তাকে। তবে কি আবেগজলের ভেতর থাকে আরেক জলধারা? জীবনধারা? ভেতর থেকেই কি ঠেলে রাখে তা মানুষকে? ডুবতে দেয় না অতলে?

সময়ের ঢেউয়ের মধ্যে ডুবে গিয়েও ভেসে রইল রাহুল। কে তাকে ভাসিয়ে রাখছে? তলে তলে কি অন্য কোনো প্লাবতার ঢেউ কিংবা সম্পর্কের ডালপালা ধরে ঝুলে আছে নিজে? প্রশ্নটির কণাতরঙ্গ উঁকি দিল মনে। আর তখনই রাহুল দেখল নিজের আরেক রূপ, চোখের সামনে ছিল সেই রূপগাথা, দেখার মতো করে দেখা হয়নি চোখ মেলে, অনুভবের চলন্ত সিঁড়ি বেয়ে নামতে-উঠতে কখনও মনে পড়েনি সেই কথা। এখন হঠাৎ বিন্দু বিন্দু আলোর কণা ছড়িয়ে যেতে লাগল চারপাশে। আলোর উদ্ভাসে ঢুকল কেউ নেই কাছে, দূরে সরে গেছে সবাই। জানালা খোলার পর দেখল রোদের বাড়াবাড়ি। রোদের দিকেই তাকিয়ে রইল সে। চোখ পুড়ে যাচ্ছে দুপুরের কড়া রোদে। তবুও চোখ সরানোর তাগিদ পেল না। বরং রোদের কড়া আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য পকেটে রাখা রোদচশমাটি লাগিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল জানালার পাশে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে চকিত মনে হলো রোদেরও ছায়া আছে। রোদের ছায়ার মতোই নিজের ছায়াজীবন আবিষ্কার করার পর পাশের সেই ছায়াসঙ্গীকে চেনার চেষ্টা করে চমকে উঠল। কড়া রোদ দেখতে দেখতে যেমন রোদের ভেতর থেকে প্রবলভাবে বেরিয়ে এসেছে রোদছায়া, আপনার মাঝে লুকোনো ছায়াটা তার চেয়েও বেশি ক্ষিপ্রগতিতে সামনে এসে সরিয়ে দিল রাহুলের আসল সত্তা আর ছায়ার মধ্যে ওঁৎ পেতে থাকা কালো পর্দা। কেঁপে কেঁপে উঠল রাহুল। নেপালের প্রকৃতি-সড়ক-জনপদ-লোকালয় ভূকম্পনে যেভাবে কাঁপতে কাঁপতে চুরমার হয়ে গেছে, তার চেয়েও বড় কম্পনের শিকার হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। জানালার পাশ থেকে নিজেকে সরিয়ে রোদচশমা খুলে বসে পড়ল পড়ার টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারে। আসল রাহুল আর ছায়া রাহুলের মাঝের কালো পর্দা সরে যাওয়ার পর অনঙ্গ শুদ্ধতার ছাট লাগায় জমাট আকাক্সক্ষার বারুদ আচমকা একবার জ্বলে উঠল। অলীক আলোক-তরঙ্গমালার দাপটে নিজের মধ্যে চট করে জ্বলে ওঠা আগ্রহবিনাশী, উদ্যম লুটে নেয়া দ্বন্দ্বের শিকড় পর্যন্ত ছলকে উন্মোচিত হয়ে গেল চোখের সামনে। কী দেখল রাহুল! ব্যভিচারী বিপন্ন কোনও বহ্নি? নাকি ব্যভিচারী বহ্নিশিখায় পরিয়ে রেখেছে দেহহীন শুদ্ধতার কামরিপুর মুখোশ? চেতন মনের সিঁড়ি বেয়ে তর তর করে নিচে যেতে লাগল সে। প্রশ্নের উত্তর পেল না। নিজের শুদ্ধতার আভরণের স্তরে স্তরে ব্যভিচারী কোনো ছাপ পেল না। সে দেখল থরে থরে সাজানো প্রতিটি ঘটনার মধ্যে স্থায়ীভাবে বসে আছে ত্রিমাত্রিক জীবন্ত আঁচড়। যা সে করে, শুদ্ধতার লেপন লেগে যায় সেই আভরণে। তাহলে কি কালিমার কোনও লেপন নেই জীবনে? নাকি নিজের অনঙ্গ সৌন্দর্যের কালিমা ছুঁতে পারে না অঙ্গহীন অঙ্গকলা? নিজের মধ্যে জেগে ওঠা প্রশ্নের মধ্যে থেকেও ঘূর্ণি উঠল দ্বন্দ্বের। দ্বন্দ্বের মীমাংসা খুঁজে পাওয়ার সাহস না পেলেও নিজেকে আবিষ্কারের নেশায় ছায়াসঙ্গীকে প্রশ্ন করল, ‘আমার সঙ্গী হলে কীভাবে তুমি?’

অলীক কোনও কল্পপ্রশ্ন নয়, বাস্তবের নখের খোঁচা খেয়ে ছায়াসঙ্গী শুদ্ধ শব্দের স্ফূরণ ঘটিয়ে বলল, ‘আমি তো তোমার সঙ্গী নই কেবল, তোমার সত্তার ফাউন্ডেশন হচ্ছে আমার অস্তিত্ব। যা তুমি করো তার একটা প্রতিদৃশ্য চিত্রিত হয়ে বসে যায় আমার ভিতে।’

‘বলো কী? আমায় সব কর্মের প্রতিলিপিই কি ছাপ মেরে দেয় তোমার দেয়ালে?’

‘হ্যাঁ। সবই থেকে যায় আমার অনন্ত গভীরে। তোমার স্ববিরোধী আকাক্সক্ষার ব্যভিচারী তাড়নাও আসন নেয় আমার অনঙ্গ শরীরের অঙ্গকলায়। আর দেহ-চোখের মণি ফুঁড়ে বেরোনো ব্যভিচারী আলোকতরঙ্গও আশ্রয় নেয় আমার আঁধার জগতে। সেই জগৎ তখন আলোকিত হয়ে ওঠে। সুযোগ পেলেই সেই আলোতরঙ্গ হুঁস হুঁস বেরিয়ে যেতে পারে তোমার অগোচরে।’

‘সর্বনাশ ! তাহলে তো সবাই দেখে ফেলবে আমার একান্ত নিজস্ব মনোজগৎ।’

“হ্যাঁ। এ জগতে ভালোÑখারপ দুটোরই দাগ বসে যায়। কোনো কর্মই লুকোনো থাকে না, যে কোনো সময়, যা গোপনে করছ, গোপন থাকবে না, বেরিয়ে যাবে। ‘গোপনে যা করে মানুষ, তা প্রকাশিত হবেই’।”

অনীহার উৎস খুঁজতে গিয়ে, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোনোর মতো, দ্বন্দ্বের ত্রিমুখী গোখরার ছোবল খেল রাহুল। স্বর্ণার জন্য নিজেকে যেভাবে প্রস্তুত করছিল, শুদ্ধতার পোশাক পরে নিজেকে যেভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছিল, সেই তাগিদের ডালে উড়াল দিয়ে এসে বসল এক বাজপাখি। বাজের চোখের অভেদ্য নিশানা ছিঁড়েখুঁড়ে উন্মুক্ত করে দিচ্ছে আগোচরে থাকা ছায়াসঙ্গীর দেহাভরণ। ব্যস্ত হয়ে রাহুল বলল, ‘তোমাকে দেখতে চাই না। কথা বলতে চাই না তোমার সঙ্গে। পালাও, প্লিজ পালাও এখন।’

‘তুমি থাকলে তোমার ছায়াও থাকবে। বাইরের ছায়া থেকে ভেতরের ছায়া আরও বেশি বলবান, আরও বেশি তেজস্বী। আগোচরে থাকলেও তাকে অবহেলা করা ঠিক নয়, তাকে তাড়ানো যায় না।’

‘অবহেলা করছি না। ভয় পাচ্ছি। প্লিজ ভয় দেখিও না, সরে যাও তুমি।’ রাহুলের কথায় আকুতি ঝরে পড়ল।

ছায়াসঙ্গী সরল না, পালাল না। রাহুলের কথায় গলল না। বরং মাটি ফুঁড়ে বেরোতে থাকা অজস্র শাখা-প্রশাখার মৃত্তিকা আঁকড়ে ধরার মতো সম্পর্কের বিস্তৃত ডালপালায় ছড়িয়ে জড়িয়ে ফেলল রাহুলকে। বিরক্তি নয়, অস্বস্তি নয়, নিবু নিবু ইচ্ছার তাড়না কমে গিয়েও তাই নিভে গেল না রাহুলÑ অতল তলের আরেক তল আছে, দেখার সুযোগ পেয়ে ছায়ার মধ্যে জড়রূপে বিলীন হয়ে নিশ্চুপ বসে রইল সে।

আচমকা ছায়াসঙ্গী অতল থেকে নড়ে উঠে বলল, ‘আমার থেকে আলাদা হতে চাও? আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাও? আলাদা হলে ভুল থেকে ভুল বাড়বে, সম্পর্কে সম্পর্কে জটিলতা বাড়বে, মহত্ত্ব হারিয়ে যাবে, জৈবিকদানবের শৃঙ্খলে আটকা পড়ে যাবে। মৃত দেহের পচনের মতো কিংবা দেহে ছত্রাক গজানোর মতো পরজীবী অস্তিত্বের প্রশাখায় আটকে যাবে জীবন। কেবল মৃত্যু, এমনকি মৃত্যুও আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না তোমাকে।’

‘সবাই কি নিজের ভেতরের এমন কঠিন ছায়াসঙ্গীকে দেখতে পায়?’

“যারা পায় না, পাওয়ার চেষ্টা করে না, তারা ডুবতে থাকে জলে; জানে না যে জলের ভেতরও জল থাকে, জানে না যে ‘সম্পর্কের ভেতর থেকেই বেড়ে উঠতে পারে আর-একটা সম্পর্ক’।”

‘উহ্ ! আমি আর পারছি না। আর কিছু শুনিয়ো না। এক সম্পর্কের ভেতরে থেকেও তো আরেক সম্পর্কের জাল বিছিয়ে ফেলেছি। শুদ্ধতার চাষ করতে গিয়েও অশুদ্ধতার লেপনে নিশ্চয় ভরে তুলেছি তোমার ফাউন্ডেশন, ভিত। আমাকে রেহাই দাও।’

হো হো হেসে উঠল ছায়াসঙ্গী। হাসতে হাসতে বলল, ‘হ্যাঁ। নিজের ছায়া দেখতে পাচ্ছ তুমি। এখন নিশ্চয় অশুদ্ধতার পথে যাওয়ার সুযোগ পাবে না। এখন নিশ্চয় শুদ্ধ পথটা চিনে নিতে পারবে। অসৎ পথে হাঁটতে গেলে তোমার ফাউন্ডেশনে প্রতিচ্ছাপ খাওয়া জীবনটুকরো তোমাকে আটকে দেবে। আমি খুশি, এখন আর আমার গায়ে অশ্লীল বর্বতার ছাপ লাগবে না, প্রকৃতির রঙিন আর স্বচ্ছ-শুভ্র আলপনার আঁচড় খেতে খেতে আমার আমিকে অন্য রকমভাবে পাব, তোমাকে অভিনন্দন রাহুল!’

নক্ষত্রের হাট

টেবিলে ফাইলের পর ফাইল জমে স্তূপ হয়ে গেছে। লালফিতার দৌরাত্ম্যের বিষয় থাকলেও ফাইলের বাঁধনটা লালফিতার নয়, সাদা ফিতায় আটকানো ফাইলের দিকে তাকিয়ে রাহুল হঠাৎ দেখল ফাইলের ওপর কী যেন নড়াচড়া করছে। কী? না বুঝে বাঁ হাতে অগ্রবর্তী করা ফাইলটা টেনে নিয়ে ফিতা খুলে সেকশন অফিসারের নোটে চোখ রাখার সঙ্গে সঙ্গে নোটের প্রতিটি বর্ণমালা শব্দের বাঁধন থেকে ছুটে এসে চকিত কামড় বসিয়ে দিতে লাগল রাহুলের চোখে। ফাইলটি দ্রুত বন্ধ করে দু’হাতের আঙুলের তালুতল দিয়ে চেপে ধরল সে চোখজোড়া। আশ্চর্য! সব ব্যারিকেড ফুঁড়ে আঙুলের তালুতলে আটকানো চোখের দৃষ্টি ঝপঝপ আছড়ে পড়তে লাগল সংক্ষিপ্ত নোটের প্রতিটি বাক্যের ওপর। সাদা ফিতায় মোড়ানো ফাইলের ভেতর অজগরের মতো হেলেদুলে এগোতে দেখল প্রতিটি বাক্যকে। বুকে কামড় বসে গেল এবার। এই অজগরকে সামাল দিয়ে কীভাবে নিজে অগ্রবর্তী করবে এ ফাইল? গঠনমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কীভাবে সে ফাইলটি হাজির করাবে বসের টেবিলে? ইনস্টিটিউশনটিকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার প্রয়োজন; এই সন্ত্রাস-সময়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করা জরুরী সন্দেহ নেই। তাই বলে ত্রিশ লাখ টাকার বাজেট পেশ করতে হবে! সিসি ক্যামেরার আওতায় আনতে বড়জোর তিন লাখ টাকা খরচ হতে পারে। এ মুহূর্তে তিনের পাশে বসা শূন্যটিকে অজগরের বিশাল হা মনে হলো। সব গিলে ফেলবে এই হা? শূন্যের এত শক্তি! তিনের পাশে বসে অতিরিক্ত সাতাশ লক্ষ টাকার ঘণ্টাধ্বনি বাজাতে পারে শূন্যটি? শূন্যের শক্তি দেখে মুগ্ধ হলো না রাহুল; বরং তার চোখের পাতার ভাঁজ কপালের ভাঁজের সঙ্গে মিলেমিশে, স্ফীতমণির শূন্য বৃত্তে জাগিয়ে তুলল এক কম্পনঢেউ; ঢেউ ছড়িয়ে যেতে লাগল আর ভোঁতা হয়ে যেতে লাগল বোধের শান, মস্তিষ্কের তরঙ্গ-সঙ্গীতেও জেগে উঠল বিশৃঙ্খলা। চট করে মাথা জ্যাম হয়ে গেল, ব্যস্ত সড়কে যানজটের মতো মুহূর্তেই জট বেধে গেল ব্রেনওয়েভের সুশৃঙ্খল গতিতেও।

অদৃশ্যে ঘটতে থাকা বিশৃঙ্খল ঝড়ের তা-ব আকস্মিক থেমে গেল পাশে এসে দাঁড়ানো সেকশন অফিসারের কথা শুনে।

‘স্যার, ফাইলটা কি ছেড়ে দিলে হয় না?’

স্থিত হতে কিছুটা সময় লাগল রাহুলের। পাশে দাঁড়ানো সেকশন অফিসারের মুখভর্তি দাড়ি, নূরানি চেহারা আর মাথায় টুপি দেখে পরানে এক ফোঁটাও প্রশান্তির বাতাস বইল না, বরং অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে রাহুল জবাব দিল, ‘ফাইল কি আটক করে রেখেছি আমি?’

পাল্টা প্রশ্ন শুনে থতমত খেয়ে শরীরটাকে সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে নত হয়ে বিগলিত স্বরে দু’বার অ্যাঁ অ্যাঁ করে সেকশন অফিসার বলল, ‘উপরের নির্দেশ আছে, আজই ফাইলটা দেখতে চেয়েছেন উপরওয়ালারা। তাড়াতাড়ি করতে বলেছেন।’ কথা বলার সময় তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এলো জর্দামাখা চিবানো পানের কয়েকটি ছিঁটানো টুকরো, টেবিলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁ হাত দিয়ে সে মুছতে শুরু করল টেবিল। আর মুখে বলতে লাগল, ‘সরি স্যার, সরি স্যার।’

সেকশন অফিসারের উপরের নির্দেশের কথা অদৃশ্য চড়ের মতো চপেটাঘাত করল গালে। ভেতরের কথা আর বেরোনোর সুযোগ পেল না; আচমকা সামনে এসে দাঁড়ানো উড়ন্ত উঁচু পাঁচিলে ধাক্কা খেয়ে ডুবে গেল ভেতরে।

সেকশন অফিসার চলে যাওয়ার পরই শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত অফিস কক্ষের একলা ঘরে অবিরাম সঙ্গে থাকা নিজের নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করল সে চোখ বুজে। আশ্চর্য! ভেতরে কোনো ছায়া নেই। ছায়াহীন অস্তিত্বের ছায়ায় নিজেকে শূন্য মনে হতে লাগল। স্বর্ণাকে ঘিরে গভীরে প্রোথিত সম্পর্কের যে-জটিল শিকড়-জালে জড়িয়ে গেছে সে, জটিলতা যেভাবে ধাপে ধাপে বাড়ছে, মিথ্যার পর মিথ্যা সাজিয়ে যে-জটিলতা মোকাবিলা করা যাচ্ছে না; ‘ফাঁন্দে পড়িয়া বগা কান্দে’র মতো উড়ে উড়ে এসে জমা হচ্ছে আনুষঙ্গিক যে-প্রমাণচিহ্ন, সময়ের সিঁড়ি টপকে নিশ্চয় তা উপচে পড়বে জীবনকল্পনার বাইরেÑ এ মুহূর্তে ফাইল সংকটের চাপে পড়ে কিংবা সেকশন অফিসারের কথার ইঙ্গিত ধরে পৃথিবীর ভূ-ভাগের প্লেট সরে যাওয়ার মতো নিজের ছায়াসঙ্গীও যেন সরে গেল, কাঁপন উঠল বুকে। ঠেক দিয়ে কি তবে আর চালানো যাবে না দেহ-কাঠামো?

নিজের মধ্য থেকে উগরে বেরিয়ে আসা প্রশ্নের শান ধারালো না ভোঁতা বোঝার আগেই রাহুল দেখল আবার ফিরে আসছে সেকশন অফিসার। হাত বাড়িয়ে একটা প্যাকেট রাখল টেবিলে।

‘স্যার, এটা আপনার পাওনা।’

সেকশন অফিসারের দিকে চোখ তুলে তাকাল রাহুল। ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ থেকে আচমকা নড়ে উঠে প্রশ্ন করল, ‘এত অনিয়ম? এত বড় লুটপাট? কোথায় তিন লক্ষ আর কোথায় ত্রিশ লক্ষ! এভাবেই কি চলছে সব?’

‘স্যার, মাফ করবেন, ধাপে ধাপে সবখানে...’

‘থামুন, আমাকে আর শেখাতে হবে না।’

‘শেখানোর কথা না স্যার, অডিট অবজেকশন থেকে শুরু করে টাকা বরাদ্দের সব ধাপের জন্য টাকা ধরে না রাখলে তো কাজ এগোবে না। প্রজেক্ট ব্যর্থ হবে। তার চে...’

‘শুনুন, প্যাকেটটা হাতে তুলে নিন, আর রুম থেকে যেতে পারেন এখন।’

সেকশন অফিসার ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। বসের আদেশ মানতে কিছুটা সময় নিল। তারপর বেরিয়ে গেল রুম থেকে।

ভেতরে ভেতরে খেপে উঠতে লাগল রাহুল। আর তখনই টের পেল নিজের আড়ালে থাকা অনন্য আরেক নিজেকে।

‘বাহ্ ! তোমার তুমি তো নতুন রং মেখে দিলে আমার অস্তিত্বে।’

‘রং মাখালাম কোথায়? মেজাজ দেখালাম। অভদ্র আচরণের ব্যবহার অভদ্রভাবে না হলেও কড়া গলায় দিলাম।’

‘কড়া ভাষা মোটেও ব্যবহার করোনি, নিয়ন্ত্রিত ঢঙ্গে কথা বলেছ সেকশন অফিসারের সঙ্গে।’

‘নিয়ন্ত্রণবোধে আমার কোনো ভালো গুণ কাজ করেনি, বরং উপরের ভয় কাজ করেছে।’

‘তোমার কি মনে হয়? গভীর করে কি ভেবেছÑ সেকশন অফিসার কী উপরের ইঙ্গিত বিষয়ে আসল কথা বলেছে, নাকি তোমার সামনে সরল ছিল, তার আখের গোছাতে কাজ বানিয়ে নেয়ার ফাঁদ পাতেনি তো সে?’

‘এমন করে তো ভাবিনি!’

‘বাহ্! ভাবতে হবে না! যেÑলোক প্যাকেট অফার করতে পারে তার ইঙ্গিত কি বিশ্বাস করা উচিত, ভয় পাওয়া উচিত?’ ইঙ্গিতের আড়ালে থাকতে পারে না অন্য কোনো ঘটনা?

‘ভয় পাইনি, তবে নিজের ভেতর একটা পরিবর্তন টের পেয়েছি। গোপনে বদলে যাওয়া আমার আমি যে কে তা চিনতে পেরেছি বলা ঠিক হবে না। তবে স্বর্ণার সঙ্গে যে একটা লুকোচাপা খেলা চলছে অবচেতনভাবে যা-করে ফেলেছি, এ মুহূর্তে নিজের সেই অস্বচ্ছতাকে দেখে ফেলেছি, দেখার মধ্য দিয়েই বোধ হয় জেগে উঠেছি আপন জঞ্জাল সরিয়ে, কি বলো হে ছায়াবন্ধু?’

‘জঞ্জাল কি আসলেই সরে গেছে, নাকি অন্যপথে আবর্জনার স্তূপ পচে-গলে দুর্গন্ধ বের করবে?’

‘তা তো জানি না, তবে নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখার ইচ্ছা হচ্ছে, আর যেন ভুল না করি, প্রতিজ্ঞা করতে ইচ্ছে হচ্ছে।’

‘ভালো লক্ষণ। ভালো ইচ্ছে ধরে রাখতে চেষ্টা করছ, বেশ, বেশ ভালো।’

‘আকস্মিক চুপ হয়ে গেল ছায়াসঙ্গী। ইন্টারকমে সুপিরিয়র বসের কল আসার সঙ্গে সঙ্গে সরে গেল মনতল থেকে? রিসিভারের বাটন টিপে রাহুল বলল, ‘জি স্যার। ’

‘শোনেন, ত্রিশ লাখ টাকা বরাদ্দের একটা ফাইল আসবে। ভালো করে পড়ে ফরোয়ার্ড করবেন আপনার স্পষ্ট মতামতসহ। উপর থেকে চাপ আসছে, চাপের কারণ বুঝতে পারছি না। চাপের আড়ালে গলদ থাকে, নিশ্চয় এ অভিজ্ঞতা আছে আপনার।’

বসের কথার পিঠে কথা বলা হলো না। লাইন কেটে দিয়েছেন তিনি। নতুন প্রশ্ন হানা দিল মনেÑ একটা ফাইল কেন দু’ধারা শানে চকচক করছে? উপরে-নিচে কী ঘটছে? দু’ধারা তলোয়ার কি মোকাবিলা করা সম্ভব?

অন্তর্গত প্রশ্নের দাপটে আচমকা হুঁসহুঁস করে উঠল চারপাশ। কেবল নিজের দেহ-কাঠামোতে নয়, মন- কাঠামোর খুঁটিতে দু’দিকে দু’রকম ধার টের পেল; একধারে কাটছে সে স্বর্ণাকে, আরেক ধারে কাঠছে ফেসবুকে সখ্য গড়ে ওঠা মিতালিকে। স্বর্ণার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে না? গোপন জগৎ দখল করে নিচ্ছে না মিতালি? জীবন শুরুর আগেই স্বর্ণার জীবনে বিছিয়ে দেয়া হচ্ছে না প্রতারণার জাল? প্রতারণা করে কি গড়া যায় সুন্দর সম্পর্ক? মন কি গাইবে তখন সততার সঙ্গীত? সুখী হওয়া যাবে?

আত্ম-অবলোকনের সুযোগ ঘটার কারণে নিজের দেহতলে দেখল এঁকেবেঁকে চলা দুটো পথÑ একপথের ইটসুঁড়কি হচ্ছে চুম্বককণা, টানছে। আরেক পথে বিছানো আছে আলোরকণা, আলোকিত করছে নিজেকে। চুম্বকটানে বিভ্রান্ত হলো না, প্রলুব্ধ হলো রাহুল। ইচ্ছে করছে সে-পথে এগোতে, লাগাম টেনে রাখতে পারছে না নিজের। হঠাৎ দেখল ভাইব্রেশন মোডে রাখা সেলফোনসেট কাঁপছে। মনিটরে ভেসে উঠেছে মিতালির নাম। চুম্বকটান খেল চোখ। একটানে খুলে গেল স্বর্ণার মনগিঁট। আলগা হয়ে গেল সে স্বর্ণার সেঁটে থাকা মন থেকে। ফোনসেট হাতে তুলে কল ব্যাক করল মিতু মানে মিতালিকে।

‘হাই! কী করছ?’ প্রশ্ন করল মিতালি।

‘অফিসে কাজ করছি।’

‘কী ব্যাপার? তোমার গলার টোনে এত বিভ্রান্তি কেন? উচ্ছ্বাস নেই কেন, নক করেছি তোমাকে, খুশি হওনি?’

খুশি টের পেল না রাহুল। তবে খুশি খুশি ভাব নিয়ে বলল, ‘ইয়ে খুশি, হয়েছি।’

‘নাহ্! উচ্ছ্বাস নেই তোমার টোনে। কী পেলে উচ্ছ্বসিত হবে? যা-চাইবে পেয়ে যাবে অথবা পাওয়ার প্রতিশ্রুতিও পেয়ে যেতে পারো এখন।’

শরীরের অজগর একটা মোচড় দিল। টের পেল রাহুল।

ঠিক এ সময় সেকশন অফিসার আবার ঢুকল রুমে। অজগরের দেহ-মোচড় উপেক্ষা করে চট করে লাইন কেটে সেট অফ করে দিল রাহুল। মিতালির প্রতিশ্রুতির মোচড় ইঙ্গিতে কেঁপে কেঁপে উঠেছিল, ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছিল দানবটা। প্রায় বলেই বসেছিল কী দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে চাও? প্রশ্নটির উত্থান নিয়ন্ত্রণ করে সেকশন অফিসারের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘আবার কী চান?’

‘কিছু চাই না। প্যাকেটটা যদি আপনার হাতে গছাতে না পারি তবে আমার মাথার খুলি উড়ে যেতে পারে।’

ভীত-সন্ত্রস্ত সেকশন অফিসারের গলা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল রাহুল।

ভেঙে পড়ল না সে। জোর গলায় বলল, ‘শুনুন, কৌশলে কাবু করবেন না আমাকে। প্রলোভন কিংবা ভয় দেখিয়ে আমাকে নরম করার চেষ্টা করবেন না। আবেগ দিয়েই ভয় ঠেকাতে জানি আমি। প্যাকেটটি ফিরিয়ে নিন। বেরোন এখন এখান থেকে।’

প্যাকেটটা হাতে তুলে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে গেল সেকশন অফিসার।

মস্তিষ্কের নিউরনের বনাঞ্চলে ঘটে গেল আট রিখটার স্কেলের কম্পন। এ কম্পনে গাছপালা উপড়ে পড়ল না। পড়তে পড়তে আবার ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ আঁধারে ঢেকে যাওয়া চারপাশে আলো ফুটতে লাগল। রাহুল কল্পচোখে দেখল আলোর ঢেউয়ে ভেসে আসছে স্বর্ণা, সোনালী রঙ ছড়িয়ে সাফ করে দিচ্ছে মস্তিষ্কের ¯œায়ুকোষের বনাঞ্চলের যতসব আবর্জনা। আবার চোখ গেল টেবিলের ওপরÑ যেখানে প্যাকেটটি ছিল দেখল সেখানে কিলবিল করছে অসংখ্য জোঁক। জোঁকগুলো এগিয়ে আসছে তার দিকে!

ভয় পেয়ে গেল রাহুল। চট করে উঠে দাঁড়াল চেয়ার থেকে। টিস্যু পেপার হাতে দিয়ে পরিষ্কার করে দেয়ার চেষ্টা করল টেবিল, পারল না। হাজার হাজার জোঁক একসঙ্গে এগিয়ে আসছে তার দিকে! ভয়ে চিৎকারÑ তাড়না হুঁস করে বেরিয়ে এলো। চিৎকার দেয়ার সুযোগ পেল না সে।

হঠাৎ রাহুল শুনল গুলির আওয়াজ! একি! পিস্তলের গুলির শব্দ হলো কেন অফিসে! দ্রুত ছুটে অফিস কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো সে। আওয়াজ শুনে সবাই জড়ো হয়েছে লবিতে। একজন উঁকি দিয়ে দেখল সেকশন অফিসারের কক্ষ। তিনি স্থির বসে আছেন চেয়ারে। আর তার ঠিক মাথার পাশে পেছনের দেয়াল ফুটো হয়ে আছে। সামনে থেকে বুলেট ছোড়া হয়েছিল তাকে লক্ষ্য করে। মাথায় লাগেনি, লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সেটি আঘাত হেনেছে দেয়ালে। লক্ষ্যভ্রষ্ট বুলেটের কারণে কেবলই সেকশন অফিসারের জীবন রক্ষা পায়নি, রক্ষা পেল রাহুলের ভেতরের রাহুলও । সে বলে উঠল, ‘হার ঠেকাতে হবে। এভাবে হারলে চলবে না।’

সঙ্গে সঙ্গে রাহুল অনুভব করল উড়ে গেছে দেহের অবসাদ। উড়ে গেছে ক্লান্তি। নিজের কক্ষে ফিরে দেখল জোঁকগুলোও উধাও হয়ে গেছে টেবিল থেকে। মিতালিকে ঘিরে নিউরনের ঘন অঞ্চলে যে দূষিত চিন্তার জাল বিস্তার করছিল, প্রবৃত্তির দানব যেভাবে ভ্রষ্টপথে টেনে নামাচ্ছিল, আঁধারে যেভাবে ডুবে যাচ্ছিল, স্বর্ণার স্বর্ণালী স্বপ্নকে যেভাবে গুঁড়িয়ে দিতে চলেছিল, সেই জাল ছিঁড়ে গেছে মুহূর্তেই। সঙ্গে সঙ্গে দেহাভ্যন্তরে মোড়ানো প্রবৃত্তির বাকল খসে গেল তার শরীর থেকেÑ আলোর নতুন পরশ পেয়ে ফোনসেট হাতে নিয়ে কল করল স্বর্ণাকে। আর তখনই গহিন তলের অন্ধকারের স্তর ঠেলে হঠাৎ কে যেন নড়ে উঠল, সংক্ষিপ্ত শব্দ তেড়ে এলো ভেতর থেকে, ‘বাহ! রাহুল বাহ!

‘ওঃ ! তুমি?’ ছায়াসঙ্গীকে প্রশ্ন করল রাহুল।

‘হ্যাঁ। আমি; তোমার তুমি। আমার আকাশে দিনÑদুপুরেও বসে গেছে নক্ষত্রের হাট। সেই হাটে আমি দেখছি আলো আর আলো, তোমারই আলো, স্বর্ণার আলো।’

প্রকাশিত : ৭ জুলাই ২০১৫

০৭/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: