২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এ্যান্ড্রোপজ-পুরুষত্বের ইতি


বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শরীরে হরমোনের মাত্রা পরিবর্তিত হতে থাকে। মেয়েদের নিয়মিত রজঃস্রাবের জন্য দায়ী যেসব হরমোন, সাধারণত ৪৫-৫০ বছর বয়সে তা সহসা কমে যায় এবং রজঃনিবৃত্তি ঘটে। ইংরেজীতে একে মেনোপজ (গবহড়ঢ়ধঁংব) বলা হয়। পুরুষদের বেলায় পুরুষত্বের জন্য দায়ী হরমোনের মাত্রা এমন সহসা কমে যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে এর মাত্রা কমতে থাকে এবং এই পরিবর্তন কয়েক বছর ধরে চলে। এক পর্যায়ে পুরুষত্বের অনেক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়। এক কথায় একে ‘পুরুষদের মেনোপজ’ বলা যায়। অধিকাংশ চিকিৎসা বিজ্ঞানী পুরুষত্বের বৈশিষ্ট্যসমূহ লোপ পাওয়াকে ‘এ্যান্ড্রোপজ’ (অহফৎড়ঢ়ধঁংব) বলে থাকেন।

পুরুষত্বের জন্য দায়ী মূল হরমোন টেস্টোস্টেরন। টেস্টোস্টেরন শরীরে কমে যাওয়ার কারণে এ্যান্ড্রোপজ হয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে মেনোপজ বা রজঃস্রাব নিবৃত্তি হলে ডিম্বস্ফোটন (ঙাঁষধঃরড়হ) বন্ধ হয়ে যায়। আর নিয়মিত মাসিক রজঃস্রাব হয় না। এ পরিবর্তনগুলো খুবই দৃশ্যমান। পাশাপাশি রজঃনিবৃত্তির জন্য মহিলাদের নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে থাকে। অনেক মহিলা রজঃনিবৃত্তির শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন তীব্রভাবে অনুভব করেন; এমনকি এজন্য তারা চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। পক্ষান্তরে পুরুষদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমতে থাকে। ফলে টেস্ট্রোস্টেরন ঘাটতির ফলাফল সহসা তেমনভাবে দৃশ্যমান হয় না। এজন্য এ্যান্ড্রোপজ কখন ঘটে যায় তা অনেক পুরুষই উপলব্ধি করতে পারে না। কিন্তু টেস্টোস্টেরন হরমোনের অভাবে পুরুষের যৌন চাহিদা, মানসিক শক্তি ইত্যাদি ক্রমশ পরিবর্তিত হতে থাকে। এসব পরিবর্তন সবার অগোচরে ঘটে বিধায় অনেক সময় তা সরাসরি দৃশ্যমান হয় না।

ব্যক্তি বিশেষে পুরুষের শরীরের টেস্টোস্টেরনের মাত্রার ব্যাপক ভিন্নতা দেখা যায়। কম বয়সী যুবকদের চেয়ে স্বাভাবিকভাবে বয়স্ক পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম থাকে। বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমতে শুরু করে। গড় পড়তা ৩০ বছর বয়স হওয়ার এর মাত্রা প্রতি বছর ১% করে কমে; সাধারণত ৭০ বছর বয়স্ক পুরুষের শরীরে এর মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অর্ধেক কমে যায়। কারও কারও এ মাত্রা আরও কমে যেতে পারে। স্বভাবত একজন পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরণের মাত্রা বয়স বাড়ার জন্য কমেছে; নাকি অন্য কোন রোগব্যাধির জন্য কমেছে তা মূল্যায়ন করার প্রয়োজন রয়েছে। উপযুক্ত চিকিৎসা না করলে অনেক কারণেই টেস্টোস্টেরণের মাত্রা কমে যায়, যেমনÑ নিদ্রাকালীন শ্বাস আবদ্ধতা (ঙনংঃৎঁপঃরাব ংষববঢ় ধঢ়ৎড়বধ)

একটা প্রশ্ন সবার মনেই জাগতে পারেÑ “কেমন করে বুঝব শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমেছে কি না?” সাধারণত অনেক পুুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে গেলেও তেমন কোন লক্ষণ-উপসর্গ প্রকাশ পায় না। আবার অনেকের নানা রকম লক্ষণ-উপসর্গ দেখা যায়। যেমন :

* পুরুষের স্বাভাবিক যৌনতার পরিবর্তন সাধারণত টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে পুরুষের যৌন চাহিদা হ্রাস পায়; এমনকি নপংশতা দেখা দিতে পারে। অনেকের অ-োকোষ দুটি আকারে-আকৃতিতে ছোট হয়ে যায় এবং যৌন দুর্বলতা দেখা দেয়।

* ঘুমের পরিবর্তন : টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার ফলে অনেক পুরুষের ঘুমের ধরন বদলে যায়। আবার অনেকে নিন্দ্রাহীনতায় ভুগতে পারেন।

* শারীরিক পরিবর্তন : টেস্টোস্টোরনের মাত্রা কমার ফলে পুরুষের শরীরে নানাবিধ পরিবর্তন ঘটে থাকে। যেমনÑশরীরে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়, পেশির পরিমাণ কমে যায় এবং ভারি শারীরিক কসরত করার ক্ষমতা হ্রাস পায়। এ ছাড়া হাতের ঘনত্ব কমে যায়। অনেক পুরুষের স্তন বৃদ্ধি ঘটে এবং তা ব্যথা মুক্ত হতে পারে। অনেকের মাথার চুল পড়ে যায় এবং টাক দেখা যায়। এ ছাড়া শারীরিক শক্তি ও উদ্দীপনা ব্যাপকভাবে কমে যায় এবং কেউ কেউ হঠাৎ হঠাৎ শরীরের উত্তাপের ঝলক সৃষ্টি হয় বলে অনুভব করে থাকেন।

* মানসিক পরিবর্তন : টেস্টোস্টেরনের পরিমাণ কমার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষের কর্মস্পৃহা অনেক কমে যায়। কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার পাশাপাশি অনেকে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। যৌবনের যে উৎসাহ-উদ্দীপনা, মনের জোর, সব জয় করার এক উদগ্র বাসনা টেস্টোস্টেরনের পরিমাণ কমার ফলে তা কোথায় যেন উবে যায়। কোন কাজে এককভাবে মনোসংযোগ করতে পারে না, স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে; এমনকি অনেকে বিভিন্ন মাত্রায় বিষণœতায় ভুগতে পারেন।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বয়স বাড়ার ফলে এসব শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই ঘটতে পারে। তবে অনেক সময় অন্যান্য শারীরিক অসুখ-বিসুখ, যেমন-থাইরয়েড গ্রন্থির সমস্যা, বিষণœতা রোগ, অতিরিক্ত মদ্যপান ইত্যাদি। কিংবা ওষুধ সেবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও এ রকম হতে পারে। সুতরাং একজন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যুক্তিসঙ্গত।

মহিলাদের রজঃনিবৃত্তি কোন রোগ নয়; এটা জীবনের একটি স্বাভাবিক অমোঘ পরিবর্তন। একদিন কিশোরী যেমন রজঃস্রাব শুরুর মাধ্যমে নারীতে পরিণত হন, তেমনি রজঃনিবৃত্তির মাধ্যমে তিনি জীবনে পৌঢ়ত্বের অন্য এক স্তরে উপনীত হন। নারী জীবনে রজঃস্রাব শুরু হওয়া যেমন কোন অসুখ নয়, রজঃস্রাবের নিবৃত্তিও তেমন কোন ব্যাধি নয়। একই ধারাবাহিকতায় পুরুষ পরিণত বয়সে টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার ফলে পুরুষত্বের ইতি বা এ্যান্ড্রোপজও কোন অসুখ নয়। জীবনের একটি পরিবর্তিত ধাপ বা পর্যায়। এটাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়ে জীবনের এই নতুন পর্যায়টিকে উপভোগ করা এবং আনন্দ মুখর করে তোলা আমাদের লক্ষ হওয়া উচিত। তবে এ পরিবর্তন সম্পর্কে কোন সংশয় থাকলে কিংবা টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়া নিয়ে কোন সন্দেহ থাকলে, অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। শেষ বয়সে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া পুনরায় টেস্টোস্টেরন তৈরি হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তবে কতগুলো বিষয়ে খেয়াল রাখা উপকারী:

ষ চিকিৎসকের সঙ্গে এ নিয়ে সরাসরি কথা বলা উপকারী। সমস্যাগুলো যদি বয়স বাড়ার কারণে না হয়ে অন্য কোন অসুখ-বিসুখ কিংবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে হয়, তাহলে সেটার সমাধান করা যেতে পারে।

ষ জীবনাচরণ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। যেমনÑস্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম ও শরীর চর্চা করা উচিত। সুস্থ জীবনাচরণ শারীরিক শক্তি ও মানসিক উদ্দীপনা বৃদ্ধির জন্য সহায়ক।

ষ বিষণœতার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। আগেই বলা হয়েছে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে পুরুষের কর্মস্পৃহা, মানসিক উৎসাহ-উদ্দীপনা অনেক হ্রাস পায়। এ ছাড়া বিষণœতার কারণে অনেকের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, নিঃসঙ্গ থাকতে পছন্দ করেন এবং সামাজিক কাজকর্ম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত কাজ করা প্রবণতা, অতিরিক্ত নেশা কিংবা বিপজ্জনক কাজকর্ম করাও বিষণœতার কারণে হতে পারে।

ষ বনজ ওষুধ সেবনের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এটাই খুবই পরিষ্কার যে বয়স বাড়ার ফলে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে তা গাছ-গাছড়ার পাতা-রস খেয়ে বাড়ানা যঅয় না। অনেক ক্ষেত্রেই এসব বনজ ওষুধের কার্যকারিতার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এগুলো সেবন করে যকৃত কিংবা কিডনি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। অনেকে কৃত্রিম উপায়ে টেস্টোস্টেরন জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করে থাকেন। এর কার্যকারিতা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রোস্টেস্টের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অতএব একজন উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত এ রকম ওষুধ সেবন করা উচিত নয়।

লেখক : এফসিপিএস (মেডিসিন), এফএসিপি. পিএইচডি, এফআরসিপি (এডিন)

অধ্যাপক (চলতি দায়িত্ব ও বিভাগীয় প্রধান

মেডিসিন বিভাগ

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ